ধারাবাহিক রম্য রচনায় সংযুক্তা দত্ত – ৩

 

গত দুই পর্বে আমার ছোটবেলার কিছু মঞ্চ পরিবেশনার স্মৃতি ভাগ করে নিয়েছিলাম তোমাদের সাথে। আচ্ছা মঞ্চ মানেই কী শুধু প্রেক্ষাগৃহের মঞ্চ? সেই যে কবিগুরু বলে গেছেন,” প্রেমের ফাঁদ পাতা ভূবনে “, তেমনি আমার ও মঞ্চ আছে ভরা ভুবনে-
ভনিতা ছেড়ে আসল গল্পে আসি এবার
আমাদের বাড়ির ছাদে রোজ বিকেলে এক জমজমাট খেলার আসর জমত। একদল কচি কাঁচা মিলে হুটোপাটি। আমার ঠাকুমার পছন্দ ছিল না একমাএ নাতনি খেলতে অন্য কারুর বাড়ি যাক তাই মুখরোচক জলখাবার ও রেডি থাকত পুরো দলের জন‍্য। তখন হত লম্বা গরমের ছুটি, আর এত পড়ার চাপও থাকত না। সেই সময় আমার কাকিমা এই বিচ্ছু দলকে নিয়ে শুরু করল রবীন্দ্র নজরুল জয়ন্তী পালন আমাদের ছাদে। প্রথম বার ছিল কবিগুরুর “সামান‍্য ক্ষতি ” কবিতার সাথে নৃত‍্য আলেখ‍্য। রাণীর ভূমিকায় আমি, না না শুধু ডিরেক্টর কাকিমা বলে নয়, নাচটা একটু আধটু পারতাম কি না। রাজা টিটু,সখী মালতীর গুড়িয়া, প্রজা ববি ও ছোটন।ববি ছিল ধবধবে ফর্সা, নাটকের পর কয়েকজন বলল, কাশী রাজ‍্যে কী তখনই ব্রিটিশ রা আসতে শুরু করে দিয়েছিল নাকী? ববিদের বাড়ি গৃহ সহায়ক ছিল বাদল, সে হল রাজার সভাষদ। সখীদের দলে ছিল পল্লবী,মনি। আবার আমাদের কয়েকজন অতিথি শিল্পীও ছিল মানে যারা ওই ছাদের খেলুড়ে দলের নিয়মিত সদস্য নয়। সেরকম দুই অতিথি শিল্পী বোন ডালিয়া আর জিনিয়া, তাদের যেমন ফুলের মত নাম তেমনি ফুলের মত ফুটফুটে দেখতে আর তেমনি মিষ্টি স্বভাব। গান গাইতে আসত আরেক অতিথি শিল্পী সোমা সেই উত্তর কলকাতা থেকে।কয়েকদিন রোজ রির্হাসাল চলল। মাঝে মধ‍্যেই যদিও কখনো রাজার সাথে রাণীর, রাণীর সাথে মালতীর ঝগড়া লেগে যেত। রাণী একটু বেশিই ক‍্যারেক্টারে ঢুকে পড়েছিল আর কী। ডিরেক্টর যখন পেরে উঠত না দরকার ডাক পরত প্রোডিউসারের অর্থাৎ আমার মা। যার এক ধমকে এই রাণী “করুনা “একদম শান্ত। এবার এল অনুষ্ঠানের দিন। দড়িতে বেডকভার ঝুলিয়ে হল মঞ্চের পর্দা। রাণী যে নদীর ধারে স্নানে যাবেন তা তৈরী হল নীল সেলোফিন কাগজের তলায় আলো দিয়ে। প্রজাদের কুটীরে আগুন লাগার দৃশ্য হয়েছিল কমলা সেলোফিন কাগজের পেছনে টর্চ জ্বালিয়ে। ব‍্যাক স্টেজ সামলানোর দায়িত্বে মা এবং অন‍্য বন্ধুদের মায়েরা। দর্শক পাড়া প্রতিবেশী আর অতিথি শিল্পীদের মায়েরা। “সামান‍্য ক্ষতি” এই সামান‍্য আয়োজনেই অভূতপূর্ব সাফল‍্য লাভ করেছিল। তারপর বেশ কয়েক বছর ধরে এই অনুষ্ঠান নিয়মিত হত। আজ যখন এই মহামারীর সময় ছাদে নাচের ভিডিও তৈরী শুরু করলাম তখন বারবার ওই দিন গুলো মনে পড়ত। এই নির্মল আনন্দের স্মৃতি মনের মনিকোঠায় সদাই জ্বাজ্বল‍্যমান।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।