ক্যাফে গল্পে সুজিত চট্টোপাধ্যায়

জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে

( গল্পের আগের কিছু কথা । কিছু মৃত্যু কখনো কখনো মনের দরজায় অসহিষ্ণু কড়া নাড়ে। আমরা মানুষ, তাই খাই , গল্প করি, দৈনন্দিন কোনো কাজই পড়ে থাকে না। ফেলে রাখি না। কিন্তু সেই অসহিষ্ণু কড়া নাড়া চলতেই থাকে যতক্ষণ না অর্গল খুলে দেওয়া হয়। আজকের এই গল্প সেই অর্গল খুলে দেবার প্রয়াস।)
***********************************
বাড়ীর পিছনের নিমগাছে অসময়ে কোকিল ডাকছে। না, তার স্বাভাবিক কুহুতান নয়। এক অন্য সুরে, অন্য স্বরে ডাকছে। এতো দুঃখের মধ্যেও অভীকের মনে পড়ে যায় নজরুলের গান…..” এ কি সুরে তুমি গান শোনালে ভিনদেশী পাখী “…, , একটুকরো হাসি মুখের কোথাও দেখা দিয়েই মিলিয়ে যায় ভরা বর্ষার রোদের উঁকি মারার মতো। অন্য সময় হলে এই ব্যাপারটা বেশ উপভোগ করতেন অভীক দত্ত। কিন্তু আজ…., , পশ্চিমের ঘর থেকে পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণ শোনা যাচ্ছে…..” ওঁ কুরুক্ষেত্র্যাং গয়া গঙ্গা প্রভাস পুস্করানি চ।
তীর্থান্যে- তানি পুণ্যানি দানকালে ভবন্তিহ।।
এতে গন্ধপূষ্পে ওঁ সাচ্চাদন তৈজসাধার- প্রিয়দত্ত তদ্ভুমিভ্য নমঃ।
এতে গন্ধপূষ্পে ওঁ বিষ্ণবে নমঃ,
এতে গন্ধপূষ্পে ওঁ এতৎসম্প্রদান – ব্রাহ্মণ্যেভ্য নমঃ।
অভীক উঠে দরজাটা বন্ধ করে দেন। ভালো লাগছে না। ওঁর ইচ্ছে ছিলো না এভাবে শ্রাদ্ধশান্তি বাড়ীতে করার। কোনো মঠে হয়তো করানোই যেতো, কিন্তু এ সংসারের সবকিছুই কি আর তাঁর ইচ্ছেমতন হবে? পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মতে, পৈতৃক বাড়ীতেই করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অভীক এখন আর স্বমত প্রতিষ্ঠা করার জন্য বিশেষ জোর দেন না। সংসারের স্টোর রুমে ছেলেবেলার খেলনা ঘোড়াটার মতোই এক কোণে পড়ে থাকতেই বেশী পছন্দ করেন। একসময়ের দাপুটে প্রিন্সিপাল এখন খুবই সাধারণ মানুষ হিসেবে কাটিয়ে দিতে চান। একসময় অবসরের পর ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন হালিশহরের বাড়ীতে এসে থাকবার। কিন্তু সে ইচ্ছা সাংসারিক শান্তি বজায় রাখতে বিসর্জন দিতে হয়েছে তাঁকেও আরো অনেক কিছুর মতোই।
একসময়ের দত্ত পরিবারকে একটু একটু করে সন্দেশের টুকরোর মতো চামচ দিয়ে কেটে খেয়েছে সময়। কড়ি বরগার ছাদ আর চল্লিশ ইঞ্চি মোটা দেওয়ালের ঘরগুলো আটকে রাখতে পারে নি ভাঙনকে। ভাইদের মধ্যে সবাই জীবিকার সন্ধানে ” দূরে কোথায় দূরে দূরে ” হয়ে চলে গ্যাছে কেউ কলকাতায়, কেউ হরিয়ানায় , কেউ বা কানাডায়। অনেক আগে বিয়েথাওয়া, উপনয়নে বা দুর্গাপূজায় পালাপার্বনে একটা পারিবারিক সম্মেলন হোতো। আনন্দ হৈ হট্টগোলে বাড়ীটা প্রাণ পেতো। তারপর অনুষ্ঠান শেষে সবাই যখন চলে যেতো তখন আবার ডেকোরেটারের কাপড়ের সাজানো অস্থায়ী ঘর আর ফুলের গেট খুলে নিয়ে যাওয়া বাঁশের ম্যারাপ টুকু পড়ে থাকার মতোই পড়ে থাকতো দত্ত পরিবারের এজমালি বাড়ী ‘ সুখ নীড় ‘। ক্রমেই দত্ত পরিবার টবে রাখা বনসাই বট, অশ্বত্থগাছের মতোই ঝুড়ি নামিয়েছে কিন্তু ছায়া দেবার বা পাখপাখালীর আশ্রয় দেবার ক্ষমতা হারিয়েছে।
আজ আবার সবাই একসাথে। সেজভাই অনীক আসতে পারে নি কানাডা থেকে। মোবাইলের ভিডিওকলে উপস্থিতি জানান দিচ্ছে সর্বক্ষণ। অনেকদিন পর সবাই আবার একসাথে, শুধু অচিন এখন ছবিতে। শীর্ণ চেহারায় বিসদৃশ বড়ো মোটা গোঁফের আড়ালে দুষ্টু হাসিতে কাঁচের ওপারে। অভীক বলতো…” অচি গোঁফটাকে ছোটো কর, তোর চেহারার সাথে এটা ঠিক যায় না “। অচিন হেসে বলতো….মেজদা, ” গোঁফের আমি গোঁফের তুমি, গোঁফ দিয়ে যায় চেনা “.….পড়ো নি তুমি? আর দ্যাখো, তোমরা সবাই স্বনামে প্রতিষ্ঠিত, এক ডাকে তোমাদের চেনে, আমায় যা দু চারটে লোক মনে রাখবে , সেটা হয়তো এই গোঁফের জন্যই…..বলেই বিসদৃশ গোঁফের মতোই নিজের রসিকতায় হা হা করে হেসে উঠতো।
সময় বয়ে গ্যাছে। ভাগীরথীর জলে অসংখ্যবার জোয়ার ভাটা। অভীকরা সবাই যে যার সংসারে ছাতা ধরেছে। কোথায় কে ভিজছে , সে খবর রাখার ” সময় কোথা সময় নষ্ট করবার “! অভীক দক্ষিণের জানালায় বসে ভাবেন…ছোটোভাইটাকে কি আরো কিছুদিন ছোটো হিসেবে দেখা যেতো না? তাহলে হয়তো আজ পশ্চিমের ঘর থেকে এতো তাড়াতাড়ি ” ওঁ কুরুক্ষেত্র্যাং গয়া গঙ্গা ” এই মন্ত্রধবনি শুনতে হোতো না। অভীক, অনীক, অলীকের পেশাগত ক্ষেত্রে উচ্চতর অবস্থানই কি অচিনকে তার অক্ষমতা সত্ত্বেও তাকে প্রতিযোগিতায় নামতে বাধ্য করেছিলো? ওকেও ‘ দাদাদের মতো হতে হবে ‘এই বোধটাই ওকে ঠেলে দিয়েছিলো প্রতিযোগিতার ইঁদুর দৌড়ে। যার পরিণতি…..” ওঁ কুরুক্ষেত্র্যাং গয়া ” ….
দরজা ঠেলে ভিতরে ঢোকে সোমা, অচিনের বউ….সঙ্গে অযাচিতের মতো, অনাহুত মন্ত্রোচ্চারণ। ….
” মেজদা চা “। অপ্রস্তুত অভীক কুণ্ঠা জড়ানো গলায় বলে…” আহ! তুমি আবার নিয়ে আসতে গেলে কেন “?
মেয়েটাকে দেখে কষ্ট হয় অভীকের। তাকাতে পারে না। সোমা দাঁড়িয়ে থাকে। অভীক ভাবনার গভীর থেকে উঠে প্রশ্ন করে ….” কিছু বলবে “? সোমা ‘ হ্যাঁ ‘ , ‘ না ‘ করে কিছু একটা বলতে গিয়েও থমকে যায়। বলা হয় না, ” না মেজদা, ঠিক আছে, তেমন কিছু নয় ” বলে এড়িয়ে যায়। অভীক নির্ভরতা যোগায়….” চিন্তা কোরো না, আমি( বলতে গিয়েও বলেন), মানে আমরা সবাই আছি ” “। সোমা উত্তর দেয় না। নির্বাক , নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকে। একসময় চায়ের কাপ উঠিয়ে নিয়ে বেরিয়ে যায়। অভীকের মনে পড়ে…..বহুদিন যোগাযোগ রাখতে পারে নি অচির সঙ্গে। মাঝে এক আধবার গিয়েছিলো অচি ওর হরিয়ানার বাড়ীতে। একেবারে হঠাৎ এবং একা। কিছুটা উদভ্রান্তের মতো। কিছু কি বলতে চেয়েছিলো অচি? কোনো আর্থিক প্রয়োজন বা অন্য কিছু? অভীক প্রশ্ন করেন নি, নাকি প্রশ্ন করতে ভয় পেয়েছিলেন? তখন ওঁর ছেলেমেয়ের হায়ার এডুকেশন। বাড়ী গাড়ীর ই.এম. আই, ছেলের বিদেশ যাবার প্যাসেজ মানি, মেয়ের গান, পড়াশুনা সবকিছু নিয়ে একেবারে ছড়িয়ে বসেছেন অভীক। ভুলে গ্যাছেন সেই ডানপিটে ছোটভাই অচিকে, যে ঠাকুমার গুড়আমের আচারের বয়োমে হাত ঢুকিয়ে ,চুরি করে একা খায় নি, পড়াশুনায় ভালো, গোবেচারা মেজদার জন্যও নিয়ে এসেছে ছাদের চিলেকোঠার ঘরে। অনেকটা বড়ো হওয়া ইস্তক যে ছেলে ভাইদের মধ্যে একমাত্র মেজদাকেই সবচেয়ে কাছের মনে করতো। গল্প করেন নি অভীক। সময় দেন নি ছোটভাই অচিকে। যদি অনেক বেশী সময় পেলে নিজেকে মেলে ধরতে পারে অচি। তবুও শেষবার জিজ্ঞেস করেছিলেন ওকে….” এই, তোর ব্যবসার খবর কি রে? কেমন চলছে ? সব ঠিকঠাক তো “? অচির মধ্যে থাকা সুপিরিওরিটি কমপ্লেক্স ওকে দিয়ে বলিয়েছে….” একদম বিন্দাস। ঝাক্কাস মেজদা। চাপ নিয়ো না। আমি ঠিক আছি, শুধু একটু লেবার ট্রাবল আছে, এই যা! ও কিছু না , পার্ট অফ দা গেম। ঠিক হয়ে যাবে “।
পরে কথায় কথায় শুনেছেন, জেনেছেন ওর কেমিক্যালের ব্যবসাটা খুব ভালো চলছে না। করোনা কালে ব্যবসা মুখ থুবড়ে পড়েছে। চেষ্টা করেছে উঠে দাঁড়াতে স্যানিটাইজারের ব্যবসা নতুন করে শুরু করে। শেষ পুঁজি, বউয়ের গয়না সব কিছুই বাজী লাগিয়েছে ব্যবসাতে। কিন্তু সময় সঙ্গে চলে নি। একটু একটু করে সবটা শেষ হয়ে গ্যাছে। গড়িয়ার ফ্ল্যাটটা বিক্রী করা নিয়ে সোমার সাথে শেষদিন কিছু বাদানুবাদ…..
সোমার তো ভুল কিছু ছিলো না। ধ্বংসস্তুপের ওপর দাঁড়িয়ে শুধু দেখে যাচ্ছিলো। এ ছাড়া ওর কিইবা করার ছিলো? শুধু ফ্ল্যাটটা , শেষ আশ্রয়টা হারাতে চায় নি নিজেদের পরিবারের কথা ভেবে।
আর ভাবতে পারেন না অভীক। ক্লাস এইটে পড়া ভাইপোর মুখটা চোখের ওপর ছায়া ফ্যালে। একবার ওর ফর্সা মুখে কোঁকড়ানো চুল….আর একবার ওর মুন্ডিত মস্তকের ছবি অভীককে উন্মন করে। দিশেহারা মনে হয় অভীকের। চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ান।
সেই মুহূর্তেই দরজা ঠেলে ঘরে ঢোকে মুনিয়া, অচির একমাত্র সন্তান……” মেজজেউ! …..আমার সাথে গঙ্গার ঘাটে যাবে “? ছেলেটা যেন দুদিনেই কতো বড়ো হয়ে গ্যাছে……, অভীক সব স্থান কাল পাত্র ভুলে ছোটো ছেলের মতো ডুকরে কেঁদে ওঠে জড়িয়ে ধরেন মুনিয়াকে।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।