এই অদ্ভুত লাল ডিম্বাকার গম্বুজটি যে তার জীবনের প্রথম জীবিকাঘর হবে এটা স্বপ্নেও ভাবেনি সে। বিশাল এরিয়া জুড়ে সমতল সবুজ ঘাস। মধ্যিখানে অফিস। এই ঘাস জেনেটিক্যালি মডিফায়েড। ছাঁটতে হয়না জল দিতে হয়না মরেও যায়না। রাশি একটা ছোটো ভ্যান কার চালিয়ে এখানে এসেছে। গাড়িটা কোনো জ্বালানিতে চলেনা। মানসিক শক্তিতে চলে। ড্রাইভিং করতে হয়না। অটো এক্টিভিটিতে চলে। রাশির ইন্টুইশনের সাথে যোগ থাকে বলে দুর্ঘটনা নেইই বলা যায়। ভ্যানটাতে ভয়েস রেকগনেশন সিষ্টেম আছে। ওটাকে বলে দিতেই সুড়সুড় করে নিজে নিজেই ফোল্ড হয়ে চাকাগুলো ছোটো হাতবল হয়ে নিজে থেকেই স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে পড়ল।
বাইরেটা লাল হলে কি হবে ভিতরটা অসম্ভব সাদা। পরপর অনেকগুলো সিকিউরিটি চেকিং। অবশ্য ওরা সবই যন্ত্র। কোনোটাতে ছোটো আয়নায় চোখের মণির ছাপ কোথাও হাতের ছাপ আর কোথাও ব্রেন স্ক্যানিং। এইসব পার হয়ে এক বিশাল হলঘরে ঢোকার আগে রাশি দেখল একটি পারদর্শী দুয়ার আগলে দুজন সাদা পোশাকে দাঁড়িয়ে। ওরা দুজন হুবহু একরকম দেখতে। ওদের এখন কাজ কি তা অবশ্য রাশির এপয়েণ্টমেন্ট মেইলে লেখা আছে। প্রথমজন একটু হেসে অভিবাদন করে রাশিকে জড়িয়ে ধরতেই বুঝল ও একজন মানুষ। সে রাশির হৃদয়ের কোমলতা প্রেমভাব স্পর্শকাতরতা মেপে নিলো। চোখে চোখ রেখে তার সব আইডি কার্ড নম্বর ভেরিফাই করে নিল। আজকাল সেই প্রি মডার্ন যুগের মতো কার্ডগুলো সঙ্গে রাখতে হয়না। ভার্চুয়াল পাসপোর্ট আধার কার্ড প্যান কার্ড সব চোখের মণিতে সেভ করে রাখা হয়। এরপর দ্বিতীয়জন এগিয়ে এসে হাত মেলালো। স্পর্শে ও দেখে এতটুকুও বোঝা যায়না সে একটি রোবট। কিন্তু রাশি জানে ওর মস্তিষ্ক একটি যন্ত্র। রাশির চোখে চোখ মিলিয়ে তার মানসিক স্থিতি স্ক্যান করে নিল। রোবট সমানে কথা বলে যাচ্ছে। ‘ম্যাডাম রাশি, এই সিলিকন ডোমে আপনাকে স্বাগত। আপনি সমস্ত চেকিং ও টেস্টে উত্তীর্ণ হয়েছেন। ব্যাস একটু প্লিজ। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করে রিলাক্স করুন। আমি আপনার পার্সনালিটি বারকোড রিপোর্ট ডাউনলোড করছি। এই বারকোড দু লক্ষ ভাষা, বিচার ও সংকেত দিয়ে বানানো প্রোগ্রাম। আপনার মস্তিষ্কে স্টোর হওয়া সমস্ত তথ্য ও আপনার জিনের সমস্ত তথ্য স্ক্যান করা হবে। এখন আপনার মাথার ভিতরে একটা সিম্ফনী মিউজিক বাজবে। একটা যেকোনো ফুল মনে মনে দেখতে থাকুন এবং মনে মনে ও হম ও হম ও হম ও হম এই শব্দ জপতে থাকুন’।
রাশিকে তাই করতে হল। রাশি জানে ওর বার কোড শুদ্ধ, মানসিক ও বৌদ্ধিক আর নেগেটিভ চিন্তার ভাইরাস মুক্ত। এখানে আসার আগে বাবা মা ও ভাইয়ের জেনেটিক ও মানসিক স্থিতি বিশ্লেষণ করে সেগুলো থেকে সামান্যতম উদ্বেগও ডিলিট করে তবে এখানে এসেছে। তাই চরিত্রে খুঁত থাকার কথা নয়। হ্যাঁ, ওর পূর্বতন প্রেমিক একটু বোহেমিয়ান মানে ছন্নছাড়া টাইপের ছিল। সে এখন আর নেই, আত্মহত্যা করেছে। অবশ্য প্ররোচিত আত্মহত্যা। একটা নতুন কিলার গেম খেলতে খেলতে মারা গেছে। ওটা ছিল তার আসক্তি। আর এখন তো নানান রিপু আসক্ত মানুষদের খুঁজে খুঁজে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। আর সেজন্যেই তো তার চাকরি ! এখন এখানে ইন্টারভিউতে যদি প্রশ্ন করে তার জবাব রাশির কাছে আছে।
ভিতরের হলঘরে প্রচুর কেবিন। সব পারদর্শী। সাদা পোশাকে প্রচুর মানুষ কাজ করছে। একটু এগোতেই একটা কেবিনের সামনে একজন সাদা ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি ও চুল ফর্সা সৌম মানুষ একহাত বাড়িয়ে এগিয়ে এলেন।–ওয়েলকাম ম্যাডাম রাশি। আমি মানস, প্রফেসর মানস। সিলিকন ডোমে আপনাকে স্বাগত। প্রথমেই বলে রাখি, আপনি কনফার্মড। আমার কেবিনের পাশেই আপনার জায়গা করে দেওয়া হয়েছে। আসুন আপনার কেবিনে আপনি লগ ইন হতে আইডি পাসওয়ার্ড তৈরি করুন। এই বলে তিনি এক মিনিট চোখ বন্ধ করে কিছু ভাবলেন, তারপর দুহাতের আঙুল দিয়ে শূন্যে একটা চতুর্ভুজ আঁকলেন। সঙ্গে সঙ্গে সেখানে একটা পারদর্শী পর্দা ফুটে উঠল। রাশি স্ক্রীনের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে মনে মনে আইডি ও পাসওয়ার্ড সংকেত ভেবে নিতেই স্ক্রীনে রাশির হাসিমুখ ফুটে উঠল। স্ক্রীনের সেই রাশির ছবিটি বলতে লাগলো।
-ম্যাডাম আমি আপনার ভার্চুয়াল ক্লোন। আপনি নিশ্চয় জানেন এই মানসিক পাসওয়ার্ড মনে রাখার বা ভুলে যাবার নয়। এ আমৃত্যু আপনার ব্রেনে সেভ রইল। এই স্ক্রীন পোর্টেবল। আপনি যেখানে খুশি ব্যবহার করবেন। আমাকে পাবেন। কিন্তু যখন আপনি একা থাকবেন তবেই। অবশ্য স্ক্রীন আপনাকে জিজ্ঞেস করবে, আপনি সুরক্ষিত ও একা তো? আর রাত্রে শুতে যাবার আগে অবশ্যই মনে মনে এন্ড অফ দি ডে, বা, ই ও ডি করে নেবেন। প্রফেসর মানস বললেন, -ম্যাডাম রাশি, আমি আমার কেবিনে থাকছি। আপনার কনভারসেশন শেষ হলে আমার কেবিনে আসবেন প্লিজ। প্রফেসর মানস নিজের কেবিনে চলে গেলেন।
স্ক্রীন থেকে ক্লোন রাশি বলতে থাকল, -ম্যাডাম আপনার বার রিপোর্ট এ ওয়ান বাই ওয়ান পয়েন্ট ফোর মিলিয়ন ক্যাটাগরিতে আগামী একশ বছরের জন্য সেভ থাকলো। এরমধ্যে পৃথিবী যদি ধ্বংসও হয়ে যায়, ইউনিভার্সের যেকোনো প্লানেটে অনুকূল পরিবেশে অটো ডাউনলোডেড হয়ে যাব আমি। মানে আপনার প্রতিভূ হয়ে আপনাকে রিপ্রেজেণ্ট করব। আপনার হাই প্রোফাইলে আপনার জিনে সাইকো স্পিরিচুয়াল সিনড্রোম আছে। বিজ্ঞান ভিত্তিক অনুশীলন করে আপনি সুপ্রীম প্রোবেবিলিটি মানে মহত্তম সম্ভাবনাকে পরমশক্তি রূপে গবেষণা করছেন। আমি গর্বিত যে এই নম্বরের ক্লোন হতে পেরেছি। তবে ম্যাডাম, আপনার নম্বরটি তালিকার অনেক উপরে স্থান পেত, কিন্তু কয়েক বছর আগে আপনি আপনার অতীতের যৌন ইচ্ছা বা সেক্সুয়াল আর্জ সিনড্রোমটি মাইন্ডবুকে পাবলিকলি করেছেন। সেই প্রিমডার্ন যুগের ফেসবুকে অসামাজিক যৌনছবি যেমন পাবলিকলি পোস্ট করাটা অপরাধ ছিল, তেমনি এখন মাইন্ডবুকে এই ঘটনাটি আপনার পক্ষে ক্ষতিকর হয়েছে। এটা কেন হয়েছে বলতে পারবেন ম্যাডাম?
রাশি একটু সময় নিয়ে শুরু করল, -যৌনশক্তি বা লিবিডো না জাগালে সৃষ্টিমূলক কাজ ও গবেষনার কাজ হয়না। আর অধ্যাত্মিক শক্তির বিকাশও হয়না। আর এই জৈবিক শক্তি জাগাতে গেলে শরীরে যৌন ইচ্ছা আসতেই পারে। সেইসময় আমার মাইন্ডবুকে কোনো ক্রিয়েটিভ আর্ট বা আর্টিকাল পোস্ট করার সময় অজান্তে ওটা হয়ে থাকতে পারে। তাছাড়া আমার যৌন স্মৃতি তো শুদ্ধ পবিত্র। সেটা তো বিকৃতকাম নয়?
-হ্যাঁ ম্যাডাম। কিন্তু আপনার পোস্ট বিকৃতকামীদের আরো বেশি উৎসাহিত করেছে। ওরা এখন ভাইরাসের মত ছড়িয়ে যাচ্ছে। তার ফলে ওদের বার কোড থেকে যৌনতা ডিলিট বা ডিকোড করা মুশকিল হচ্ছে।
-হুম। ঠিক কতজনের মধ্যে আর কি কি লক্ষণ দেখা গেছে যেগুলো ডিলিট বা ফরম্যাট করতে হবে? আচ্ছা, তার আগে জানতে পারি কি আমাকে তোমার সঙ্গে ঠিক কি কি কাজ করতে হবে?
-ইয়েস ম্যাডাম। আগে আপনাকে একটা মোটামুটি তথ্য দিই। পরে কাজের কথা বলব। পৃথিবীতে এখন নয় বিলিয়ন জনসংখ্যা। প্রতিটি মানুষের লিগ্যাল ইন্টারন্যাশন্যাল বারকোড আছে যা মাষ্টার কম্পিউটার উপগ্রহে এক সুপ্রীম বারকোডের সাথে যুক্ত। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের জিনগত তথ্য, মানসিক চিন্তা ও সংবেদনা এবং তার প্রাণগত উত্তরণ বা অবরোহন সব সুপ্রীম বারকোড মারফত আমাদের কাছে বর্তমান। এই জনসংখ্যার পঞ্চাশ শতাংশ ও তারও বেশি মানুষের ধর্মীয় উন্মাদনা ও হত্যার সিনড্রোম রয়েছে। তিরিশ শতাংশের মানুষে একাকীত্বের সিনড্রোম। কুড়ি শতাংশ পুরুষের মধ্যে রেপ জিন পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে বিকৃতকাম সিনড্রোম ধরা পড়েছে। দশ শতাংশ মানুষের মধ্যে শোষণ প্রবৃত্তি ও লোভের সিনড্রোম খুব বেশি। কুড়ি শতাংশ মানুষের…।
-ব্যাস ব্যাস। আর বলতে হবে না। কম সে কম একশ রকমের নেগেটিভ সিনড্রোম এখন মানুষের মধ্যে বর্তমান। এইসব সংস্কারের ব্যাপারে যারা কাজ করছে, তারা ঠিক কত শতাংশ? আর এই নেগেটিভ মনগুলো নিয়ে এখন কি করা হচ্ছে?
-ম্যাডাম, যারা বিজ্ঞান ভিত্তিক অধ্যাত্মবোধে বিশ্বাসী ও সৃষ্টিতত্ত্ব জানা ও বোঝাই যাদের ধ্যান জ্ঞান তাদের পজিটিভ গুডনেস অন্তরে রয়েছে এবং তারাই এখন ওইসব মানুষ নিয়ে কাজ করছে। তারা পৃথিবীর জনসংখ্যার মাত্র দেড় শতাংশ। তার মধ্যে আপনি এখন জয়েন করলেন। এখন আপনাকে অপশন দেওয়া হচ্ছে আপনি মানুষের কোন নেগেটিভ সিনড্রোমটি রিমুভ করতে চান ও আমাদের চার্ট অনুযায়ী তাদের কি ধরনের শাস্তি দিতে চান?
রাশি মুখ নিচু করে হাসলো।– মানুষের ভিতরে বদ মতলবের লক্ষণটি সরিয়ে দিলে কি সে ভালো হয়ে যাবে? আর শাস্তি দিলে তো পুরো মানব প্রজাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে?
-তাহলে আপনি কিভাবে কাজ করতে চান?
-আমি ওই সব মানুষদের নিয়ে কাজ করব যাদের মধ্যে বিকৃতকাম ও অতিকামের সিনড্রোম দেখা গেছে এবং যাদের শরীরে রেপ জিন পাওয়া গেছে। এরা মানবসমাজের সর্বস্তরের মানুষ। এরা ধর্ষকামী। এদের জন্যেই মানবপ্রগতি স্তিমিত হয়ে যাচ্ছে। এরা মানুষের মধ্যে ভাইরাসের মত ভয় ঘৃণা লোভ ক্রোধ যৌনপ্রবৃত্তি আলস্য ছড়িয়ে যাচ্ছে। এদের থামানো দরকার। আমাদের প্রযুক্তি এখন এতই উন্নত যে, যে মানুষটির দেহ ও চরিত্র থেকে বিশেষ দোষ ও দোষের লক্ষণ বা সিনড্রোম আমরা মুছে দিতে চাই তাতে তার উপস্থিতির প্রয়োজন হয় না। ওর বারকোডে আমরা পরিবর্তন করি আর সেই অনুমতি আমাদের সুপ্রীম কম্পিউটার দিয়েছে।
প্রফেসর মানস নিজের কেবিন থেকে বেরিয়ে এলেন। –সুস্বাগতম ম্যাডাম রাশি। আমি এই কাজটিই শুরু করেছি। আমি ওদের বারকোডে ঢুকে শরীরের সমস্ত কোষের জিনের সংরচনা থেকে সেক্স জিনটি ফরম্যাট ও রিমুভ করতে চাই। আর আমি চাইছিলাম এই কাজের এক উৎসাহী পার্টনার। ব্যাস পেয়ে গেছি।
-স্যার আপনি যদি শরীরের সেক্স জিন রিমুভ করেন তো ওর মন তো আরো বেশি ক্রূর হয়ে পড়বে? তাছাড়া ওর যৌনশক্তি চলে গেলে বিচার বিবেচনাহীন বুদ্ধিহীন হয়ে পড়বে না?
-হুম। তা তো ঠিক? তাহলে আপনি কি বলেন?
-স্যার আমি ঠিক করেছি রিমুভ এন্ড রিপ্লেস। ওদের জেনেটিক কোডে ওই অংশটি বাদ দিয়ে ওর ভিতরে সাইকো স্পিরিচুয়াল সিনড্রোম ফুটিয়ে তোলা। মনের ভিতর থেকে অতিকাম ও বিকৃতকাম ইচ্ছা সম্পুর্ণ ডিলিট করে দেওয়া। এবং এই রিফর্মেশনের জন্য আমার তো ট্রেনিং করাই আছে তাই না?
স্ক্রীন থেকে রাশির ক্লোন হাততালি দিয়ে উঠল। তার চোখে জল। –ম্যাডাম আপনার বারকোডে তো এই কোয়ালিটি আমি দেখেছি, আমি জানি। আসুন আমরা এই কাজ শুরু করি। জগতের কল্যাণ হোক।
(এই লেখাটি লেখকের নিজস্ব কল্পনা ও বিচার প্রসূত)