গল্পেসল্পে সুবল দত্ত – ৩

এক উত্তরাধিকারের সংরক্ষণ কাহিনি 

আজ শুধু ধ্বংসকে জাগানো,আর ধ্বংসের ভিতরে জেগে থাকা (বিকাশ গায়েন)

ব্রীজটা এত নিচু যে মাঝ বরাবর ওর উপর দিয়ে জল বইছে। বর্ষাতে নিশ্চয়ই পুরোটা জলের তলায়। পুরোনো আমলের ইঁটএর তৈরি সেতু মাঝখানটা বসে গেছে তবু টিকে আছে। একটু একটু করে এগোতেই হাঁটু অব্দি ডুবে গেল। স্রোতের টান এত যে পা খুলে যেতে চায়। ব্রীজ ছেড়ে রাস্তা ধরতেই পুরোনো প্রাসাদের মতো বাড়িটা দেখা গেল। অন্ধকার ভুতুড়ে নিঃসঙ্গ একটা জমিদার বাড়ি। এই এলাকার ইঞ্চি ইঞ্চি তার চেনা। এই কথা মনে আসতেই আবেগে তার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে এল। দীর্ঘ দিন স্মৃতি বিপর্যয়ের পর এখন সবকিছুই তার কাছে জলজ্যান্ত মনে হতেই সে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিল। পঁচিশ বছর বয়েসের কচি যৌবনকালে সে রাজকুমার হয়ে এই এলাকায় ঘুরে বেড়াতো। সেই অহমিকায় জোরে জোরে চিত্কার করে গান জুড়ে দিল। উই শ্যাল ওভারকাম …। কিন্তু গলা দিয়ে মোটেই আওয়াজ বেরল না। তাই চুপ করে গেল। গেটের কাছে আসতেই গা শিরশির করে উঠল।এক দমকা হওয়া। খড়মড় শব্দে শুকনো ঘাসের ঘূর্ণি ঝড় তার চারপাশে ঘুরপাক খেয়ে চলে গেল। সারা গা তার আবর্জনায় ভরে উঠল। একে অন্ধকার,তায় বিশাল কালো অট্টালিকা। একটা সাদা খরগোশ দৌড়াতে দৌড়াতে তার পায়ের কাছে। কিছু বুঝতে না বুঝতে হঠাত্‍ দেখে একটা কালো মতন কি যেন লাফ দিয়ে তার পায়ের কাছ থেকে খরগোশটাকে ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। তার রিফ্লেক্স এখন এত বেশি ক্রিয়াশীল হয়েছে যে তক্ষুনি সে সবুট লাথি ঝেড়ে কসালো। ছাড়া পাওয়া খরগোশ ও সেই বুনো শেয়াল দুটো দুদিকে দৌড়। এখানে শব্দহীন মৃত্যু মৃত্যু খেলা। মৃত্যুর দৃশ্য থেকে জীবন রক্ষা। শরীরে ও মনে যেন যৌবন এসে গেছে। এমনিই হালকা লাগছে নিজেকে। কাঁধের ভারী ব্যাগটা লোহার গেটে ঠেস দিয়ে রাখতেই গেটটা কেঁপে উঠল। সে নিশ্চিত যে ভিতর মহলে কেউ নেই। কারোর থাকার কথা নয়। কেননা হি ইজ দ্য লাস্ট এম্পেরর। তাই জ্ঞাতে অজ্ঞাতে একটা প্রেরণা তাকে ইতিহাস সংরক্ষণে উদ্বুদ্ধ্ব করেছে। কিন্তু একমাত্র উত্তরসূরী হওয়ার অহংকার তাকে চিত্কার করে ‘কে আছ? কে আছ?’ বলতে বাধ্য করছে,ভিতর থেকে কেউ যেন প্ররোচিত করছে। তিনচার বার গলা ফাটিয়ে চিত্কার করার চেষ্টা করল কিন্তু গলা দিয়ে হাঁফানির মত খেসখেসে হাওয়া বেরল। অবশেষে ক্লান্ত হয়ে থেমে গেল। গলা শুকিয়ে কাঠ। একে তো ডায়াবেটিস, তার উপর এতদিন সে ছিল মাথার ভিতরে অচেতন অন্ধকারে একা, আবার এখন সে বাইরের বিস্তীর্ণ চেতনাহীন অন্ধকার পরিবেশে একা। যদি পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ হিংসার আবর্তে পুড়ে নিঃশেষ হয়ে যায়,যাক। কিন্তু কিছু মানুষের জাগতিক প্রগতি নীরবে এগিয়ে নিয়ে যাবার প্রচেষ্টা তো বেঁচে থাক! ভারী ব্যাগটা উঠিয়ে নিতেই লোহার সিংহদ্বার আবার নিঃশব্দে কেঁপে উঠল। অন্ধকার দৈত্যের মতো বাড়িটার ছাদের উপরে একটা সবুজ আলো আলেয়ার মত জ্বলে উঠে নিভে গেল যেন? সে অপেক্ষা করল আরো কিছু দেখার কিন্তু বহুক্ষণ ধরে অপেক্ষা করেও আর কিছু দেখা গেল না। নাঃ নিশ্চয়ই এটা ভ্রম। লম্বা লম্বা পা ফেলে টেরাকোটার কারুকাজ করা জাফরিওলা উঁচু একটা জানলার কাছে গেল। ভিতরে কাঁচ বসানো বন্ধ কবাট। খুব কাছে চোখ রেখে ভেতরটা দেখার চেষ্টা করলো। কঠিন আঁধার। দরজার দিকে সরে এল সে। বিশাল দরজা। ভারী কাঠে স্টিলের মোটা মোটা পাত্তি বসানো,মাঝে মাঝে বড় গোল গোল কিল বসানো। এত ভারি ও নিশ্ছিদ্র বন্ধ দরজা মাছি পর্যন্ত গলে যাবার উপায় নেই। সে আশ্বস্ত হল।

দীর্ঘ তিরিশ বছরের উপর হল সে এখানে নেই। এখান থেকে বিদেশ যাবার আগে যেমনটি সে ছেড়ে গেছিল ঠিক তেমনটিই আছে। শুধু আপন কয়েকজন নেই আর মস্ত বড় বড় শাল ইউক্যালিপটাস আর খেজুর গাছের জঙ্গল হয়েছে। চুনসুরকির পুরোনো দেওয়াল কয়লার মতো কালো হয়ে গেলেও টসকায়নি একটুও। ঘরের ভিতরে কি কোথায় ছিল চোখ বন্ধ করে এখন বলে দিতে পারে। এখন তা আদৌ আছে কি না তা কিন্তু সে জানেনা। ছেড়ে যাওয়ার আগে কয়েকটা পুরোনো মেহগনি কাঠের পালঙ্ক মস্ত বড় বড় পেণ্টিংস আয়না কিছু এন্টিকস একটা ভারি রূপোর গড়গড়া।

এইসব চিন্তা করতে করতে ভারী তোরণ দরজা একটু ঠেলতেই নিঃশব্দে খুলে গেল। একটু অবাক হল কিন্তু সহজ ভাবেই মেনে নিলো সেটা। তিরিশ বছর কম সময় নয়। তার মাঝে কি হয়েছে না হয়েছে সে কি করে জানবে। কিছুক্ষন ব্যাগের দিকে তাকিয়ে থেকে ঝিম মেরে দাঁড়িয়ে রইল। ধীরে ধীরে তার বহুদিনের সংকল্প জোরদার হয়ে উঠল মাথার ভিতরে। মাথায় আঘাতে মস্তিষ্ক বিকল হওয়ার পর কেবলমাত্র আ আ আ শব্দ জনিত যত জ্ঞান বুদ্ধি বিদ্যা সব তার মাথায় ভিড় করত। বাদবাকি সব কিছু শূন্য। আর একটা ছবি সমানে চোখের সামনে ভাসতো। সেটা হল এই মহলের বাইরে একটা চৌবাচ্চা। যেটাতে তিন চার রকমের পদ্মফুল ফুটতো। এখন তো সব জলের মতন পরিষ্কার মনে পড়ছে। সেই চৌবাচ্চাটি খুব একটা গভীর নয়। তার পাশেই একটা আন্ডারগ্রাউন্ড গুদাম ঘর। ওরা ওটাকে বলত ঠান্ডা ঘর। সেখানে জরুরী অবস্থার জন্য প্রাকৃতিক নিয়মে শস্য মজুদ থাকত। বস্তা বস্তা চাল সেখানে জমা থাকতে দেখেছে। এমন গোপন ঘর যে বাইরের লোকের হদিস পাওয়া দুরূহ ব্যাপার ছিল।

ভিতরে ঢুকে খুব সাবধানে এদিক ওদিক থাকলো। অন্ধকারে কিছুই দেখা যায় না। সে ভিতরে ঢুকে পিঠ দিয়ে ভারী দরজা বন্ধ করলো। ঘরটা তার অতি পরিচিত। চোখ বন্ধ করে যে কোনো যায়গায় যেতে পারে। কিন্তু এমন স্বতঃস্ফুর্ত জ্যোতিপ্রভাময় পোশাক পরে আছে যে সে তার পরিসর অব্দি কিছুটা দেখতে পাচ্ছে। বাঁদিকে সরে সরে ঘরের কোণার দিকে এগিয়ে গেল। কোণার দিকে দেওয়ালে হাত বোলাতেই ভাঙ্গা গর্তে হাত ঠেকল। এখানে একটা ভারী মস্ত বড় বেলজিয়ামের আয়না ছিল। ফ্রেমটা ছিল ভারী রূপোর। কেউ দেওয়াল ভেঙে নিয়ে গেছে। আর একটু এগিয়ে গিয়ে বাঁ দিকে একটা করিডোর দেখতে পেল। এটা পুজোর ঘর যাবার রাস্তা। এর ডান পাশে একটা চওড়া সিঁড়ি দোতলায় চলে গেছে। একটু গিয়েই দোতলা যাবার সিঁড়ি উঠতে লাগল। একটু যেন এসিডের গন্ধ ! না ঠিক এসিড নয় কেমন বারুদ পোড়া গন্ধ। নাঃ তা নয়। মন থেকে ঝেড়ে ফেলল সন্দেহ। বহুদিন ধরে কোন মৃত কিছুর পচনের পর সেখানে শেষ গন্ধটা এমনই হয়।

দোতলার বাইরের বারান্দা দিয়ে এগিয়ে একটা বড় বৈঠকখানাতে একটা বস্তায় বাঁধা বড় কিছুতে হোঁচট খেয়ে বসে পড়ল। ওর ব্যাগ একদিকে আর ও একদিকে। কোমরের কাছটা কোনও ধারালো কিছুতে কেটে গেছে।একটু নিজের উপর রাগ। হালকা হলেও তো সব কিছু দেখতে পাচ্ছিল,তবে সাবধান হল না কেন? ভাল করে তাকিয়ে দেখে সেখানে প্রচুর ওই রকমের ছোট বড় বস্তা ও প্যাকিং কার্টুন ভর্তি। দেওয়াল ঘেঁষে বৈঠকখানার ওপারে ঘরগুলোও দেখল সেইসব জিনিসে ভরা। শেষে সিঁড়ির কাছের ছোট ঘরে ঢুকতেই সেই বড় বড় লোহার পাইপগানগুলো দেখতে পেল। যেগুলো সে ব্রিজের ওপরদিয়ে মার্চ করে লোকগুলোকে বয়ে নিয়ে যেতে দেখেছে।

মাথাটা আবার ঝিমঝিম করতে শুরু করেছে। চারপাশে ফ্যাকাশে লাল হলুদ রঙ চরকির মত ঘুরছে। চোখের সামনে সেই সুন্দর চৌবাচ্চায় রাশি রাশি পদ্মফুল ফোটা দেখতে পাচ্ছে সে। কিন্তু না। ভিতর থেকে অবচেতন মনে গেঁথে থাকা সংকল্প তেড়েফুঁড়ে উঠল। অনেক কাজ বাকি আছে। অনেক কাজ বাকি। লম্বা লম্বা পা উঠিয়ে দোতালার সব ঘরগুলোতে ঘুরে ঘুরে নুয়ে পড়ে হাত বুলিয়ে দেখতে লাগলো জিনিসগুলো। বারুদ হ্যাণ্ড গ্রেনেড মেশিনগান রাইফেল কি নেই ! হঠাত্‍ আবার শূন্য হয়ে গেল মাথা। ভুল হয়ে গেল কোথায় আছে সে। মাথা চেপে বসে পড়ল বারুদের উপরে।

ক্রমশঃ

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।