সম্পাদকীয়

স্পেস ও ব্যাকস্পেসের গল্প
যতিচিহ্ন, বিরামচিহ্ন বা ছেদচিহ্ন হল সেইসব সাংকেতিক চিহ্ন যেগুলো ব্যবহার করে বাক্যের বিভিন্ন ভাব, যেমন: বিবৃতি, অনুরোধ, উপরোধ, জিজ্ঞাসা, বিস্ময়, সমাপ্তি ইত্যাদি সার্থকভাবে প্রকাশের মাধ্যমে বাক্যের অর্থ সুস্পষ্ট করা হয়। বাংলা ভাষায় ২০টির মতো যতিচিহ্ন রয়েছে। এদের মধ্যে বাক্যশেষে ব্যবহার্য যতিচিহ্ন ৪টি; বাক্যের ভিতরে ব্যবহার্য ১০টি এবং বাক্যের আগে পরে ব্যবহার্য ৬টি। অন্য ভাষায় এর বাইরেও বিভিন্ন রকমের যতিচিহ্ন বর্তমান। বাংলা ভাষায় এই যতিচিহ্নগুলির ব্যবহার সম্পর্কে সবাই কমবেশী অবহিত। তাছাড়া এতে ভুল ভ্রান্তি হলে তা শুধরে দেওয়ার মতো গুণীজনের অভাব নেই। যদিও বানান ভুল যতটা চোখে পড়ে, তারচেয়ে অনেক কম চোখে পড়ে যতিচিহ্নের ভুল। বা অনেক সময় তা লেখকের খেয়াল রূপে নজর আন্দাজ করা হয়। যতিচিহ্নের নিয়মের রাশ কিছুটা আলগা হওয়ায় আমাদের কাছে যতিচিহ্নের নিয়মগুলো সড়গড় হয় না। কোথাও যেন সাহিত্যে (বাংলা, ইংরেজি যাই হোক না কেন) বানান বা ব্যাকরণ সুয়োরানী হলে, যতিচিহ্ন দুয়োরানী। তবে যতিচিহ্ন একেবারে উঠে গেলে বা ভুল জায়গায় বসলে বাক্যের অর্থ পরিবর্তিত হয়ে যায়, তখন বোঝা যায় এর গুরুত্ব। তাই মূল বিষয়টি ঠিক রাখা অত্যন্ত জরুরি। আজকাল অনেক বিশিষ্ট লেখকদের অবহেলাজনিত অসতর্কতার কারণে এই ভুলটি প্রায়শঃই ধরা পড়ে। যদিও এর বাইরে আর কোন ভুল ধরা আমার কাজ নয়। যতিচিহ্নের সূক্ষ্ম বিচারের দায়িত্ব তুলে দিই গুণীজনদের হাতেই। কিন্তু একজন সম্পাদক হিসেবে কিছু কথা বলতে চাই। আমার মতো প্রায় সকল সম্পাদক বিষয়টির সম্মুখীন হন হামেশাই, বিশেষ করে অনলাইন ম্যাগাজিনের সম্পাদকরা। কারণ বেশিরভাগ লেখক/কবি অনলাইনে লেখা দিতে খুবই কম যত্নবান। এটি যদি হয় প্রথম কারণ, তাহলে দ্বিতীয় কারণটি অবশ্যই অজ্ঞতা। অজ্ঞতা কথাটি সাহিত্যিকদের খুবই অপছন্দের, অথচ অজ্ঞতা জীবনের অঙ্গ। অজ্ঞতা না থাকলে জ্ঞানের অস্তিত্ব অথবা উপযোগিতা কোথায়? যাইহোক, এক্ষেত্রে অজ্ঞতাটি আমাদের কখনো দূর করা হয়নি। ছোটবেলা থেকে লেখার সময় যতিচিহ্নের ব্যবহার তো শেখানো হয়েছে, কিন্তু শব্দের সঙ্গে যতিচিহ্নের অবস্থান কখনো শেখানো হয়নি। তেমনি দুটি শব্দের মধ্যেকার ব্যবধান সম্পর্কেও তেমনভাবে কিছু বলা হয়নি। শুধু বলা হয়েছে সমান গ্যাপ দিয়ে সুন্দর হাতের লেখায় লেখো। যতিচিহ্নের ক্ষেত্রে সেটুকুও বলা হয়নি। আমরা অভ্যাসবশতঃ শব্দের শেষে যতিচিহ্ন দিয়েছি ঠিকই, কিন্তু গ্যাপটা খেয়াল রাখিনি কখনোই। এদিকে হাতের লেখায় গ্যাপ কমবেশি হলেও বোঝার তেমন উপায় থাকে না। কিন্তু গণ্ডগোলটা হলো বর্তমানে টাইপিং এর যুগে এসে। টাইপ রাইটার আগেও ছিল, কিন্তু তা টাইপে শিক্ষিত টাইপিস্টদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। কিন্তু বর্তমানে টাইপিং না শিখেও কম্পিউটারের বা মোবাইলের কিবোর্ডে ঝড় উঠছে। কম্পিউটারের মাইক্রোসফট ওয়ার্ডে টাইপ করতে গিয়ে খেয়াল করি, যখনই একটা শব্দের পর স্পেস দিয়ে দাড়ি, কমা বা ইংরেজিতে ফুলস্টপ দিচ্ছি, তখনই লালরঙা আন্ডারলাইন হয়ে যাচ্ছে। অনেকেই এগুলো ইগনোর করেন। কিন্তু এখানেই শিক্ষার বিষয়টি। শব্দ ও যতিচিহ্নের মধ্যেকার ওই স্পেসটি সরিয়ে দিলেই লাল আন্ডারলাইন অন্তর্হিত হচ্ছে। অর্থাৎ শব্দের পর যতিচিহ্ন লিখতে কোন স্পেসের প্রয়োজন নেই। দুটি বাক্যের মাধ্যমে বিষয়টি একটু দেখে নিই…
আমি ভাত খাবো । X
আমি ভাত খাবো। ✓
এবারে আগের বাক্যের যতিচিহ্ন তো ঠিক জায়গায় দিলাম, পরের বাক্যের প্রথম শব্দটি কিভাবে শুরু করবো? এখানে সাধারণত দাঁড়ি, কমা, ফুলস্টপ, জিজ্ঞাসা চিহ্ন, ড্যাশ এগুলোর পরে একটা স্পেস দিয়ে পরের বাক্য বা বাক্যাংশটি শুরু করতে হবে। আবার যদি অবলিক বা স্ল্যাশ, হাইফেন এর মতো যতিচিহ্ন হয়, তবে কোন স্পেস ছাড়াই পরবর্তী বাক্যাংশ শুরু করতে হবে। উদাহরণ গুলো দেখে নিই চটপট…
আমার খিদে পেয়েছে,আমি ভাত খাবো। X
আমার খিদে পেয়েছে, আমি ভাত খাবো। ✓
স্থান- কাল- পাত্র বিচার করো। X
স্থান-কাল-পাত্র বিচার করো। ✓
রাম/ শ্যাম এই কাজটি করবে। X
রাম/শ্যাম এই কাজটি করবে। ✓
এবারে আসি ইনভার্টেড কমা বা উদ্ধৃতি চিহ্নের ক্ষেত্রে। এই যতিচিহ্নটি ব্যবহার করতে হবে যে শব্দ বা বাক্যটি উদ্ধৃত করা হচ্ছে তার সাথে যুক্ত করে। কোন স্পেস যেন না থাকে। আর বাক্য শেষ হলে বা বাক্যাংশ বর্জন হলে সেই যতিচিহ্নগুলিও উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যেই থাকবে। খুব জটিল লাগছে? উদাহরণে সব জলবৎ তরলং হয়ে যাবে।
তুমি বলেছিলে, ” আমরা সবাই ঘুরবো, কিন্তু ” … X
তুমি বলেছিলে, “আমরা সবাই ঘুরবো, কিন্তু…” ✓
এরকমভাবে ব্র্যাকেটের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম। সংক্ষেপণ চিহ্নের ক্ষেত্রে এম . এল . এ . বা M .L . A . নয়, হবে এম.এল.এ. বা M.L.A.
ড্যাশ ও হাইফেন, কোলন ও কোলন ড্যাশ, কমা ও সেমিকোলন এর পার্থক্য ও তার ব্যবহারের সঠিক স্থান তো আমরা ভুলতেই বসেছি, তবে এনিয়ে আমি কিছু বলবো না এবিষয়ে আমি যথেষ্ট অজ্ঞ, আমার তা স্বীকার করতে দ্বিধা নেই। আমিও শিখতে চাই, গুণীজনরা আমাদের শেখাবেন তা আশা রাখি। এদিকে এই যে যতিচিহ্নের ব্যবহারে গড়বড়, তাতে লেখায় যেমন কুপ্রভাব পড়ে, তেমনি রিডিং পড়ার সময়েও তার ওপর কুপ্রভাব পড়ে। তবে আজকাল লেখার পাশাপাশি রিডিং এর হালও সঙ্গীন।
এবারে আসি শব্দে শব্দে গ্যাপের বিষয়ে। এটা খুব সহজ বিষয়, অথচ এই সহজ বিষয়টিই কোন অজানা কারণে জটিল হয়ে ওঠে। দুটি শব্দের মাঝে একটি স্পেস থাকবে। দুটি বা তিনটি নয়। এক্ষেত্রে আমাদের টাইপিং স্পীড প্রয়োজনে কমাতে হবে। কিন্তু লেখকের এই সিলি মিসটেক একজন সম্পাদকের পুরো বারোটা বাজিয়ে দেয়। একটা ১০০০-২০০০ শব্দের গল্প/প্রবন্ধ এডিট করার সময় যদি দেখা যায় তার মধ্যে ৫০০-৭০০ জায়গায় স্পেস কমবেশী আছে, তাহলে তা ঠিক করতে গেলে ৫০০-৭০০ বার ব্যাক স্পেস প্রেস করতে হবে। লেখকের কাছে এটা সিলি মিসটেক হলেও বিন্দুতে সিন্ধু সৃষ্টির মতো সম্পাদকের কাছে তা ৫০০-৭০০ টি শব্দ লেখার সামিল। মানে আমরা বসে বসে কার্জার প্রতিস্থাপন ও ব্যাকস্পেসের গল্প লিখতে বসি তখন। এদিকে লেখক লেখা দিয়েই অধৈর্য্য হয়ে যান, “এখনো প্রকাশিত হলো না?” তাই একটু ধীরে সুস্থে লিখুন… দেখে নিন আরও একবার…
আমি ভাত খাবো, তারপর কিছু পরে জল পান করবো।তুমিও তাই করবে । X
আমি ভাত খাবো, তারপর কিছু পরে জল পান করবো। তুমিও তাই করবে। ✓
এবারে আসি আরও একটা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তবে এটাই লাস্ট, আমি আমার ছোট মুখে অনেক বড় বড় কথা বলে ফেলেছি, এটাই শেষ। টি, টা, খানা, খানি, গুলো, তে… এগুলো বিভক্তি তা আমরা সবাই জানি। বিভক্তির একা একা কি কোন অর্থ আছে? না, নেই। শব্দের সঙ্গে বসে তা অর্থ তৈরি করে। তাহলে এই বিভক্তিগুলিকে দূরে ঠেলে দেওয়া কেন? কাছে টেনে নিন, ওরা আপনাকে সুন্দর সুন্দর অর্থ দেবে। যেমন…
এই শহর টা উচ্ছন্নে গিয়েছে, মানুষ গুলো স্বার্থ নিয়ে চলে, জলপাইগুড়ি তে এমন টা দেখিনি। X
এই শহরটা উচ্ছন্নে গিয়েছে, মানুষগুলো স্বার্থ নিয়ে চলে, জলপাইগুড়িতে এমনটা দেখিনি। ✓
আমার বলার কথা বললাম। অনেকেই বলবেন, অতশত বুঝি না। আসলে তাঁরা বুঝতে চান না। তাঁদের মর্জি। অথচ ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় এটি। আর এটাকে মেনে চলাটাও ভীষণ সহজ। সত্যি কথা বলতে কি আজকাল অনেকেই এটি শিখে উঠছেন। তাদের লেখায় হাত চোখ কোনোটাই বুলোতে হয় না। একদম নিখুঁত টাইপিং। প্রসঙ্গতঃ আমার কথাগুলির বিষয় কখনোই লেখার বিষয়ের মান নয়, ওটি আপনারা আমার থেকে অনেক বেশি জানেন। আমার বক্তব্য টাইপিং এর মান নিয়ে। আমারও উপরের সবকটি ভুল হতো। ওই যে শুরুতে বলেছি না, অজ্ঞতা কোন দোষ নয়, অজ্ঞতা না মানাটা দোষ। অজ্ঞতা শিকার করে শিক্ষাগ্রহণ, জ্ঞানার্জন কখনোই নিজের পরাজয় নয়, ভবিষ্যতের জন্য নিজের জিৎ। এই ভুলগুলোকে সংশোধন করানোর পিছনে রয়েছে প্রাচীনপন্থীদের (যারা ফেসবুক কবি, অনলাইন লিটল ম্যাগাজিন দেখে গেলো গেলো রব তোলেন) চোখের বিষ এই কম্পিউটারের কিবোর্ড, মোবাইলের গুগল বোর্ড। হ্যাঁ, এই দুটিকে ফলো করুন দেখবেন আপনার টাইপিং কোয়ালিটি উন্নত হয়েছে। আর এতে আমাদের তথা সম্পাদকদের কাজ অনেক সহজ হয়ে উঠবে।
সায়ন্তন ধর