T3 শারদ সংখ্যা ২০২২ || তব অচিন্ত্য রূপ || বিশেষ সংখ্যায় শ্যামশ্রী চাকী

লেজঝোলা আর ফেলে আসা খাঁচার গল্প

কথা ছিল পরীক্ষায় ফাস্ট হলে একটা টিয়া দেওয়া হবে। তখন সার সার দিয়ে কাঁধের দুদিকে ইয়াব্বড় খাঁচা ঝুলিয়ে টিয়া, চন্দনা, মুনিয়া, ময়না বিক্রি করতে আসত পাখি কাকুরা। মা বাড়ি ফিরত যখন সন্ধ্যে হয়ে যেত। কাজেই টিয়া আমার হয়েও হয়না। বাবা সেই সময় সলসলাবাড়ির স্টেশন সুপারিন্টেন্ডেন্ট। পাখি নিশ্চই আসে স্টেশনে কিন্তু বাবা অত মনে রাখেনা।

একদিন ছুটির দুপুরে ঘুম থেকে উঠে দেখি মা টিয়া পাখি কিনেছে। সবুজ রঙ গলায় রঙিন দাগ লাল ঠোঁট। আমি বোঁ করে বেড়িয়ে সারা পাড়ার সব বাড়িতে ছুটে গিয়ে জানিয়ে এলাম আমার টিয়া হয়েছে। রাতে বাবা এলো সাইকেলের ক্রিং ক্রিং শুনে আমি লাফাতে লাফাতে হাতে খাঁচা নিয়ে গেটের কাছে গিয়ে দেখি বাবার হাতেও টিয়া! কি কপাল আমার একদিনে জোড়া টিয়া। এবার নাম করণ হল ঠাম্মা নাম দিল ভক্তদাস আর কৃষ্ণকলি। টিয়াদের খাঁচা রাতে কাপড়ে ঢাকা, আমি একটু পর পর কাপড় তুলে দেখি টিয়ারা ঝিমায়। সকালে শুরু হল টিয়ার খাবার দাবার। টিয়া কি খায়? পাকা পেয়ারা, কলা,লংকা, ছাতু, আর তেলাকুচের ফল, ছোলা ভেজানো, ধান। এই হল ডায়েট চার্ট সাথে জল আর প্রসাদী ফল। আমার কাজ হল ঠিক ঠাক খাবার দেওয়া। এক সপ্তাহেই ভক্তদাস আমার আঙুল ঢুকরে খাবার খাওয়া শিখল আর কৃষ্ণকলি বারো দিনে। দেড় মাস পর ওরা শুধু রাতটুকু খাঁচায় থাকত। তখন আমাদের টিনের চাল বেয়ে স্কোয়াশ গাছ হয়েছিল। ওই গাছেই ওরা বসত নেমে এসে খাবার খেত আবার গাছে যেত বিকেলে একেবারে নেমে আসত। ও হ্যাঁ, একটা কথা বলতেই ভুলে গেছি প্রথমে ভক্তদাস আর কৃষ্ণকলির এক্কেবারে বনিবনা ছিল না। এ ওকে ঠুকরে রক্ত বের করে দিত। ওদের খাঁচা আলাদা করা হল। আশ্চর্য হল এবারে ওরা খুব মুষড়ে পরলো। বাবা আবার এক খাঁচায় দিতে কি ভাব! এ ওর ঘাড় খুঁচিয়ে দিচ্ছে একসাথে পিঠ লাগিয়ে বসে আছে। আমার জাঁদরেল ঠাম্মাও ওদের প্রতি মায়ায় পুজোয় দু কুচি ফল বেশি দিত। তারপর এলো সেই ভয়ংকর দিন!আমাদের উলটো দিকের বাড়িতে ঝুলন সাজানো হচ্ছিলো। আমি কৃষ্ণনগরের কটা মাটির পুতুল দিয়ে সামনেটা সাজিয়ে এক্টু মাটির গোলায় কাপড় ডুবিয়ে পাহাড় বানানোর চেষ্টা করছি। আমাদের বাড়িতে থাকত লক্ষ্মী এসে হাউমাউ করে বলল কৃষ্ণকলি নেই! সারা বিকেল গিয়ে সন্ধ্যে হয়ে গেল কৃষ্ণকলিকে আর পেলাম না…..

২।

কেউ বলছে ভামে খেয়েছে কৃষ্ণকলিকে কেউ বলছে চুরি হয়েছে। বাবা বলল বনের পাখি বনে ফিরে গেছে। সেই রাত কাঁদতে কাঁদতে না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। রাতে স্বপ্ন দেখলাম কুল গাছে কৃষ্ণকলি।
ভোরের স্বপ্ন নাকি সত্যি হয়। মুখ ধুয়ে বিষ্ণুবাড়ির গোয়ালের পিছনে জঙ্গলে কুল গাছ দেখতে বেরোলাম। ওই জঙ্গলে একা গেছি জানলে মা আস্ত রাখবেনা। জামরুল গাছের নীচে যেতেই গা ছমছম করে উঠল। এদিকে বেশ কাদা। কটা আঁশ শ্যাওড়ার পাকা টুসটুসে ফল ছিঁড়ে মুখে পুরে কুল গাছের নীচে গেলাম। কুল গাছ তন্নতন্ন করে খুঁজেও কৃষ্ণকলিকে পেলাম না। ওইদিকে মানকচুর ঝোপ একটু নাড়িয়ে দেখতে গিয়ে দেখি হাতে কি লেগে চ্যাটচ্যাট করছে! একটা এত্তবড়ো সাপের খোলস। আমি ভয়ে দৌড়। ওদিকে কারা চ্যাঁচাচ্ছে বাগানে কে ঢুকেছে রে! কাদায় পরে হাঁটুর ছাল বাকল উঠে গেল। বাড়িতে কেউ এতটুকু বকল না। মা হাত পা ধুয়ে পড়তে বসতে বলল। ঠাম্মা বলল পশুপাখির জন্য কাঁদতে নেই। ওরা ধরেই নিয়েছিল আমার কৃষ্ণকলি আর নেই। এভাবে দিন কাটে, আমি স্কুলে যাই আসি, মাঠে খেলি আর সব গাছের দিকে তাকাই, টিয়ার ডাক শুনলে চমকে উঠি। বাড়িতে মন টেকেনা। বাড়ির সামনে স্টেশনে আলপনা মাসির বর আচার বিক্রি করে।মাঝে মাঝে মনে হয় ওই ট্রেনে করে দূরে চলে যাই। ভক্তদাস ও আজকাল কেমন চুপ হয়ে গেছে।

একদিন দুপুরে আমি রান্নাঘরের প্লানকিং এর নীচে ইটের বাড়ি করে একটা গর্ত খুঁড়ে পুকুর বানাচ্ছি, দেখি ঝুপ করে কি পড়লো। আমার কৃষ্ণকলি! এ কি দশা! ডানা লেজ সব কাটা। সেদিন ঠাম্মা হলুদ বেটে আর কি কি দিয়ে ডানায় লাগালো। ঘা মত হয়েছিল। খাঁচায় ঢোকাতেই ভক্তদাসের সেই কি খুশি। বাবা বলল সেলুনে ঘুরে এসেছে। ঠাম্মা বলল চারদিকে দেখে নিল ফ্রি তে দানাপানি মেলে না তাই আবার চলে এলো বলে কটমট করে আমার দিকে তাকালো। আমার বাড়ি থেকে ট্রেনে পালানোর প্ল্যানটা আমি সেভাবে কাউকেই বলিনি একটা বন্ধু ছাড়া তবু জেনে গেল। কিছুদিনেই কৃষ্ণকলি আবার আগের মত হয়ে গেল। কেউ ওকে ধরে ডানা কেটে দিয়েছিল যেন উড়ে পালাতে না পারে। একটু ভালো হয়েই ও পালিয়ে এসেছে। এরপর পুজো এসে গেল। লক্ষ্মীপুজোর পর ঠিক করলাম ওদের জন্মদিন করতে হবে। একই দিনে এসেছে তাই একই দিনে জন্মদিন। বাবা ঝুরিভাজা বোঁদে এনে দিলো। পাড়ার বন্ধুদের নেমন্তন্ন করলাম। অনেকেই ছোলা, ধান দিলো কেউ তেলাকুচের ফল আর পেয়ারাও এনেছিল। ধুমধাম করে জন্মদিনটা হল। তখন আমাদের পুতুল বিয়েই ছিল উৎসব। এর মধ্যে টিয়ার জন্মদিন একটা অন্যরকম আনন্দ হল। কিছুদিন পর শীত কাল এলো। তখন একটা অদ্ভুত ব্যপার ঘটল।
৩।
কুয়াশায় দুপুর আর হয়না একটু আলো ফোটে তারপর একেবারে সন্ধ্যে। রাতে রাস্তায় কাছের মানুষই চেনা যায়না। নাকের ডগা কাঠি বরফের মত ঠান্ডা আর চোখের পাতা ভ্রু চুলে রোঁয়া রোঁয়া জল। ভক্তদাস আর কৃষ্ণকলি আজকাল আর খুব একটা ঘর থেকে বেরোয় না। একদিন আমি দেখলাম ওরা সকাল বিকালে চায়ের কাপ থেকে মুখ ডুবিয়ে তলানি চা খায়। কাপ রাখার সাথে সাথেই ছুটে এসে খায় একদম ঠান্ডা চা খায়না। তিন চারদিন পর থেকে ওদের জন্য চা বরাদ্দ হল। বিকেলে একটু চা দিতে দেরী হলে ওরা ঠাম্মার আঁচল ধরে ঝুলে পরে ট্যাঁ ট্যাঁ করে ডাকতে থাকে। ইতিমধ্যে দুচারটে কথাও ওরা শিখে গেছে। এই সময় শহরে হায়না বেরোলো, রোজই শোনা যায় এ পাড়া ও পাড়ায় হায়না এসেছে। একে কুয়াশার জন্য স্কুলেই যাওয়া যায়না। আবার হায়নার ভয়। খেলাধুলা প্রায় বন্ধ। ভক্তদাস আমার নাম ধরে ডাকা শুরু করল। তার পর যেটা বলল সেটা শুনলে পিত্তি জ্বলে আগুন হয়ে যায়। পড়তে বস। যখনই আমাকে দেখে একই কথা; পড়তে বস।

সরস্বতী পুজোর পর কুয়াশা কেটে রোদ উঠলো হায়নার কথাও আর কেউ বলেনা। আমরা আবার মাঠে খেলা শুরু করলাম।আবার ওদের স্নান রেগুলার করানো শুরু হল। শীতে স্নান বন্ধ ছিল। খাঁচায় ওদের ঢুকিয়ে ওপর থেকে জল দেওয়া হয়। স্নান সারা হলে পাতলা কাপড়ে মুছে দেওয়া। আর এম্নিও ওরা গায়ের জল ঝেরে ফেলে। পয়লা বৈশাখের আগে ওদের আর একটা জন্মদিন হল। এবারে ঝুরিভাজা বোঁদের সাথে খুরমাও ছিল। আমার পুতুলের বাড়ি চেঞ্জ করা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পরলাম। নতুন জুতোরবাক্সে পুতুলদের শিফট করা হল। চরকের মেলায় আমার পুতুলের নতুন খাট, আলমারি হল,মাটির হনুমান আর পুলিশ পুতুল সাথে জলবেলুন হল। টিয়াদের জন্য বেতের খাঁচা আনা হল খুব সুন্দর। ভক্তদাস আর কৃষ্ণকলি এখন অনেক কথা বলে। দেখতে দেখতে আমার জন্মদিন এসে গেল। ভালোমাসির বাড়িতে গিয়ে আমার থাক থাক গোলাপি ফ্রকের মাপ দিয়ে এলাম। মা আর ভালোমাসি চা খাচ্ছে আমি ডিমের ওমলেট। আমার উসখুস দেখে মা বলল কিছু বলবি? আমি গিয়ে মায়ের কানে কানে বললাম টিয়াদের জামা চাই। মা কটমট করে তাকাতেই আমি উঠে গিয়ে আবার ডিমের ওমলেট খাওয়া শুরু করলাম। আমি লংকা খাই কিন্তু ভালোমাসি আমার ওমলেটে লংকা দেয়না। ভালোমাসি এসে আমাকে বলল মায়ের দিকে না তাকিয়ে মাসি কে বলতে, আমি গড়গড় করে বলেদিলাম। ভালোমাসি রাগী রাগী মুখ করে বলল টিয়াদের মাপ নেই ওসব হবে না। বাড়ি ফেরার পথে মা রেলগেট বাজারে আমার গোলাপী রঙের চুড়ি, ক্লিপ, মালা আর হেয়ারব্যান্ড কিনে দিল। মা বাবা কে লুকিয়ে তখন আমি বিহারী বস্তির বাচ্চাদের সাথে গুলি খেলা শুরু করেছি। একদিন ভক্তদাস আমাকে বার বার পড়তে বস বলাতে দিলাম গালি। মা আসার সাথে সাথে লক্ষ্মী দৌড়ে গিয়ে বলল দিদি আজকে টিয়াকে ‘সৌরের বাচ্চা ‘ বলেছে, দিদি রোজ গুলি খেলতে যায় বিহারী পাড়ায়। ওই দিনের থেকে আমার বাইরে বেরোনো বন্ধ হল। উঠোনে ইটের বাড়ি বানিয়ে, রান্নাঘরের নীচে পুকুর কেটে একা একাই খেলতাম। ইঁটের ঝোলে মাছপাতা, লুচিপাতার তরকারি করে বালির ভাত দিয়ে ভক্তদাস আর কৃষ্ণকলিকে দিতাম। রোজ উঠান নোংরা করায় ঠাম্মা বিরক্ত হয়ে সামনের মাঠে খেলার পার্মিশন দিল। খেলে এসে বাড়ি ফিরে দেখি আমার জন্মদিনের নতুন জামা এসে গেছে সাথে টিয়াদের জন্য চারটে পুচকু পুচকু জামা।
৪।

জন্মদিনের পায়েস ভক্তদাস আর কৃষ্ণকলি একটু ঠুকরে খেয়েই আমার মাথার ধান দুব্বো থেকে ধান বেছে খেলো। নতুন জামা পরে ওদের খুব সুন্দর দেখাচ্ছিল। জামা ফিতে দিয়ে বাঁধা ওরা ফিতেটা কামড়াচ্ছে দেখে জামা খুলে দেওয়া হল। ভক্তদাস ঠাকুরের নাম শিখেছে সন্ধ্যাবেলা ঠাম্মার সাথে সেগুলোই বলে আমাকে খুব একটা পাত্তা দেয়না। কৃষ্ণকলিই বেশ ন্যাওটা আমার।
স্কুল থেকে ফিরে ভাবছি একটু টুবাইদের বাড়ি ঘুরে আসবো। ওদের মাসির বাড়ি থেকে অনেক পুতুলের শাড়ি হয়েছে। বারান্দায় উঠতেই টুবাইদের দিদা বিচ্ছিরি করে বকে উঠল, আমার পায়ে ধুলো। কেউ বকলে আমার চোখে জল টপটপ করে পরে। একটু ধুলোয় কি হয়? আমার ঠাম্মা বাড়িতে কেউ এলে কক্ষনো বকেনা। সবাই রান্নাবাটি খেলে কত বারান্দা নোংরা করি, ওরা চলে যাওয়ার পরে আমাকে মাঝে মাঝে একটু বলে। আমি ওদের বারান্দা থেকে নেমে দাঁড়ালাম। টুবাই আর ঘরে খেলল না। জিগা গাছের পাতার ডাঁটি ভেঙে বাবলস ওড়াতে ওড়াতে নদীর ওদিকে তাকিয়ে দেখি কালো কুচকুচে মেঘ। এক দৌড়ে বাড়ি ফিরে কোনো মতে ভক্তদাস কে চাল থেকে নামালাম। কৃষ্ণকলিকে ধরতে গেলেই উড়ে যাচ্ছে। ততক্ষণে জোর হাওয়া শুরু হয়ে গেছে। একটা কড়াৎ করে বাজ পড়তেই কৃষ্ণকলি ভয়ে ডানা ঝাপ্টে আমার মুখে। আমি টাল খেয়ে সোজা নীচে পরলাম। মাথাটা ফুলে গেছে কানের পাশে খুব ব্যথা। দু ফোঁটা রক্ত ও পরল। এই প্রথম ঝড় দেখলো ওরা। ঝড়ের পরে বৃষ্টি নামতেই মা বাড়ি ফিরল। ততক্ষনে আমার ধুম জ্বর। মা বাবা ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে আমাকে জামা পরানো হচ্ছে আর কিছু মনে নেই। সেই প্রথম আমি অজ্ঞান হলাম।

মাথায় কি সব নল আর চ্যাটচ্যাটে আটার দলার লাগিয়ে টেস্ট করা হয়েছে। শ্যাম্পু করতে হয়েছে। সেদিনের পর ওরা খাঁচাতেই থাকে। আমার স্কুল অনেক দিন বন্ধ, বাড়িতেই খেলি আর গল্পের বই পড়ি। একটা ডল হয়েছে নতুন চোখ পিটপিট করে।
একদিন একটা বন্ধু নতুন পুতুল বানানো শিখিয়ে দিয়ে গেল। ডিমের খোলে চোখ মুখ এঁকে কালো সুতোর চুল আঠা দিয়ে লাগিয়ে একটা শিশির মুখে বসিয়ে শিশিটাকে শাড়ি বা জামা পরানো। একটা তাক ভর্তি ডিম পুতুল হয়েছে আমার। ঘরে বসে পুতুল বানাই আর দেশলাই এর খাপ দিয়ে চেয়ার টেবিল। বাবা মা আমাকে নিয়ে কলকাতায় যাবে ডাক্তার দেখাতে….

 

(৫)

কলকাতা থেকে ফিরে দেখলাম রাস্তায় পিচ ঢালা হয়েছে। খালি পিচের ড্রাম গুলো রাস্তার ধারে মাঠের কোনে রাখা হয়েছে। বৃষ্টিতে জল জমে ওই ড্রামে কত ব্যাঙাচি। আমরা কাঠিতে সুতো বেঁধে ছিপ বানিয়ে ব্যাঙাচি দিয়ে মাছ ধরা খেলি।

আমি আবার স্কুলে যাচ্ছি। ভক্তদাস আর কৃষ্ণকলি যথারীতি আবার ঘুরে বেড়াচ্ছে বাড়ির চালে। ঝড় বৃষ্টি এলে নিজেরাই নেমে আসে। বৃষ্টিতে খেলা যায় না। আমার বাঘাডুলি আর ব্যবসায়ী হয়েছে কলকাতা গিয়ে। এখানে বৃষ্টি শুরু হলে আর থামেনা, টানা দশদিন রোদের দেখা নেই নদীতে জল বেড়েছে। ঠাম্মার রান্নাঘরে খিচুড়ি আর তিলের বড়া হচ্ছে। উঠোনে জল জমে হাঁটু পর্যন্ত। আমি নেমেই দেখলাম সুপুরি গাছ বেয়ে কই উঠছে। আমি আর লক্ষ্মী মিলে গামছা ছুঁড়ে ক’টা ধরলাম। ছোট্ট বালতিতে কই রেখে তিনটে ছাতা উলটে তাবু বানিয়ে কৃষ্ণকলি ভক্তদাস কে ঢুকিয়ে টিনের শেডের থেকে যেখানে মোটা হয়ে জল পরে সেখানে স্নান সেরে নিলাম।
বিকালে ভক্তদাস খাঁচায় ঢুকলেও কৃষ্ণকলি কিছুতেই ঢুকল না। ঠায় বসে থাকল টেবিলের ওপরে। জোর করায় চ্যাঁচানো শুরু করল। সারারাত ওখানেই থাকল কৃষ্ণকলি। সকালে দেখলাম চোখ কেমন ঘোলাটে। কিছুই খাচ্ছেনা, ধুঁকছে। সারাদিন ঠাম্মা নানা রকম চেষ্টা করল চাঙা করার। বিকেলে আস্তে আস্তে নেতিয়ে পরল কৃষ্ণকলি। বাইরে তখন ধুম বৃষ্টি। আমি একটা তোয়ালায় জড়িয়ে ওকে নিয়ে ছুটলাম পাড়ার এক হোমিওপ্যাথি ডাক্তার কাকুর বাড়ি। পেছনে মা আর ঠাম্মা। কৃষ্ণকলিকে টেবিলে নামিয়ে দেখালাম, ততক্ষণে শক্ত হয়ে গেছে কৃষ্ণকলির ছোট্ট শরীরটা। ঠাম্মা আমাকে জড়িয়ে ধরে মুখ ঢেকে বাড়ি নিয়ে গেল। সেই রাতে আমি প্রথম মৃত্যু দেখলাম কাছ থেকে আমার কৃষ্ণকলির মৃত্যু।

ভোর বেলা বৃষ্টি থামলো। রাস্তায় তখনো জল। বাবা আমাকে ঘুম থেকে তুলে ভক্তদাসের খাঁচাটা হাতে দিল। সাইকেলের সামনে আমি বসে, বাবা আস্তে আস্তে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমার চোখ ঝাপসা। ভক্তদাস খাঁচায় চুপ। জংশন ছাড়িয়ে ফরেস্ট। বাবা সাইকেল থেকে আমাকে নামালো। চোখ মুছিয়ে বলল খাঁচা খুলে দে। আমি ভক্তদাস কে বের করে গায়ে হাত বোলালাম। ভক্তদাস একটু উড়ে গিয়ে আবার সাইকেলে এসে বসলো। আমি বললাম; যা আর আসবি না। তোর নিজের মা বাবার কাছে ফিরে যা ভক্তদাস…….
কি বুঝল কে জানে উড়ে গেল সামনের গাছে। বাবা বলল এবার চল। খাঁচাটা ওখানেই নামিয়ে রেখে বাবার সাথে বাড়ি ফিরলাম রইল পরে তেলাকুচের ফল, কাংড়ি ঘাসদানা, ছোলা ভেজা বাটি.…..

এ্যানুয়াল পরীক্ষা শেষ হল বলে।পরীক্ষা বলে আমি আর মাঠে যাইনা বাড়িতেই থাকি ফাঁকা সময়ে গল্পের বই পড়ি, পুতুলের বাক্সও তাকে তোলা। চালের ওপর থেকে পরে চোট পেয়েছিলাম, সেটার জন্য দুবার কলকাতার ডাক্তার দেখানো হয়ে গেছে। এই শেষবার যেতে হবে পরীক্ষার পরে।মা ব্যাগ গোছাচ্ছে, আমি বারান্দায় অংক করছি। হঠাৎ কাঁঠাল গাছ থেকে চেঁচিয়ে উঠল পড়তে বস…. পড়তে বস… মা ঠাম্মা দুজনেই বেরিয়ে এলো বারান্দায়। তিনজন তাকিয়ে দেখলাম, কাঁঠাল গাছ থেকে সুপুরি গাছের ডগা ছাড়িয়ে বটগাছ পার করে ওই নীল আকাশটায় আরো দূরে সবুজ ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছে ভক্তদাস।

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!