সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী (পর্ব – ১)

ক্ষণিক বসন্ত

এক
আহির

পরজন্ম বলে কিছু হয়? কে জানে কিছু হয় কিনা। আহির আশিক সেইসব কখনও ভেবে দেখেনি। ভেবে দেখবার জন্য যে পর্যাপ্ত সময়টির প্রয়োজন,আহিরের আপাতত সেটা নেই। কী করে থাকবে! একসময় যখন সে বাংলা কামড়ে পড়েছিল, তখন সকলে তাকে ঘরানা জিজ্ঞেস করত। কোন ঘরানার কথা বলবে সে। ঠাকুমা রবীন চট্টোপাধ্যায় তালাত মাহমুদ হুবহু হারমোনিয়ম বাজিয়ে গেয়ে দিতেন। অতোটুকুই তো। আহির তখন খুব ছোট। বাবা গল্প করত। সে গল্পের মাত্র তিনটে শব্দ গেঁথে গেছে তার স্মৃতিতে। ঠাকুমা দাদু খুলনার লোক। পরে বাংলাদেশে প্রোগ্রাম করতে গিয়ে জানতে পেরেছে সে। বড় প্রাণের দেশ। তবু তার শৈশবের সেই তিনটে শব্দ ঘুরপাক খেতে থাকে তার মাথার ভিতর। ‘এদেশ তোমাগো না’। এদেশ তোমাগো না। শব্দগুলো ঘুরপাক খেতে খেতে চিৎপাত হয়ে শুয়ে পড়ে আহিরের মনের ভিতর।
আহির ভৌমিক।”খুব রিজিওনাল ফ্লেভার। পাবলিক নেবে না।”কথাটা বলেছিল শক্তিদা। একসময় একচেটিয়া ‘রফি-আশা-কিশোর নাইট’ অ্যারেঞ্জ করতো সে। বাংলায় সে বিজয়াসম্মিলনী হোক বা বর্ষবরণ, হিন্দিনাইট মানেই শক্তিদা। শক্তিদার একটা গুণ ছিল আর একটা দোষ। প্রথমে গুণের কথায় আসা যাক।এমন একটি মহৎ সৎবৃত্তি যার জন্য তাকে তরুণ গায়ক গায়িকারা ভগবান মনে করত তাঁকে। প্রতিভা থাকলে শক্তি সামন্ত প্রচারে জান লড়িয়ে দিত। ফলত যা হয় আর কি। শক্তি সামন্ত হয়ে উঠল তরুণদের আপরাইজিংদের কাছে মুম্বাই যাবার সিঁড়ি। এমন অনেক তারকাই আজ মিউজিক ইণ্ডাস্ট্রি দাপাচ্ছে দেশজুড়ে যাদের হাতেখড়ি হয়েছিল শক্তিদার হাত ধরে। পড়ে যখন একটিমাত্র দোষে সেই মুম্বাই আর বেঙ্গল মিউজিকের সেতু শক্তি সামন্ত হাবুডুবু খাচ্ছেন,ঠিক সেই সময় সেই তারক তারকারা হঠাৎ কোথায় যে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে পড়েছিল কে জানে। শক্তি সামন্ত উদার, পরোপকারি, দিলখোলা এতো সব সুকুমারবৃত্তির ভিতরেই লুকিয়ে ছিল এক মোক্ষম দোষ। দোষ না বলে নেশা বলাই তো ভালো। এমন দোষ কতো রাজপুরুষকে পথে নামিয়েছে। কতো সাধককে গৃহী বিচু্্যতি এনে দিয়েছে। শক্তির ছিল সেই দোষ। মেয়েমানুষের দোষ। উঠতি অনেক তরুণী সিঁড়ির মতোই ব্যবহার করেছিল তাকে। সাপলুডোর মতোই বিছানায় শক্তিদা সাপ হতেন, আর তাদের কেরিয়ারে জুটে যেত মই। বেশ চলছিল। গোলমাল বেঁধে গেল রাজস্থানের এক প্রোগ্রামে। সেখানে একটি বাঙালি তরুণী গায়িকা হঠাৎ পালটি খেল। তারপর যা হবার। এফ আই আর, মামলা, মিডিয়া, ইউটিউব। শক্তিদা সাপের লেজ ধরে চলে এল ফের বোর্ডের স্টার্টিং পয়েন্টে। আহির অবশ্য যখন শক্তিদার সান্নিধ্যে এল, তার অনেকটাই বয়স হয়ে গেছে। বিয়ে থা না করায় এমনিতেই ঝাড়া হাত পা। ওই ঘটনার পর মদে চুড় হয়ে থাকত সবসময়। তখন আহিরের টুকটাক নামডাক হচ্ছে। নজরুল গীতি আর বাংলা রাগপ্রধানে বেশ মুনশিয়ানা ফুটে উঠছে গলায়। ফস করে একটা লোকাল কাগজ খবর করে দিল। “আহিরের আহির ভৈরোঁ অনবদ্য।” তেমনই এক কনসার্টের পর শক্তিদার সঙ্গে আলাপ হয়েছিল তার। এমনিতে তখন বাঙালী শিল্পী বিশেষত ধ্রুপদী গায়ক গায়িকাদের বড়সড় অনুষ্ঠানে ‘ফিলার’এর কাজে ব্যবহার করা হতো। ফিলার মানে পূরক। জনপ্রিয় হিন্দি আর্টিস্ট ব্যাকস্টেজে সাজগোজ করছেন। মিনিট দশেক সময় লাগবে। এদিকে তার হ্যাণ্ডস রেডি। ব্যাস। ফস করে তুলে ধরো দুটো নজরুল অতুলপ্রসাদ। বা মান্না শ্যামল। আড়চোখে লাইটম্যান চোখ মারবে। আর্টিস্ট রেডি। অমনি আহিরদের তেহাইটা ছেঁটে মিষ্টি হেসে নেমে যেতে হবে। এটাই নিয়ম। আহির তখন একুশ। রক্ত গরম। একুশের সঙ্গে বাঙালির দীর্ঘ যোগ। এসব তার সহ্য হতো না। কনসার্টে মাথা গরম করে ফেলল সে। “বোগাস। বাংলা গান গেয়ে দেখাক শালা। ওই কাজ করে দেখাতে পারলে বুঝবো”। কথাটা শুনে পিঠ চাপড়ে সান্ত্বনা দিয়েছিল শক্তিদা। পুরনো গ্ল্যামার ফিকে হয়ে গেলেও ভিতর ভিতর শক্তিদা তখনও একটা মেন্টর। জহুরি হীরে চিনে নিতে ভুল করে না। শক্তিদাও করেনি। পরে শক্তিদাই বোঝালো আহিরকে। দোষটা আয়োজকদের নয়। যাদের জন্য এই অনুষ্ঠান, সেই পাবলিক যদি বাংলা গান না শুনে ভাঙরা বা ইন্দিপপ চায়, তাহলে অরগানাইজাররা কী করবে। “তোর গলায় দম আছে আহির। শুধু ওই নামটা আর মটকাটা চেঞ্জ করতে হবে। হিন্দি গাস না একদম?” আহির মাথা নেড়েছিল। মঞ্চে কতোবার দক্ষ গলায় ‘যমুনা কী বলতে পারে’ উত্তরে ভেসে এসেছে দর্শকদের চিৎকার। “এ দেশ তোমাগো নয়”।শক্তিদা বুঝিয়েছিল।
-রাজ করতে হলে হিন্দি গাইতে হবে। পাঞ্জাবি ফোক গাইতে হবে। তোর গান গুলোতে বড্ড পিরিয়ড গন্ধ। উয়োন্ট সেল ম্যান। বি উইথ টাইম।
সেই থেকে আহির, আহির আশিক। শেষ কবে সে মঞ্চে বাংলা গান গেয়েছে মনেই পড়ে না। আজও পুরো প্যাকড শিডিউল। চারটে পরপর পিঠোপিঠি ফাংশান। সব হিন্দি নাইট। বাংলা নেই সেখানে একটুকরোও।

প্রথম অনুষ্ঠান বারাসাতে। উদ্যোক্তাদের বলে রেখেছে আহির। ঘড়ির কাঁটা মেপে দু’ ঘন্টা। আহিরের টাকাপয়সার হিসেবনিকেশ দেখে সোহিনী। সোহিনীও গান করত একসময়। কিন্তু একসময় গান আর চাকরির মধ্যে একটা তাকে বেছে নিতে হতোই। প্রথমটায় মাদক মাদক আচ্ছন্নতা আছে। কিন্তু আচ্ছন্নতা দিয়ে পেটের জ্বালা মেটানো যায় না। সোহিনীর বাবা মা দুজনেই শয্যাশায়ী। তাই তাকে দ্বিতীয়টা বেছে নিতে হলো। সোহিনীই আজকাল আহিরের সব বুকিং সামলায়। বারাসাতের পর লেকটাউন। তারপর একটা কলেজ ফেস্টে লেডি ব্রেবোর্ন। শেষটা নেতাজি ইণ্ডোর। ওটা সোলো নয় অবশ্য। আরো সব রথি মহারথিরা থাকবে। সোহিনীর বলা আছে। ঘড়ি ধরে স্টেজ ছেড়ে দিতে হবে। শান্তনুরা টিউন করতে ঠিক সতেরো মিনিট নেয়। প্রথমটায় বেশি লাগবে। পরের গুলোয় আরও কম। আহির মেপে দেখেছে ঘড়িতে। শান্তনু মুম্বইয়ের সেরা গিটারিস্টদের একজন। তার সঙ্গে কী বোর্ডে আছেন আস্রফ, পারকাশনে মনজিত আর বাঁশিতে মুরুগান। পুরো ‘মিলে সুর মেরা তুমহারা’ ভাব আহিরের দলে। আহির মজা করে বলে ‘এম আই’ টিম। মুম্বাই ইণ্ডিয়ান টিম।
আহিরের মা ছিল গেল বছর অবধি। বাবা চলে গেছেন আরও দুবছর আগে। তখন চারিদিকে চাপ চাপ আতঙ্ক। ভাইরাসের আতঙ্ক। বাজারে একচিলতে কাজ নেই কোথাও। স্টুডিও বন্ধ। প্রোডাকশন হাউজ বন্ধ। ব্যাঙ্ক সেভিংস তলানিতে। আহির তলিয়ে যাচ্ছিল। তার সাধের মুম্বাই ইণ্ডিয়ান টিম ভেঙে যাবার মুখে। আস্রফ দেশে ফিরে গেছে। মুরুগান চেন্নাইয়ে মন্দিরের কাজ নিয়েছে। সোহিনী আপ্রাণ চেষ্টা করছে লাইভ স্ট্রিম ইন করে আহিরের ইমোকে ধরে রাখতে। ঠিক এরই মধ্যে পাঁচ দিনের জ্বর আর একরাত্রির শ্বাসকষ্ট কেড়ে নিল আহিরের মাকে। যে মায়ের কাছ থেকে তার সাত সুরের প্রথম পরিচয়, সেই মায়ের পায়ে প্রণাম করবার অনুমতি মিলল না পর্যন্ত। গুনগুন করতে লাগল কানের ভিতর। “এদেশ তোমাগো না”। আহিরকে প্রেম করেছে অনেক নারী। সুন্দরী। কেন করবে না! প্রথম ভারতীয় গায়ক যে আন্তর্জাতিক মঞ্চে পরপর তিনবার গ্রামি পুরস্কার জিতে নিয়েছে সে যে দেশের সবচেয়ে যোগ্য ব্যাচেলর হবে সন্দেহ কী! কিন্তু আহিরের প্রেম করা হলো না দুটি কারণে। প্রথম কারণ অবশ্যই মা। তার মনের ভিতরের এক ধারণা। প্রেম করলে মাকে অবহেলা করা হবে। দ্বিতীয় কারণ শক্তিদা। আহিরের এই শিল্পী থেকে মেগাস্টার হয়ে ওঠার পিছনে অনেক বড় কৃতিত্ব শক্তিদার। সেই জিনিয়াসসূলভ মানুষটার এমন হঠাৎ অধঃপতিত হওয়াটাকে সে সহজভাবে নিতে পারেনি। যদিও শক্তিদা আলাপ হবার বছর খানেকের ভিতরেই স্ট্রোক হয়ে চলে গেছিলেন। তবু কখন যেন তার একটা প্রচ্ছায়া তিনি আহিরের ভিতর রেখে গিয়েছিলেন শ্রুতির মতো। আহিরের মনে হতো শক্তি সামন্ত আর আহির ভৌমিক আসলে একই রাগের দুটি বন্দিশ। তাই নিজেরই অজান্তে আরও বেশি সাবধানী হয়ে উঠেছিল সে হয়তো।

গাড়ি ছুটে চলেছে বারাসাত। কাল সকালে এই পথ নিয়েই তাকে মুম্বাই ফিরতে হবে। সামনের সিটে বসে সোহিনী শিডিউল মেলাচ্ছিল। কাঁচের ভিতর থেকে শহরের বাইরেটা কেমন রোমান্টিক লাগে। দূরে হাতছানি দিয়ে ছেলেবেলার তালিমের মতোই ভেসে আসছে নজরুল গীতি। কী আশ্চর্য ঘটনা। আহির ভাবছিল। যে কবির জয়ন্তীতে আজ এই উদযাপনগুলো, সেই অনুষ্ঠানেই অরগানাইজারস সোহিনীকে বারবার পৈ পৈ করে নিশ্চিত করিয়ে নিয়েছে।
-দাদা কিন্তু হিন্দিই গাইবেন। ইমরা বাংলা টিউনস চাইছি না। সেভাবেই ‘আহির আশিক’ নাইটের প্রচার করেছি আমরা। আর ওই ‘দিল তেরা’ আর ‘রুবাইয়া’ অ্যালবামের গানগুলো গাইতে বলবেন প্লিজ।
সোহিনী ঘাড় নেড়ে গেছে। যে কবি সুরের ডালি নিয়ে মনের গভীর যন্ত্রণা বুকের ভিতর চেপে ওদেশে চলে গিয়েছিলেন, তাকেও শুনতে হয়েছিল। ‘এদেশ তোমাগো না’। শিল্পীদের আদৌ কি কোনও দেশ থাকে! বেড়া থাকে। ভাবতে ভাবতেই বারাসাত পৌছে গেল আহির। অভ্যর্থনা ইত্যাদি সেরে ব্যাকস্টেজে যেতেই ভেসে এল মধুর এক কণ্ঠস্বর। কোনও এক মেয়ে গাইছে ‘আমার আপনার চেয়ে আপন যে জন’।এই গান একসময় বড় প্রিয় ছিল তার। ‘আজকাল এইসব গান আর কেউ শোনে না।’ শক্তিদা তাই বলেছিল। আহির বুঝতে পারল তার আসার কথা মঞ্চে চলে গেছে। তড়িঘড়ি তেহাই টেনে গানের ইতি টানল মেয়েটি। এই প্রথম আহিরের বুকের ভিতরে দোল দিয়ে উঠল যেন। একঝলক ভেসে এল মল্লিকার মুখ। মল্লিকা ছেত্রিকে সে মাত্র দুই বছরের জন্য বিয়ে করেছিল। একটা সামাজিক দায়বদ্ধতা। সোশ্যাল কমিটমেন্ট। মল্লিকার সঙ্গে তার কোনও প্রেম নেই। কখনও হয়নি। সে তার চিফ প্রোডাকশন হাউজ মালিকের একমাত্র মেয়ে। দাবার একটা ঘুঁটি মাত্র। বদলে বান্দ্রার তীরে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, ক্লাব মেম্বারশিপ। সেই অট্টালিকায় সমুদ্রের হিমেল হাওয়া নেই। সেই হাওয়া বারাসাতে ভেসে এল কোথা থেকে? কে মেয়েটা? ভাবতে ভাবতেই শান্তনুরা উঠে খেল মঞ্চে। গানের একটা লিস্ট মোটামুটি তৈরি করাই থাকে। সেটাই উল্টেপাল্টে গাওয়া হয়। সেই লিস্ট হাতে নিয়ে মেয়েটার নাম জানা হল না আহিরের। জমে উঠছে আসর। মাতামাতি শুরু হয়ে গেছে আহিরের গানের তালে তালে। আহির ভীড়ের ভিতর মেয়েটাকে খুঁজছিল আপ্রাণ। অনেক খুঁজেও শেষমেশ তাকে নেমে আসতে হল।

বড় এস ইউ ভিতে আহির সোহিনী আর ড্রাইভার। অন্য গাড়িতে হ্যাণ্ডস। এটাই নিয়ম। গাড়ি চলেছে পরবর্তী গন্তব্যে। সোশ্যাল মিডিয়া খুলে আহির দেখল তাকে নিয়ে একটা পোস্ট দিয়ে সুবর্ণ। সুবর্ণ তার স্কুলের বন্ধু। গর্ব করে লিখেছে আহির তার একসময়ের ব্যাচমেট। ইতিবাচক মতামত করেছে অনেকে। শুধু একজন লিখেছে,”মুম্বইয়ের হাওয়া লাগিয়ে যে নিজের মাতৃভাষা ভুলে যায়, তার গান শুনতে চাই না।”ধক করে বুকের ভিতর লাগল আহিরের। মন্তব্য করেছে মৈত্রেয়ী বলে একটি মেয়ে। মাত্র তেরো মিনিট আগে। বারাসাতের অনুষ্ঠানের ওই মেয়েটার নাম মৈত্রেয়ী নয় তো? সোহিনী বলতে পারবে কি মেয়েটার নাম? জিজ্ঞেস করা ঠিক হবে এইভাবে? সোহিনী কি ভাববে? আহির বুঝছিল আবার তার ভিতর শক্তিদার অল্টার্ড ইগো ভর করছে। কারণ সে জানে। সোহিনী এই দলটা কামড়ে পড়ে আছে শুধুই তার জন্য। এটাকে কী ভালোবাসা বলা চলে? না নির্ভরতা? নাকি সিমবায়োসিস?
লেকটাউনের পর ব্রেবোর্নের অনুষ্ঠানেও বেশ ভালো সাড়া মিলল। কিন্তু আহির জানে তার শেষ গানে দু জায়গায় আউট অব পিচ গেছে। বার বার ‘মৈত্রেয়ী’ নামের মেয়েটির কমেন্ট তার চোখের সামনে ভাসছে। মুম্বইয়ের হাওয়া কী মল্লিকা ছেত্রী। না বান্দ্রার ফ্ল্যাট। বাংলা গান গাইতে গিয়েছিল ফেস্টে আহির। মেয়েরা থামিয়ে দিল। যাচ্ছে না জাস্ট। এরপর আপাতত দিনের চতুর্থ ও শেষ স্টেজ শোর পথে নেতাজি ইন্দোর। আহির দেখছিল ওই ইডেনের বড় বড় আলোর থামগুলো একসময় বাবার সঙ্গে মিনিবাসে হাওড়াস্টেশনে বেড়াতে যাবার সময় অবাক চোখে দেখত আহির। আজ সেই গম্বুজগুলো তাকে দেখবে। অনুষ্ঠানে স্টেজ মাতিয়ে রেখেছেন এক পল্লীবাংলার বাউল। সারা প্রেক্ষাগৃহ যেন ম্যাজিক। আহির গ্রিনরুমে গিয়ে মুখে জলের ছিটে দিয়ে এল। বুকের ভিতর দম বন্ধ হয়ে আসছে তার। একটা বড় ঢেউ তেড়ে আসছে ছোট্ট আহিরের দিকে। ঢেউয়ের গর্জনের ভিতর একই কথা ভেসে আসছে।”ওহে আহির আশিক। এদেশ তোমাগো না।”
আয়নায় নিজের দুই চোখের দিকে তাকায় আহির। সেই চাহনিতে মদ্যপায়ী নেশাগ্রস্থতা নেই। আছে এক অসহনীয় ছটফটানি। ঢেউকে মুখোমুখি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল।
-তৈলে কোনডা আমাগো দেশ?
ঢেউ ধেয়ে আসে। তার কানায় সাজিয়ে রাখা ফসফরাসের মালা যেন বৃদ্ধ বিদূষকের দন্তরাজির মতো কৌতূক করছে আহিরের সঙ্গে ।
-তোমাগো দেশ না এ।চলি যাও।
-কৈ যামু। এই ঘর বাটি।তানপুরা।সন্ধ্যাপ্রদীপ ছাইড়া।
-চলি যাও।নৈলে ভসায় দিমু। ডুবায় দিমু।
বজ্রগর্জনের মতোই হলের ভিতর থেকে বেল বেজে উঠল। আহিরের এন্ট্রি। কিন্তু আহির দেখল তার হাত পা মাথা ভারি হয়ে আসছে ক্রমশ।সে নড়তে পারছে না কিছুতেই। আয়নায় আহির দেখল তার ঠিক পিছনে কালো কাপড়ে মোড়া এক নারীমূর্তি। তার দুই হাত শিকলে বাঁধা। মল্লিকা? আহির চাবি খুলে দিতে যায় শিকলের।
-স্যার। আপ কা এন্ট্রি। হিন্দি নাইট। আহির দ্য ম্যাজিশিয়ান। ওয়ান অ্যাণ্ড ওনলি আশিক। আহির আশিক।
কিন্তু চাতকের মতো চেয়ে থাকে আহির। কালো কাপড়ে ঢাকা মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে এখনও। মৈত্রেয়ী! কি চান আপনি? থাকতে চেয়েছিলাম তো! ফিলার বানিয়ে রাখলেন। আপনারা শুনতে চান না। যা শুনতে চান শোনাব। বান্দ্রার হাওয়া না। মুম্বইয়ের হাওয়াও না। এ তোমাগো দেশের বাতাস। বিশ্বাসঘাতক। গ্রিণরুম জুড়ে এইবার ‘তোমাগো দেশ না’ গান গেয়ে ওঠে অনেকগুলো স্বর। নেপথ্যে কান্নার আওয়াজ ভেসে আসে। শক্তিদা কাঁদছে।
-স্যার। আপনি ঢুকুন। আর অসম্ভব ঘামছেন আপনি। একটু ঘামটা মুছে নিন।

আহির আশিক অবশেষে তার দিনের শেষ অনুষ্ঠানের মঞ্চের দিকে পা বাড়িয়ে দেয়। সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসছিল সে। প্রথম ধাপে সে পার করল তার বিলাশবহুল বাড়ির ইএমআই। দ্বিতীয় ধাপে মল্লিকা ছেত্রীর গর্ভবতী শরীর। এই গর্ভে তার নয়, আগরওয়ালের সন্তান। মল্লিকা ছেত্রীর বাবা বিকাশ ছেত্রীর বিজনেশ পার্টনার অশোক আগরওয়াল। তৃতীয় ধাপে গানের খাতা, মা আর বাবার ফটো। চতুর্থ ধাপে অবশেষে সে মঞ্চে পা রাখল। শান্তনুরা প্রিলিউড বাজাচ্ছে। কিন্তু এ কি গান! পরজনম যে আহির মানে না। তার ঘরানা নেই। গুরুমা নেই। তবু বারাসাতের হিমেল হাওয়া আর একটুকরো ঝটকা যেন তাকে ক্ষণিক বসন্তে ফিরিয়ে আনল। কতোদিন পর আবার বাংলায় গাইছে সে। অডিয়েন্স আপত্তি করছে না এতোটুকুও। কোথাও কেউ বলছে না ‘এদেশ তোমাগো না’। আহির ভাসছে। ইছামতীর হিমেল হাওয়া,মেঘনার উদাসী হাওয়ায়।

মঞ্চেই ঘটনাটা ঘটে যাওয়ায় শ্রোতারা অনেকে ব্যাপারটা মেনে নিতেই পারছিলেন না। কী করে মেনে নেবেন? কতোটুকুই বা বয়স। কোনও নেশা নেই, বদভ্যাস নেই। নজরুল জয়ন্তীর অর্ঘ্য অপূর্ণ রেখে দীর্ঘ বারো বছর পর আবার বাংলা গান গাইতে গাইতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মঞ্চেই প্রাণ হারালেন বিশ্বখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী আহির কৌশিক। মাত্র বিয়াল্লিশ বছর বয়সে। মৃত্যুর আগের মুহূর্তে তার শেষ উচ্চারণ ছিল। “এদেশ আমাগো দেশ…”

ক্রমশ…

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!