পুরুষোত্তম প্রেস পেরিয়ে কয়েক পা হেঁটে গেলেই তিন চারটে বাড়ি পরে ‘আরুণি’ প্রকাশনার অফিস।সকাল দশটায় তাদের অফিস খোলে।ঘড়ির কাঁটায় দশটা বাজতে তখনও সাত মিনিট বাকি।শুভব্রত ঠিক করলো সে অপেক্ষা করে যাবে।দারোয়ান পেরিয়ে লৌহফাটক।সেখানে একজোড়া সিসি ক্যামেরা লাগানো।সেখানে দাঁড়াতেই একজন গার্ড এগিয়ে এল তার দিকে।
-এখানে দাঁড়াবেন না।নিষেধ আছে।
শুভব্রত ছিটকে সরে গেল।”নিষেধ আছে”।কিসের নিষেধ?এই বিরাট অট্টালিকা কী তার সাধের দেশের ভূখণ্ড নয়?যাঁরা নিজেদের দাবি করে আপামর বাংলাভাষী মানুষের মুক্তকন্ঠস্বর হিসেবে।সাবান ফেসপাউডারের পাশেই যাঁরা সেই বিজ্ঞাপন লটকায়,তাঁদের রাজপ্রাসাদের বাইরে দুদণ্ড দাঁড়িয়ে থাকাও ‘নিষেধ’!কতো বিচিত্র এই দেশ।শুভব্রত অবশ্য কোলাহল করল না।তার এখানে আসবার উদ্দেশ্য অন্য।গার্ডটিকে শুধু জিজ্ঞেস করলো ‘আরুণি’র আউটলেট কাউন্টারটি আজ খুলবে কিনা।সেই গার্ডটি জানালো খুলতে খুলতে সেই সাড়ে দশটা এগারোটা।তার মানে এখনও পৌনে এক ঘন্টা প্রায়।তা হোক।সে অপেক্ষা করবে।অতএব সে রাস্তার অপর পারে চায়ের দোকানের বেঞ্চে গিয়ে বসলো।এক ভাঁড় চায়ে চুমুক দিতে দিতে শুভব্রত লাল কাঁকড়া নয়,সমস্ত রাস্তা ভরে গেছে পেঁজাতুলো মেঘে।রাস্তায় ক্রমশ গাড়িচলাচলে বেড়ে ওঠা ধুলিকণা দেখতে দেখতে শুভব্রতর দেরাদুনের কথা মনে পড়ে গেল।বিয়ের পর সেই প্রথম পাহাড় দেখতে যাওয়া।শুভব্রতর রাণাঘাটের বাল্যবন্ধু নিখিলেশ পরবর্তীতে প্রসারভারতীতে চাকরি নিয়ে সস্ত্রীক দেরাদুনে থাকতো।এমনই এক সকালে তার কাঠের বাংলোর দোতলা বারান্দায় বসে নিখিলেশ পড়ে শোনাচ্ছিল মানবেন্দ্র রায়কে ১৯৩১ সালে লেখা লেখক সুধীন্দ্রনাথ দত্তর চিঠি।দেরাদুনের মোহিনী রোডে এমএনরায়ের বাড়ি থেকে সদ্য কলকাতা ফিরেছেন সুধীন্দ্রনাথ দম্পতি।নিখিলেশের ছিল চিঠি সংরক্ষণ করার শখ।দুর্লভ সেই চিঠির ফোটোকপি পরম যত্নে হাতে রেখে তরুলতা আর তাকে পড়িয়ে শুনিয়েছিল সে সেইদিন।সুধীন্দ্রনাথ লিখছেন,”আমরা এখনও দেরাদুনকে ভুলতে পারছি না।ওখানে থাকাটা কত চমৎকার ছিল আর আবহাওয়া ও আধ্যাত্মিক দিক থেকে কলকাতা নিরানন্দময়।”দেরাদুন থেকে ফিরেই গর্ভবতী হয়ে পড়ল তরুলতা।কিন্তু সে গর্ভ স্থায়ী হয়নি বেশিদিন।জরায়ুর সরু নালিকা বেয়ে সেই ভ্রুণ স্থির হয়ে ছিল।ডাক্তার বললেন “একটোপিক।রাখা যাবে না।”তরুলতাকে বারবার উপেক্ষা করেছে সে।তাই কি তরুলতা তাকে ছেড়ে চলে গেল?কিন্তু সে কি সত্যিই চলে গেছে?আজও রোহিত মিত্রর কম্পিউটার স্ক্রিনে যখন তার পত্রিকার আনুষ্ঠানিক প্রকাশের পোস্টার দেওয়া হলো,তখনও তবে কেন সে তরুলতাকেই বারবার খুঁজছিল!দোয়াবের দুই নদীর একজন যদি হয় তরুলতা,তাহলে অন্যজন তোয়া।তোয়াকে কখনও দেখেনি শুভব্রত।কেমন দেখতে মেয়েটা কে জানে?দেখতে যেমনটাই হোক,যে বসন্তের বাহারিয়া সন্ধ্যায় হেমন্তের বিষাদময় বিরহ দেখতে পারে,সে তো সামান্য মানবী নয়।সে নিশ্চিত কূহকিনী।দেরাদুনের ভাসমান মেঘের মতোই কূহকিনী।
-স্যার।শুনছেন?অফিস খুলেছে..
চাদোকানের বাচ্চা ছেলেটার ডাকে সম্বিত ফিরে পেল সে।দেরাদুন আর পেঁজাতুলো ছেড়ে শুভব্রত এক লহমায় ফিরে এল আরুণি প্রকাশনার লৌহফাটকের সামনে।নিজের অজান্তেই সময় কেটে গেছে বেশ খানিকটা।সঞ্চরমান প্রকাশনা দপ্তরে ব্যস্ততা বেড়েছে।শুভব্রত সামান্য ইতস্তত করে সেই দ্বারপাল গেটরক্ষীকেই গিয়ে জিজ্ঞেস করলো প্রদ্যুত সরকারের সঙ্গে কীভাবে দেখা করা যাবে।প্রত্যুত্তরে সেই দ্বাররক্ষী তাকে রিসেপশন ডেস্ক দেখিয়ে দিল।
ডেস্কে একটি অল্পবয়সী মেয়ে বসে আছে।বোধহয় সে এই অফিসে নতুন।সামান্য দোনামনা করছে সব বিষয়তেই।শুভব্রতকে দেখে ভ্রুপল্লব নাচিয়ে সে বলল,”বলুন?”
-প্রদ্যুত সরকারের সঙ্গে দেখা করতে চাই?
-ওহ।উনি তো বোধহয় একটা আউটডোর শ্যুটে গেছেন।
-আজ আসবেন না অফিসে?
-একটা মিনিট স্যার।জেনে বলছি।
মেয়েটি পাশের ইন্টারকম ডায়াল করে কথা বলে।সম্ভবত রিসিভারের ওপারে থাকা মানুষটি শুভব্রতর ক্রেডেনশিয়াল জানতে চায়।মেয়েটি আমতাআমতা করে।তারপর ফোন কেটে দিয়ে সামান্য অপরস্তুত হেসে শুভব্রতর দিকে একটা চিট এগিয়ে দেয়।
-এই কাগজে আপনার নাম,ফোন নম্বর, কার সঙ্গে দেখা করতে চান,ও দেখা করার উদ্দেশ্য সংক্ষেপে লিখে দিয়ে যান।আজ উনি ফিরবেন না।আপনাকে কাল আরেকবার ঠিক এই সময় আপনাকে এখানে আসতে হবে।
শুভব্রত ঘাড় নাড়ে।নাম আর ফোন নম্বর লিখে থমকে যায় সে।দেখা করবার কারণ কীই লিখবে সে!অনেক ভেবে শুভব্রত লেখে “কর্ণ পত্রিকার সম্পাদকের তরফ থেকে আসছি।” এই অবধি লিখেই শুভব্রত ভাবে।প্রদ্যুত এখন স্টার।কে জানে এইটুকু লিখলে সে আদৌ তাকে সময় দেবে কী না।তাই আবার সে দাঁড়ির পর লেখে।”বিশেষ প্রয়োজন”।কাগজের চিটটি মেয়েটির হাতে দিয়ে মূল বিল্ডিংয়ের দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসে সে।
প্রধান দরজার ঠিক পাশেই ছোট বইয়ের কাউন্টার।সেখানে আরুণি প্রকাশনার সমস্ত বই বিশেষ ছাড়সহ পাওয়া যায়।সাম্প্রতিক প্রকাশিত ‘প্রবন্ধ সংকলন’ ও সম্পাদক হিসেবে প্রদ্যুত সরকারের নাম সেই কাউন্টারের গায়ে লেপ্টে থাকা অনেকগুলি পোস্টারে চোখে পড়ল তার।কাউন্টারে এখনও তেমন ভীড় জমেনি।শুভব্রত বইটির কথা বলতে কাউন্টারের লোকটি অনায়াসে সেই বইটি বের করে দিল।এখন আর এখানে বিশেষ কাজ নেই।মনের ভিতর একটা চাপা উত্তেজনা হচ্ছে তার।ঘরে গিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে হবে প্রতিটি পাতায়।সূচিপত্র খুলেই সে ইতিমধ্যে বুঝতে পেরেছে বইটিতে “কর্ণ” পত্রিকা বা তার সম্পাদক মৃন্ময় মণ্ডলের প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকারের বিষয়টি সম্পাদক সন্তর্পণে এড়িয়ে গেছেন।তবু আরেকবার খুব মনোযোগ দিয়ে দেখা দরকার।কলেজ রোর ঘরের পথে পা বাড়ায় শুভব্রত।
ঘরে বসে সাড়ে চারশো পাতার সেই প্রবন্ধ সংকলন ওলটাতে থাকে শুভব্রত।বইটির ভূমিকায় প্রদ্যুত সরকারের প্রবেশক লাইন,”সমাজ ছাড়া পত্রিকা অস্তিত্বশূন্য”।এই লাইন প্রদ্যুত সরকারের লেখা নয়।’পরমা’ পত্রিকার সম্পাদকীয়তে একথা এভাবেই লেখেন সম্পাদক মণীন্দ্র গুপ্ত।এর পরের লাইনে তিনি লেখেন,”এবং সামাজিক হয়ে ওঠা সম্পাদকের পক্ষে অসম্ভব।”১৩৮৩ বঙ্গাব্দর শীত সংখ্যার সম্পাদকীয়।প্রদ্যুত অবশ্য নিজেকে ‘অসামাজিক’ ঘোষণা করেনি।সে সুচতুর।তাই তার সম্পাদিত সংকলনের প্রতিটি লেখকের উত্তরসূরির কাছ থেকে সে যে লিখিত অনুমতি গ্রহণ করেছে,একথা সে জানিয়েছে।কিন্তু যে মানুষটি তার নিজের জীবন ক্ষয় করে সেই সব লেখা যত্ন করে পাঠকের সামনে তুলে ধরলেন,সেই সম্পাদকের অনুমতি?তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার।না।প্রদ্যুত সরকার সে বিষয়টি খুব প্রয়োজনীয় মনে করে নি।প্রবন্ধগুলি হুবহু “কর্ণ” পত্রিকার ক্রমিক অবস্থানেই সাজানো হয়েছে।এবিষয়ে শুভব্রত এতোটাই নিশ্চিত হতে পারলো কারণ এই প্রবন্ধগুলির প্রতিটির মূল পাণ্ডুলিপি মৃন্ময় শুভব্রতকে দেখিয়েছিল।সার্ত্র বনাম অধ্যাত্মবাদ,ছৌনাচ ও সভ্যতার আত্মবিমোচন,ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ইতিবৃত্ত…কতো বার ঘুরেঘুরে এইসব দুর্লভ লেখা একসময় সংগ্রহ করেছিল মৃন্ময়।তার সামনেই মুগ্ধ পাঠক প্রবন্ধ রচয়িতার ঠিকানা সংগ্রহ করেছে কফিহাউজে।অথচ এই সংকলনের পাতা ওলটাতে ওলটাতে শুভঙ্করের মনে হচ্ছিল লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদক কী তবে কুশপাতার মতোই অসহায়।যজ্ঞোপবেশনে ভস্ম হওয়াই তার নিয়তি।যজ্ঞে লব্ধ পূণ্যফলের উপর তার কোনও অধিকার নেই?
মাথা ঘুরছে তার।ব্রহ্মান্ড ঘুরছে অলীক আকর্ষণে।মৃন্ময় প্রদ্যুতের এই প্রতারণার কথা জানে কি?সেই শেষসাক্ষাতের কথা মনে পড়ে যায় তার।মৃন্ময় ভেবেছিল এভাবেই ‘কর্ণ’ পুনর্জন্ম পাবে।সে বোঝেনি কালের অঞ্জালিকাবাণ তার পত্রিকার শিরোশ্ছেদ করেছে আগেই।এখন সে একটা আর্কাইভ।বিধ্বস্ত একটি আরকাইভ শুধু।শুভব্রত শুনতে পায় দূর থেকে ভেসে আসছে ছায়ানটের সেই শব্দগুলো।জীবনানন্দ দাশের এই গল্পটি প্রথম শুভব্রত পড়েছিল হলুদ হয়ে আসা একটি লিটল ম্যাগাজিনের পাতায়।সেই লেখা রয়ে গেছে।কিন্তু সেই পত্রিকার প্রথম বর্ষের প্রথম সংখ্যাটির কথা কেউ মনে রেখেছেন কি আজ?ভেসে আসছে শব্দগুলো।রেবা কথা বলছে।স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে শুভব্রত।
-ঘুমিয়ে পড়েছে।
মিনিটখানেক সব চুপচাপ।
তারপর চুমোর শব্দ ….
দুজনে উশখুশ করছে।…
শেষে সব চুপ।…
অন্ধকারে একা ঘরটা ঠাণ্ডা মেরে গেছে।
এ বীভৎস না সুন্দর!
বুঝে উঠতে পারছে না কেউ।শুভব্রতও তার ব্যতিক্রম নয়।কেন বুঝে উঠতে পারছে না কেউ?