সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী (পর্ব – ৩০)

জন্ম কলকাতায়(২৭ নভেম্বর ১৯৮০)।কিন্তু তার কলকাতায় বসবাস প্রায় নেই।কর্মসূত্রে ঘুরে বেড়ান গ্রামবাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে।সেখান থেকেই হয়তো ইন্ধন পেয়ে বেড়ে ওঠে তার লেখালিখির জগত।প্রথম কাব্যগ্রন্থ "আকাশপালক "(পাঠক)।এর পর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থগুলি হলো শিকারতত্ত্ব(আদম), আড়বাঁশির ডাক(দাঁড়াবার জায়গা), জনিসোকোর ব্রহ্মবিহার(পাঠক), কানাই নাটশালা(পাঠক),বহিরাগত(আকাশ) ।কবিতাথেরাপি নিয়ে কাজ করে চলেছেন।এই বিষয়ে তার নিজস্ব প্রবন্ধসংকলন "ষষ্ঠাংশবৃত্তি"(আদম)।কবিতা লেখার পাশাপাশি গদ্য ও গল্প লিখতে ভালোবাসেন।প্রথম উপন্যাস "কাকতাড়ুয়া"।আশুদা সিরিজের প্রথম বই প্রকাশিত "নৈর্ব্যক্তিক"(অভিযান)।'মরণকূপ' গোয়েন্দা আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় অভিযান,যদিও তার বিন্যাস ও বিষয়বস্তুতে সে একেবারেই স্বতন্ত্র।এই সিরিজের তৃতীয় উপন্যাস 'সাহেববাঁধ রহস্য '(চিন্তা)।সম্পাদিত পত্রিকা "শামিয়ানা "। নেশা মনোরোগ গবেষণা,সঙ্গীত,অঙ্কন ও ভ্রমণ ।

বিন্দু ডট কম

চারিদিক ঘন কালো অন্ধকার।যেন পাতা মুড়ে বানানো এক খোপ।সেই খোপে রেশম সুতোর প্রলেপের মতো খড়ের কয়েক গাছি পড়ে আছে।আর তরুলতার সারা গা জুড়ে মূককীটের সাদা গুঁড়োর মতো ধুলো লেগে।ঘোর কাটতেই তরুলতা বুঝতে পারলো তার মাথার পিছন দিকটায় অসম্ভব ব্যথা।কী হয়েছিল শেষমেশ?তরুলতার মনে পড়ে আবছাআবছা।শালবনির জঙ্গলের ভিতর তাদের জিপ।গাড়ির ভিতর থেকে তখন পশ্চীম মেদিনীপুরের এএসপি রাজেশ কুমার আর চালক পরশুরাম মাহাত বাইরে থেকে ধেয়ে আসা গুলির জবাব দিয়েই চলেছে।জবাবের পর জবাব।ফুটিফাটা হয়ে যাচ্ছে গাড়ির চ্যাসিস।আর তরুলতার ভিতরে আঁকড়ে থাকা পিউপাটা!তার কিছু হলো না তো?ভাবতে ভাবতেই তরুলতা শুনতে পেল তাকে বলছে “বেন্ড ডাউন ম্যাডাম”।রাজেশ কুমারের বাঁ হাত দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে গলগল করে।ওখানে এখুনি একটা পট্টি বাঁধা দরকার।লোকটা এলিয়ে পড়ছে ক্রমশ।এ কী!পরশুরামের দিক থেকে কোনও জবাব আসছে না কেন।পরশুরাম কি গাড়ির স্টিয়ারিংএ মাথা রেখে সামান্য জিরিয়ে নিতে চাইছে।ওর মাথার চুলগুলো ভিজে গেছে।কেন?ও কি তবে গুলি হয়ে গেল?ভাবতে ভাবতেই আবার কালচে খয়েরি গ্রাস করে তরুলতাকে।তার ভিতর বিভিন্ন মাপের ও আকৃতির সাদা সাদা ছিট।একসার সাদা কালো বূটির ছক।ওরা ডানা মেলে বসে পাপড়ির উপর ওর নাম ‘ইন্ডিয়ান স্কিপার’।তরুলতা জানে ওর একটা বাংলা নামও আছে।অখিলেশের প্রজাপতি খাতায় ও তাকে দেখেছে।ওই ঘন কালো পীতবেড়েলার ওপর বসে থাকা প্রাণীটির নাম ছিটকুল।
আচ্ছন্ন তরুলতা তখনও বুঝতে পারেনি তার দুইহাত মোটা নাইলন দড়ি দিয়ে আষ্টেপৃষ্টে বাঁধা।তার আচ্ছন্নতা অবশেষে কেটে গেল এক তীব্র ধাতব শব্দে।মেঝের ওপর একতাল এলোমেলো ছড়ানো খড়ের উপর শুয়ে তরুলতা দেখল তার সেই মূককীটের অন্ধকার ঘরে সামান্য আলোর চিলতে এসে পড়েছে।লোহার দরজা খুলে গেছে।বুট জুতো পরে বিদেশী কায়দায় চেনা স্বর বলে ওঠে।
-কী ডার্লিং।কেমন আছো?তোমার এই পিউপাটা কেমন লাগছে।
তরুলতার মাথাটা ঝনঝন করছিল।তবু সে চোখের ঝাপসা কাটিয়ে ওঠে মনের জোরে।এই অখিলেশ তার অজানা।নিরীহ মূককীটের ব্যবচ্ছেদে তার হাত কাঁপে না।তরুলতা কিছু বলতে পারে না মুখে।কথা বলবার মতো শক্তি তার আর নেই।অখিলেশ হাঁটু মুড়ে বসে পড়ে।
-কী নামে ডাকি তোমাকে?তরুলতা?নাকি পিয়ালি?পুলিশের সঙ্গে হাত মেলানোর চিন্তাটা কিন্তু তোমার মাথায় আসা ঠিক হয়নি।আফটার অল।উই হ্যাড বিন লাভ বার্ডস ওয়ান্স।
তরুলতার মুখে একদলা থুতু চলে আসে নিমেশে।কিন্তু পরক্ষণেই সে নিজেকে সংযত করে।
-আগেই বলেছি তরু।আমি একা নই।আমার সঙ্গে লম্বা হাত আছে।আমার কথা শুনলে দুটো তরতাজা পুলিশ অফিসারকে ওভাবে মরতে হতো না।আই শুড হ্যাভ নোন।রাজেশ কানোরিয়া একটা ফাঁদ ছিল।ভাগ্গিস আমি প্রজাপতি নই।কী বলো তরু?
-আমি পুলিশে যাইনি।ওরা আমাকে জোর করে….
-আই নো তরু।জানি আমি।কিন্তু কী জানো।সমরজিত এসব মানতে চাইছে না।এতোগুলো টাকার প্রোজেক্ট।একটু অসাবধান হলেই তো।ব্যাস।ওর কী দোষ বলো…
-অতোগুলো গাছ,নিরপরাধ বন্যপ্রাণী…
-কাম অন তরু।তুমি কোনও যুগাবতার নও।সবখানেই তো এমন হচ্ছে।আফ্রিকা?জাপান?চীন?আমাদের পুরুলিয়া?বিদ্যুত প্রকল্পর নামে বৃক্ষনিধন?আমরা করলেই দোষ তরু?
তরুলতার গলা শুকিয়ে আসে।হাতটা টনটন করছে।মনটা কেমন করে।পরশুরাম আর রাজেশ কুমার তার মানে মৃত!তাদের এই মৃত্যুর জন্য কে দায়ী?সেইই কী?অখিলেশ বলে চলে।
-থ্যাঙ্কস টু ইওর ইউথ তরু।সমরজিত আমার আর তোমার ভালোবাসাবাসি আগেই দেখেছে ভিডিওর পর্দায়।হি ব্লাডি ফেল ইন লাভ উইথ ইউ।ও তোমাকে চায়।গিভ ইন টু হিম তরু।ভালোবাসাবাসি ব্যাপারটা আমার আসে না।ধরে নিতে পারো,আমি এব্যাপারে একেবারেই চেস্টনাট টাইগারের মতো।ফুলের প্রতি আসক্তি আমার আছে।ভিজে মাটির প্রতিও।কিন্তু সে আসক্তি সাময়িক।আমি সেই ঢিলেঢালা ভাব কুশ প্রজাপতির মতোই ঝেড়ে ফেলে উড়ে যেতে পারি।
তরুলতা সেকথা জানে।কিন্তু অখিলেশকে সে আর ঘৃণাও করে না।দরজার বাইরে কথাবার্তা শোনা যায়।ঘরের ভিতর ঢুকে পরে ঋতবান।তার সঙ্গে বিশালাকার দানবিক চেহারার একটি লোক।তার দাঁতে পানের ছ্যাতলা পরা।তাকে দেখে অখিলেশ সরে বসে।
-এসো সমরজিত।শি ইজ অল ইওরস নাউ।
কতো সহজ!ঠিক কাঁচের জারভর্তি স্কুলের প্রোজেক্টের মতোই।পাতাশুদ্ধু জারে রেখে দিলেই হলো।তরুলতা তার হয়ে যাবে।তাই নয় কি?
সমরজিত ইশারা করতেই ঋতবান এগিয়ে আসে।এই কদিনে ছেলেটা রোগা হয়ে গেছে খানিকটা।মুখে কিছু বলে না সে।নাইলনের দড়ির বাঁধন খুলে দেয় তরুলতার।হাত গুলো অবশ হয়ে আছে তার।সমরজিত ঘনিষ্ঠ গলায় বলে ওঠে।
-তরুলতা ম্যাডাম।আপনি প্রজাপতির মতোই সুন্দরী।আপনাকে মেরে ফেলতে মন চায় না।একটু সময় আমরা কি পরস্পরকে দিতে পারি না?
তরুলতা কী বলবে এখন!পুরুষের স্পর্ধা কতো।সে ধর্ষণের আগে সম্মতি চায়।ঋতবানকে বাইরে যেতে ইশারা করে অখিলেশ।তারপর তরুলতাকে বলে,”ডানা মেলে ধরো তরুলতা।হি উইল স্পেয়ার ইউ।আই প্রমিস।”
তরুলতার কন্ঠে শব্দ হয় না।সে যেন সত্যিই মূককীট হয়ে গেছে।তার বাঁচা মরা নিরর্থক।অন্ধকার ঘর আবার অন্ধকারে ভরে সদর গেট বন্ধ হয়।একচিলতে আলোয় তরুলতা দেখতে পায় অখিলেশের হাতে ধাতব কিছু একটা চকচক করছে।সেটা হয়তো একটা পিস্তল।কিন্তু তার গর্জন নেই কেন?সমরজিতের কোমড় থেকে বেল্ট আলগা হয়ে আসে।ধুপ করে মাটিতে ভারি কাপড় পড়ার আওয়াজ হয়।অন্ধকারে মাকড়শার মতো এগিয়ে আসছে সেই লোকটা।হিসহিস করে বলছে,”চল মাগী।এবার বল।পুলিশকে আমাদের সম্পর্কে কী কী বলেছিস?”
তরুলতার চুলের মুঠি ধরে মোচড় দেয় সমরজিত।মাথার পিছনটা যন্ত্রণায় কুঁকড়ে ওঠে।সমরজিত আরেক হাতে খামছে ধরে তরুলতার বাঁদিকের বুক।ঠিক সেই সময় আবার সেই লোহার দরজা ঝটকা মেরে খুলে যায়।চেনা আরও একটি স্বর বলে ওঠে।
-ওকে ছেড়ে দিন এক্ষুণি।
অখিলেশ বিস্মিতভাবে চমকে পিছনে তাকিয়ে বলে ওঠে,”ঋতবান।ইউ বাস্টার্ড।ট্রেটর।”
-বিশ্বাসঘাতক আমি নই।আপনি।আমিই আপনাকে বিশ্বাস করে একদিন আমার অসুস্থ বোনের কথা বলেছিলাম।তখন ভাবিনি যে সেই বিশ্বাস আমার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হয়ে উঠবে।
এই আকস্মিক ভোলবদলে তরুলতার চুলের গোঁছ ছেড়ে দিয়ে সমরজিত প্যান্ট গলিয়ে নেয় আবার।তার ফ্যান্টের পকেট থেকে বের হয় এক মুঙ্গেরি পিস্তল।কিন্তু ঋতবান দেরি করে না।মুহূর্তে তার হাতের পিস্তল গর্জে ওঠে।’ধপ’ করে মাটিতে পড়ে যায় দেহটা।অখিলেশ হিসহিস করে বলে,”কী করে বাঁচবে তুমি এইবার ঋতবান।ওরা তোমার বোনকে চেটেপুটে কুঁচিকুঁচি করে খাবে।”
ঋতবানের বন্দুক আবার ঝলসে ওঠে।তার বন্দুকের গুলি এবার অখিলেশ চৌধুরীর খুলি ভেদ করেছে।ঝাপট খাওয়া নিথর প্রজাপতির মতোই অখিলেশের দেহ পড়ে যায় তরুলতার পায়ের কাছে।ঋতবান এবার বলে ওঠে।
-চলুন ম্যাডাম।পালাতে হবে।পুলিশ আসছে।ওরা ইনটেরোগেট করবে।তার আগেই আপনাকে সেফ জোনে রেখে আসবো।
তরুলতার সামনে এতো সব ঘটনা এতো কম সময়ে আকস্মিকভাবে ঘটে চলেছে যে সে আর প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে না।অখিলেশের নিথর চোখগুলোর দিকে চেয়ে থাকে সে।অবশভাবে বসে পড়ে।
ঋতবান তড়িঘড়ি অখিলেশ আর সমরজিত দলুইয়ের মোবাইল ফোনগুলো পকেটে পুড়ে ফেলে।
-এই ফোনগুলোতে আপনার ভিডিওগুলো আছে।আমি ডিলিট করে দেব।এখন চলুন।যদিও আপনার কিছু হবে না।আমি অবন্তিকা ম্যাডামকে আপনার কথা বলে রেখেছি।
অবন্তিকা ম্যাডাম!মানে বেলদা স্টেট ব্যাঙ্কের অস্থায়ী কারলোন প্রোভাইডর অবন্তিকা হেমব্রম!সেও এর মধ্যে জড়িত!
তরুলতাকে ধরে ধরে বাইরে নিয়ে আসে ঋতবান।সেখানে অখিলেশের সাদা সুইফট ডিজায়ার দাঁড়িয়ে।গাড়িতে তরুলতাকে তুলে নিজে ড্রাইভারের আসনে বসে পড়ে গাড়ি স্টার্ট দেয় ঋতবান।তরুলতা আচ্ছন্ন হয়ে জিজ্ঞেস করে।
-অবন্তিকাও ওদের সঙ্গে জড়িয়ে?
-না।অবন্তিকা হেমব্রম কলকাতা পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের অফিসার।অখিলেশ চৌধুরি আর সমরজিত দলুইয়ের মধূচক্র ভাঙতেই তাকে ব্যাঙ্কে ঢোকানো হয়েছিল।
-আর আপনি ঋতবান?
-আমি একজন বিপন্ন ভাই।একজন ভীতু সাধারণ মানুষ।এতোদিন চুপ করেছিলাম।কিন্তু আজ আপনাকে দেখে আমার মনে হয়েছে আমি আর একা নই।আপনার স্বামী শুভব্রতবাবুর কথা আমি শুনেছি।আপনারা দুজন থাকলে নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি আমার বোনের কিচ্ছু হবে না।
গাড়ি শালবনির জঙ্গলের ভিতর গভীর রাতে চলতে থাকে তীরবেগে।
-আমরা কোথায় যাচ্ছি ঋতবান?
-ঘরে ফিরে যাচ্ছি ম্যাডাম।আপনার ঘরে।আমার ঘরে।আমার অসহায় ছোটো বোনটির ঘরে।
অন্ধকার রাজপথে আলো জ্বলে ওঠে।তরুলতা ডানা মেলে জোনাকি পোকার মতো আবার আচ্ছন্ন হয়ে থাকে।মৃদু নড়ে ওঠে তার ভিতরে সঞ্চিত পিউপাটা।হাত বুলিয়ে দেয় সস্নেহে।সে অবশেষে পিয়ালির বন্ধন থেকে মুক্ত!
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।