সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী (পর্ব – ৮)

বিন্দু ডট কম
মাটির কোল ঘেঁষে ছটফট করছে একদল প্রজাপতি ।তাদের ওড়ার মধ্যে গতি নেই তেমন।তবু ডানা ঝটফটানিতে তাদের মধ্যে অসম্ভব অস্থিরতা গোপন থাকে না।একটা কাওয়াগোড়া ঝোপের কাছে ওদের এই মুক্ত বিচরণে হন্যে শিকারীর মতো অখিলেশ প্রজাপতি ধরবার চেষ্টা করছে।এই ধরে এই পালিয়ে যায়। ফের ধরতে যায়।
তরুলতাদের রিসর্টটা লোদাশুলি জঙ্গলের একদম ভিতরদিকে।দোতলা কটেজে উঠতে হয় কাঠের সিঁড়ি দিয়ে।মাটির থেকে ইচ্ছাকৃতভাবেই কটেজগুলো উঠিয়ে তৈরি করা হয়েছে।এই অঞ্চলে বন্যহাতি চলে আসে যখনতখন।এছাড়া বুনো শুকর তো আছেই।সেই কারণেই এই ব্যবস্থা। বেশ দশ পনেরো বিঘাজুড়ে এই রিসর্ট।অখিলেশের এক পুরনো ক্লায়েন্ট এই রিসর্টের মালিক।তাঁর সুপারিশেই হঠাৎ বুকিং পাওয়া সহজ হলো।এখানে প্রতিটি কটেজের নাম দেওয়া হয়েছে আলাদা করে।তরুলতাদের কটেজটার নাম “ডুলুঙ”।ছোট একটা বারান্দা ছাড়া একটা বেশ বড়সড় ডাবলবেডরুম।সঙ্গে অ্যাটাচড বাথ।অখিলেশ বলছিল আলাদা দুটো ঘর নেবে।তরুলতাই বারণ করল।মনকে ছলনা করে মিথ্যা লৌকিকতা করতে চায় না সে।আর এতো বড় পৃথিবীতে দুটো ছোট ডানা মেলা প্রজাপতি একটা ফুলের পাপড়ির আড়াল পাবে না কিছুতেই?তরুলতা জানে তার কটেজের নাম একটা নদীর নামে।সেই নদী বেলপাহাড়ির দিকে।আজ অখিলেশ সকালে চেকইন করার সময় বলেছে তাকে নিয়ে যাবে।কটেজের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সে দেখছিল তার দিকে পিঠ করে অখিলেশবাবু কেমন প্রজাপতি ধরছেন।দেখতে দেখতে মনেমনে হেসে ফেলে সে।আজ তার শরীরে যন্ত্রণাটা নেই তেমন।যেন প্রকৃতির স্পর্শে নতুন জীবনীশক্তি ধারণ করেছে তার শরীর।কোনও রকমে চেক ইন সেড়ে ফেলেই প্রজাপতি ধরতে থাকা মানুষটা শেষমেশ তার জালে একটা ময়লা ফিকে আকাশি প্রজাপতি বন্দি করতে পারে।দলছুট প্রজাপতিটা জালের মধ্যে আপ্রাণ ডানা ঝাপটাচ্ছে।নিজের এই সাফল্যে খুশি হয়ে অখিলেশ ‘ইয়েস ইয়েস’ বলে ওঠে।হাততালি দিয়ে ওঠে তরুলতাও।জালবন্দি প্রজাপতি নিয়ে সম্রাটের মতো উঠে আসে অখিলেশ।
-বলো দেখি এই প্রজাপতিটা স্ত্রী না পুরুষ?
-স্ত্রী।
-একদম ঠিক।কী করে বুঝলে?তুমিও কী পিয়েরিডি নিয়ে গবেষণা করেছ নাকি?
-পিয়েরিডি?সেটা কি?
-প্রজাপতির একটা গোত্র।এই প্রজাপতির বাংলা নাম তল্লার।এটা আকাশি ওয়ান্ডারার।কিন্তু তুমি জানলে কী করে এটা স্ত্রী?
-কেন?ঠিক বলিনি।
-বলেছোই তো।কিন্তু ভাবছি কীভাবে!
-খুব সহজ।যবে থেকে তোমার ঈশ্বর এই পৃথিবীতে প্রাণের সৃষ্টি করলেন,তবে থেকেই জালে আবদ্ধ হয়ে তিলতিল করে মরবার বিধিলিখন কেবল তিনি স্ত্রীদের কপালেই লিখে গেছেন।
-জানো।এই প্রজাপতিদের এক অদ্ভুত স্বভাব আছে।এরা একটিই মাত্র বাধা পথে যাতায়াত করে চলে।বিশেষত পুরুষেরা।অবসেসড থাকে বোধহয়। কাকে খোঁজে যেন সবসময়!কাকে খোঁজে?
-আমি জানি কাকে খোঁজে।
-কাকে?
-পাতার আশ্রয় খোঁজে।সেই আশ্রয়ে লুকিয়ে থাকে তাদের প্রেয়সীরা।
-তুমি পেলে?
-কী?
-পাতার আশ্রয়?
-পেয়েছি।
টেবিলে জালবন্দি প্রজাপতি রেখে অখিলেশ আর তরুলতা ঘরে ঢুকে দরজা টেনে দেয় অগোছালোভাবে।জালবন্দি প্রজাপতি ততক্ষণে তার শক্তি ফুরিয়ে ফেলে স্তব্ধ হয়ে যায়।
ডুলুঙ নদীর তীরে মৃদু জলের ঢেউ আছড়ে পড়ছে।তরুলতা অস্ফুট প্রজাপতির মতো ডানা মেলে দেয়।আর জাল নিয়ে তাকে ঘিরে ধরে অখিলেশ।ধীরে ধীরে সে কাওয়াগোড়ার ঝোপের দিকে অগ্রসর হয়।ডুলুঙ নদী কেঁপে ওঠে শিহরণে।অখিলেশের ঠোঁটের কোণায় সামান্য রক্ত লেগে।অখিলেশ রক্তপায়ী শ্বাপদের মতো এবার উঠে আসে তরুলতার বুকের ওপর।তারপর আবার ডুলুঙ নদী দুলে ওঠে।একবার বারবার। চোখ বন্ধ করে তরুলতা দেখতে পায় একটা ছোট্ট গলিপথ।তার একপাশে বসে আছে যে মানুষটা তাকে সে খানিকটা চেনে।খানিকটা চেনে না।চাঁদিপুরের কথা মনে পড়ে তরুলতার।সেদিনও তার শরীর রক্তাক্ত ছিল।শুভব্রত তাকে জোর করেনি সেদিন।তরুলতা সেদিন হতাশ হয়নি।মনের ভিতর একটা বিস্ময় তৈরি হয়েছিল।আজ সেই বিশ্বাস ভেঙে দিচ্ছে অখিলেশ।যেন ছেনি হাতুড়ি দিয়ে ভেঙে দিচ্ছে সেই চাঁদিপুরের ঢেউগুলো।তরুলতা ভাসছে।ভাসতে ভাসতে তার ডানাদুটোও অবসন্ন হয়ে পড়ছে ক্রমশ।
খানিকটা বেলা করে লাঞ্চ সারলো দুজনে।এখান থেকে ডুলুঙ নদী কাছেই।তার এক কোলে কনকদুর্গার জাগ্রত মন্দির।অন্য কোলে প্রাচীন চিলকিগড় দুর্গ।শরীরে সামান্য ব্যথা আছে তরুলতার।কিন্তু সে ব্যথা অপরাধবোধের ব্যথা নয়।এই ব্যথা প্রকৃতির।সে তো আসলে ডুলুঙের মতোই একটি ক্ষরস্রোতা নদী।অখিলেশ সেই নদীতে আজ রক্তস্নান সেরেছে।কিন্তু এই শোনিতে হিংসা নেই।আছে প্রেম।আছে বিপ্রলব্ধ।