কর্ণফুলির গল্প বলায় সৌমেন দেবনাথ (প্রথম পর্ব)

দুই বসন্ত
বয়স গেছে কিন্তু যৌবন যায়নি। আজো আঙুররঙা টসটসে দেহতনু। এখনো অদ্ভুত মাদকতা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে সর্ব অবয়বে। বড় বেশি আবেদনময়ী মহিলা। কেউ বলবেন না উনি বাইশ-তেইশ বছরের এক কন্যা সন্তানের জননী। আজো লাগে সেই কুড়ি বছরের মতো। আটোসাটো শরীরের গাঁথুনী।
আপেলের ন্যায় রাঙা জাহ্নবীর স্বামী মারা গেছেন বছর পনের আগে। সেই থেকে সংসারের জোয়াল কাঁধে নিয়েছেন তিনি। কিন্তু এতটুকু তার আঁচ পড়েনি শরীরে। যেন সোনার শরীর, শত তাপ আর চাপে উজ্জ্বলতা বাড়ছে। বিকেলের সোনারোদ শরীরে পড়লে শরীরটা হয়ে যায় শিল্পীর নিপুণ হাতে তৈরি অকল্পনীয় ছবি।
স্বামী মারা যাওয়ার সাথে সাথে গ্রামবাসী জাহ্নবীকে নিয়ে কত বাজে মন্তব্য করেছিলেন। মালবী বৌদি কটাক্ষ করে বলেছিলেন, বর মরেছে ঘরের অভাব হবে না। যেমন সুন্দরী হয়ে জন্মেছে বর যাবে বর পাবে।
স্বামীহারা এক বৌয়ের মনের অবস্থা বোঝার চেয়ে তাঁর ঘাড়ে নানা অপবাদের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছিলেন গ্রামবাসী। কাকলির মা বলেছিলেন, বর মরেছে, দেবরের অভাব আছে নাকি! গ্রামের সব ছেলেই তার দেবর, বর মেরেছে দেবরদের জন্যই। ঘরের বৌ পরের সাথে এত আলাপ করে এই মহিলাকে না দেখলে বিশ্বাসই হতো না।
মাটির পুতুলের সৌন্দর্য আছে, রূপ-রং লাবণ্যও আছে, প্রাণের স্পন্দন নেই। জাহ্নবীও মাটির পুতুলের মতো প্রাণের স্পন্দনহীন রূপ লাবণ্যের একজন হয়ে গেলো। সবাই যে কটাক্ষ করতেন, বা শত্রুপনা করতেন তা নয়। কেউ কেউ এসে সান্ত্বনাও দিয়ে যেতেন। সুভদ্রার মা এসে জাহ্নবীকে সান্ত্বনা দিতেন, বলতেন, মেয়েদের জীবন এমনি দিদি। স্বামীহীন কানাকড়ির চেয়ে মূল্যহীন। স্বামীই সম্বল, স্বামীহীন নিঃসম্বল। মেয়েরা লাউয়ের ডগা। খুঁটি পেলেই আঁকড়ে বাঁচে। মেয়েটাকে কোলে পিঠে মানুষ করো।
জাহ্নবীর চোখ দিয়ে জল ঝরতো। প্রথমে রাকেশকে সহ্যই করতে পারতো না জাহ্নবী। বাবা তাঁর অমতে তাঁকে বিবাহ দিয়েছিলেন, একারণে বাবা ও রাকেশকে ইচ্ছামত বকতেন। অপমান করতেন। প্রতিবেশীরা জাহ্নবীর সম্বন্ধে জেনে গেলে রাকেশ পথে প্রান্তরে বন্ধুদের দ্বারা টিটকিরির স্বীকার হতেন। পবন তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে বলেছিলেন, কিরে বৌ বকে! কেমন পুরুষ! পুরুষ নামের কলঙ্ক! বৌ বকবে কেন? বৌ থাকবে জব্দ।
রাকেশ মানুষের কথা শুনেও না শোনার ভান করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, সময়ের সাথে সাথে সব ঠিক হয়ে যাবে। সময় সবচেয়ে বড় শিক্ষক।
মনকে বুঝ দিতেন রাকেশ। জাহ্নবীর মন বোঝার চেষ্টা করতেন। কোল আলো করে স্নেহা আসলো। রাকেশ ভেবেছিলেন এবার জাহ্নবী ভালো হয়ে যাবে। কিন্তু তার লক্ষণ তিনি দেখলেন না। মনকে বুঝ দিলেন, ওর চরিত্রই হয়ত এমন, একটু রগচটা। কিন্তু যেদিন তাঁর সম্পর্কের কথা শুনলেন সেদিনই রাকেশ খুব ভেঙে পড়েছিলেন। হঠাৎ করে রাকেশ মারা যান। যে মানুষটাকে জাহ্নবী সহ্যই করতে পারতেন না তাঁর মৃত্যুতে জাহ্নবী কী কান্নাকাটিই না করেন। মালবী বৌদি কাটাক্ষ করে বলেছিলেন, দেখো, কী মায়াকান্না। কত অভিনয় জানে এই বাজে মহিলা!
কাকলির মা বলেছিলেন, স্বামীকে অসহ্য করলে স্বামীর মন-মানসিকতা ভালো থাকে? মানসিক পীড়ায় স্নেহার বাবা মারা গেছেন। নাও স্নেহার মা, যাকে সহ্য হতো না সে বিদায় নিয়েছে। তোমার হাড় জুড়ালো তো!
রুহিনীর পিসি বলেছিলেন, অতি সুন্দরী তো, রাকেশে মন ভরেনি। নে, এবার নায়ক ধরে বিয়ে করিস।
মালবী বৌদি তীর্যক চেয়ে বলেছিলেন, বাসি ভাত খাবার জন্য কাক বসে আছে! বিয়ে?
কাকলির মা বলেছিলেন, পুরুষ মানুষ চেনো না বৌদি, সুন্দর দেখলে সরে না। ভেবো না জাহ্নবী পড়ে থাকবে!
রুহিনীর পিসি বলেছিলেন, এবার বুঝবি বাস্তবতা কী?
এরপর পনের ষোল বছর চলে গেছে। জাহ্নবী মেয়েকে মানুষ করে তুলেছেন। একা থাকলেই কাঁদেন। মেয়ে প্রশ্ন করলেই কাঁদেন। স্বামীহীন নারীর জীবন আসলেই কঠিন। স্বামীহীন পথ চলা নারীর কত কঠিন উনি হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন, পাচ্ছেন। মা মেয়ে একত্রে ঘর থেকে বের হলে মানুষজন মেয়ের দিকে না তাকিয়ে মায়ের দিকেই বেশি তাকান। আর ভাবেন, নিরেট মহিলা। কোনো অপূর্ণতা উনার মাঝে নেই। জীবনের মাস্তুল বেয়ে দিনগুলো হুহু করে পার হয়ে গেলেও যৌবন তাঁর দেহ থেকে আজো বিদায় নিতে চায় না। যেদিক দিয়ে হেঁটে যান পিছন দিয়ে নদীতে ঢেউ উঠে, গাছে গাছে ঝড় বয়। এখন কত সংযত থাকেন, পোশাক-পরিচ্ছদে নেই আড়ম্বতা। তবুও মানুষের নজর আটকে যায় তাঁর দেহ-প্রকোষ্টে। যথেষ্ট সংযত হয়ে পথে ঘাটে বের হন। আর ভাবেন মনে মনে, স্বামী থাকলে তাঁর হাত ধরে তাঁকে সম্বল করে পথে উঠতে পারতেন। সম্বলটি ভেঙে গেছে। আজ তাঁকে সম্বল করে তাঁর মেয়ে পথে উঠে। মেয়ে মাকে সম্বল করে যেখানে মা নিজেই বেশি সহায়হীনা। আয়ত গভীর চোখ। চোখে যে মায়ার মেলা তা আর মেলে ধরেন না। চশমা পরেন। মাঝে মধ্যে মেয়ের সাফল্য শুনলে একটু ঠোঁটে হাসেন। কী অদ্ভুত রূপ সৃজন হয় তখন। ঠোঁটে লেগে থাকা হাসির জ্যোৎস্না দেখে স্নেহা বলে, মা, তুমি পৃথিবীর সেরা মা।
জাহ্নবী থেমে যায়, রূপের প্রশংসা শুনে শুনে তিনি বিষিয়ে গেছেন। নিজের রূপকে যত আড়াল করতে চান তত তাঁর রূপ প্রকাশ পেয়ে যায়, মেলে যায় রূপ ততোধিক। নিজের রূপের প্রতি তাই বিতৃষ্ণা জাগে আজ তাঁর।
আজ কলেজ থেকে ফিরে স্নেহা মায়ের উপর খুব চটেছে। মাকে বললো, মা, কাকলির মা কাকলিকে বলেছেন তুমি নাকি আমার বাবার মৃত্যুর জন্য দায়ী?
জাহ্নবী বললেন, এসব কী বলছিস মা!
স্নেহা আরো বললো, আমার বাবাকে একদিনও শান্তি দাওনি নাকি, কেনো? আমাকে কেনো পিতৃহারা করেছো?
জাহ্নবী কিছু বলতে চাচ্ছিলেন। স্নেহা না শুনে নিজ ঘরে চলে গেলো। জাহ্নবী মেয়ের পিছন পিছন মেয়ের ঘরে এসে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, তোর দাদু আমাকে তোর বাবার সাথে জোর করে বিয়ে দেন।
মাকে থামিয়ে স্নেহা বললো, তুমি প্রেম করতে!
জাহ্নবী চুপ হয়ে গেলেন। বড় ঘরের মেয়ে ছিলেন জাহ্নবী। ছোটবেলাতেই বোঝা গিয়েছিলো জাহ্নবী একদিন মিস ডায়ানাকেও সৌন্দর্যে হার মানাবেন। ক্লিও-প্রেট্রাও তাঁর রূপের কবলে পড়ে সেরা সুন্দরীর মুকুটটা নিজ হাতেই জাহ্নবীকে তুলে দেবেন। ধারণাটা সত্যের চেয়েও আরো সত্যে পরিণত হয়। অভাবের তাপ লাগেনি শরীরে, সংকটের মুখে পড়েনি এক মুহূর্তের জন্য, এমনি পরিবেশে বেড়ে উঠেন তিনি।
জোড়া ভ্রু’র মাঝে তারা ফুলের খসে পড়া পাপড়ির মতো সরু টিপ থাকতো। চোয়ালের ধার জুড়ে ক্ষুদ্রকায় সোনালী পশম বিকেলের হালকা আলোয় চিকমিক করতো রেশমের মতো। স্বর্ণের এক ফালি চেন কচি বুকের উপর বাঁক খেতো। দুলতো দামী দুল কানের পাতায়। সৈকতের বালির মতো নাকে নোলক ঝিকমিক করতো যা আজ তিনি ইচ্ছাপূর্বক এবং বাধ্যতামূলক ভাবে দেহ থেকে সরিয়ে ফেলেছেন। বিবাহের পূর্বে জাহ্নবীর বাড়ির আশেপাশে অনেক যুবকের ভিড় জমতো। সকলে তাঁকে এক নজর দেখবেন বলে এপাশ দিয়ে ওপাশ দিয়ে ঘুরতেন। কেউ একটু কথা বলার জন্য ফিটফাট হয়ে আসতেন। চোখে চোখ পড়লে নিঃশেষ হয়ে যেতেন কেউ কেউ। রূপের আগুন এমনি; শরীর থেকে খসে পড়া উড়না টেনে অতিকায় সুন্দর মনোরম বুকটা ঢাকতে ঢাকতে সবাইকে পিছনে তৃষ্ণার মাত্রা বাড়িয়ে চলে যেতেন অন্দর মহলে। আড়ালে গেলে আস্ফালন যেত দ্বিগুণ বেড়ে। দীঘির মাঝে এ এমনি একটি পদ্ম ছুঁতে পাওয়া ছিলো তো অকল্পনীয়। এক পলক দেখতে পাওয়া সৌভাগ্যের ছিলো। বড় খেয়ালি ছিলেন জাহ্নবী। খেলার ছলে একটু দেখা দিয়ে যেতেন। কেউ যদি সেটুকু দেখতে পেতেন, তবে তিনি বলতেন, দূরেই থাকো, কাছে এলে আবার হারিয়ে যাবে। আশায় থাকা ভালো, আশা ফুরায় না।
ধন্যবাদ ও কৃতঙগতা