ক্যাফে গল্পে সুমন দে

কৃষ্ণহরিবাবুর ভাড়াটে

কৃষ্ণহরি বিশ্বাসের দোকানের ঠিক সামনেই একটা তিনতলা ফ্ল্যাট বিল্ডিং। বেশ পুরনো ফ্লাট বিল্ডিং-টা। একটা সময়ে এই জমিটা কৃষ্ণহরিবাবুরই ছিল। টাকার প্রয়োজনে সেটা প্রোমোটারকে দিয়ে দিয়েছিলেন। বিনিময় নগদ টাকার পাশাপাশি একটা ফ্ল্যাট পেয়েছেন।
সেই ফ্ল্যাটটা তিনি ভাড়া দেন। তার পৈতৃক বাড়ির কাছেই
আর ফ্ল্যাটের ঠিক উল্টোদিকেই তার মুদির দোকান। দোকানটা সেভাবে চলে না। খদ্দেরের থেকে কাজে বকা আর আড্ডা দেওয়ার লোক বেশি আসে না দোকানে। ফ্ল্যাটটা ভাড়া দিয়ে তাও কিছু টাকা ওঠে। ফ্ল্যাটটা দোতলায়। এক বেডরুম, সঙ্গে রান্নাঘর আর বাথরুম আর ছোট একটা ব্যালকনি। খুব যে একটা ভাড়া পান তা নয়, তবে দোকান আর ফ্ল্যাটের ভাড়া মিলিয়ে তার মোটামুটি চলে যায়। কৃষ্ণহরিবাবু এতেই খুশি। তবে ফ্ল্যাটে তিনি ছোট পরিবার অথবা স্বামী-স্ত্রী ছাড়া ভাড়া দেন না।
সকালে কৃষ্ণহরিবাবু দোকান খোলার কিছু পরেই হীরালাল এল। হীরালাল কাছেই থাকে। সকালে পাড়ার বুলুদার দোকানে চা খেয়ে কৃষ্ণহরিবাবুর দোকানে সে আসে আড্ডা মারতে। বেলা বাড়লে হীরালাল উঠে যায়। একটা ফুট কোম্পানিতে ডেলিভারি বয়ের কাজ করে হীরালাল। ডিউটিতে যায় বেলা করে আর ফেরে অনেক রাতে। হীরালাল দোকানের বাইরের রোয়াকে আয়েশ করে বসে কৃষ্ণহরিবাবুকে উদ্দেশ্য করে বলল,’গতরাতে স্কুটি নিয়ে ফেরার সময় মনে হল ওই ফ্ল্যাটবাড়ির সামনে একটা টেম্পো দেখলাম, তা তোমার ফ্ল্যাটে নতুন ভাড়াটে এলো নাকি কৃষ্ণদা?
কৃষ্ণহরিবাবুর দোকানে কোন খদ্দের ছিল না, তিনি একা বসে খবরের কাগজ পড়ছিলেন, তার থেকে চোখ সরিয়ে বললেন,’হ্যাঁ, গেল হপ্তায় তো সুনীলবাবু ফ্ল্যাটটা ছেড়ে দিলেন, ওনার আবার অন্য জায়গায় বদলি হয়ে গেছে, তারপরেই ওই পলাশ আমার কাছে এসেছিল, ওর বন্ধু নাকি আছে, সস্তায় এক ফ্ল্যাট ভাড়া দরকার, পলাশের বন্ধুটি নাকি নতুন বিয়ে করেছে, মেয়েটির বাড়ি থেকে মত ছিল না,কারণ ছেলে এখন‌ও সেরকম কিছু রোজগার করে না,এদিকে মেয়ের বাড়ি থেকে বিয়ের জন্য উঠে পড়ে লেগেছে, তাই একরকম নাকি পালিয়েই দুজনে বিয়ে করেছে। ছেলেটি এখন এখানে এসে চাকরির চেষ্টা করবে। পলাশ এমন করে আমাকে বলল যে আর না করতে পারলাম না, গতরাতে দোকান বন্ধ করে বাড়ি যাবার পর পলাশ ওদের নিয়ে আসে। তা আমি তখনই কথাটথা বলে এডভান্স বাবদ কিছু টাকা নিয়ে আমি ওদেরকে ফ্ল্যাটের চাবি দিয়ে দিয়েছি’।
হীরালাল চোখ গোলগোল করে বলল,’সে কি গো দাদা,এ তো কেস বেশ জটিল মনে হচ্ছে, তুমি খোঁজ খবর না নিয়েই ভাড়া দিয়ে দিলে? পালিয়ে বিয়ে করেছে বলছে, দেখো আবার তুমি নিজে কোন‌ও কেসে ফেঁসে যেও না’।
কৃষ্ণহরি বাবু কথাগুলো শুনে একটু চিন্তায় পড়লেন।তারপর বললেন,’আমি তো আর কাউকে পালাতে বলিনি, তাছাড়া মেয়েটি সাবালিকা, ছেলেটিও পলাশের ছোটবেলার বন্ধু, দুজনে নাকি একসাথে স্কুলে পড়েছে,ছেলেটি নাকি হোস্টেলে থাকতো। নাম হলো গিয়ে সোমনাথ আর মেয়েটির নাম মৌসুমী।মেয়েটিকে দেখে বেশ ভালো ঘরেরই মনে হল,ডাকখোঁজ‌ও ভালো, আমাকে কাকাবাবু বলে ডাকল, প্রণাম করল, তুমি ভাই অনর্থক আমার মনে ভয় ঢোকাচ্ছ’।
হীরালাল একটু গোঁসা করে বলল,’আমার কি দায় পড়েছে বলো যে তোমাকে ভয় দেখাবো। আজকাল নানা রকম ঘটনা ঘটে তাই বলছিলাম, তুমি পারলে একবার ভাড়াটের ডিটেলসটা নিয়ে থানায় রাখতে পারো’।
কৃষ্ণহরিবাবু দু’পাশে মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন,’পাগল নাকি? যেচে বাঁশ নেবো। আর যদি কোন‌ও ঝামেলা না হয় তাহলে পুলিশের কাছে গিয়ে শুধু শুধু সময় নষ্ট করেই বা লাভ কি? না বাপু, আমার ছেলে মেয়ে দুটিকে মোটেই খারাপ মনে হয়নি, দিব্যি ভদ্র সভ্য, তাছাড়া পলাশের বন্ধু, তুমি এ ব্যাপারে আমাকে ভয় দেখিও না’।
হীরালাল একটু মনঃক্ষুন্ন হল,সে বলল,’যে কৃষ্ণদা ফ্ল্যাট তোমার, তুমি যা ভালো বুঝবে করবে,আমি উঠি এখন,আজ একটু আগেই ডিউটিতে রিপোর্ট করাতে হবে’‌। এই বলেই হীরালাল রোয়াক থেকে উঠে পড়ল। ঠিক তখনই একজন খদ্দের এলেন দোকানে। তাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন কৃষ্ণহরিবাবু। হীরালাল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দোকান থেকে বেরিয়ে পড়ল।
পরবর্তী কয়কদিন বেশ নিরুপদ্রবেই কাটলো। মৌসুমী একদিন এসে তার নিজের হাতে কিছু খাওয়ার কৃষ্ণহরিবাবুর দোকানে এসে দিয়ে গেল তাকে। কৃষ্ণহরি বাবু দেখলেন সোমনাথ ছেলেটিও রোজ‌ই ব্যাগে ফাইলপ‌ওর নিয়ে বেরোয়, বোধহয় চাকরির খোঁজে পরীক্ষা বা ইন্টারভিউ দিতে যায়। পলাশ‌ও একদিন দোকানে এল, বলল সেও সোমনাথের চাকরির ব্যাপারে দু’চার জায়গায় বলে রেখেছে,কিছু না কিছু একটা হবেই। পলাশ দশ রকমের দালালি করে বেড়ায়। বাড়ি কেনাবেচা থেকে শুরু করে আর‌ও নানারকম দালালির কাজ সে করে,অনেক রকমের লোকের সঙ্গে তার ওঠা বসা, তাই কৃষ্ণহরিবাবুরও মনে হল যে পলাশ হয়ত সোমনাথের একটা কাজের ব্যবস্থা করে দিতে পারবে।
কিন্তু তার দুই একদিন পরেই দোকানে বসে যে খবরটা পেলেন কৃষ্ণহরিবাবু তাতে তার মনে হীরালালের বলা সন্দেহটা চাগিয়ে উঠল।ওই ফ্ল্যাট বাড়ির দোতলায়
অন্য ফ্ল্যাটের মতিলালবাবু দোকানে এসে জানালেন যে আগের রাতে সোমনাথ আর মৌসুমীর মধ্যে প্রচন্ড ঝগড়া হয়েছে। পরের দিন ওই ফ্ল্যাটে ঠিক নীচের একতলার ফ্ল্যাটের সোমা বৌদি এসেও একই কথা বললেন। সেই দিনই মৌসুমী দোকানে এল কিছু টুকিটাকি জিনিস কিনতে, তার চোখমুখে আঘাতের চিহ্ন। চোখদুটোও ছলছলে, কৃষ্ণহরিবাবু বুঝলেন অশান্তি তো হয়েছেই ও সোমনাথ তার বউয়ের গায়েও হাত দিয়েছে। কৃষ্ণহরি বাবু তাকে সান্ত্বনা দিলেন এবং যদিও মৌসুমী এ বিষয়ে জিজ্ঞাসার কোন উত্তরই দেয়নি। কিন্তু তাও কৃষ্ণহরিবাবু
তাকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করলেন। যে তিনি এই ব্যাপারে তার স্বামীকে বোঝানোর চেষ্টা করবেন। মৌসুমী চলে গেলে কৃষ্ণহরিবাবু ঠিক করলেন সোমনাথের আগে এ বিষয়ে তিনি পলাশের সঙ্গে কথা বলবেন কারণ পলাশ‌ই এই ভাড়াটেদের নিয়ে এসেছে। সেইমতো বিকেলের দিকে কিছু সময়ের জন্য দোকান বন্ধ রেখে কৃষ্ণহরিবাবু ক্লাবে নিয়ে পলাশকে আলাদা করে ডেকে নিয়ে এসব কথা বললেন, সেইসঙ্গে এও বলে রাখলেন সোমনাথ যদি এ চালিয়ে যায় তাহলে তিনি এই ভাড়াটে পরিবারকে আর নিজের ফ্ল্যাটে থাকতে দেবেন না। পলাশ কথা দিল যে সে সেইরাতেই সোমনাথের সঙ্গে কথা বলে তাকে বোঝাবে।
পরদিন থেকে আর কোন‌ও অভিযোগ এল না। কৃষ্ণ হরিবাবু ভাবলেন যে পলাশ নিশ্চয়ই সোমনাথের সাথে কথা বলে তাদেরকে বুঝিয়েছে অশান্তি ঝামেলা না করতে। কৃষ্ণহরিবাবু এবার ক্লাসে গিয়ে পলাশের খোঁজ করলেন, পাশাপাশি তাকে সেখানে না পেয়ে তার মোবাইলেও কল করলেন কিন্তু কলে পেলেন না। কিন্তু মনে মনে ভাবলেন যে পলাশ নিশ্চয়ই কথা বলে সব মিটমাট করে দিয়েছে। কিন্তু তার একদিন পরেই মতিলালবাবু আবার দোকানে এলেন। তিনি জানালেন,’আপনার ভাড়াটেরা কি ফ্ল্যাট ছেড়ে দিল। গত পরশু রাতে দেখলাম দুজনেই ফ্ল্যাটে তালা মেরে বেরিয়ে গেল। তারপর আর তাদের দেখছি না’। কৃষ্ণহরিবাবু একটু অবাক হলেন, কিন্তু তিনি কিছু বললেন না,কিন্তু জানলে তো বলবেন। রাতে দোকান থেকে ফিরবার সময় ভাবলেন একবার ফ্ল্যাটের ভাড়াটেরা ফিরেছে কিনা দেখে যাবেন। কিন্তু এমন জোরে বৃষ্টি নামলো দোকান বন্ধের সময় যে তাড়াতাড়ি করে ছাতা মাথায় দিয়ে বাড়ি ফিরে গেলেন।
অনেক রাতে দরজা ধাক্কানো আর চিৎকার চেঁচামেচির শব্দতে ঘুম ভাঙলো কৃষ্ণহরিবাবুর। প্রথমে ভাবলেন বাড়িতে ডাকাত পড়েছে। বাড়ির অন্য লোকজন‌ও এইরকম একটা অতর্কিত ঘটনায় কিছুটা হকচকিত। শেষমেশ কৃষ্ণহরিবাবু গিয়েই দরজা খুললেন। দরজা খুলতেই দেখলেন মতিলালবাবুসহ ওই ফ্ল্যাটবাড়ির আর‌ও কয়েকজন দাঁড়িয়ে রয়েছেন। মতিলালবাবুই সরাসরি কথা বললেন,’আমাদের বিল্ডিং এ আপনার ওই দোতলার ফ্ল্যাট থেকে মারাত্মক দুর্গন্ধ বেরোচ্ছে,পচা গন্ধ, আপনি এখনই একবার চলুন’।
কৃষ্ণহরিবাবু বেজায় অবাক হলেন। আরেকজন ফ্ল্যাট বাড়ির বাসিন্দা বলে উঠলেন,’দরজায় তালা দেওয়া রয়েছে, এদিকে ফ্ল্যাটের ভেতর থেকে এত দুর্গন্ধ বেরোচ্ছে যে আমরা কেউ টিকতে পারছি না, আপনি চলুন তাড়াতাড়ি’।
কৃষ্ণহরিবাবু তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিলেন। ফ্ল্যাটের সামনে এসে দরজায় তালা দেখে বললেন,’এ তালা আমার নয়, আমার কাছে যে ডুপ্লিকেট চাবি রয়েছে তা দিয়ে এ তালা খোলা যাবে না’। বলেই নাকে রুমাল চাপা দিলেন। বৃষ্টি কমে গেলেও বাইরে একটা সোঁদাভাব রয়েছে, তাকে ছাঁপিয়ে ফ্ল্যাট থেকে আসা দুর্গন্ধ এমন পরিস্থিতি তৈরি করেছে যে সবাই নাকে রুমাল চাপা দিয়েও তিষ্টতে পারছে না। মতিলালবাবু কোন‌ওরকমে বললেন,’তাহলে তো দরজার তালা ভাঙা ছাড়া গতি নেই’।
মন থেকে ইচ্ছা না থাকলেও কৃষ্ণহরিবাবুকে দরজা ভাঙার অনুমতি দিতেই হল। ফ্লাটেরই একজন একটা বড় রাজমিস্ত্রীর হাতুড়ি এনে ঠুকে ঠুকে তালা ভাঙলেন, তারপর সবাই মিলে হুড়মুড় করে ফ্ল্যাটের ভেতরে ঢুকে পড়লেন। ফ্ল্যাটের বেডরুমে পৌঁছে যা দৃশ্য দেখলেন সবারই চোখ তাতে ছানাবড়া হয়ে গেল। বেডরুমের বিছানায় পড়ে রয়েছে একটি দেহ, যাতে পচন ধরতে শুরু করেছে আর তার থেকেই এত দুর্গন্ধ। তাকে যে মেরে ফেলা হয়েছে সেটার গলার নলি কাটা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। সবচেয়ে হতবাক হলেন কৃষ্ণহরিবাবু,যে বিছানায় পড়ে থাকা মৃতদেহটি আর কেউ নয়, সে পলাশ। কৃষ্ণহরিবাবু মাথা ঘুরে পড়ে যাচ্ছিলেন, কেউ একজন তাকে ধরে ফেলল। মতিলালবাবু জোরে হেঁকে বলে উঠলেন,’পুলিশে খবর দিতে হবে এখনই’।
প্রায় ভোর রাতের দিকে পুলিশ এল ফরেনসিক টিমসহ। তদন্তকারী অফিসার স্থানীয় থানার ওসি রাহুল মহাপাত্র প্রথমেই কৃষ্ণহরি বিশ্বাসকে একহাত নিলেন,’কি মশাই ভাড়া দেওয়ার আগে কোন‌ও খোঁজখবর নেননি, আমরা বারবার বলি ভাড়া দেওয়ার সময় ভাড়াটির নাম ধাম, কোথা থেকে এসেছে,পরিচয়পত্র,আধার কার্ড এসবের ফটোকপি থানায় জমা দেবেন, সেসবেরও কোন বালাই নেই, এখন ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর আমাদের ডাক দিয়ে মনে করেন আমরা ম্যাজিকের মত সব কাজ করে ফেলব,আপনাকেও অনেক জবাবদিহি করতে হবে কৃষ্ণহরিবাবু।
কৃষ্ণহরিবাবু আমতা আমতা করে বললেন,’আসলে ওই ভাড়াটে ছেলেটি সোমনাথও এই পলাশের বাল্যবন্ধু নাকি ছিল, এখানে স্কুলে পড়ার সময় হোস্টেলে থাকত। পলাশের সঙ্গে আমার অনেকদিনের পরিচয় সম্পর্ক, তাই ওর কথাতেই ভাড়া দিয়েছিলাম’।
রাহুল মহাপাত্র গোঁফে তা দিয়ে বাঁকা হাসি হেসে বললেন,’তাহলেই বুঝুন কেমন বন্ধু? যে কি না বন্ধুকেই খতম করে পালালো?ওই পলাশ আর তার বউ কোথা থেকে এসেছিল জানেন?কোন‌ও ঠিকানা, যোগাযোগের নম্বর কিছু দিয়েছে?’
কৃষ্ণহরিবাবু মাথা নিচু করে দু’পাশে ঘাড় নাড়ালেন। রাহুল মহাপাত্র আবার বাঁকা হাসি হেসে বললেন,’চমৎকার, এই না হলে দায়িত্বশীল নাগরিক? আচ্ছা দু’জনের চেহারা দেখেছেন তো? নাকি সেটাও দেখেননি?’
কৃষ্ণহরিবাবু এবার মাথা তুলে ঘাড় নেড়ে জানালেন যে তিনি দুজনেরই চেহারা ভালোভাবেই দেখেছেন। অফিসার রাহুল মহাপাত্র তার সহকারী প্রদীপ মিত্রকে ডেকে বললেন,’প্রদীপ,স্কেচ আর্টিস্টকে খবর দাও, এখানে যারা আছেন তাদের দিয়ে দুজনের স্কেচ করাও তারপর আমাদের ক্রিমিনাল ডেটাবেসের সঙ্গে ম্যাচ করে দেখো পলাতকদের কোন পুলিশ রেকর্ড আছে কি না, দরকার হলে গোয়েন্দা বিভাগেও এদের স্কেচ পাঠিয়ে দেখ, কি যে মতলবে এসেছিল তা তো এখন‌ও স্পষ্ট নয়’।
প্রদীপ তড়িঘড়ি স্কেচ আর্টিস্টকে কল করার জন্য নিজের মোবাইল নিয়ে অন্যদিকে চলে গেলেন। তখনই ফরেনসিক দলের হেড প্রিয়াংশু কুন্ডু এসে বললেন,’ক্লিয়ার কাট, নিখুঁত ছুরি চালিয়েছে, তবে মার্ডার টা এখানে মানে এই ঘরে হয়নি, হয়েছে ব্যালকনিতে, ওখান থেকে লাশ টেনে এনে বিছানায় ফেলা হয়েছে, রক্তের দাগ আর ব্যালকনিতে জমে থাকা রক্ত তাই বলছে, আর খুনটা করেছে কোন‌ও মহিলা, তার উচ্চতা ভিকটিমের থেকে কম, অতর্কিতে পেছন থেকে এসে ছুরি চালানো হয়েছে, আততায়ীর উচ্চতা কম হলেও ছুরি ধারালো যে দিক দিয়ে আক্রমণ করা হয়েছে তার কাট মার্ক কিছুটা উপরের দিকে হয়েছে, আর গলার ক্ষত বলছে যেভাবে ছুরি টানা হয়েছে তার মার্ক একমাত্র ফিমেল ক্যারেক্টরিসটিকসকে রিপ্রেজেন্ট করে,মার্ডার ওয়েপন আমরা বারান্দায় পেয়েছি,তবে তাতে কোন‌ও ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেই, আততায়ী দস্তানা পরেই খুনটা করেছে।
আর কিছু পোড়া কাগজপত্র আমরা পেয়েছি রান্নাঘরের ডাস্টবিনের মধ্যে, হয়তো খুনের কিছু আগে বা পরে সেগুলো পোড়ানো হয় আর একটা পেনড্রাইভ পেয়েছি, যেটা নষ্ট করার চেষ্টা করা হয়েছিল, এখন আমরা ল্যাবে নিয়ে গিয়ে এগুলো থেকে কোন‌ও কিছু উদ্ধার করা যায় কি না তা দেখব, তবে এর বাইরে আর কিছু আপাতত পাইনি। তবে ডেডবডি যেভাবে টেনে হিঁচড়ে আনা হয়েছে তাতে মনে হয়, সেই কাজটা দুজন মিলে করেছে, আপাতত এইটুকুই বলতে পারি’।
রাহুল মহাপাত্র ধন্যবাদ জানালেন প্রিয়াংশু কুন্ডুকে। এর‌ই মাঝে প্রদীপ মিত্র এসে জানালেন যে স্কেচ আর্টিস্টকে ঘুম থেকে তোলা হয়েছে সে আধঘণ্টার মধ্যেই তার বাইক নিয়ে এখানে এসে পড়বে।
স্কেচ আর্টিস্ট সুনন্দর বাড়ি কাছেই, সে আধঘন্টার ও আগে পৌঁছে গেল কৃষ্ণহরিবাবুর ফ্ল্যাটে। তবে কৃষ্ণহরিবাবু আর ফ্ল্যাটের অন্যান্য বাসিন্দাদের সাহায্যে দুই ভাড়াটের ফাইনাল স্কেচ তৈরি করতে করতে সকাল হয়ে গেল। ততক্ষণে ফরেন্সিক দল তাদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে আর অ্যাম্বুলেন্সে পলাশের বডি নিয়ে চলে গেছে। দুজন ফটোগ্রাফারও তাদের সঙ্গে চলে গেছেন। স্কেচ তৈরি হ‌ওয়ার পর রাহুল মহাপাত্র দুই ভাড়াটের স্কেচ দেখে বললেন,’হুম চেহারা তো বেশ নিরীহ হই, অনেকেই ধোঁকা খেয়ে যাবে, কিন্তু প্রিয়াংশুবাবুর কথা যদি সত্যি হয় তাহলে খুনটা করেছে এই মেয়েটিই’।
কৃষ্ণবাবু সেটা শুনে বলে উঠলেন,’কি বলছেন স্যার? মৌসুমী মানে এই ভাড়াটি বউটা তো খুব নিরীহ, বরং সোমনাথ ছেলেটাই ওকে মারধোর করত, আমি নিজে দেখেছি মেয়েটির হাতে-গালে চোটের দাগ’।
মতিলালবাবুও সেখানে উপস্থিত ছিলেন,তিনিও বললেন,’হ্যাঁ স্যার, ঝগড়ার সময় সোমনাথের গলাই বেশি শোনা যেত, ওর বউয়ের প্রায় কোন‌ও আওয়াজই শোনা যেত না’।
রাহুল মহাপাত্র একটু রেগে বললেন, এত কিছু এই ফ্ল্যাটে ঘটেছে আর আপনারা একবারও থানায় জানাননি,’বলেই প্রদীপ মিত্রকে উদ্দেশ্য করে বললেন,’এখানকার কাজ এবার গোটাও, সুনন্দকেও ছেড়ে দাও, এখন থানায় ফিরে তুমি এই দুটো ফটোর ক্রিমিনাল ডেটাবেস চেক করো। আর অন্যান্য থানাতেও আর গোয়েন্দা দপ্তরেও এই স্কেচ দুটো পাঠাও, দেখা যাক এদের ব্যাপারে কোন‌ও সূত্র পাওয়া যায় কি না’।
এর কিছু পরে ফ্ল্যাটবাড়ির বাসিন্দারা আর কৃষ্ণহরিবাবু তাদের নিজস্ব বয়ান রেজিস্টার করিয়ে ছাড়া পেলেন।কৃষ্ণহরিবাবু ক্লান্ত শরীরে আর দোকান খুলতে পারলেন না। শারীরিক ও মানসিকভাবে একেবারে বিধ্বস্ত লাগছে তার। শুধু বাড়ি ফেরার পথে তার সাথে হীরালালের দেখা হল।মাথা নিচু করে সব কথা তিনি হীরালালকে জানালেন।হীরালাল তখন তার স্কুটি নিয়ে কাজে বেরোচ্ছে, সে শুধু বলল,’কৃষ্ণদা, আপনাকে তো আমি আগেই সাবধান করেছিলাম।কৃষ্ণহরিবাবু মাথা নেড়ে বাড়ি ফিরে এলেন।পরিবারের লোকেরা দুশ্চিন্তা নিয়ে অপেক্ষা করছিল, তিনি জানালেন যে পুলিশ ডাকলে তাকে থানায় হাজিরা দিতে যেতে হবে, আর কোন কথা না বলে নিজের ঘরে গিয়ে বিছানায় নিজের ক্লান্ত শরীরটাকে এলিয়ে দিলেন। সারারাত ঘুম হয়নি, কিন্তু তাও নানারকম চিন্তা দুশ্চিন্তায় তার চোখে ঘুম এল না।একটু পরেই বিছানা ছেড়ে উঠে বাথরুমে ঢুকলেন স্নান করে কিছুটা ধাতস্থ হয়ে নিতে।
সারাটা দিন কৃষ্ণহরিবাবুর কাটল দুশ্চিন্তার মধ্যে।দুপুরে ভালো করে খেতেও পারেননি। সন্ধ্যের দিকে যখন চা খেয়ে একটু মনটাকে শান্ত করেছেন, তখন দরজার ডোরবেল বাজলো। বাড়ির কেউ দরজা খুলে দিল নিশ্চয়, তবে কে খুলল সেটা জানতে পারলেন না ভেতরে থাকায়।নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে সামনের বসার ঘরে আসতেই দেখলেন অফিসার রাহুল মহাপাত্র সিভিল ড্রেসে দাঁড়িয়ে আছেন, সঙ্গে আরেকজন কেতাদুরস্ত পোশাকের ভদ্রলোক। কৃষ্ণহরিবাবু আসতেই তাকে দেখিয়ে রাহুল মহাপাত্র অন্য ভদ্রলোকটিকে বললেন,’স্যার ইনিই ওই ফ্ল্যাটের মালিক কৃষ্ণহরিবাবু’, বলেই কৃষ্ণহরিবাবুকে অন্য ভদ্রলোকটিকে দেখিয়ে বললেন,’ইনি গোয়েন্দা বিভাগের বড় অফিসার সব্যসাচী দ‌ও।কেসটা এখন গোয়েন্দা বিভাগের হাতে, ইনি আপনাকে কিছু কথা জিজ্ঞেস করবেন, সব কথা খোলাখুলিভাবে বলবেন’।
গোয়েন্দা অফিসারকে দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন কৃষ্ণহরিবাবু। তারপরেই একটু নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন,’বসুন স্যার আপনারা, চা করতে বলব?’
সব্যসাচী দত্ত বললেন,’কোন‌ও দরকার নেই, ডিউটিতে আছি, ওসব দরকার নেই,যা জিজ্ঞেস করবো তার ঠিকঠাক জবাব দেবেন’।
কোন‌ওমতে ঘার কাত করে সম্মতি জানালেন কৃষ্ণহরিবাবু।
সব্যসাচী দত্ত বললেন,’আপনি সত্যিই ওই ভাড়াটে দম্পতিকে আগে থেকে চিনতেন না?’
কৃষ্ণহরিবাবু কাঁচুমাচু হয়ে বললেন,’স্যার আমি শুধু পলাশকে চিনতাম,ওর কথাতেই চোখ বুঁজে ভাড়া দিয়েছিলাম,ওই যে এইভাবে খুন হয়ে যাবে,তার কি করে জানব স্যার?’
সব্যসাচী তো বললেন,’পলাশকে আপনি কত সময় ধরে চেনন?’
কৃষ্ণহরিবাবু বললেন,’অনেক সময় ধরেই চিনি, স্থানীয় ক্লাবের একজন কর্মঠ সদস্য ছিল?’
‘সে কি কাজ করে তা আপনি জানতেন?’জিজ্ঞেস করলেন সব্যসাচী দত্ত।
কৃষ্ণহরিবাবু বললেন,’নানা রকমের দালালি করে, এটা জানতাম এর বেশি আর কিছু জানতাম না’।
সব্যসাচী দত্ত বললেন, সে যে মারাত্মক এক উগ্রপন্থী সংগঠনের হয়ে কাজ করছে সেটা জানতেন না?’
কৃষ্ণহরিবাবু অবাক তো হলেন‌ই সেই সঙ্গে ভয় কেঁদে ফেলে বললেন,’না স্যার আমি এসব কিছু জানি না, বিশ্বাস করুন স্যার,আমি জানি না এসবের কিছুই। বলেই হাউমাউ করে কেঁদে ফেললেন তিনি।
সব্যসাচী দত্ত এবার একটু ঠান্ডা স্বরে বললেন,’সেটা আমারও মনে হয়েছে, তাই আপনাকে আমাদের ওখানে ধরে না গিয়ে আমি নিজেই এখানে এসেছি আপনাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে’।
রাহুল মহাপাত্র বললেন,’সোমনাথ বলেছে ছেলেটির কথা আপনি জানিয়েছিলেন সে একজন স্মাগলার, পলাশ আর সোমনাথ মিলে নানারকম বে-আইনি জিনিস পাচার করত।মাদক,অস্ত্র এমনকি নারী পাচারচক্রের সঙ্গে জড়িত ছিল।’
আবার সব্যসাচী দত্ত বললেন,’এভাবেই তারা ব্ল্যাক উইডো নামের এক সাংঘাতিক উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িয়ে যায়। পলাশ ছিল তাদের কভার। সে হয়তো নিজেও জানত না যে কিরকম ভয়ংকর সংগঠনের সঙ্গে সে জড়িয়ে গেছে। তার বিরুদ্ধে ছোটখাটো কেস থাকলেও বড় কোন‌ও কেস নেই, কিন্তু সোমনাথ একজন কুখ্যাত উগ্রপন্থী।একেবারে ব্রেইনওয়াশ করা ছেলে। সোমনাথ,শিশির,সাকিব,মাইকেল এবং বহু নাম ও বহু ছদ্মবেশ রয়েছে তার। তবে আসল লোক হল গিয়ে ওই মেয়েটি,সেই আসল ব্ল্যাক উইডো,তার কোন আলাদা ছবি আমাদের কাছে নেই,শুধু অনেক নাম আর কিছু ইনফরমেশন। তুলিকা,শ্রুতি,প্রিয়া,ডালিয়া এরকম অনেক নাম রয়েছে তার, সেই সম্ভবত মৌসুমী। আপনার ফ্ল্যাট থেকে যে পোড়া কাগজগুলো পাওয়া গেছে আর যে নষ্ট হয়ে যাওয়া পেন-ড্রাইভটা পাওয়া গেছে আমাদের ফরেন্সিক অফিসাররা তার থেকে কিছু কিছু তথ্য অনেক চেষ্টার পর বের করতে পেরেছে, কিন্তু তা খুবই সামান্য। একটু শুধু বোঝা যাচ্ছে যে শহরের টাউন হলে তারা কিছু ঘটাতে চাইছে এবং যেহেতু আগামী পরশু সেখানে সারা ভারত মৈত্রী সম্মেলন রয়েছে তো সেখানে সারা দেশ থেকেই অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ আসবেন। রাজ্যপাল ও মুখ্যমন্ত্রী সহ এই রাজ্যের অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ‌ও থাকবেন,ওরা হয়তো সেখানেই নাশকতামূলক কিছু ঘটাতে চাইছে।এখন আমাদের কাছে সময় মাত্র দেড়দিন, এরমধ্যে যে করেই হোক এদেরকে ধরতে হবে,অলরেডি
ডেলিগেটসরা সম্মেলনের জন্য শহরে আসতে শুরু করেছেন। দেরি করলে এর মধ্যে কোন বড় ঘটনা তারা ঘটিয়ে ফেলতে পারে।
সবকিছু শোনার পর কৃষ্ণহরিবাবুর মাথা ঘুরতে লাগল। তিনি থপ করে একটি চেয়ারে বসে পড়লেন। ঠিক তখনই দরজার বাইরে থেকে ‘কৃষ্ণদা কৃষ্ণদা’ ডাক শোনা গেল। তারপরই বন্ধ দরজায় জোরে জোরে কড়া নাড়ার শব্দ। কৃষ্ণহরিবাবু গিয়ে দরজা খুলতেই হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে পড়ল হীরালাল,’কৃষ্ণদা ওই মেয়েটা, ওই যে তোমার ভাড়াটে,ওই মৌসুমিকে দেখেছিলাম একদিন ওকে ওই ফ্ল্যাট থেকে বেরোতে, ওকে আবার দেখতে…’, কথা বলতে বলতেই ঘরে উপস্থিত অন্য দুজনের দিকে চোখ পড়তেই থেমে গেল হীরালাল।
সব্যসাচী দত্ত এগিয়ে এসে বললেন,’বলো কি বলতে এসেছিলে,কোথায় দেখছ মেয়েটাকে?’
কৃষ্ণদা বলে উঠলেন,’বল হীরালাল বল,কোথায় দেখেছ ওই মৌসুমিকে?’
সব্যসাচী দত্ত বললেন,’আমি গোয়েন্দা বিভাগের লোক, এর সঙ্গে দেশের সুরক্ষা জড়িয়ে আছে,চুপ করে না থেকে নির্দ্বিধায় বলো যা বলতে এসেছিলে।’
হীরালাল একটু চুপ করে থেকে বলতে শুরু করল,’আমি গ্রিন পার্কের কাছে একটা ফ্লাট বাড়িতে ফুড প্যাকেট ডেলিভারি করতে গিয়েছিলাম। প্যাকেট ডেলিভারি করে বেরোচ্ছি, হঠাৎ মনে হলো পার্কের অন্য প্রান্তে সেই মেয়েটা মানে ওই মৌসুমি।আমি স্কুটিটা ওখানেই রেখেই ওকে অনুসরণ করতে শুরু করি ও একটা শুরু গলিতে ঢুকল, গলির একেবারে শেষ মাথায় একটা বাড়িতেও ঢুকে গেল, ব্যাস আমিও আর না এগিয়ে গলির মুখ থেকে ফিরে এলাম।তবে মেয়েটার সাজ পোশাক একদম বদলে গেছে। একটা টপ আর জিন্স প্যান্ট পড়েছিল’।
সব্যসাচী দত্ত বললেন,’তুমি শিওর ওই মেয়েটাই ছিল’।
হীরালাল বলল,’একদম হান্ডেড পার্সেন্ট স্যার, আমি ফুড ডেলিভারি করি স্যার,একবার যার মুখ দেখি সে মুখ কোন‌ওদিন ভুলি না,এটা ওই মৌসুমী মেয়েটাই’।
রাহুল মহাপাত্র বললেন,’আর ‘ক’জন আছে ওই বাড়িতে জানো’?
হীরালাল বলল,’বাড়িটা খুব বড় নয়,তবে লোক আছে ভেতরে,ওই মৌসুমি গিয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দু’বার দরজায় ঢোকা মারতেই কেউ ভেতর থেকে দরজাটা খুলে দিল’।
সব্যসাচী দত্ত বললেন,’ঠিক আছে হীরালাল,তুমি এখন আমাদের সঙ্গে চলো,ওই বাড়িটা দেখিয়ে দাও। আর এক মুহূর্ত নষ্ট করা যাবে না,যে করেই হোক আজকের মধ্যেই ওদের ধরতে হবে, রাহুলবাবু আপনি আপনার ফোর্স রেডি করুন। আমি আমার ডিপার্টমেন্টে কল করে এডিশানাল ফোর্স আনিয়ে নিচ্ছি আর ওখানকার লোকাল থানার ওসিকেও ম্যাসেজ পাঠিয়ে দিন বাড়ির লোকেশন দিয়ে যাতে আমরা পৌঁছানোর আগে পর্যন্ত ওরা ওই বাড়ির উপর নজর রাখতে পারে, কুইক রাহুলবাবু আমাদের হাতে বেশি সময় নেই’।
সব্যসাচী দত্তের কথা মত রাহুলবাবু দ্রুত মোবাইলে কল করে সব ব্যবস্থা করতে বলে দিলেন। সব্যসাচী দত্ত হীরালালকে সাথে নিয়ে বাড়িটার বিষয়ে আর‌ও কিছু খবর জানার চেষ্টা করলেন। সবকিছুর মধ্যেই কৃষ্ণহরিবাবুই শুধু হতবাক হয়ে চেয়ারে বসে রইলেন।
রাত হয়েছে বেশ অনেকটাই।বেশ কিছু সময় আগে থেকেই সাদা পোশাকে তিনজন পুলিশকর্মী নজর রাখছিলেন গলিটার ওপর।তাদের দুজন পুরুষ ও একজন নারী।সব্যসাচী দত্ত তার টিম নিয়ে পৌঁছে গেলেন হীরালাল,রাহুল মহাপাত্র আর প্রদীপ মিত্রকে সঙ্গে করে। তাদের গাড়ি বেশ কিছুটা তফাতে রাখা।আরেকটু দূরে আরও একটা গাড়ি রয়েছে।তার থেকে দুজন লেডি অফিসার নেমে ওই গলিটার পেছনের দিকে একটা রাস্তায় ঢুকে গেলেন,রাস্তাটাকে গোল করে ঘুরে তারা গলির অপরপ্রান্তে চলে গেলেন।গলির মুখে এসে গেল গোটা টিম।হীরালাল গলির মুখ থেকে বাড়িটাকে দেখিয়ে দিল।নজরদারী রাখা অফিসারকে দিয়ে হীরালালকে দূরে রাখা পুলিশের গাড়িতে ফেরত পাঠানো হল। সব্যসাচী দত্ত তার টিমের সবাইকে পজিশন নিতে বললেন গলির মুখ থেকেই।
আশপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেছে।স্থানীয় থানার পক্ষ থেকে আরো দুজন পুলিশ কর্মীকে রাস্তার মোড়ের দিকে গ্রীন পার্কের সামনে মোতায়েন করা হয়েছে।তারা লক্ষ্য রাখছে, যাতে আর কেউ এদিকে না আসতে পারে। পুলিশি অপারেশন চলবে,কোন‌ওভাবেই কোন‌ও সিভিলিয়নকে এদিকে আসতে দেওয়া যাবেনা। যদিও এখন এই রাতে এই দিকের রাস্তায় লোভ চলাচল প্রায় নেই বললেই চলে।
সাবধানতা অবলম্বন করে গোটা দল এগোতে লাগল।বাড়ির প্রধান দরজার দুপাশে দুইজন সশস্ত্র অফিসার পজিশন নিলেন,ওপাশ থেকে দুজন মুখ ঢাকা লেডি অফিসার জানালেন যে তারাও তৈরি।একজন অফিসার এগিয়ে গিয়ে দরজায় টোকা দিলেন।ভেতর থেকে কোন‌ও আওয়াজ হল না।কিছু মুহূর্ত নিস্তদ্ধতা, তারপরেই মনে হল কেউ যেন হালকা করে দরজা খুলে দেখতে চাইছে বাইরে কেউ আছে নাকি,কারণ দরজায় কোন আইহোল নেই,যে মুহূর্তে দরজাটা অল্প একটু ফাঁক হল সঙ্গে সঙ্গে সামনে থাকা সেই অফিসার গিয়ে সজোরে এক লাথি মারলেন দরজায়,দরজার ওপাশে আরেকজন থাকা লোকটি ছিটকে পড়ে গেল,সেই সুযোগে সামনে থাকা অফিসারটির সাথে আরেকজন অফিসারও দরজা খুলে ঢুকে পড়লেন, সঙ্গে সঙ্গে ভেতর থেকে শুরু হল এলোপাতাড়ি গুলি চালনা।সামনে থাকা অফিসারটি ঝাঁপিয়ে নীচে শুয়ে পড়তে পারলেও অন্য অফিসারটি গুলিবিদ্ধ হয়ে মেঝেতে পড়ে গেলেন,এদিক থেকে বাকি পুলিশ বাহিনীও গুলি চালাতে চালাতে ভেতর থেকে ঢুকে পড়ল,ভেতর থেকে যারা গুলি করছিল তাদের দুজন গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল আর‌ও কেউ ভেতর থেকে আড়াল থেকে গুলি চালাচ্ছিল কিন্তু অফিসার সব্যসাচী দত্ত ও অফিসার প্রদীপ মিত্র দুইদিক থেকে তাকে ঘিরে ধরে নিজেদের গুলিতে তার হাত থেকে বিবরণ ফেলে দিলেন,বুলেট লেগেছে তার হাতে,তাকে আড়াল থেকে টেনে বের করতেই দেখা গেল সে আসলে সোমনাথ।ঠিক তখন‌ই পেছন থেকে অতর্কিতে আক্রমণ করে একজন মেয়ে বুকে ছুরি বসিয়ে গুরুতর জখম করে ফেলল রাহুল মহাপাত্রকে আর দ্রুত অদ্ভুত দক্ষতায় সে তার রিভলভার ঠেকিয়ে ধরল প্রদীপ মিত্রের মাথায়।এই সেই মেয়ে মৌসুমী ওরফে ডোনা,তার এই রূপ অভাবনীয়। সে প্রদীপের মাথায় রিভলভার ঠেকিয়ে তাকে হোস্টেজ করে দরজা দিয়ে বেরিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু তখনই পেছন থেকে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন দুজন মুখ ঢাকা লেডি অফিসার।খুব সহজে এবং অতি দ্রুত তারা মৌসুমিকে মেরে ধরে তাকে কব্জা করে নিল। প্রদীপ মিত্র তখন মুক্ত হয়ে দ্রুত ছুটে গেছেন রাহুল মহাপাত্রের কাছে,তিনি তখন মেঝেতে পড়ে গোঙাচ্ছেন। সব্যসাচী দত্তের নির্দেশে প্রদীপ মিত্র তাকে দ্রুত সেখান থেকে বের করে নিয়ে গেলেন চিকিৎসার জন্য। কাছেই অ্যাম্বুলেন্স মোতায়েন করা আছে।সেখানে দ্রুত রাহুল মহাপাত্র পৌঁছে দিতে সচেষ্ট হলেন প্রদীপ মিত্র। সব্যসাচী দত্ত তখন দুই মুখোধারী লেডি অফিসারের দিকে তাকিয়ে বললেন,’ওয়েলডান মহামায়া আর শুভমিতা’।
দুজনেই নিজেদের মুখের ঢাকা খুলে ফেললেন, তাদের কব্জায় থাকা মৌসুমী তখন রাগে গজরাচ্ছে। অফিসার স্পেশাল ব্রাঞ্চ মহামায়া সিংহ আর তার সহকারী শুভমিতা দুজনে মিলে মৌসুমীর হাতে পিছমোড়া করে হাতকড়া পরিয়ে দিলেন। সব্যসাচী দত্ত তখন প্রদীপের দিকে এগিয়ে গিয়ে তার মাথায় রিভলবার ঠেকিয়ে বললেন,যদি বাঁচতে চাও,যদি চাও এখানে তোমার এনকাউন্টার না হোক তাহলে সব সত্যি কথা বলতে শুরু করে দাও’।
মৌসুমী ওরফে ডোনার গর্জন স্বত্বেও সোমনাথ প্রাণের ভয় বলতে শুরু করল,আমরা বিদেশী শত্রুদের কাছ থেকে মোটা টাকা নিয়ে আগামী পরশুর সারা ভারত মৈত্রী সম্মেলনে বম্ব ব্লাস্ট করার পরিকল্পনা করেছিল,এখানকার কয়েকজন দুর্নীতিবাজ আধিকারিক ও আমাদের কাছে আছে,তাদের নামধাম সব ডোনা জানে। মনের কথা খুব মন দিয়ে শুনছো দিচ্ছি।মিলিয়ন ডলারের কন্ট্রাক্ট ছিল।এদিকে আমিই সর্বত্র ওয়ান্টেড, যদিও ডোনাকে কেউ সেভাবে চেনে না। আমরা আমাদের এখানকার এজেন্ট পলাশকে কাজে লাগিয়ে কৃষ্ণহরিবাবুর ফ্ল্যাটে ভাড়া নিয়ে নবদম্পতি সেজে চলে আসি।স্থানীয় মানুষকে ভুল বোঝাতে সাংসারিক ঝগড়ার পরিবেশ তৈরি করি,যাতে সহজেই সময়মত আমরা ওই ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে আমাদের এই গোপন আস্তানায় এসে এখান থেকে পরিকল্পিত অ্যাটাক করতে পারি,কিন্তু সমস্যা বাধালো পলাশ,সে জানত আমি কোন‌ও মেয়ে পাচার করতে এখানে ছদ্দবেশে এসেছি,সে ভেবেছিল সেই মেয়ে ডোনা,আসলে ওই যে আমাদের মাস্টারমাইন্ড তা পলাশ জানত না,আমাদের পুরোপুরি পরিকল্পনা শোনার পর সে বেঁকে বসে।এখানে বম্ব ব্লাস্টের পরিকল্পনার আর উগ্রপন্থী কার্যকলাপের কথা শুনে সে বেঁকে বসে।এখানে বম্ব ব্লাস্টের পরিকল্পনার আর উগ্রপন্থী কার্যকলাপের কথা শুনে সে ঘাবড়ে যায়, আমরা হাজার বোঝাতেও সে শোনে না,তখন আমি তাকে ফ্ল্যাটের বারান্দায় কথায় ব্যস্ত রাখি আর ডোনা হঠাৎ করে পেছন থেকে আক্রমণ করে তার গলার নলি কেটে দেয়।পলাশের লাশকে বিছানায় ফেলে আমরা দুজন চুপিসারে বেরিয়ে আসি ওই ফ্ল্যাট থেকে রাতের বেলায়। কিন্তু আপনারা কিভাবে এখানে আমাদের সন্ধান পেলেন তা বুঝে উঠতে পারলাম না।
সব্যসাচী দত্ত বললেন,’একজন ফুড ডেলিভারি বয়ের স্মৃতিশক্তি আর উপস্থিত বুদ্ধিতে তোমরা কুপোকাত হলে’।মহামায়া সিংহ ডোনার কলার ধরে তাকে তুলে দাঁড় করিয়ে বললেন,’সব্যসাচী স্যার, একে আমার হাতে ছেড়ে দিন,কোরাপ্ট আধিকারিক আর বিদেশী শত্রুদের সব কথা এর মুখ থেকে আমি আদায় করে ছাড়ব’।
সব্যসাচী দত্ত সম্মতিতে মাথা নাড়লেন। সব্যসাচী দত্ত টিম নিয়ে যখন অ্যাম্বুলেন্সর কাছে এসে পৌঁছলেন তখন রাহুল মহাপাত্র কিছুটা ধাতস্থ হয়েছেন, তার ঘায়ে প্রাথমিক চিকিৎসা করা হয়েছে, তিনি স্ট্রেচারে শোয়া অবস্থায় হাত নেড়ে জানালেন যে তিনি ঠিক আছেন। সব্যসাচী দত্ত তারপর এসে গাড়িতে বসা হীরালালকে বললেন,’আজ তোমার জন্যই এই শহর বেঁচে গেল আর একটা ভয়ংকর উগ্রপন্থি গোষ্ঠীর দুটো মাথাকে আমরা ধরতে পারলাম।থ্যাঙ্ক ইউ’।হীরালাল আর হেসে মাথা নাড়াল।
হীরালালকে পুলিশ নামিয়ে দিয়ে গেল তার পাড়ায়। পাড়ার মোড়ে কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছিলেন কৃষ্ণহরিবাবু। হীরালাল কে ফিরে আসতে দেখেই সবাই জয়ধ্বনি দিয়ে উঠল। কৃষ্ণহরিবাবু তাকে জড়িয়ে ধরে বললেন,’এবার থেকে ভাই তোমাকে জিজ্ঞেস করে, দেখিয়ে তবেই আমি ভাড়াটে রাখব’।
পাড়ার অন্যান্যদের সঙ্গে এই কথা হেসে ফেলল হীরালাল‌ও।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।