সম্পাদকীয়

লাঠির মহিমা
গতকাল ছিল সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্মদিন। ১৮৩৮ খ্রীষ্টাব্দের ২৬শে জুন তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর লেখার যে বিষয়টি আমার সবচেয়ে ভালো লাগতো, সেটি হলো উনার শব্দচয়ন। তখন বাংলা ভাষাটা হয়তো সহজ ছিল না, কিন্তু খুব সুন্দর ছিল। বাঙালির অন্যতম এক সঙ্গী লাঠি। আজ যখন বিভিন্নভাবেই লাঠির ব্যবহার হ্রাস করা হচ্ছে, তখন মায়ের কাছে গল্প শুনি আগে প্রতিটি বাড়িতে লাঠি থাকতো আত্মরক্ষার জন্য। লাঠি তখন মানুষকে এক আলাদাই সাহস যোগাতো। বৃদ্ধ হলেই যে লাঠি নিয়ে হাঁটতে হবে, এমন ব্যাপার ছিল না। মাইলের পর মাইল হাঁটতে লাঠি দিত গতি, দিত পথ কুকুরের হাত থেকে সুরক্ষা। আজকাল তো বৃদ্ধ বৃদ্ধারাও সঙ্কোচ করেন লাঠি ব্যবহারে। আমরা স্কুলজীবনটা কাটিয়েছি লাঠি তথা বেত্রাঘাতের ভয়ে ভয়ে। পড়াটা করে যেতেই হবে স্কুলে। অথচ সেই লাঠি বা বেত ব্যবহার এখন লুপ্ত। তাই পড়াশোনার মানটাও কমেছে। লাঠির আঘাত পড়ার পর শিক্ষকদের যে ভালোবাসাটা পেতাম, তা থেকেও এখনকার প্রজন্ম বঞ্চিত। এ তো গেলো এখনকার কথা। কিন্তু সেই সময়েই লাঠির ব্যবহার হ্রাস পাওয়া নিয়ে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় হাহুতাশ করে গেছেন। লাঠি নিয়ে তিনি কিছু কথা লিখেছিলেন দেবী চৌধুরানী উপন্যাসে। সেই অংশটি হুবহু তুলে দিলাম। কারণ পাঠককে আবারো সেই অসাধারণ সুন্দর শব্দগুলো থেকে বঞ্চিত করতে চাই না।
“হায় লাঠি! তোমার দিন গিয়াছে! তুমি ছার বাঁশের বংশ বটে, কিন্তুশিক্ষিত হস্তে পড়িলে তুমি না পারিতে, এমন কাজ নাই। তুমি কত তরবারি দুই টুকরা করিয়া ভাঙ্গিয়া ফেলিয়াছ, কত ঢাল-খাঁড়া খণ্ড খণ্ড করিয়া ফেলিয়াছ – হায়! বন্দুক আর সঙ্গীন তোমার প্রহারে যোদ্ধার হাত হইতে খসিয়া পড়িয়াছে। যোদ্ধা ভাঙ্গা হাত লইয়া পলাইয়াছে। লাঠি! তুমি বাঙ্গালায় আব্রু পর্দ্দা রাখিতে, মান রাখিতে, ধান রাখিতে, ধন রাখিতে, জন রাখিতে, সবার মন রাখিতে।”বিদেশীরা”তোমার ভয়ে ত্রস্ত ছিল, ডাকাইত তোমার জ্বালায় ব্যস্ত ছিল, নীলকর তোমার ভয়ে নিরস্ত ছিল। তুমি তখনকার পীনাল কোড ছিলে – তুমি পীনাল কোডের মত দুষ্টের দমন করিতে, পীনাল কোডের মত শিষ্টেরও দমন করিতে এবং পীনাল কোডের মত রামের অপরাধে শ্যামের মাথা ভাঙ্গিতে। তবে পীনাল কোডের উপর তোমার এই সরদারি ছিল যে, তোমার উপর আপীল চলিত না। হায়! এখন তোমার সে মহিমা গিয়াছে। পীনাল কোড তোমাকে তাড়াইয়া তোমার আসন গ্রহন করিয়াছে – সমাজ-শাসন-ভার তোমার হাত হইতে তার হাতে গিয়াছে। তুমি, লাঠি! আর লাঠি নও, বংশখন্ড মাত্র! ছড়িত্ব প্রাপ্ত হইয়া শৃগাল-কুক্কুর-ভীত বাবুবর্গের হাতে শোভা কর; কুক্কুর ডাকিলেই সে ননীর হাতগুলি হইতে খসিয়া পড়। তোমার সে মহিমা আর নাই। শুনিতে পাই, সেকালে তুমি নাকি উত্তম ঔষধ ছিলে – মানসিক ব্যাধির উত্তম চিকিৎসকদিগের মুখে শুনিতে পাই, ‘মূর্খস্য লাঠ্যৌষধং।’ এখন মূর্খের ঔষধ ‘বাপু’ ‘বাছা’ – তাহাতেও রোগ ভালো হয়না। তোমার সগোত্র সপিণ্ডগণের মধ্যে অনেকেরই গুণ এই দুনিয়াতে জাজ্বল্যমান। ইস্তক আড়া বাঁকারি খুঁটি খোঁটা লাগায়েৎ শ্রীনন্দনন্দনের মোহন বংশী, সকলেরই গুণ বুঝি – কিন্তু লাঠি! তোমার মত কেহ না। তুমি আর নাই – গিয়াছ। ভরসা করি, তোমার অক্ষয় স্বর্গ হইয়াছে; তুমি ইন্দ্রলোকে গিয়া নন্দনকাননের পুষ্পভারাবনত পারিজাত-বৃক্ষশাখার ঠেকনো হইয়া আছ, দেবকন্যারা তোমার ঘায় কল্পবৃক্ষ হইতে ধর্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষরূপ ফল সকল পাড়িয়া লইতেছে। এক আধটা ফল যেন পৃথিবীতে গড়াইয়া পড়ে।”
(দেবী চৌধুরানী-বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়)
সায়ন্তন ধর