গদ্যানুশীলনে সঞ্চালী দত্ত

অভিনন্দার অনুভব
অভিনন্দা একটা ছাপোষা বাঙালী ঘরের মেয়ে । মধ্যবিত্ত পরিবার, বাবা কাকা জেঠু রা মিলিয়ে পাঁচ ভাই ।
অভিনন্দার বাবা অলক বাবু, বাংলার টিচার, বাংলা সাহিত্য নিয়ে তার খুব আগ্রহ, অভিনন্দার বাবা র খবু ইচ্ছে মেয়ে বড় হয়ে বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়বে, অনেক ভালো কিছু কাজ করবে বাংলা সাহিত্যের উপর ।
মেয়ে কে সেই ভাবেই তৈরি করছিলেন তিনি, মেয়ে ভালো লিখতেও পারত, মেয়ের লেখা গল্প কবিতা পরে অলক বাবু মনে মনে গর্ব অনুভব করতেন ।
সময় স্রোতের মতোই দেখতে দেখতেই অভিনন্দার মাধ্যমিক হয়ে গেল, খুব ভালো রেজাল্ট ও হলো, বাবা র ইচ্ছা মেয়ে আর্টস নিয়ে পড়ুক আর মা র কথায় সাইন্স নিয়ে না পরলে কোন ফিউচার নেই ।
অগত্যা মা র কথাই শেষ কথা, সাইন্স নিয়েই ভর্তি হলো অভিনন্দা ।
ক্লাস 12 সাইন্স, পড়াশুনা র খুব চাপ, লেখা লিখি র পাঠ বন্ধই হয়ে গেছে অভিনন্দার জীবন থেকে, অলক বাবু মনে মনে দুঃখ পেতেন আর মেয়ে র পুরনো ডাইরী পরতে পরতে ভাবতেন, বিজ্ঞান র সাথে সাহিত্যে র তো কোন বিবাদ নেই, সময় পেলে মেয়ে আবার নিশ্চয় লেখা লিখি শুরু করবে ।
কিন্তু কোথায় কি, অভিনন্দা যেন কেমন বদলে যেতে লাগল, অন্য স্কুলে র ইংলিশ মিডিয়াম থেকে এসে ভর্তি হওয়া মেয়ে দের বাংলা ইংরেজি মেশানো ভাষা যেন, অভিনন্দাকে খুব বেশি আকর্ষণ করত, তাদের দেওয়া শর্ট নাম “Abby ” বলে ডাকলে অভিনন্দা আজকাল বেশি সাচ্ছন্দ বোধ করে ।
অলক বাবু র অমতেই অভিনন্দা এবার ইঞ্জিনিয়ারিং এ ভর্তি হলো, কলেজ শেষে বড়ো কোম্পানি তে চাকরি পেতে দেরি হলো না ।
মেয়ে র সাথে অলক বাবু র দুরত্ব টা যেন আরও বেড়ে গেল যখন এক বর্ষার বিকেলে অভিনন্দা এসে বলল বাবা আমি প্রমোশন পেয়েছি, আর এবার সোজা ইংল্যান্ড ।
দেখতে দেখতে দশটা বছর পেরিয়ে গেছে, অলক বাবুর স্ত্রী গত হয়েছেন, মেয়ে টাও আর দেশে আসে না, একাকিত্ত যেন অলক বাবু র একমাত্র সঙ্গী, মাঝে মাঝে ভাবেন মেয়েটা যদি ফিরে আসত,কোন একটা শীতের দুপুরে, আবার সেই আগের মতন ঘুম থেকে ডেকে তুলে বলতো বাবা দেখত কেমন লিখেছি কবিতা টা..ভাবতে ভাবতে ঘুম এসে যায় অলক বাবু র চোখে; হঠাৎ অভিনন্দা র ফোন, বাবা একটা কবিতা লিখেছি একটু শুনবে ?
চোখে জল এসে যায় অলক বাবু র, গলা ধরে আসে, বাবা এই corporate এর চাপ এ আর বিদেশী আদব কায়দা আর এই ইংরেজি কথা বলতে বলতে আমি খুব বিরক্ত হয়ে গেছি বাবা, আচ্ছা বাবা তুমিই বলো নিজের মাতৃভাষা ছাড়া কি মনের কথা বলে শান্তি পাওয়া যায়, একদম যায় না, এমনকি নিজের সাথেও কথা বলে শান্তি হয় না, তাই তো এখন রোজ রাত এ আগের মতোন গল্প লিখছি আমার ভাষা তে লিখছি….