সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী (পর্ব – ৩৬)

বিন্দু ডট কম
গাড়ি ছুটে চলে কলকাতার দিকে।সেই গাড়ির ভিতর পরিযায়ী দুই প্রজাপতির মতোই বসে থাকে তোয়া আর তরুলতা।কিন্তু কলকাতায় পৌছে কোথা থেকে শুরু করবে তারা।এতো বড় একটা শহর।সেখানে একটা বিন্দুর মতো মানুষকে কীভাবে খুঁজে বের করবে তারা?ভাবতে ভাবতেই তোয়া বলে ওঠে,”সূর্য আসবে চুমু খেতে এই ঘাসে/এ ঘাসে মাটির দোতারাগন্ধ পাবে/হে পুরুষ তুমি আমাকে স্পর্শ করো/পুরুষোত্তম হয়ে উঠে এইভাবে।”তরুলতা অবাক হয়।
-কার লেখা?
তোয়া বলে।
-আমার।জানো দিদি।যখন প্রথম কবিতা লিখতে শুরু করি আমি,একটু একটু হাঁটতে পারতাম তখনও।হাত তো সচল ছিলই,বাতের ব্যথা ভেবে পাদুটোর যন্ত্রণাও তখন উপেক্ষা করতাম।একদিন এমনই এক গাড়ি চেপে চললাম কলকাতা।আন্দুলে ছোটো ছোটো কবিসভা হতো প্রায়সই।সেখানে শহর থেকে বড় বড় কবিরা আসতেন মাঝেমাঝে।তাদের একজন আমার কবিতা পড়ে বললেন,’তোমার কবিতা কতো সুন্দর।বলিষ্ঠ।কিন্তু এই গ্রামে বসে লিখলে কিছুই হবে না।তোমাকে শহরে যেতে হবে।কলকাতা শহরে।
-তারপর?
-গেলাম কলকাতা শহর।সঙ্গে একগুচ্ছ অপ্রকাশিত কবিতা।সাদা কাগজের একদিকে লেখা।দিনে একটার বেশি লেখা যেত না।হাত টনটন করতো।মনে হতো ঘাড় থেকে খসে পড়ে যাবে হাতটা।
-তারপর কী হলো?
-সেদিন দা ভাই সঙ্গে ছিল।বড় বড় কতো পত্রপত্রিকার অফিসে গেলাম লেখা জমা দিতে।কেউকেউ নিল,কিন্তু একঝলক পড়েও দেখলো না।মনে হলো আমি ঘর থেকে বেরিয়ে এলেই কাগজটা দলা পাকিয়ে ফেলে দেবে ওয়েস্টবিনে।কেউ আবার জমাই নিল না।বলল তাদের সব লেখা আমন্ত্রিত।আমার নাম শুনে চিনতে পারলো না।কী করে চিনবে?আমি তো আমার কবিতা কখনও ছাপাইনি এর আগে।
-তারপর?
-সারাদিন তালিকা মিলিয়ে সংবাদপত্রর অফিসে ঘুরেঘুরে ক্লান্ত হয়ে দুদন্ড জিরিয়ে নিতে এলাম কলকাতা কফিহাউজে।এই প্রথম এলাম।এর আগে কতো শুনেছি সেই জায়গাটার কথা।কতো বড় মানুষ আড্ডা মারতেন সেখানে বসে।দা ভাই আর আমি একটা টেবিল নিয়ে বসলাম।অবশিষ্ট কয়েকটি কবিতা কী করবো ভাবছি।টেবিলের উপর রেখে পাঁউরুটিতে কামড় দিতে যাবো,সিলিঙ ফ্যানের দমকা হাওয়ায় দুটো পাতা উড়ে গেল জানলা দিয়ে।
-তারপর?হারিয়ে গেল?
-সেসব রূপকথার মতো দিদি।তুমি বললে বুঝবে হয়তো।তুমি তো প্রজাপতি ভালোবাসো।এক মধ্যবয়সী লোক খানিকপর পাতাদুটো হাতে কফিহাউজের দরজায় এসে দাঁড়ালেন।তার সন্ধানী দৃষ্টি সারা ঘরময় কাকে যেন খুঁজে চলেছে।আরদালিকে জিজ্ঞেস করছে’তোয়া চ্যাটার্জি বলে কারোকে চেনেন?’দা ভাই সে কথা শুনতে পেল।উঠে গিয়ে আমাকে দেখিয়ে দিল।লোকটি পাতাদুটো আমাকে ফিরিয়ে বলল,’আপনিই তোয়া চ্যাটার্জি?এই কবিতাগুলো আপনার লেখা?আমার নাম শুভব্রত সেনগুপ্ত।’দোয়াব’ পত্রিকার সম্পাদক।আপনি তো অসামান্য কবিতা লেখেন!
তরুলতার চোখে জল।কতোদিন অখিলেষের প্রজাপতিখাতার শুকনো পাতায় এই জলকণার উপস্থিতি অনুভব করেনি সে।লালতিখড়া,খৈরি,সূর্মা,চাতল।তাদের ডানাগুলি আবার যেন নড়ে উঠছে তিরতির করে।শুভব্রতকে যেন নতুন করে তোয়া চ্যাটার্জির চোখ দিয়ে আবিষ্কার করছে সে।তারপর?তারপর কী হলো?তরুলতা দেখতে পায় চোখ বন্ধ করে।কফিহাউজের থাম বেয়ে নেমে আসছে আলোর ঝরনা।টেবিলে বসে আছে সে আর তোয়া।শুভব্রত তোয়ার কবিতা পড়ে চলেছে।একের পর এক।
মেঘ তুমি ফিরে যাও কুশিনগরের পথে
আমাকে রেখে যাও
আমি জরা আমি কাঠ
আমি প্রস্তর হয়ে থেকে যাই পাহাড়ের বুকে
শিলালিপি হয়ে রয়ে যাই
মেঘ ও মালিনী তুমি মাটির সোঁদা গন্ধে
মনে করে দেখো সেইদিন
আমাকে পেয়েছিলে…
আলোকিত সেই পাহাড়প্রদেশে তিনটি বিন্দুর মতো তিনজন মানুষ।শুভব্রত সে আর তোয়া।তোয়ার সবকটি লেখা ছাপা হবে শুভব্রতর ‘দোয়াব’এ।তরুণ কবির বন্দিশ।আহা।এমন বনবিতান ছেড়ে কিসের খোঁজে চিলকীগড় ছুটে গিয়েছিল সে।কেন গিয়েছিল?ভাবতে ভাবতেই গাড়ি সাইড করে চালক।কলকাতা ঢুকে পড়েছে তারা।
-আব কাঁহা যাইয়েগা?
কোথায় যাওয়া উচিত?পুলিশ স্টেশন?নাকি প্রকাশক পাড়ায়?কোন প্রকাশনা।
-পুরুষোত্তম প্রেস।
তোয়া হঠাৎ বলে ওঠে।
-ওই প্রেস থেকেই দোয়াবের সবকটি সংখ্যা ছাপানো হয়েছে।আমি জানি।আমাকে প্রতিটি পত্রিকা যত্ন করে পাঠাতেন শুভব্রতবাবু।সে পত্রিকার প্রিন্টার্স পেজে পুরুষোত্তম প্রেসের ঠিকানা লেখা থাকতো।১০৬/৬ বৈঠকখানা বাজার।
গাড়ি চলতে থাকে সেই দিকে।শহরের ভীড়ে আটকে ধীরে ধীরে গুটিপোকার মতো এগুতে থাকে তারা।পুরুষোত্তম প্রেসের উদ্দেশ্যে।তোয়ার মন আজ ফুরফুরে।সে আপনমনে কবিতা বলে চলে।
“… আগত রাত্রির জন্য আমার ভয় হয়/ওগো বিস্মৃতি,ওগো চিমচিকে,মৃত্যু-অন্ধকার এই দুর্গে এখন/এসো না,এসো না।”
-তোমার লেখা?
-না।কবি চন্দন মুখোপাধ্যায়ের কবিতা।বাংলার কবিসমাজ তাকে ভুলে গিয়েছে কবে।
তরুলতার বুক দিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস নেমে আসে।এই ঘটনা বাংলা সাহিত্যে প্রথম ঘটেনি।এই ঘটনা এই শেষ ঘটল এমনও তো নয়।গাড়ি রাজাবাজারে রেখে তরুলতা হেঁটে চলল পুরুষোত্তম প্রেসের দিকে।তোয়াকে নামালো না সে।পায়ে হেঁটে পথ কম করে হলেও দুশো তিনশো পা।হুইলচেয়ারে এতোটা পথ চলা তোঅয়ার পক্ষে ভালো না।রাস্তার মোড়ে একটি পাঠ্যপুস্তকের দোকানে জিজ্ঞেস করতেই সে প্রেসের গলি দেখিয়ে দিল।যাবার পথে বাঁদিকের খাঁচায় তরুলতা দেখলো অনেকগুলো নানান রঙের বদরিপাখি।এই পথঘাট গলিগুলো অনেকদিনের চেনা মনে হচ্ছিল তার।ঠিক যেন মায়ের শাড়ির গন্ধ।শুভব্রতর সঙ্গে হঠাৎ দেখা হলে কী বলবে সে?শুভব্রত অবশ্য কিছুই বলবে না।সে জানে।অভিমান,দুঃখ,ক্ষোভ স্তর স্তর মাটি চাপা দিয়ে যুগের পর যুগ গোপন রাখতে পারে সে।ঠিক যেন তালসেরির নদীতটে লালকাঁকড়া।তরুলতার মনে হলো সে যেন মোহনার নদীতট দিয়েই হেঁটে চলেছে।
মোড় পেরিয়ে সামান্য মেইন রাস্তার দিকে এগিয়ে গেলেই পুরুষোত্তম প্রেস।কিন্তু প্রেসের সামনে গিয়েই সে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।’পুরুষোত্তম প্রেস’ লেখা পুরনো বাড়ির সদর দরজার সামনে একটি ‘দেবযান’ দাঁড়িয়ে। নাম ‘দেবযান’ হলেও তাকে ঘিরে জড়ো হওয়া মানুষগুলির মধ্যে কোনও বিভূতিভূষণসূলভ পরাবাস্তবতা খুঁজে পেল না তরুলতা।গাড়ির ভিতরে সাদাকাপড়ে ঢাকা একটি প্রান্তবয়সী মানুষের শব।তাঁর শরীর থেকে যেন আলো ঠিকড়ে বের হচ্ছে।কে ইনি?তরুলতা ভীড়ের ভিতরে একটি ছোট ছেলেকে জিজ্ঞেস করল,”কী হয়েছে?”ছেলেটি চাপাস্বরে বলল,”পুরুষোত্তম প্রেসের প্রতিষ্ঠাতা অচিন্ত্য মিত্র দীর্ঘ রোগভোগের পর আজ মারা গেলেন।ওই যে তাঁর শায়িত দেহ।”
তরুলতা ঈশ্বর মানে না।তবু কোনও অমোঘ ইশারায় তার দুই হাত শ্রদ্ধায় করজোড় হয়ে যায়।অচিন্ত্য মিত্রর চলে যাওয়া যে তার শুভব্রতর জীবনে কতো বড় শূন্যতায় ভরে যাওয়া তা সে জানে না।জানবার কথাও নয়।তবু কেন যেন এক অমোঘ অদৃশ্য নির্দেশে তরুলতার মনে হলো এই পুরুষোত্তম প্রেসে তার আজ হঠাৎ আসা নেহাত কাকতালীয় নয়।তার অদৃষ্ট ঈশ্বর যেন আজ তার চোখের সামনে দিয়ে দেবযান চড়ে অমৃতলোক পাড়ি দিলেন সশরীরেই।