আজ মাসের শেষ লকডাউন । একটু আগেই পুলিশের বড় ভ্যান গাড়িটি টহল দিয়ে গেলো ।
পাড়ার মোড়ে জটলা হচ্ছিল । পাড়ার মাতব্বর মধুসূদন সামন্ত মুখে মাস্ক না পরেই বেশ তর্ক করছিলেন গোপীর সাথে ।
ব্যাস । পুলিশ ভ্যান থেকে বড় বাবু নেমে সোজা গাড়িতে তুলে নিলো মধু মাতব্বর কে । সদ্য বাবা হওয়া বিকাশ বাবু ছেলেকে দোলনায় ঘুম পাড়িয়ে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে এসব দেখছিলেন ।
এপাড়ার বনেদি পরিবারের ছেলে । তাঁর স্ত্রী মনোরমা দত্ত একজন গাইনি ডক্টর । দুমাস হলো তাঁদের সন্তান হয়েছে ।
কদিন থেকেই কোভিড হাসপাতালে ডিউটি করছে । টানা পনেরো দিন । তাই একা একা অনেকটা সময় ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে মানুষ দেখে সময় কাটান বিকাশ বাবু । তাঁর অফিসও ছুটি ।
আজকাল বড্ড রাজনীতি হচ্ছে এই কোভিড নিয়ে। অথচ যাঁরা প্রথম সারির কোভিড যোদ্ধা তাঁদের নিয়ে কে বা মাথা ঘামাচ্ছে ?
পুলিশ আর স্বাস্থ্য কর্মী এরাই তো সব এই যুদ্ধে । এসব কথা ভাবতে ভাবতে হাতে ধরা সেল ফোনটা বেজে উঠলো ।
ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে ভেসে এলো এক খুব পরিচিত কণ্ঠস্বর । কিন্তু বুঝতে পারছেন না বিকাশ বাবু । কেননা একটা দুশ্চিন্তা সব সময় থেকেই যাচ্ছে এই করোনা কালে ।
‘ কিরে চিনতে পারিস নিতো ? মিতা । ‘
তোরা কেমন আছিস ? আমি তো সেই লকডাউনের আগে মেলবোর্ন এ এসে আটকে গেছি।
হ্যা বুঝলাম তুই আমাদের মিতা । বল ? কী বলছিলি ?
আজ সকালের গেজেটে তোর ডাক্তার বৌ এর একটা ছবি দেখলাম সাথে খবর । দেখে বুকটা ফুলে উঠলো মিসেস দত্তর জন্য । ‘
বিকাশ বাবু বললেন কী বলছিস ? কী করেছে সে ?
কেন জানিস না ?
সেই গেজেটে লেখা ‘ দি গ্রেট ডক্টর মিসেস মনোরমা দত্ত ‘
পরে পড়ে জানলাম , উনি কোভিড হাসপাতালে ডিউটিরত অবস্থায় নিজের স্তন্য পান করিয়ে এক কোভিড মায়ের শিশু সন্তান কে বাঁচিয়ে দিয়েছেন । টানা সাত দিন ।
বাহ রে এতো কিছু আমি তো টেরই পেলাম না ।
আমাদের সন্তান কে তো আমি নিয়ে গিয়ে দুবেলা ওর ব্রেস্ট মিল্ক খাইয়ে আনতাম ।
জাস্ট সারপ্রাইজ !
সত্যিই মহৎ রে মিতা তোর বৌদি । আমাকে কিছু জানায় নি । আর লোকাল কোন খবরই হলোনা এটা নিয়ে ।
সামনের মাসে হয়তো এখান থেকে ফিরতে পারবো । বৌদি এলে বলিস । আজ রাখি ।ফোন বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় ।
বিকাশ বাবু ব্যালকনির ফাঁক গলিয়ে যতদূর দৃষ্টি যায় শহর টাকে দেখলেন । এই শহরের বুকেই কত কাণ্ড ! হঠাৎ ভিতর থেকে বাচ্চার কান্নার আওয়াজ ভেসে এলো । বিকাশ বাবুর চোখে ভেসে উঠলো এক স্নেহময়ী নারী মুখ ।