গল্পেসল্পে শুভাঞ্জন চট্টোপাধ্যায়

বাক্সবন্দী

প্রোডিউসার বিমল সিনহার সুদৃশ্য অ্যাপার্টমেন্টে ককটেল পার্টি চলছিল। ফিল্ম ইণ্ডাষ্ট্রির মধ্যমণি প্রায় সকলেই উপস্থিত সেখানে। হিরোইন অপরূপা গল্প করতে করতে এর ওর পাশ কাটিয়ে করিডোরের ফাইবার গ্লাসের ডোর ঠেলে আস্তে আস্তে সামনে এগিয়ে যায়। হুইস্কির গ্লাস হাতে বারান্দার ধারে দাঁড়িয়ে ঠান্ডা পানীয়ে মৌজ করে চুমুক দিতে দিতে তখন বাইরের হাওয়া খাচ্ছিলেন স্বস্তিক সেনগুপ্ত, বাংলা চলচ্চিত্রের খ্যাতনামা নায়ক।
‘ আসতে পারি?’
বলতে গিয়ে গলার কাছটা বুঝি ঈষৎ কেঁপে ওঠে ওর।
একটু আগে স্বস্তিক বলছিল, ‘ আমি যতক্ষণ করিডোরে থাকবো, কেউ যেন বিরক্ত না করে। মদের নেশার সঙ্গে হাওয়ার কম্বিনেশনটুকু একটু নিজের মতো করে উপভোগ করবো…’
ওকে আর ছাড়েই বা কজন! সেই থেকে এঁটুলির মতো সব ধরে রেখে দিয়েছে। মেয়েরা তো কথাই নেই। উঠতি নায়িকা, দু একটা ফিল্মে মুখ দেখিয়েছে…তার কাছে শুধু স্যারের হাসিটুকুই যথেষ্ট…সেই প্রসাদটুকু পাবে বলে ভীড়ের মাঝে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা…তারা নাহয় ওটুকু সম্বল করেই বাড়ি ফেরে…আর যারা সঙ্গ ছাড়তে চায় না…সে নারী সঙ্গই হোক, পুরুষ সঙ্গই হোক…তিন দশক পেরিয়ে আসার পর নায়কের জীবনে সে সংখ্যা যে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো।
আজ যারা এই পার্টিতে রয়েছে, তাদের বেশিরভাগই সুপরিচিত, প্রতিষ্ঠিত কলা কুশলী, বিমল বাবুর প্রোডাকশনের লোকজন… পর্দার আড়ালের মানুষ…যাদের ছাড়া ফিল্ম চলবে না, শিল্প মুছে যাবে শিল্পীর জীবন থেকে…মজার কথা এটাই … হাজারো গল্পগুজব, ফূর্তি, আমোদপ্রমোদের মাঝে এদের সিংহভাগ অংশই কিন্তু দিনের শেষে স্বস্তিক সেনগুপ্তেরই মুখের দিকে তাকিয়ে। তার একটা বড় কারণ, বিগত তিন দশক ধরে একের পর এক হিট সিনেমা আজ এই মূহুর্তে যে আলোয় ঘিরে রেখেছে তাঁকে, সেই আলোর বৃত্তে পৌঁছোবার মতো বিকল্প আর কেই বা আছে! নায়িকা অপরূপা, যাকে আজ পার্টিতে শুরু থেকেই কিছুটা অন্যমনস্ক লাগছে, স্বস্তিকের মতোই হীরের আর এক দ্যুতি। তবু যেন স্বস্তিকেই পূর্ণ চারিধার। বাস্তব জীবনে নারী সমাজ যতই তাকে ঘিরে স্বপ্ন দেখুক…চেহারা, ক্যারিশমা, অভিনয় দক্ষতা… সবকিছু মিলে মিশে যে নায়ক বাসা বাঁধে মানুষের মনে, ডিরেক্টর সমালোচকদের মতে ‘ স্বস্তিক সেনগুপ্ত ইজ আ কমপ্লিট অ্যাকটার…রিয়েল পারফেকশনিস্ট.. ‘ প্রোডিউসাররা কিছুদিন আগেও যে অপরূপা- স্বস্তিক জুটিকে মধ্যমণি রেখে টাকা ইনভেস্ট করতে পিছপা হতেন না…ব্যক্তিগত ক্যারিশমার সেই আলোকবৃত্তাকার পথে একা একা হাঁটতে হাঁটতে মাঝে মাঝে নিজেকে বড় নিঃসঙ্গ বলে মনে হয় স্বস্তিকের। মনে হয় কাঁচের পৃথিবীর ওপারে সমুদ্রের মতো একটা জনঅরণ্য রয়েছে, যে অরণ্য আসলে তাকেই ঘিরে রেখেছে…এ পৃথিবী থেকে বেরোনোর কোনো উপায় নেই… আজ আর কেউ তাকে অরণ্যাচারী পথিক হতে দেবে না…পেছন পেছন ছুটে বেড়াবে, ধাওয়া করবে ব্যস্ত সাংবাদিকের মতো…
‘বিগত দুই দশকের সফলতম জুটি স্বস্তিক -অপরূপার মাঝে তবে কি সত্যিই কোনো প্রেমকাহিনী লুকিয়ে…একান্ত সাক্ষাতকারে নায়িকা অপরূপার ইতিবাচক সাড়া..”আমি কারো ঘর ভাঙতে চাই না…তবে নিজে থেকে আসতে চাইলে তার জন্য আমার অপেক্ষার দরজা সবসময় খোলা থাকবে”….
‘এ নিয়ে স্টুডিও পাড়ায় গুঞ্জন অব্যাহত…অপেক্ষা করে আছি আমরাও, নায়ক স্বস্তিক সেনগুপ্ত মৌনতা ত্যাগ করে নিজের ব্যক্তিগত পরিসরকে কতটুকু উন্মোচন করেন, আদৌ উন্মোচন করবেন কিনা…সদ্য সমাপ্ত অপরূপা-স্বস্তিকা জুটি অভিনীত ‘ বাক্সবন্দী’ সিনেমার মতোই এ প্রশ্নের উত্তরও বুঝি বন্দী হয়ে রয়েছে সেলুলয়েডের মতো অন্য এক চমকপ্রদ পর্দার অন্তরালে….’
স্টার অভিনেতার জীবনে গসিপ কিংবা স্ক্যান্ডাল থাকবে না, তাই আবার হয় না কি …বাজারে এই ট্রেন্ড বহুকাল ধরে চলে এসেছে…সদ্য প্রয়াত সাতের দশকের নামী পরিচালক, স্বস্তিক সেনগুপ্তের একসময়কার গড ফাদার সন্তোষ ধর বলতেন, “‘কেচ্ছা, কেলেঙ্কারি এসব হলো রাজমুকুটের পালক। নায়ক নায়িকা হতে পারলে তো কথাই নেই! সেসব টপ মোস্ট রসালো খবর ছাপিয়ে কাগজওয়ালারা ব্যবসা করবে…এ তো সাধারণ সত্য। বাজার লাভ, ক্ষতি ছাড়া কিছু বোঝে না। তুমি অভিনয়ে এসো…তোমাকে হিরো বানানোর কাজ আমাদের। এইভাবে খেলিয়ে খেলিয়ে জলে নামাবে। এরপর তোর যদি কোয়ালিটি থাকে তো তুই ইন্ডাস্ট্রিতে টিকে গেলি, আর যদি না থাকে ওরা তোকে ভুলে নতুন মুখ খুঁজে নেবে। উল্টোরথের পাতায় দিনকয়েক হয়তো স্থান হতে পারে ফ্লপ নায়ক হিসেবে। তারপর ভ্যানিস। যেখান থেকে জীবন শুরু করেছিলি, হয় সেখানেই ফিরে আসতে হবে আর নয় স্ক্যান্ডালের তকমা গায়ে এঁটে বাকি জীবন রিপেন্ট করতে হবে…মুছে গেলে কে কার খোঁজ রাখে…একমাত্র ঘরটুকু ছাড়া আর কিছু থাকবে না…তাই বলি ঘরটাকে যত্ন করে রাখিস…কাল হয়তো আমি থাকবো না…বাজার থাকবে…পাবলিক ডিম্যান্ড আরো বাড়বে…যত্নে রাখলে ঘরটাও থাকবে…তার জন্য একটাই ছোট্ট শব্দ…” ব্যালেন্স..”
এই ফিল্ম ইণ্ডাষ্ট্রি কিন্তু ভীষণ স্লিপারি। কাগজওয়ালা গসিপ তৈরি করে, আমরা সিনেমা বানাই…বাজার, ব্যবসা…জীবনের ভালো মন্দ, লাভ ক্ষতি ভাবতে থোড়াই কেউ বসে আছে…কী বুঝলি?’
ভাবছিস এত কথা হঠাৎ কেন বলছি? তোর ভেতর একটা ইননেট কোয়ালিটি আছে, অনেকদিন ধরে দেখে আসছি…পরিচালকের চাওয়ার থেকেও অভিনীত দৃশ্যে অারো বেশি কিছু করে দেখানো…এই কোয়ালিটি সবার থাকে না, তোর আছে…এটাকে ধরে রাখ, নড়বড়ে হতে দিস না, অজস্র প্রলোভন থাকবে, থাকবে অন্য নায়িকার প্রতি অ্যাটাচমেন্ট, দূর্বলতা, আকাঙ্খা, মায়া, মোহজাল….এই সবকিছুর মাঝে আত্ননির্মাণের এটাই কিন্তু সময়। বাজারে সোনার কদর এক…হীরের কদর আর এক রকম..কথাটা মাথায় রাখিস…’
কথাগুলো বলে হো হো করে হেসে উঠেছিলেন সন্তোষ ধর। পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘ যাবি কোথায়? সেই তো বাজারেই ফিরে আসতে হবে…ভাগ্যিস আমার নজরে পড়ে গিয়েছিলিস! প্রথম দুটো স্ক্রিন টেস্ট দেখেই আঁচ করতে পেরেছিলাম…ছেলের কোয়ালিটি আছে। হবে। দরকার শুধু প্রপার গ্রুমিং। ঐ আশু মুখুজ্জের দরজায় হত্যে দিয়ে পড়ে থাকলে অ্যাদ্দিনে স্টপ গ্যাপ আর্টিস্টের তকমাটা বাকি জীবনেও তোর কেরিয়ার থেকে ঘুচতো কিনা সন্দেহ। অ্যাক্টর তৈরি করতে হয়, আবিষ্কার করতে হয়…তার জন্য চোখ থাকার দরকার… সে চোখ আছে ওর? মেইন রোলে স্টার অভিনেতা ছাড়া আর কাউকে মানায় না…এ কনসেপ্টে ওরা বিশ্বাস করে, ইন্ডাস্ট্রির হয়তো অনেক তাবড়-তাবড় লোকে বিশ্বাস করে, আমি করি না। অভিনয় জীবন থেকে উঠে আসে। সে কোনো কল্পলোকের বাসিন্দা নয়। তুমি যত মাটিতে পা ফেলবে, যত বেশি জীবনকে দেখবে, তত তোমার অভিনয় সহজ হবে, স্বাচ্ছন্দ আসবে। ইনফ্যাক্ট তুই যেদিন ফার্স্ট দেখা করতে এলি, মনে আছে তোকে একটা স্ক্রিপ্ট দিয়ে বলেছিলাম সেটাকে নাটকের আকারে বলতে? সেদিনই মাথায় খেলে গিয়েছিল, যে চিত্রনাট্যটা লিখেছি, এর মেইন ক্যারেক্টরটা যেন বসানো তুই! আর কেউ নয়। স্ক্রিপ্ট শোনার পর থেকে মনটা যেন কিছুতেই ছাড়তে চাইছিল না তোকে। ঐ ছবিতে যার অভিনয় করবার কথা…সেই অহর্নিশ দত্ত প্রযোজকের সঙ্গে পয়সাকড়ি নিয়ে ঝামেলায় শেষমেশ করবে কিনা ঠিক নেই…এমতাবস্থায় বনিবনা না হওয়ায় অপেরা থিয়েটার্স ছেড়ে দিতে বাধ্য হলো অহর্নিশকে। পথ এমনি এমনি পরিষ্কার হয় নি। স্টার আর্টিস্টের মোহ ছেড়ে নবাগত একজনকে সেই জায়গায় ইনপুট করা…চোখ সায় দিয়েছিল, মন সায় দিয়েছিল, তবেই না…’
দাদার কথার প্রত্যুত্তরে স্বস্তিকও কথাটা না বলে পারে নি।
‘ অহর্নিশের না থাকাটা সেদিন আমার আরো একটা চোখ খুলে দিয়েছিল সন্তোষ দা। সেটা হলো কাজের প্রতি দায়বদ্ধতা। একজন ছেড়ে দেয়। আর একজন আসে। আমি শুধু সেদিনের ঐ আসাটাকে দেখতে পাই। একটা মস্ত বড় প্লাটফর্ম যেন। অপেক্ষমাণ যাত্রীর মতো দাঁড়িয়ে রয়েছি। অনেকদূর যেতে হবে। কতদূর নিজেও জানি না। আর এই না জানার কারণে অপেক্ষার প্রহরগুলো বেড়েই চলেছে ক্রমশ…এটুকু শুধু জানি, একদিন হয়তো কোথাও একটা গিয়ে ল্যান্ড করবো ঠিকই, কিন্তু ঐ যে বললাম, কখন করবো, কোথায় গিয়ে করবো সবটাই ধোঁয়াশা। আনপ্রেডিক্টেবল। হঠাৎ কি মনে করে একটা ট্রেন ধরেই ফেললাম। উঠে কি দেখলাম জানো? দেখলাম সেখানে যারা বসে রয়েছে তারা সকলেই আমার চেনা! এই যেমন অহর্নিশ দত্ত, আশু মুখার্জি, বিনোদ বিহারি মিত্তির…এই সেদিনও যারা আমায় ফিরিয়ে দিয়েছিল…স্টপ গ্যাপ অ্যাকটার কিংবা সাইড রোল ছাড়া আর কোনো পাঠ দেয় নি..আজ তারাই…আচমকা তাকিয়ে দেখি, বেশ কিছুটা দূরে ঐ দিকের জানলার ধারে বসে তুমি আমায় ডাকছো…বিশ্বাস করো, এই স্বপ্নটা এখনো মাঝে মাঝেই আমার চোখের সামনে কিরকম ভেসে ওঠে…!’
‘ দ্যাট ইজ আ ভেরি গুড সাইন! স্বপ্ন দেখা অভ্যেস করতে হয়। সে অভ্যেস না থাকলে বেশিদূর এগোনো যায় না। তবে এসবের মাঝে আবার আমায় নিয়ে এলি কেন? ওরা সব বড় অ্যাক্টর দিয়ে কাজ করানোর লোক। আমার মতো অল্প পয়সার পরিচালক তো আর নয়। সন্তোষ ধরের মতো কম বাজেটের আর্ট ফিল্ম ডিরেক্টরের সে টাকা কোথায় যে চাইলেই ওদের নিয়ে আসবে? তবু তাদের মধ্যে থেকে যারা আসে, তারা নিজে থেকেই আসে…পয়সার জন্য আসে না…যে মুষ্টিমেয় মানুষ গুলো আমার ছবি দেখতে ভালো বাসে তারা আমার কাছে অ্যাসেট..’
কথাগুলো বলতে বলতে খদ্দরের পাঞ্জাবির পকেট থেকে সিগারেট বের করে নিজে একটা ধরালেন, আর একটা অফার করলেন ভদ্রলোক। প্রথম দিকে ইতস্তত করতো স্বস্তিক। ক্রমে সহজ হয়ে গিয়েছে। ফিল্ম লাইনটাই বোধহয় এমন। সহজ, সপ্রতিভ না হয়ে উপায় আছে!
সন্তোষ ধরের ঠোঁটের কোণে আলগা হাসি। পান খাওয়া, খোঁচা খোঁচা দাঁড়িওলা, ভাঙা মুখে একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে বলেন, ‘ ফোন করেছিল কাল রাতে।’
‘ কে দাদা?’
‘ অহর্নিশ দত্ত। জেপি প্রোডাকশন আমার নতুন যে ছবিটা করতে চলেছে, ওর খুব ইচ্ছে ছিল কাজটা হাতে পাওয়ার। ‘
‘ তারপর? ‘
‘ কি আবার…রিসেন্টলি একটা দুটো ছবি, যেগুলোতে ওর করার কথা ছিল, সেগুলো তুই করছিস। হোঁচট তো খানিকটা লাগবেই। যদিও আমি ব্যক্তিগত ভাবে স্টারডমে বিশ্বাসী নই, তবু বলতে বাধ্য হচ্ছি, একের পর এক অন্তঃসারশূণ্য বানিজ্যিক ছবির পেছনে ছুটতে ছুটতে নিজের আসল কোয়ালিটিকে ও ক্ষয় করে ফেলছে। এখন ফিরে এসে যদি বলে কাজ দিন, নেবো কোত্থেকে? কম পয়সায় যদি কাজ করতে চায় পরে ভেবে দেখবো। ওকে বলেও দিয়েছি সেকথা। বছর তিন আগে, যখন এ ছবিটার স্ক্রিপ্ট তৈরি করেছিলাম…তখনো তুই এ লাইনে পা দিস নি… ভেবে রেখেছিলাম চৌধুরী মানে আমাদের অম্বরিশকে দিয়ে মেইন ক্যারেক্টারটা করাবো। ছেলেটা কমার্শিয়াল ছবির স্টার অ্যাকটার হতে পারে, কিন্তু পার্টিকুলার আমার এই সিনেমার চরিত্রটাতে ও ই ফিটেস্ট। কিন্তু আজ এই মুহূর্তে কি মনে হচ্ছে জানিস? মনে হচ্ছে, ছবিটা তোকে ছাড়া চলবে না। তোর জন্যই বোধহয় এত দিন অপেক্ষা করছিল সিনেমাটা। আর তাই হয়তো ইচ্ছে থাকলেও নানান কারণে করে উঠতে পারি নি… এই ইন্ডাস্ট্রিতে সিলেকশন ব্যাপারটা বড্ড দামী বুঝলি…আগে তোমার চোখ দুটো..বাকি অল্প কিছুটা মনের হাত। তোর জায়গায় তো আর আমি আসতে পারবো না…এলে সেটা পরিচালকের ব্যর্থতা…বড় জোড় সে আমায় অন্য কোনো চরিত্রে ফিরিয়ে আনতে পারে…আমার কথা ভবিষ্যতে স্মরণে রাখতে পারে…এটুকুই মনের হাত, ব্যাস আর কিছু না…’
অন্যমনস্ক ভাবে সিগারেটের শেষ টুকরোটা ছুঁড়ে ফেলে দেন সন্তোষ দা। অম্বরিশ চৌধুরীর গাড়ি এসে দাঁড়ায় একটু দূরে। দুধ সাদা অ্যাম্বাস্যাডার থেকে নেমে গটগটিয়ে হেঁটে চলে যায় অম্বরিশ… নিউ এম্পায়ার প্রোডাকশন হাউজের দিকে…ওখানে একটু পরে শ্যুটিং শুরু হবে। সেটা ছাড়ালে আলোছায়া স্টুডিওর মেইন গেট। ভেতরে পরপর সারিবদ্ধ শ্যুটিং ফ্লোর। স্টুডিও চত্বর ছেড়ে বেরিয়ে চলে যাচ্ছেন বর্ষীয়ান অভিনেতা আর্য শংকর রায়। ঋজু, সুঠাম, ছ’ফুটের ওপর লম্বা। ব্যাক ব্রাশ করা চুল। পরনে চিকনের পাঞ্জাবি। ময়ুরপুচ্ছ ধুতি। আপেলের মতো গায়ের রঙ। সূর্যের আলোয় সে রঙ যেন ঠিকরে বেরোচ্ছে। বয়সকালের এই চেহারার দিকে এখনো তাকিয়ে থাকতে হয়। রাশভারি গোছের লোক। জলদগম্ভীর মেজাজি কন্ঠস্বর। পুরোনো কিছু আর্টিস্ট ছাড়া আর কাজের কথা বাদ দিলে কারো সঙ্গেই বড় একটা কথাবার্তা বলেন না। শ্যুটিং ফ্লোরে যখন আসেন, সাথে একটা দুটো করে দামী হুইস্কির বোতল থাকবেই। মুখ থেকে ভরপুর ওয়াইনের গন্ধ বেরোলেও তার বিন্দুমাত্র প্রতিফলন আজ পর্যন্ড শ্যুটিং ফ্লোরে কেউ কখনো লক্ষ্য করে নি। একটা সময়ে এই মানুষটিকে চিত্র জগতের আইডল বলে ভাবতো স্বস্তিক। ভাবতো আর স্বপ্নের রাজ্যে বিচরণ করতো। যবে থেকে তাদের বাড়িতে টিভি এসেছে, তারো কত আগে থেকে মানুষটির সঙ্গে তার পরিচয়! সে নেহাতই শখ করে দেখা সিনেমার পর্দায়। সেখানে পরিচয় হয় অবশ্য আরো অনেকের সাথেই, যারা আজও অভিনয় করে চলেছেন। স্টুডিও পাড়া যাদেরকে আলাদা ভাবে সম্মান করে, চেয়ার ছেড়ে দেয়। তাদেরই মাঝে ছফুট দু ইঞ্চির ব্যাক ব্রাশ করা চুলের এই বিশিষ্ট চরিত্রাভিনেতার আসন দখল করা মানুষটি কবে কিভাবে যে স্বস্তিক সেনগুপ্তের মনের আসনও একদিন দখল করে ফেলেছিলেন তা সে নিজেও জানে না। অভিনেতা হয়তো আজও তাঁর নিজের জায়গাতেই রয়ে গিয়েছেন। শুধু ছবির জগতে প্রবেশের পর একটু একটু করে স্বপ্ন দেখার চোখদুটোই পালটে গিয়েছে স্বস্তিকের। এ জগতের এটাই হয়তো নিয়ম। মানুষের ভীড়ে সবই একদিন সহজ হয়ে যায়। দূরের নক্ষত্রও আলো বিকিরণ করতে করতে কাছে চলে আসে। তখন আর সে দূরের থাকে না।
গেটের ওদিকটায় একটা কালো রঙের ফিয়াট গাড়ি দাঁড় করানো ছিল। আর্য বাবুর নিজের গাড়ি। এরকম আরো একটা গাড়ি নিয়ে স্টুডিওতে আসেন ভদ্রলোক। লাল রঙের স্ট্যান্ডার্ড হেরাল্ড। নিজেই ড্রাইভ করেন। কালো কাঁচে ঢাকা গাড়িটাডে উঠে চোখের সামনে দিয়ে হুশ করে বেরিয়ে গেলেন আর্য শংকর।
একঝলক সেদিকে তাকিয়ে সন্তোষ ধর বলেন, ‘ অভিনেতা আসে। অভিনেতা চলেও যায়। যাওয়া আসার মাঝে জড়িয়ে থাকে নানান উত্থান পতন, টানাপোড়েনের কাহিনি। সাফল্যের সিঁড়ি বাইতে বাইতে আজ যে ক্রমশ ওপরে উঠে আসছে, কাল পরপর তিনটে ছবি ফ্লপ করলে কোথায় গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়বে সে নিজেও জানে না। জীবনের সঙ্গে চিত্রনাট্যের আমি এক অদ্ভুত মিল খুঁজে পাই বুঝলি! আসা যাওয়া, এই দুয়ের মাঝে যেখানে কেউই অপরিহার্য নয়। যে কাহিনিকার, সে ই বোঝে এক একটা চরিত্র সন্তান ছাড়া আর কিছু নয়। সেই উপলব্ধির আলোয় তোর পরিচয় একটাই…চরিত্রাভিনেতা। তুমি নায়কও নও, গায়কও নও…অনলি ক্যারেকটর আর্টিস্ট। ছবি আঁকতে আঁকতে দেখার চোখদুটো যে মুহূর্তে থেমে যাবে…সেই মুহূর্তে কলমও থামিয়ে দিতে হবে। হবেই। নড়বড়ে গল্পের বানিজ্যিক ছবি নিজে বাজার করতে না পারলেও ভবিষ্যতের জন্য কোনো গান বা সুর রেখে যেতে পারে হয়তো বা। আর্ট ফিল্মের ক্ষেত্রে বোধহয় এ তত্ত্ব খাটে না। বোধহয়ই বা বলছি কেন। সেকশান অব পিপল যারা এ ছবি দেখতে আসে তারা উপলব্ধির আলোটুকু খুঁজে পেতে আসে। এপিফ্যানি। গাড়ির কালো কাঁচে ঢাকা আর্য শংকর রায়কে খুঁজে বেড়াতে নয়। তাঁর অবয়বটুকু অনুভব করতে। মানে বুঝলি?’
এসব সত্তরের দশকের শুরুর কথা। সেদিনকার বাজার আর এখনকার বাজার…দুইয়ে আকাশ পাতাল পার্থক্য ঘটে গিয়েছে। বহুদিন আগেই ছবি পরিচালনার কাজ থেকে সরে এসেছিলেন সন্তোষ ধর। হয়তো ভেতরে ভেতরে ফুরিয়ে গিয়েছিলেন। আর কিছু দেবার ছিল না। অন্তরীণ হয়ে গিযেছিলেন অনেক আগেই। হঠাৎ একদিন চুপিসারে চলে গেলেন।
…’ জীবনে সবই থাকবে…প্রলোভন, মায়া, মোহজাল…তারই মাঝে আত্ননির্মাণের এটাই কিন্তু সময়… ‘
কথাগুলো এখনো কানে বাজে স্বস্তিকের। দিন দশেক আগে বালীগঞ্জ গল্ফ ক্লাবের পুজো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ফিতে কাটার আমন্ত্রণ পেয়ে সেখানে যেতে হয়েছিল স্বস্তিককে। ফিরে আসার সময় গাড়িতে উঠতে গিয়ে সন্তোষ দার ছেলের সঙ্গে হঠাৎ মুখোমুখি দেখা। বলেছিল, ‘ বাবা ভালো নেই…কেউ আর খোঁজ রাখে না…’
কেন ভালো নেই সেকথা আর জানা হয়ে ওঠে নি স্বস্তিকের। সামনে তখন হাজারো ভীড়, তাকে দেখবার জন্য। তারই ভেতর থেকে এক সাংবাদিক ক্যামেরা মাউথপিস নিয়ে এগিয়ে আসে…
‘ স্যার, আজকের আনন্দলোকের কভার পেজে যে নিউজটা ছাপা হয়েছে, সেটা নিয়ে সকলেরই একটা বড় কৌতুহল…’
‘ কোন্ নিউজ?’
‘ আপনার আর অপরূপা ম্যাডামের মধ্যেকার……সরি স্যার, অন্যরকম ভাববেন না…আসলে এই মূহুর্তে সংবাদ দুনিয়ায় যে কৌতুহলী প্রশ্নটা ঘুরে বেড়াচ্ছে সেটা এই…একসময় আপনার নামের সঙ্গে যাঁরা জড়িয়ে গিয়েছিলেন, সেই মিসেস সুনেত্রা দত্ত গুপ্ত, অর্চিতা পাল কিংবা নাচের জগতের সনামধন্যা মিস ছন্দা বাগচি…তাঁদের সঙ্গে আপনার যে অ্যাটাচমেন্টের কথা ওয়ানস আপন এ টাইম শোনা গিয়েছিল আজকের এই ইনভলভমেন্টের বিষয়টাও কি সেরকমই কিছু, না কি….? স্যার…স্যার…তাহলে কি আমরা ধরে নিতে পারি বিনোদন জগৎ এবার একটা বড়সড় রিশেপসান পেতে চলেছে?’
কটমট করে সাংবাদিক মেয়েটির দিকে একবার তাকিয়ে সোজা গাড়িতে উঠে পড়ে স্বস্তিক। একবার মনে হলো, ফিরে গিয়ে সকলের সামনে দাঁড়িয়ে জোড়ের সাথে বলে, আপনাদের কি খেয়ে দেয়ে কাজ নেই? কেন, কি কারণে এমন সব অর্ধসত্য খবর ছাপান? শুনুন, এই স্বস্তিক সেনগুপ্ত কোনোদিন কারোর দিকে হাত বাড়ায় নি। কেউ যদি তার ব্যক্তিগত ক্যারিশমা দেখে, চেহারা দেখে, নামযশ কিংবা অভিনয় দেখে কাছে আসতে চায়, সে কি করতে পারে? যেদিন চাক্ষুস প্রমাণ পাবেন সেদিন ক্যামেরা নিয়ে ছুটে আসবেন খবর কিনতে। স্বস্তিক ভালো করেই জানে, কথাগুলো আজ এই মূহুর্তে ভাবা যত সহজ বলা ততটাই কঠিন। এ জীবনে এই সহজ কথাগুলো হয়তো সত্যিই আর বলা সম্ভব হবে না। বলতে গেলে যে সাধারনের মতো হেঁটে হেঁটে পা ফেলে ভীড়ের মাঝে এগিয়ে যেতে হবে তাকে! পেছন ফিরে তাকায় স্বস্তিক। সন্তোষ দার ছেলেকে আর দেখা যায় না। কোথায় মিশে গেছে…!

খবরটা হঠাৎ করেই শোনা গেল। সন্তোষ ধর আর নেই। মূল ধারা থেকে সরে গিয়েছিলেন অনেক দিন আগেই। ইন্ডাস্ট্রির চোখের বাইরে চলে গেলে সে মানুষকে আর কেউ মনে রাখে না। সন্তোষ দার বেলাতেও তাই হলো। কাজেকর্মে, শ্যুটিংয়ের ব্যস্ততায় স্বস্তিকের দিক থেকেও আর কোনো যোগাযোগ রাখা সম্ভব হয় নি। একসময়কার কত হিট সিনেমার কারিগর…যে মানুষ বলতেন, ‘ নিজেকে বারবার ভাঙতে হবে, ভেঙে নতুন করে গড়তে হবে…তবেই না সে শিল্পী…শিল্পের যাদুকর…’
সেই মানুষই ভাঙতে ভাঙতে জীবনের একটা অধ্যায়ে এসে আর….সন্তোষ দা নিজে শেষ কবে ছবি তৈরি করেছিলেন…সন্ধ্যায় বিমল সিনহার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে মনে করবার চেষ্টা করছিল স্বস্তিক। তা প্রায় কুড়ি বছর হতে চললো। তখন স্বস্তিক সেনগুপ্ত নামটা নায়কের দরজার চৌকাঠ ডিঙিয়ে বেশ কয়েক কদম এগিয়ে গিয়েছে। অন্য একটা ছবির শ্যুটিংয়ে ব্যস্ত থাকায় ঐ ছবিতে অভিনয় করা স্বস্তিকের পক্ষে আর সম্ভব হয়ে ওঠে নি। অগত্যা অহর্নিশ দত্তকে দিয়ে নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করিয়েছিলেন সন্তোষ দা। উল্টোদিকের নায়িকা ছিল অপরূপা। সেদিনও। আজও। সেদিন ও ইন্ডাষ্ট্রিতে নিউ কামার। ঝুলিতে দুটো কি একটা সিনেমা। সবকটাই ফ্লপ। সন্তোষ ধরের রচিত এবং পরিচালিত’ বাক্সবন্দী ‘ অপরূপা বসুকে দিল গ্ল্যামার হিরোয়িন হিসেবে প্রথম প্রতিষ্ঠা। নায়িকার রূপ আর অভিনয়ের ছটায় যেন ম্লান হয়ে গেল অহর্ণিশ দত্তের ব্যক্তিগত ক্যারিশমাও। কাগজে, বিগ্যাপনের ব্যানারে শুধু অপরূপার মুখের ছবি। তারপর থেকে ওকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয় নি।
একজনের কেরিয়ার উর্ধমুখী হয়, একটু একটু করে প্রতিষ্ঠার শীর্ষে অবতরণ করে, আর একজন মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হতে ক্রমশ সময়ের আড়ালে, একাকিত্বের অন্ধকারে দূর থেকে আরো দূরে….।
বছর কয়েক পর বাংলা সিনেমা ‘বাক্সবন্দি ‘ নিয়ে হিন্দি চলচ্চিত্র তৈরি করলেন প্রবাসী বাঙালি পরিচালক সায়ক রায়। প্লেনে করে মুন্বাই উড়িয়ে নিয়ে আসা হলো বাংলা ছবির নবতম নায়িকা অপরূপা বসুকে। অপরূপার বিপরীতে নায়ক অবশ্য মুম্বাই থেকে বেছে নেওয়া হলো প্রথম সারির অভিনেতাদের একজনকে। সে ছবিও সুপার ডুপার হিট করলো বক্সঅফিসে। অপরূপা বসুর জনপ্রিয়তার মুকুটে আরো একটি নতুন পালক সংযোজিত হলো…’বাক্সবন্দী ‘ তাকে দিল আরো এক নতুন পরিচয়…’ মুম্বাইয়া রূপা…’
টিভি, ফিল্ম ম্যাগাজিন থেকে শুরু করে তোয়ালে জড়িয়ে সাবানের বিজ্ঞাপনে মডেলিং…প্রচার দুনিয়ার কোথায় নেই সে!
ততদিনে স্বস্তিক সেনগুপ্তের নিজস্ব কেরিয়ারও থমকে দাঁড়িয়ে নেই। বরং অভিজ্ঞতার নিরিখে নতুন, পুরোনো নায়কদের পেছনে ফেলে জনপ্রিয়তার দৌড়ে বেশ অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছে সে। বাংলা চলচ্চিত্রে তার সমকক্ষ তখন একজনই। মুম্বাই খ্যাত রূপা। প্রোডিউসার, ডিরেক্টরেরা এমন সূবর্ণ জুটিকে বলতে গেলে লুফে নিল। একসাথে জোট বেঁধে কয়েক বছরের মধ্যে একের পর এক ছবি রিলিজ করতে শুরু করলো…প্রতিটি ছবিই সুপার হিট। বছর যায় বছর আসে…স্বার্থক জুটির স্বার্থক রূপায়নের হাত ধরে কাগজ, পত্রিকার পাতায়, বাংলা চলচ্চিত্র মহলের আড়ালে আবডালে তখন নতুন গুঞ্জন ভ্রমরের মতো এ ফুল ও ফুলে বেড়াতে শুরু করেছে… ‘ সিনেমার জুটির বড় পর্দায় একসাথে একটানা সাফল্যের সঙ্গে পথ চলা ক্রমশই কি উভয়ের ব্যক্তিমনকে পরষ্পরের কাছে আনতে শুরু করেছে ? ‘
ক্যামেরার সামনে দুই নায়ক নায়িকার অন্তরঙ্গ ফটোসেশান, রূপোলী পর্দায় ভেসে বেড়ানো বাঙালি জীবনের রঙীন কল্পলোক, আবেগ, রোমান্টিকতার নতুন মুখচ্ছবি…ততদিনে জনপ্রিয়তার আড়ালে লোকমুখে, সিনেচর্চাকে কেন্দ্র করে যে গসিপ ও ছড়াতে শুরু করেছে সন্দেহ নেই।
ছাপানো অক্ষরে এসব খবর যখন প্রকাশিত হতো, তখন সন্তোষ ধরের বলা অনেক বছর আগেকার কথাগুলো বড্ড বেশি মনে পড়তো স্বস্তিকের।
…….’ জনপ্রিয়তার সাথে সাথে গসিপ শব্দটাও একদিন দেখবি কিভাবে তোর পেছনে আঠার মতো সেঁটে গিয়েছে…নায়ক হলে তো কথাই নেই…রাজমুকুটের নতুন পালক…যাই ই হোক, নিজের ঘরটাকে যত্নে রাখিস…আর সেরকম পরিস্থিতি সত্যিই এলে ক্যামেরার সামনে নো কমেন্টস…’
কোথায় গেলেন সন্তোষ দা? কত বছর দেখা হয় না! গিয়ে দেখা করার মতো সে সময়টারও যে আজ বড় অভাব স্বস্তিকের! যেমন একফোঁটা সময় নেই ওসব গসিপ টসিপ নিয়ে আলাদা করে ভেবে নিজেকে ক্ষতবিক্ষত করা। নিজের কেরিয়ারের স্বার্থে সেটা সে চায়ও না। তবু মনটা যে সময় সময় ডিসটার্বড হয়ই। ক্যামেরাওয়ালাদের চাহিদা মেটাতে ফটোসেশন, ছবিতে একটানা সফলতা সিনেমার পর্দায় তাদের যতই কাছে আনুক না কেন,…প্রফেশনাল জীবনের টানাপোড়েনের ছায়াটুকু তার ব্যক্তিগত, বিবাহিত জীবনে এসে পড়ুক কোনোভাবেই সে চায় না।
….’ প্রফেশনাল না হতে পারলে এ লাইনে টিকে থাকা মুশকিল…কোথায় ভেসে চলে যাবি…গসিপ থাকবে…গসিপওয়ালারাও থাকবে…শুধু নিজেকে ভেসে যেতে দিস না..ক্যামেরার প্রশ্নে একটাই জবাব…” নো কমেন্টস.. ”
সন্তোষ দাকে বিশ্বাস করে স্বস্তিক। বিশ্বাস করে ওঁর কথাকে। সেই বিশ্বাসটুকু নিয়েই যে নায়ক স্বস্তিক সেনগুপ্তের পথ চলা। সে শুধু জানে, তাকে প্রতিষ্ঠা পেতে হবে। তার জন্য দরকার অদম্য পরিশ্রম। তাই বাইরের চর্চায় কান না দেওয়াই শ্রেয়। তবে হ্যাঁ, বিতর্ক কিংবা চর্চা জিনিসটা যে তার পপুলারিটির একটি পরিচায়ক বটে, মনে মনে সন্তোষ দার একথা কেও বিশ্বাস করতে শিখেছে স্বস্তিক।
একদিন শ্যুটিংয়ের অবসরে মেকআপ রুম থেকে বেরিয়ে করিডোরে হাওয়া খাচ্ছিল স্বস্তিক। ওপাশের ঘর থেকে অপরূপা বেরিয়ে আসে।
‘ দারুণ লাগছে কিন্তু তোমাকে পোষাকটাতে! একেবারে সাক্ষাৎ জমিদার…’
‘ আর তোমায় সাক্ষাৎ জমিদার গিন্নি…’
‘ কাল মিত্রর বাড়িতে পার্টি আছে। যাবে তো? আমি না হয় তোমাকে গাড়িতে পিকআপ করে নেবো… ‘
স্বস্তিক -অপরূপা যে সিনেমার শ্যুটিংয়ে অভিনয় করছে তার অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর আশিস মিত্র।
আগে একসময় পরিচালক থেকে শুরু করে সহকারী পরিচালকদের দোড়ে দোড়ে ঘুরতে হতো স্বস্তিককে, কাজ পাবার জন্য। এখন পরিচালকরা স্বস্তিকের কাছে আসে, আর তাদের পেছন পেছন ফেউয়ের মতো আসে সহকারী লোকজন। সময় আর আগের মতো নেই। স্বস্তিক এখন বেছে বেছে কাজ নেয়। চিত্রনাট্যের মাণ বুঝে তবেই সই করে। অপরূপা নিজেও এসব প্রফেশনাল ব্যাপারে স্বস্তিকের কাছ থেকে প্রায়সময় ভালো মন্দ টিপস নেয়। তাই হয়তো সেদিন এক সাক্ষাৎকারে বলেছিল ‘ আমরা শুধু সিনেমাতেই রোমান্টিক জুটি নই, স্বস্তিকের কাছে আমি ঋণী…এর বেশি আর কিছু বললাম না….’
এ নিয়ে ইন্ডাস্ট্রিতে গুঞ্জনের স্রোত দখিনা হাওয়ার পরশ যে বোলায় নি তাও নয়। বিষয়টাকে ঘিরে দুজনেই পরে মুখে কুলুপ আঁটলেও স্রোতের গতিকে তো রোধ করা যায় না। সে তার নিজের মতোই এগিয়ে যায়। একসময় মিলিয়েও যায়। মিলিয়ে যাবার আগে স্বস্তিকের শুধু এটাই মনে হয়েছিল, মেয়েটা এতদিন ধরে নায়িকার পাঠ করছে…নেই নেই করে কতগুলো সিনেমা করে ফেললো…তবু প্রফেশনাল আর হয়ে উঠতে পারলো না…একেক সময় এমন ভাবে বেকায়দায় ফেলে দেয় স্বস্তিককে যে আর বলার নয়…’
‘ আমার যাওয়া হবে না। ইনফ্যাক্ট কাজ আছে।’
‘ যাবে না তাহলে? মিত্র হয়তো এক্সপেক্ট করে থাকবে’
‘ মিত্রকে বলা আছে’
‘ ও। খুব জরুরি কিছু?’
‘ সেরকমই ভাবতে পারো।’
কথাটা ওখানেই থামিয়ে দিয়েছিল স্বস্তিক। সে এখন জানে, কখন কোন জায়গায় এসে থামতে হয়। কোথা থেকে শুরু টানতে হয়। সবমিলিয়ে বাস্তব জীবনের ঠিক কতটুকু চিত্রনাট্যে রূপ দিতে হয়। সন্তোষ দা যাকে বলতো, ‘ব্যালেন্স।
আগামী কাল সেই সন্তোষ ধরের বাড়িতেই যাবে বলে ঠিক করেছে স্বস্তিক, ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা করতে। কতদিন যোগাযোগ নেই! না থেকেও স্বস্তিক সেনগুপ্তের ব্যক্তিগত পরিসরে আজও যেন সমান প্রাসঙ্গিক সে মানুষ, তাঁর সে উপস্থিতির ছায়া।
যাওয়া আর অবশ্য হয়ে ওঠে নি। বাড়ি ফিরে টিভি চ্যানেলে সেদিনই চোখে পড়লো খবরটা….
‘আগামীকাল সন্ধ্যাবেলায় দূরদর্শনে একান্ত সাক্ষাৎকারে আসবেন প্রবীণ চিত্র পরিচালক সন্তোষ ধর… ‘

বয়স আর সময়ের সাথে সাথে চেহারায় ক্ষয় ধরেছে। কপালের স্পষ্ট বলিরেখা। চুল উঠে মাথার সিংহভাগ জুড়ে টাকের আধিক্য। প্রায় অচেনা, শীর্ণকায় মানুষটির উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় টিভি সাংবাদিক…’
‘ আপনার নিজের হাতে গড়া ‘ বাক্সবন্দি ‘ ছবির জনপ্রিয়তা একদিন বাংলা চলচ্চিত্র জগৎ ছাড়িয়ে সুদূর মুম্বাই পাড়ি দিয়েছিল…তারপর বহুবছর হয়ে গেল চলচ্চিত্র পরিচালনার মূল স্রোত থেকে একেবারেই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেন…এককালের দাপুটে পরিচালক সন্তোষ ধর, যিনি কিনা কত অসংখ্য সাড়া জাগানো ছবি উপহার দিয়েছেন, কেরিয়ারের একটা সময়ে এসে হঠাৎ কেন এরকম হলো? কী বলবেন এমনতরো অন্তরীণ হয়ে পড়ার ঘটনাকে ?’

কুড়ি বছর পর বিমল সিনহার দশতলার ব্যালকনির হাওয়ায় নিভৃতে দাঁড়িয়ে হুইস্কির স্বাদ নিতে নিতে সাংবাদিকের সেদিনের প্রশ্নের ছোট্ট উত্তরটুকু যেন ঝাপসা কুয়াশার আড়ালে মিশে যাওয়া কোনো এক অস্পষ্ট সময়ের অবয়ব হয়ে ভেসে উঠলো স্বস্তিকের চোখের সামনে… ‘একান্ত ব্যক্তিগত পরিসরটুকুকে আমি অন্য কারো সামনে হাজির করতে চাই না…তবে হ্যাঁ, একটা সময় এসে মানুষকে কোথায় থামতে হবে, সেই গন্তব্যটা না বুঝলে তার সৃষ্টিরও আর কোনো মূল্য থাকে না… ‘
সন্তোষ ধর আজ আর নেই। তাঁর কথা থেকে গেছে। থেকে গেছে ছবিগুলো। আজ কুড়ি বছর পর সেই ‘বাক্সবন্দি ‘ সিনেমাই গতকাল নতুন করে মুক্তি পেল। মুক্তি পেল হাল আমলের প্রযোজক বিমল সিনহা , পরিচালক প্রীতিময় বাগচীর হাত ধরে। নায়িকা থাকলেও মূলত নায়ক প্রধান সিনেমা। যে নায়ক, আসলে সে নিজেই আগাগোড়া ছবির খলনায়ক। স্বস্তিকের কেরিয়ারে এ ধরনের নেগেটিভ চরিত্রে অভিনয় করা এই প্রথম। একপেশে নায়ক হবার চাইতে কাজটা প্রথম থেকেই হাজার গুণ চ্যালেঞ্জিং মনে হয়েছিল তার। সন্তোষ দার নিজের হাতে লেখা চিত্রনাট্য। টানটান কাহিনি। কাজটা হাতে নিতে মূহূর্ত মাত্র দ্বিধা করে নি স্বস্তিক। কুড়ি বছর আগে অহর্নিশ দত্ত যে ছবিতে খলনায়কের ভূমিকায় অভিনয় করে বক্স অফিস মাত করে দিয়েছিল, আজ সে জনপ্রিয়তার দিক থেকে যতই পেছনের সারিতে পড়ে যাক না কেন, এত বছর পর সত্যি সত্যিই যেন সময় এসেছে আজও লোকমুখে ঘুরে বেড়ানো খলনায়ক অহর্নিশ দত্তের সেই পর্দার উপস্থিতিকে কুয়াশার মতোই ঝাপসা করে দেওয়ার। শুটিং পর্ব শেষ হওয়ার পর স্বস্তিকের মনে হয়েছিল, এই রকম একটা চরিত্রে অভিনয় করবে বলেই বুঝি এতকাল ধরে সে পাঠ খুঁজে বেড়াচ্ছিল। অপরূপা নিজেও নায়িকা হিসেবে ছোট্ট চৌহদ্দির ভেতরে ওর পক্ষে যতটুকু করা সম্ভব, নিজেকে মেলে ধরেছে। তবু দর্শক বোধহয় সেই আগেকার অপরূপাকেই দেখতে চেয়েছিল বা আশা করেছিল। কুড়ি বছরের ব্যবধানে বয়সের পার্থক্য চেহারায় বোধহয় অজান্তেই চলে আসে যাকে মেকআপ দিয়েও খুব একটা ঢাকা যায় না। অনেকে বলে আজকের অপরূপা অনেক বেশি গ্ল্যামারাস। হয়তো ভুল বলে। কিংবা ঠিকই বলে। সেদিনের সে চেহারা ছিল সাক্ষাৎ দেবীপ্রতিমা। নিটোল নিখুঁত কমনীয়। কিন্তু বয়সের সাথে সাথে যে ঢেউ খেলানো হিল্লোল তার শরীরের ভাঁজে ভাঁজে বেড়ে উঠেছে তা হয়তো রাতের নীরবতার মতো অনেক বেশিমাত্রায় লোভনীয়,যৌনগন্ধী,উত্তেজক। স্বস্তিকের নিজের ক্ষেত্রেও আজকের অপরূপা কোথায় যেনতাকে বেশি আকর্ষণ করে। আগে ওর এরকম মদালসা চাউনি ছিল না। এখন বেশ রপ্ত করে নিয়েছে। একসঙ্গে বহুবছর কাজ করার সুবাদে ছবির পর্দার মতোই জীবনের পর্দাতেও ওর চোখের ভাষা পড়তে এখন আর দেরী হয় না স্বস্তিকের। এইমূহুর্তে অপরূপার সাথে সাথে ছায়া হয়ে রয়েছে আরো এক নায়িকা। পাখি চক্রবর্তী। বয়সে অপরূপার জুনিয়র। বেশিদিন হলো ইন্ডাষ্ট্রিতে পা রাখে নি। খুব বেশি গ্ল্যামারাস না হলেও চেহারায় আলগা চটক রয়েছে, যেটা অভিনয়ে এক আলাদা উচ্ছ্বলতা বয়ে আনে। এই মূহুর্তে পাখির হাতে বেশ কিছু সিনেমা। মাস ছয়েক আগে নায়ক স্বস্তিক সেনগুপ্তের যে ছবিটা রিলিজ করেছে, তার নায়িকাও ছিল পাখি।
বাক্সবন্দি ছবিতে পরিচালক প্রীতিময় বাগচী অবশ্য প্রথম থেকেই অপরূপা ছাড়া দ্বিতীয় আর কারো কথা ভাবে নি। স্বস্তিক নিজেও চেয়েছিল, এ ছবিতে তার পাশে অপরূপাই আসুক। যে চিত্রনাট্যে নায়িকা হিসেবে আলাদা ভাবে খুব বেশি কিছু করে দেখানোর নেই, সেখানে বানিজ্যিক ছবির দর্শক প্রধানত একটা জিনিসের দিকেই ভীড় করে তাকিয়ে থাকে। তা হলো গ্ল্যামার।
……’ কেউ যদি নিজে থেকে আসতে চায়,তার জন্য আমার দরজা সবসময়েই….’
কুড়ি বছর পরে, জীবন নিয়ে নতুন করে বিতর্কের মুখোমুখি দাঁড়ানোর মতোই ছবির স্বার্থে সেই কাঙ্খিত নায়িকাকে কাছে পাওয়া… এও যেন এক নতুন চ্যালেঞ্জ হার্ডকোর প্রফেশনাল অ্যাক্টর স্বস্তিক সেনগুপ্তের কাছে।
গত পরশু রিলিজ করেছে বাক্সবন্দি। আর কালই শোনা গেল সন্তোষ দার মৃত্যু সংবাদ। গিয়ে দেখলো স্বস্তিক, ক্ষয় হয়ে যাওয়া শীর্ণকায় চিরনিদ্রায় শায়িত মানুষটিকে। কথায় বলে, মন আর শরীর একই সুতোয় বাঁধা। শারীরিক জীর্ণত্বের আগেই কি একপ্রকার মানসিক ক্ষয় তবে শুরু হয়েছিল? সেই যেবার দূরদর্শনে এসেছিলেন সাক্ষাৎকার দিতে, তারও কত আগে থেকে ছিন্ন করেছিলেন ছবির জগতের সঙ্গে সম্পর্ক! এ প্রশ্নের উত্তর আর কি পাওয়া যাবে কোনোদিন? স্বস্তিকের মনে হয়েছিল, আজ সে যে টানে ছুটে এসেছে, সেই টান, সেই তাড়না এতদিন সত্যিই কি নিজের ভেতর অনুভব করেছিল সে? যদি করতো তাহলে হয়তো একটিবার অন্তত…।
যখন সে ফিরে আসছে, সন্তোষ দার ছেলে হাতে করে খানকতক লেখা পৃষ্ঠা স্বস্তিকের সামনে মেলে ধরে বললো, ‘ একদিন দুপুরবেলায় দেখি, বাবা পুরোনো সিন্দুকের ওপর কতগুলো দিস্তে কাগজ নিয়ে একমনে কি যেন লিখে চলেছেন…কিছুসময় লেখার পর কলম থামিয়ে আমার দিকে তাকালেন, ” হাত কাঁপছে…আমি বরং মুখে বলি, তুই লেখ…মাথায় যখন এসে পড়েছে, যেভাবেই হোক শেষ করতেই হবে…”
আমি জানতে চাইলে বললেন, ” বুঝলি না তো? ভাবলি বাপ বুঝি অকর্মণ্য হয়ে গিয়েছে…বাতিলের দলে…মাথায় আবার কি ভূত চাপলো যে হঠাৎ করে লেখাজোকা…! তাহলে বলি শোন…বাক্সবন্দি ছবিটা হঠাৎ করে একদিন দেখি মাথার ঐ ভূতটাকে বাক্সের ভেতর থেকে ঠেলা মেরে নাড়িয়ে দিল…কুড়ি বছর আগে নিজে ছবি বানিয়েছি, কুড়ি বছর পর সেই ছবিতেই স্বস্তিক বাবুর অভিনয় দেখবো বলে মুখিয়ে আছি…সেদিনের সে ছোকরাও তো এই শর্মারই হাতে গড়া…একটা চিত্রনাট্য লিখছি…সিনেমা তৈরি করবো…আমাদের স্বস্তিক এখন অনেক বড় নায়ক…ওকে দিয়ে অভিনয় করাবো…ব্যাটাচ্ছেলে এবার বুঝবে, এ বুড়ো এখনো কত কি করে উঠতে পারে আর পারে না…”
আনফরচুনেটলি বাবা আর চিত্রনাট্য শেষ করে যেতে পারলেন না। পারলে হয়তো কিছুটা শান্তি পেতেন… ‘
বলেছিল সন্তোষ দার ছেলে।
ম্যানাস্ক্রিপ্টগুলো চেয়ে নিয়ে এসেছে স্বস্তিক। শেষ টুকু লিখবে বলে। কলেজ, ইউনিভার্সিটি জীবনে এমনকি তারও পরে বেশ কিছু কাল অপেশাদারি রঙ্গমঞ্চে অভিনয়ের পাশাপাশি স্ক্রিপ্ট রাইটারের কাজ করতো সে। এ কাজে অন্যরকম এক আনন্দও লুকিয়ে থাকতো। যে আনন্দ অভিনয় করার চাইতে কোনো অংশে কম ছিল না। আর এই সুবাদেই তাদের নৈহাটির এককালের শখের নাট্যদলে, আঞ্চলিক স্তরের নাট্যচর্চায়, চেনা মহলে অভিনয় বৃত্তের বাইরে স্বস্তিকের আরএক পরিচয় গড়ে উঠেছিল চিত্রনাট্য লেখক হিসেবে। অভিনয়ের সূত্র ধরে পরবর্তী কালে স্টুডিও পাড়ায় যাতায়াত, সেখান থেকে সন্তোষ ধরের হাত ধরে বড় পর্দার জগতে পা রাখা…একটা সময়ে এসে ছবির বৃত্তে প্রবেশ করে কেরিয়ারের উন্নতি ঘটানোর তাগিদে চিত্রনাট্য লেখা বা তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করার অভ্যেসটা একপ্রকার মুছেই গেল স্বস্তিকের জীবন থেকে।
সেদিন কি মনে করে সন্তোষ দার ছেলের কাছ থেকে অর্ধসমাপ্ত পান্ডুলিপি গুলো চেয়ে নিয়ে এসেছিল স্বস্তিক। বাসনা একটাই… বাকিটুকু নিজে লেখার। সন্তোষ দার প্রতি যদি শ্রদ্ধা জানাতেই হয়, এর থেকে বড় আত্মতৃপ্তি আর বোধহয় কিছু হতে পারে না…নাটকের চিত্রনাট্য লিখে যখন সফলতা এসেছিল , সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে চেষ্টা করলে কি পারা যায় না পান্ডুলিপির অসমাপ্ত গল্পের সুরটুকু শেষ তারে বেঁধে দিতে? গতকাল অনেক রাত অবধি গল্পটা পড়ছিল স্বস্তিক। পড়তে পড়তে এটাই মনে হচ্ছিল বারবার, সন্তোষ ধর বেঁচে থাকলে এ কাহিনিকে কোথায় কত দূর টেনে নিয়ে যেতেন সেটা জানা না থাকলেও, তাঁর সেই আরাধ্য কাজ সম্পন্য করাটা এই মূহুর্তে অভিনেতা স্বস্তিক সেনগুপ্তের সামনে বাক্সবন্দি সিনেমার ফেলে আসা নেগেটিভ ক্যারেকটারকে দূরে সরিয়ে যেন জীবনের সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জের জায়গাটা দখল করে নিয়েছে। ব্যালকনির নিভৃতে আধো অন্ধকারে রেলিংয়ের কোণ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে মনে মনে চিত্রনাট্যের বাকিটা নিয়েই চিন্তা করছিল স্বস্তিক। হাতে আপাতত আর কোনো ছবি নেই। এটাই তো উপযুক্ত সময় লেখাটা নিয়ে বসার।
‘ একটু আসবো?’
অপরূপা। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। ফরসা চকচকে মুখের একপাশ ছায়ায় ঢাকা। হাতে ওয়াইন গ্লাস। সম্ভবত শেরি। অপরূপার পছন্দের তালিকার অন্যতম।
‘ এসো।’
নিজস্ব চিন্তা থেকে সরে আসে স্বস্তিক। স্থির ভাবে তাকিয়ে থাকে অপরূপার দিকে। তাকিয়ে আছে অপরূপা। মাঝখানে আবছায়া।
‘ কিছু বলবে?’
‘ একটা বিষয় বেশ কিছু দিন ধরে বারবার মনে হচ্ছে…পার্টিতে এসেছি, কথা বলছি, গল্প করছি…কিন্তু বড্ড খচখচ করছে মনটা…এক্ষেত্রে তোমার মতামতটুকু আমার কাছে সবচেয়ে জরুরি, না এসে পারলাম না। ‘
‘ বলো শুনছি।’
মুহূর্ত কয়েক সময় নেয় অপরূপা। তারপর খুব আস্তে স্বরে বলে, ‘ আমার অভিনয়টা বুঝলে, ভালো হয় নি। শুধু মনে হচ্ছে, নিজেকে যতটা আপগ্রেড করা উচিত ছিল, সেই পারফেকশন পর্যন্ত আমি রিচ করতে পারি নি। আফটার টোয়েন্টি ইয়ার্স যখন একটা ছবি নতুন করে করতে চলেছি…প্রথম থেকে একটু একটু করে শেষের পর্যায়…শ্যুটিং যত প্যাকআপ হয়ে আসছিল আরো বেশি বুঝতে পারছিলাম কুড়ি বছর পর আর আজকের মধ্যে সত্যিই যেন একটা ফাঁক থেকে গেল …সময় ফেরে না জানি…কিন্তু অভিনয়, পারফেকশন এগুলো? আমি খুব চেষ্টা করছি খুঁতগুলো ধরার, ধরতে যে আমাকে হবেই স্বস্তিক…!’
‘ কেউ কিছু বলেছে তোমায়?’
‘ এটা একেবারেই আমার মনের কথা স্বস্তিক। ভেতরকার রিপারকেশন। যে মানুষ এখন কিছু বলছে না, কে বলতে পারে সে বা অন্য কেউ হয়তো কাল বা পরশু কিংবা কোনো এক দিন…’
‘বাইরে সবাই রয়েছে। তুমি এখন যাও অপরূপা। আমি চাই না এ মুহূর্তটাকে নিয়ে লোকে অন্য কোনো মানে করুক। এ বিষয়ে পরে কথা বলা যাবে…’
চলে যাচ্ছে অপরূপা। মাথাটা নীচু। কিরকম যেন অন্যমনস্ক। ধীর পায়ে এগিয়ে যায় কাঁচের দরজার দিকে। নিলাভ আলোয় ওর দিকে তাকিয়ে হঠাৎই স্বস্তিকের মনে হলো, এতদিনকার সেই গায়ে পড়া মেয়েটির বদলে এই অপরূপা যেন একেবারেই নতুন তার কাছে! সত্যিই কি নতুন? মনে মনে এই মুহুর্তের এই মেয়েটিকেই যে এতবছর ধরে কামনা করে এসেছে সে…ক্যামেরার সামনে শুধু বলতে পারে নি…গসিপ ওয়ালাদের সামনে প্রতিবাদও করতে পারে নি…ডিভোর্সি, দুই সন্তানের মা অপরূপা যেটা পেরেছে…তফাৎ একটাই, অপরূপা ভুল মানুষটিকে পছন্দ করেছিল…স্বস্তিকের মনের গভীরে যে অপরূপা স্বযত্মে জায়গা করে রয়েছে তাকে চিনতে পারে নি… আজও কি চিনতে পেরেছে? উত্তরগুলো হয়তো বাক্সবন্দিই থেকে যাবে নায়ক, নায়িকার চর্চিত জীবনের আড়ালে।
হুইস্কির গ্লাসে শেষ চুমুকটুকু দিয়ে নীরবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্বস্তিক। বাইরে ফিল্ম ইণ্ডাষ্ট্রির কলরব, হাসির শব্দ, বিদেশি মিউজিকের হালকা সুর ভেসে আসছে। কুড়ি বছর আগেকার অপরূপা নতুন করে দর্শক মনে ফিরে আসতে পারবে কিনা তার উত্তর হয়তো সময় বলবে। দক্ষতার মাপকাঠিতে অহর্নিশ দত্তকে কতটুকু ম্লান করতে পেরেছে স্বস্তিক, তাও বোধহয় সময়ের গর্ভেই নিহিত। শুধু আক্ষেপ একটাই রয়ে গেল…হাল আমলের ডিরেক্টর প্রীতিময় বাগচী অনেক যত্ন করে যে ছবিটা তৈরি করলেন, যে ছবি অপরূপা কে এই প্রথম অন্য এক প্রফেশনালিজম, আত্মঅন্বেষণের পথ ধরে জীবনের আর এক প্রান্তসীমায় এনে দাঁড় করিয়ে দিল,যে ছবিকে ঘিরে দর্শকের সামনে স্বস্তিক সেনগুপ্তের প্রথম নেগেটিভ চরিত্রে অভিনয় করতে আসা…সেই ছবি সন্তোষ দার আর দেখা হলো না। চলে যাওয়া আর নতুন করে ফিরে আসা…এর মাঝে যে অসমাপ্ত চিত্রনাট্য রয়ে গেল তার নায়িকা আর কেউ নয়, স্বস্তিক সেনগুপ্তের মনের ভেতরকার অপরূপা…যার হদিশ বোধহয় একজনই পেয়েছিলেন…সন্তোষ ধর…যদি না পেতেন তাহলে জীবনের শেষ চিত্রনাট্যে কেন্দ্রিয় চরিত্র হিসেবে যে মেয়েটিকে তিনি নিজের মনের মতো করে সাজিয়ে তুলতে শুরু করেছিলেন, সেই শুরুটা নায়িকা অপরূপার চরিত্রের সাথে এভাবে একাত্ম হয়ে যায় কি করে?
নিভৃত পরিসরে মনে মনে পান্ডুলিপির কাগজপত্রের মাঝে ডুব দেয় স্বস্তিক…. চিত্রনির্মাতা সন্তোষ ধরের মাঝরাস্তায় ফেলে আসা ব্যক্তি অপরূপাকে নিজের করে নেবে বলে। কিন্তু তার জন্য যে এখনো অনেকটা পথ যেতে হবে! স্টার্ডি করতে হবে আরো কত! কতরকম ভাবে পড়তে হবে অপরূপাকে…সে জন্য ওর কাছে হয়তো ফিরে আসতে হবে বারবার..একদিন যে অপরূপা আসতে চেয়েছিল স্বস্তিকের জীবনে, আজ সময় হয়েছে তাকে যত্ন সহকারে ফিরিয়ে আনার। তবেই না সঠিক চিত্রায়ন সম্ভব।

উৎসাহী মানুষের প্রত্যাশায় জল ঢেলে সিনেমাটা ফ্লপ করলো শেষমেশ। পত্র পত্রিকা , ফিল্ম ইণ্ডাষ্ট্রির লোকজন, গড়পরতা সিনেমামুখো মানুষ অনেকেই মতামত পোষণ করলো, ‘ ছবির সময় নির্বাচনটা ঠিক হয় নি…মাস কয়েক আগে করা পাখি- স্বস্তিক জুটির ‘মস্করা’ ছবির রেশ এখনো লোকের মনে হাইজফুল…তার পাশে এই ছবি চলতে পারে কখনো? এই ধরনের আর্ট ফিল্ম কটা পাবলিকই বা টানতে পারে…’
‘কবেকার কাহিনি…বিশ বছর আগেও দেখেছি…তা সে যতই ভালো লাগুক…আজ যখন আইনক্সের আরামে বসে দেখছি, কি মনে হচ্ছিল জানেন? মনে হচ্ছিল , গল্পটার ভেতর সব আছে, নেই শুধু প্রাসঙ্গিকতা। সেদিনের ঐ ছারপোকা ধরা সিটই ভালো ছিল।’
কেউ বা মত পোষণ করলো, ‘ কুড়ি বছর আগে আর কুড়ি বছর পরে…দুটো সময়ের মাঝে ফারাক যে কতটা সেটা অপরূপা বসুকে দেখলেই বোঝা যায়। কিছু কিছু চরিত্র আছে যেখানে খুব বেশি গ্ল্যামার চলে না…পরিচালক ঠিক সেটাই করলেন…অদূরদর্শীতা… ‘
কারো কারো মতে, ‘ আইনক্সে ম্যাটিনি শোয়ে “মস্করার” টিকিট কাউন্টারে ভীড় দেখলে অবাক হতে হয়, এদিকে দ্যাখো নুন শোতে “বাক্সবন্দি” র কাউন্টার প্রায় গড়ের মাঠ…অথচ স্বস্তিক সেনগুপ্তের এটাই মনে হয় সেরা অভিনয়… কি দারুণ নেগেটিভ রোল!’
‘ যা বলেছেন…অহর্নিশ দত্ত একেবারে ফেড হয়ে গেল! অপরূপা বসু নেহাৎই বিশ বছর আগেকার টুকরো ছায়া ছাড়া আর কিছুই নয়… ‘
‘ ঐ ছায়াটুকুও গেল বলে…বয়স আর কদিন…আরে আমি ও বয়সের কথা বলছি না…নায়িকাদের বয়স…যে কদিন শ্বাস, সেকদিন আশ…কেচ্ছা, স্ক্যান্ডাল, গসিপ সবকিছু…এ ওকে বিয়ে করছে, ও তাকে ছেড়ে ওকে বিয়ে করছে, এ ওর ঘর ভাঙবে বলে ক্যামেরার সামনে মনের দরজা খোলা রাখার মতো বাইট দিচ্ছে…এসব আর কতদিন? মেকআপ খুলে ফেললে এই বিশ বছরে আসল চেহারা বেরিয়ে পড়বে…ভালো কথা, অপরূপা বসুর ডিভোর্স হয়ে গেছে শুনলাম? ঐ স্বস্তিক সেনগুপ্তের সঙ্গেই তো যত প্রেম মাখামাখি…ম্যাগাজিনগুলোয় যা সব লেখাপত্তর বেরোয়! আমি ওসব গিলি না মশাই, সময় কৈ? বৌ পড়ে, ওর মুখে শুনি, তাই বললাম।’
‘ ডিভোর্স তো কবেই হয়েছে। ওদের আবার ডিভোর্স! সম্পর্কে জড়ানোটা একটা অভ্যাস। ওসব কেচ্ছা কাহিনী নায়ক নায়িকাদের সাথে সাথে চলে…ওতে ওরা গা সওয়া…স্বস্তিকের নিজের বেলাতেই দেখুন না, এ আসার আগে নতুন পুরোনো কটা নায়িকার সাথে রিলেশনে জড়িয়েছে…ওদের নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই… তবে অপেক্ষা করুন…পাখি চক্রবর্তী খুব তাড়াতাড়ি জায়গা দখল করে নেবে…”মস্করা” দেখার পর বলতে বাধ্য হচ্ছি…তবে হ্যাঁ, সিনেমা বাজার করতে পারলো না সেটা আলাদা কথা…আজকের “বাক্সবন্দি ” কিন্তু বিশ বছর আগের অতীতটাকেও সাথে নিয়ে চলে গেল…পাবলিক সেন্টিমেন্ট জানবে ওটা স্বস্তিক সেনগুপ্তের ” বাক্সবন্দী ” আর কারো নয়…আমার তো তাই মনে হয়…সন্তোষ ধর লোকটা ভালো সময় চলে গেল… ‘
‘ তা যা বলেছেন।’

নায়িকা হবার আগে সিনেমায় নামার ব্যাপারে তেমন কোনো স্বপ্ন ছিল না অপরূপার। ছবির জগতে আসার পর স্বস্তিককে ঘিরে সে স্বপ্ন দেখা অভ্যেস করে। তাই বোধহয় এত সুন্দর করে ওকে আঁকতে পারে স্বস্তিক। যদিও সে আঁকা শেষ পর্যন্ত আর চলচ্চিত্রে রূপায়িত হয় নি। যত দিন যায়, নতুন মুখের দুনিয়ায় অপরূপা বসু নামটা ততই ঝাপসা হতে থাকে পরিচালকদের চোখে। একটা সময় আসে যখন আর কিছুই দেবার থাকে না। তবু অপেক্ষা করে স্বস্তিক। বাক্সবন্দি হয়ে থাকা চিত্রনাট্যে সেদিনের রূপা ছাড়া আর যে কেউ কোনোদিন স্থান করে নিতে পারবে না। এ বন্দীদশা শুধুই তার নিজের।।

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!