সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী (পর্ব – ২)

ক্ষণিক বসন্ত

দুই
সোহিনী

কে প্রথম। মধ্যম না পঞ্চম? কোন সেই স্বর যে অনন্ত আদি। নাকি গান্ধার! বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী আহির আশিকের হঠাৎ মৃত্যুর পর সোহিনীর জীবন থেকে এই স্বরগুলো পাকাপাকিভাবেই যেন মিলিয়ে গেছে। উত্তরপাড়ার গলিতে চারতলার একটি ফ্ল্যাটবন্দি হয়ে কেটে গেছে গোটা এক বছর। আহির যখন বেঁচে ছিলেন, ব্যস্ততার সীমানা খুঁজে পেত না সে। সারা পৃথিবী ঘোরার পর আজ এই অপরাহ্নের গঙ্গাতীর তার কাছে নিঃসঙ্গ জাহ্নবীতীর।
সোহিনীর বাবা একসময় কলকাতার ব্রেবোর্ন রোডের অফিসপাড়ার ফুটপাথে টাইপ করতেন। সেখান থেকেই একদিন জিপিওর ক্লার্কের চাকরি পেয়েছিলেন। পোস্ট এণ্ড টেলিগ্রাফ। চিঠির আদানপ্রদান। হলের ভিতর রানার পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। উত্তরপাড়ার আট কাটা পৈতৃক ভিটেজমি ভগ্নস্তূপে পরিণত। সোহিনীর বাবা শংকর কানুনগো হার মানেননি। শুধু তার ভাবাবেগকে হার মানিয়ে একদিন প্রোমোটারকে দিয়ে দিলেন জমিটা। মেয়ে বড় হচ্ছে। কী মিষ্টি গানের গলা। আহা। যেই শোনে সেই বলে। সার্থক ওই নাম। সোহিনী। রাগ সোহিনী। উদাত্ত ষড়জে যেন মাটির গন্ধ ভরা। শংকর কানুনগো অবসরে বই পড়তেন অনেক। কলেজস্ট্রিটের পুরনো বইপাড়া থেকে হুস করে একদিন হাতে পেয়ে গেলেন ‘মাণ্ডুকী’র খয়েরি হয়ে যাওয়া পুঁথি। মধুবন্তী তখন আটমাসের অন্তঃসত্ত্বা। উত্তরপাড়ার রাজবাড়ি হাসপাতালের গাইনি ডাক্তার বলেছে সিজার করতেই হবে। পেলভিস ছোট। এরই মাঝে শংকর ভাবতে শুরু করেছিলেন। ছেলে হলে নাম রাখবেন সারঙ্গ। আর মেয়ে হলে? ‘মাণ্ডুকী’ পড়তে পড়তে সেদিন চোখ লেগে গিয়েছিল তার। “ষড়জে বদতি ময়ূরো গাবো রমভন্তি চর্যভে। আজ বদন্তি গান্ধারে ক্রৌঞ্চ নাদস্তু মধ্যমে। পুষ্পসাধারণে কালে কোকিলঃ পঞ্চমস্বরে।অশ্ববস্তু ধৈবত প্রাহ কুঞ্জরস্তু নিষাদবান।” ‘কুঞ্জরস্তু নিষাদবান’। শব্দগুলি ঘুরপাক খাচ্ছিল তার মনের ভিতর। ‘নিষাদ’। শংকরের বাবার কীর্তনের দল ছিল। মধ্যবয়সেই হঠাৎ গান করতে করতেই চলে গিয়েছিলেন বৈকুন্ঠ্যলোকে। কিন্তু চলে যাবার আগে সঙ্গীত মঞ্জরীর সেই অমোঘ অমৃতধারা প্রভাবিত হয়েছিল শংকরের রক্তেও। নিষাদের পূর্ণ মূর্চ্ছনা থেকে হঠাৎ মনের ভিতর ভেসে উঠল নামটা। ‘সোহিনী’। সূর্যোদয় হতে তখনও ঘন্টাখানেক বাকি। উত্তরপাড়ার রাজবাড়ি হাসপাতালে জন্ম হল সোহিনীর। সেই সোহিনীকে ভেঙে পড়তে দেখে আজকাল চঞ্চল হয়ে ওঠেন শংকর। পুরনো রেমিঙটন দিনের প্রযুক্তি আজ আর নেই। পক্ষাঘাতের পর ডান হাত পা অচল হয়ে গিয়েছে অনেকটাই। আঙুলগুলো নড়তে পারে শুধু। তাই সই। সোহিনী বিগত একবছর কোনও কাজ করছে না। মানতে বাধা নেই। সংসারের হাল ওই ছোট্ট মেয়েটিই ধরে রেখেছিল। তাই বামহাতকে নিঃশব্দে নিষ্ঠার সঙ্গে সচল করে তুলছিলেন শংকর কানুনগো। টাইপরাইটিংএর যুগ না থাকলেও ডিটিপির একটা বাজার এখন বেশ আছে। ছোটছোট পত্রপত্রিকার সম্পাদকরা চাইছেন তাদের স্ক্রিপ্ট বাংলায় টাইপ হোক। শংকর বাঙলায় টাইপ জানতেন না। অনেক কষ্টে ঘরের ডেস্কটপে একটা সফ্টওয়্যার আপলোড করলেন তিনি। তারপর বামহাতে অভ্যাস করলেন টাইপ করা। যেন নতুন করে অক্ষরপরিচিতি হচ্ছিল তার। প্রতিটি অক্ষরে ভেসে উঠছিল তার আদরের মামণি সোহিনীর মুখ। না। সে হারতে দেবে না। স্পিড উঠতে চায় না। অথচ স্ত্রী মধুবন্তীর বিরল অস্থিরোগের ওষুধের দাম বেড়ে চলে চড়চড় করে। এইভাবেই ইঁদুরদৌড়ে দৌড়তে দৌড়তে একদিন শংকর কানুনগো আংশিক হলেও জিতে গেলেন। উত্তরপাড়ারই হাইস্কুলের ছেলে বাহার। ছোট থেকেই তাকে বড় হতে দেখেছেন শংকর। বাহারের একটা ছোট্ট প্রকাশনা দপ্তর হয়েছে। শংকরজ্যেঠুকে বিপদে পড়তে দিল না সে। বয়সে সে প্রায় সোহিনীর সমবয়সী। বাহার তাঁকে মোটামুটি বেতনের একটি চাকরি দিয়েছে। মাস গেলে পনেরো হাজার টাকা। তাতেই বাবা বেটি আর মায়ের আপাতত চলে যায়। এখন শংকর কানুনগোর চেতন অবচেতন ঘিরে শুধুই তার মেয়ের চিন্তা। আহিরের মৃত্যু যেন তার মামণিরও মৃত্যু। এইসব বড় বড় শোবিজ মানুষের জীবনে কতো না বলা কাহিনী থাকে। কেজানে সোহিনী তার কোনও চরিত্র কিনা! তবে কি আহিরের সঙ্গে তার কোনও সম্পর্ক ছিল? মেয়েটা কি আহিরকে মনেমনে ভালোবাসত? মনের ভিতর জিজ্ঞাসা তৈরি হয় শংকরের। কিন্তু তার বের হয়ে আসতে পারে না কিছুতেই। কী করে আসবে? আজকাল মেয়েটার সামনে দাঁড়ালেই কেমন শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সোহিনী। সেই চোখের চেনাফুলের গন্ধে ফাগুনধারার অন্ধকার। শংকর জিজ্ঞেস করতে সাহস পায় না কিছুতেই।
ঘরের একপাশে তানপুরার তারগুলোয় জঙ ধরে যাচ্ছে দিন দিন। সোহিনী যেন দেখেও দেখে না। শুনেও শোনে না। স্নানের সময় শাওয়ার খুলে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সাবান ঘষতে থাকে মুখে। বাপি বলে চাঁদপানা মুখ। বাহারদার অফিসে কাজ নেবার পর বাপি অনেকটা আবার আগের মতো হয়েছে। কিন্তু তার চোখে মুখে কালি ভাব আর যাচ্ছেই না। কেন যাচ্ছে না? সোহিনী সেই অনির্বাণ কালিমালিপ্ততার আসল কারণ জানে। বাপি তাকে যে প্রাণাধিক ভালোবাসে। বাপি ভাবে আহির স্যারকে সে ভালোবাসত। ভালোবাসা তো ছিলই। কিন্তু সে ভালোবাসা রাধারমণ আর কৃষ্ণমুরারীর মতো নয়। সে ছিল মীরাবাঈয়ের ভালোবাসা। আহির তাকে স্পর্শ করেনি কোনওদিন। করে বলেই কী এই বিপত্তি? সাবানের গোলা ফুরিয়ে যায় রোজ। জল গড়িয়ে পড়ে তার দেহ জুড়ে। কিন্তু সেই সুবাস যেন মুছতেই চায় না তার দেহ থেকে। এর চেয়ে স্পর্শের সুবাস মুছে ফেলা সহজ।
আহির স্যার চলে যাবার পর ধুলো পড়া তানপুরা দেখে মাঝেমাঝে ছোটবেলির গানের ক্লাসের কথা মনে পড়ে যায় সোহিনীর। নিষাদে পাক্কা সুর ছিল তার। গুরুমা বলত,”সাবাশ বেটি। ওস্তাদ হবি।”মনের ভিতর গুণগুণ করে ওঠে সোহিনী। বুকের ভিতর বৈরাগীর মতো বেজে ওঠে বোল। ধা দিন টা তেটে কাত গদি ঘন। দরজার ভিতরবন্দি মধ্যরাতে সোহিনী আজকাল গুণগুণ করতে থাকে। ‘তারই বাঁশির ধ্বনি সে যে বিরহে মোর গেছে রেখে। পরিচিত নামের ডাকে তার পরিচয় গোপন থাকে।’ গুরুমা শিখিয়েছিলেন এই গান। তখনও সে আহিরস্যারের ট্রুপে যোগ দেয়নি। কঠিন বস্তু কঠিন বাস্তবের মতোই হয়। সে সত্যকে খুব সহজে চিনে নিতে সাহায্য করে। সেই কারণেই কঠিন দেয়ালের ভিওর শব্দতরঙ্গর গতিবেগ সবচেয়ে বেশি। গুণগুণ করতে করতে এমনই এক মাঝরাতে দেওয়ালে কান পেতে সোহিনী শুনতে পেল তার অপর দিকে তার বাবা আর মা কথা বলছেন।
-মেয়েটা কেমন হয়ে গেল মধুবন্তী। আমি ওর ওই শুকনো মুখটার দিকে যে আজকাল তাকাতেই পারি না।
-তোমার অফিসে একবার বলো না। ওই মিউজিক মিউজিক করে তো মেয়েটা গ্র্যাজুয়েটও হল না। অন্তত যদি একটা ছোটখাটো ডাটা অপারেটরের চাকরি…
-মামণি করবে না বলে দিয়েছে। তবে আমি ভাবছি অন্যকথা।
-কী কথা?
-তোমার কি মনে হয়? আহিরের সঙ্গে ওর কি কোনও সম্পর্ক হয়েছিল?
-ওসব কথা মুখেও আনবে না তুমি। আমার মেয়েকে নিজের থেকেও বেশি ভালো করে চিনি আমি। ও পবিত্র।
-তাহলে?
-কী তাহলে?
-মামণির বাইশ হয়ে গেল। ঘরে বসে আছে এক বছর। ওর বিয়ে দিয়ে দিই এমন কথা মনে আসে মাঝে মাঝে।
-বিয়ে অমনিই হয়। দেখা নেই। শোনা নেই। কথা নেই। অমন যার তার হাতে আমার মেয়েকে দিতে পারব না বাপু। চারপাশে কতো কথা শুনি। মেয়ে যদি তোমার গলায় কাঁটা হয়ে বিঁধে থাকে, তো আমাকে বল। বিয়ের গয়নাগুলো সামান্য পড়ে আছে এখনও। ওগুলো বেচে বেশ কিছুদিন এখনও খাওয়াতে পারব ওকে।
-ও কথা নয়।
-তাহলে কী কথা?
-ও বড় একলা হয়ে গেছে। তেমন বাইরে তো মিশতেই চাইত না কোনওদিন।একজন আছে যে ওর খবর রোজ নেয়। যেচে যেচে।আমি ওর চোখ দেখে বুঝতে পারি। ও ভালোবাসে সোহিনীকে।
-কে গো?
-বাহার।
-মুসলমান !!
-তো? ওর মা হিন্দু। বাড়িতে লক্ষ্মীপুজো হয়। তাছাড়া বাহার নিজেকে মুসলমান না, নাস্তিক বলে। ও নিজে কমিউনিস্ট। ঈশ্বর পয়গম্বরের ধার ধারে না একদম। হলফ করে বলতে পারো? আমি না বললে বা সমাজ ওর পদবী ঠুকে না দিলে তুমি বুঝতে পারতে ও বিধর্মী?
-ছোট থেকে দেখছি। বড় ভালো ছেলেটা। তা বেশ। কিন্তু আমার মেয়েটার মনের কথা জেনেছ কোনও দিন?

এতোটুকু শুনে দমবন্ধ হয়ে আসে সোহিনীর। বাহারদাকে ছোটবেলা থেকে দেখছে সে। কখনও তেমন কথা হয়নি। বাহারদা তার খবর নেয় রোজ? কিন্তু! এই কিন্তুর মায়াজালে জড়িয়ে পড়ে সোহিনী। ঘুম আসে না। মনে মনে ভাবে। চোখ বন্ধ করলে ভালোবাসার মানুষকে নাকি দেখতে পাওয়া যায়। পুরনো হিন্দি সিনেমায় এমন কতোবার দেখেছে সে। জানলার ধারে বসলে আবছা গঙ্গার ঘাট দেখা যায় সোহিনীদের ফ্ল্যাটটা থেকে। এখন সেই জলের রেখার গতিপথ ঠাহর করা কঠিন। তবু সোহিনী চেয়ে দেখে। ভাবতেই থাকে। কে হবে তার মনের মানুষ? হিমাংশু দত্তর মতো জীবন থাকবে তার গলায়। চোখ বন্ধ করে দেখতে পায় সোহিনী। লালগালিচায় আড়াআড়ি বসে গান গাইছেন তালাত মাহমুদ। এঁরা যে সবাই তার ঠাকুরদার ঠাকুরদার বয়সী। তবু সে দেখতে পায় স্পষ্ট। বদল হচ্ছে মানুষটির। সে যেন গাইছে ‘আমি বলতে ভুলে গেছি সে যেন বাঁশি না বাজায়।’ এসব গান সে ছোট থেকে বাপির জমানো ক্যাসেট আলমারি থেকে খুঁজে বের করে শুনেছে। আবার সোহিনীর বুকে গুণগুণ ফিরে আসে। ‘চেনাফুলের গন্ধস্রোতে ফাগুনরঙের অন্ধকারে।’ সে জানে। তার মনের মানুষ নিষাদ ধরবে পাক্কা জোড়ে। গুরুমা যেমনটি বলতেন।

বাহারদার সঙ্গে দেখা হল অবশেষে সোহিনীর। বাড়িতে এসেছিল দাদা। বাহারদার আব্বা চলে গেছেন ছোট্ট বয়সে। আম্মিই তাকে বড় করেছেন। উত্তরপাড়ার হিন্দুপাড়ার এককোণে মাকলার দিকে তাদের আদিবাড়ি। এখন অবশ্য বাহারদার প্রকাশনা জগতে অনেক নামডাক। সুরে তার দখল নেই একটুকুও। কিন্তু সঙ্গীত নিয়ে পড়াশোনা বিস্তর। সোহিনী কতো মাস পরে ঘর থেকে বের হল। জয়কৃষ্ণ লাইব্রেরিমাঠে বিকেল বিকেল দেখা হল দুজনের। ভারি মজার লাগলো তার বাহারদাকে। কথা বলে না। খালি চেয়ে থাকে মালবা সুলতান বাজবাহাদুরের মতো। সোহিনী গানবাজনার পাশাপাশি ইতিহাস পড়তে ভালোবাসত খুব। সে লজ্জায় চোখ নামিয়ে নেয়। মনে মনে ভাবে। সে কি রূপমতী নাকি? কতো বছর গান করেনি সে। এই এক বছর ঘরের ভিতর বসে থাকতে থাকতে মুটিয়ে গেছে কতো। বাহারদা কী তবে রঙ্গ করছে তার সঙ্গে? প্রশ্ন গোপন থাকে না।
-কী?
-কি কী?
-অমন তাকিয়ে আছেন কেন?ছোট থেকেই তো দেখছেন। কখনও বলেননি তো?
-কী বলিনি?
-কিছু না। বলুন কি বলবেন?
-আর গান করো না কেন সোহিনী?
-আমার গান আপনি শুনেছেন?
-শুনেছিই তো। ভদ্রকালীর সেই অনুষ্ঠানে। ভারি সুন্দর গেয়েছিলে। পুরাতনী। গুড্ডি সিনেমার গান। ‘বোল রে পাপিহারা’।
-বাপরে। এতো কিছু মনে রেখেছেন আপনি বাহারদা। আমরা সবাই অবশ্য আপনার কথা বলি সবসময়। আপনি না থাকলে আমাদের সংসারটা ভেসে যেত।
-ও সব কথা থাক সোহিনী। গানে ফেরো আবার।

বাহারদার দুই চোখে বাজবাহাদুরকে খুঁজছিল সোহিনী। এই মানুষটা কি তাকে মালব্যসুলতানের মতো নজরমিনার বানিয়ে দিতে পারবে? সেখানে দাঁড়িয়ে রোজ নর্মদা মাকে প্রণাম করে অন্ন গ্রহণ করবে সে। মন বলে পারবে। বাহারদা ঠিক পারবে। কিন্তু সমাজ? এই বিচ্চুতি মেনে নেবে সমাজ? স্পেশাল ম্যারেজ অ্যাক্ট কী পারবে সমাজকে চশমা পরাতে। ভাবতে ভাবতেই নিজেকে প্রজাপতি মনে হল সোহিনীর। এই এক বছর যেন একটা পিউপার ভিতর ছিল সে। আহির স্যার চলে যাবার পরপর যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, এখন আর তা বুঝতে পারছে না সে। কিন্তু একটা ‘তবু’ থেকে গেল তার বুকের ভিতর। এই মানুষটার কণ্ঠে সুর নেই যে। এ তবে কেমন করে তার স্বপ্নপুরুষ হবে? ভাবতে ভাবতেই সোহিনী দেখে তার বাজবাহাদুর বাহারদা অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। লজ্জায় নজর সরিয়ে নিল সে।
-কী এতো দেখছেন শুনি। ঘরে বসে বসে তো মোটা হাতি বনে গেছি।
-তোমাদের ঋগবেদে হাতির স্বর কী জানো সোহিনী?
সোহিনী অবাক চোখে তাকিয়ে দেখে। সে যে সত্যিই জানে না। একজন সুরহীন মানুষের ভিতর এতো সঙ্গীতপিপাসা আসে কোথা থেকে!
-ঋগবেদে হস্তী ‘নিষাদ’ স্বরের প্রতীক। অশ্ব ধৈবত, কোকিল পঞ্চম, সারস মধ্যম, অজ গান্ধার, বৃষ ঋষভ আর ময়ূর ষড়জ।
-ওহ। আগে বলেননি তো আপনি ‘সা’ গাইতে পারেন।
-কে বলল ?
-বা রে।এই তো বললেন বোল রে পাপিহারা। সে যে মল্লহার। বৃষ্টির রাগ।
-আর আমি বুঝি ময়ূর?

লাইব্রেরির মাঠে নদীর মলয়পবনে এক ক্ষণিক মুহূর্ত যেন মনের অলিতে তাড়ানা হয়ে ওঠে। বাহার ভাবে। আর সে নিজেকে নাস্তিক ভাববে না। আল্লা মেহেরবান। ঈশ্বর আছেন। নাহলে সোহিনী কীভাবে হঠাৎ মিশে যাচ্ছে বাহারে! একজন মারোয়া ঠাট। অন্যজন কাফী। তবু কতো কাছাকাছি দুই জন। ঘরে ফিরতে ফিরতে বাহার আলম ভাবতেই থাকে। নিকেতে সোহিনীকে ময়ূর নীল জোড় উপহার দেবে সে। রাতের আলোয় সেই জোড় জোছনা হয়ে উঠবে। বাহার কী জানত বিধাতা ও নিয়তি বড় অবাধ্য? তার ভাবুকভাব নাই।

রাত বাড়তে থাকে। গুণগুণ আসে সোহিনীর গলায়।’বোল রে পাপিহারা’। গাইতে গাইতে সে দেখে তার বাবা মায়ের মুখে এতো গুলো মাস পর আবার খুশির আলো ফুটে উঠছে। মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় অনেকক্ষণ। বাবা জেগে থাকে। টাইপ করে। টাইপের গতি বেড়ে যায় নিজেরই অজান্তে। শেষরাতে বাবামা দুজনকেই ঘুম পাড়িয়ে নিঃশব্দে ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে এল সোহিনী। মনের ভিতর থেকে কথাখুলো আবার বলে উঠছে কেউ। ডাকছে কাছে। ‘আয় আয়’। তাকে ডাকাতিয়া বাঁশি ডাকছে। আয় আয়। সোহিনী শব্দের উৎসকারী মানুষটিকে খুঁজে পায় না কিছুতেই। তাকে দেখা যায় না। শুধু বেহালা সাড়েঙ্গী বেজে ওঠে। কানের ভিতর দরবারি কণ্ঠস্বর গেয়ে ওঠে। ‘কোয়েলিয়া গান থামা এবার। তোর ওই কুহুস্বর…’ । জনহীন রাস্তা দিয়ে একা সোহিনী হেঁটে যাচ্ছে নদীঘাটের দিকে। কানের ভিতর কেউ ডাকছে। ‘আয়, আয়’। সোহিনী রামঘাটের দিকে এগিয়ে গেল। ঘাটের পাশে বিলুমাতালের হাত টপকে চলে গেল সে।এক এক ধাপে জলে নেমে পড়ল সোহিনী। কানে শব্দ হয়ে চলে। ‘আয় আয়’।অন্ধকারে জলের ভিতর নেমে সোহিনী দেখল নদীর বুকের কাছে তার গুরুমা দাঁড়িয়ে। তাকে আসতে দেখে হাতছানি দিয়ে ডাকল সে। ‘আয় বাবু। মল্লারের নিষাদটা একবার কর দেখি। আয়। কাছে আয়।’ সোহিনী এগিয়ে যায় জলের দিকে।

বিলুমাতালের ডান কানে কানামাঝি ঢুকেছিল। ধড়মড় করে উঠে সে দেখল এক অপরূপ সুন্দরী যুবতী গঙ্গার ঘাট পেরিয়ে মাঝদরিয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ভয়ে জিভ শুকনো হয়ে আসছিল তার। একী কোনও জিনপরি! তার কি নেশা কাটেনি এখনও? ভাবতে ভাবতেই মাছিটা বের হয়ে ঢুকে পড়ল তার নাকে। আরে রামোহ। ছোঃ। ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ বিলু দেখল নদীর বুকে মেয়েটার সারাটা গা ঠিকরে আলো বেরিয়ে আসছে। তারপরেই এক দমকা হাওয়া। জোয়ারের উজান স্রোতে বিলুমাতালের জিনপরি সোহিনী হঠাৎ হারিয়ে গেল জলের স্রোতের ভিতর।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।