ক্যাফে গপ্পে সোহম চক্রবর্তী

।। স্মৃতি ।।

“মা আমার মানিব্যাগটা কোথায়”? চিৎকার করে বাড়ি মাথা তুলল সঞ্জয়। মিসেস গুপ্ত হন্তদন্ত হয়ে সঞ্জয় ঘরে ঢুকলেন ওর মানিব্যাগটা নিয়ে বললেন কাল তুই বসার ঘরে ফেলে এসেছিলি বিরক্তিভাব নিয়ে মানিব্যাগটা মিসেস গুপ্তর হাত থেকে নিয়ে বললে ,”এত দেরি করে শুনতে পেলে আমার একটা জরুরী মিটিং আছে দেরি হল মুশকিল।”মিসেস গুপ্ত বললেন,” কি করব বল হার্টের অসুখ টা আবার মনে হয় বেড়েছে তাড়াতাড়ি তাই চলতে পারছি না”। কোন কিছুর উত্তর না দিয়েই বেরিয়ে গেল সঞ্জয়।
সঞ্জয় একটা এমএনসি তে কাজ করে খুব উঁচু পোস্টে বিলেতফেরত পাশ করে এসেই চাকরি পেয়ে গেছে তারা এখন থাকে গড়িয়াতে একটা three room flat এ,সঞ্জয়ের বাবা গত হল বছর তিনেক আগে এখন তার মা-ও একটা বিশ্বস্ত পরিচালক আছে তার নাম রঘু নিচের ঘরে গিয়েযখন প্রাতরাশ করবে তখন দেখছে যে দুটো পাউরুটি টোস্ট আর একটা গ্লাসে ফলের রস রাখা আছে কিছুক্ষণ পর মেসেজ গুপ্ত নামলেন সঞ্জয় তখন বলল ,”এতদিন ধরে খাবার দিচ্ছ জানো না আমার টোস্ট ভালো লাগেনা!”মিসেস গুপ্ত বললেন ,”আজকে একটু কষ্ট করে খেয়ে নে কালকে আমি তোকে চিঁড়ের পোলাও টা বানিয়ে দেবো ঘরে তো চিড়ে ছিল না।” “সারাদিন ঘরে থেকেও মনে থাকেনা কি আছে না আছে কি করতে থাকো?” বলে রাগে গজগজ করতে লাগলো সঞ্জয় কিছুক্ষণ পরে উঠে যেতে মিসেস গুপ্ত বললেন ,”কিরে খাবিনা?” কপট রাগে সঞ্জয় বললো ,”এসব ন্যাকামো তোমার কাছেই রাখো ,আমি খাব না যাও “, বলে সদর দরজার দিকে এগোতে লাগলো। “একটু কিছু খেয়ে নে সঞ্জয় ,একটু……” ধড়াম করে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে বেরিয়ে গেল সঞ্জয় ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল মিসেস গুপ্ত, তারপর ঘরে গিয়ে সে শুকনো পাউরুটি গুলো চিবোতে লাগলো।
প্রভু বাজার থেকে এসে দেখে মিসেস গুপ্ত শুকনো পাউরুটি গুলো খাচ্ছে,” একি মা জননী !আপনি এই শুকনো পাউরুটির গুলো কেন খাচ্ছেন ?আমাকে বলতে পারতেন আমি নতুন করে বানিয়ে দিতাম”। রঘু বলল।
“আরে না সঞ্জয়ের আজকে একটা জরুরী মিটিং ছিল তাই খাওয়ার সময় পায়নি”হাসি মুখ করে বললেন মিসেস গুপ্ত।
“সেই আপনি যাই বলুন না কেন আজকে কি হয়েছে আমি জানি ছোট মুখে একটা বড় কথা বলছি আপনাকে দাদাবাবুর এরকম আচরণ আমার কিন্তু ভাল লাগেনা আপনার কষ্টের কোন মূল্যই দেয় না।”
কথা করাবার জন্য মিসেস গুপ্ত বললেন আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে এবারে বাজারগুলো রেখে এদিকের কাজগুলো সেরে নে।
সন্ধ্যেবেলা সঞ্জয় ঘরে ফিরতে মিসেস মিসেস গুপ্ত চা, জলখাবার আনলেন তার জন্য একটু পরেই ছেলেকে বলল ,”দেখ বাবা দুদিন পর তোর জন্মদিন আমি ভাবছিলাম তোর নামে একটা পুজো দেবো।”
“সে তুমি যা ইচ্ছা করো আমাকে এসবের মধ্যে টেনো না, সেদিন আমার অফিসের কিছু জরুরি কাজ আছে।”
“প্রত্যেক দিনই কি তোর জরুরী কাজ একটা দিন মায়ের সাথে সময় কাটাতে ইচ্ছা করে না ?” অনুনয়ের সুরে বললেন মিসেস গুপ্ত
“কেন কানের সামনে এরকম ভাবে ঘ্যান ঘ্যান করছো ?বলছিতো আমি সেদিনকে ছুটি নিতে পারব না !তুমি যা ইচ্ছা করো তোমার যা মন চায় আমাকে মধ্যে টেনো না!!” বলে উপরে চলে গেল সঞ্জয়।
দুদিন পর সঞ্জয়ের জন্মদিনের এল মিসেস গুপ্ত সকালে মন্দিরে বেরিয়ে গেছিলেন পুজো দেওয়ার জন্য বাড়ি এসে দেখে ছেলে তৈরি হচ্ছে।
“শুভ জন্মদিন বাবু অনেক আশীর্বাদ আর ভালোবাসা তোর জন্য রইল ,একটু প্রসাদ খা আমি পুজো দিতে গেছিলাম”
“মা আমার এখন অনেক কাজ আছে এসব পরে হবে”।
“তাহলে অন্তত পায়েস টুকু খেয়ে যা আমি তৈরি করে রেখেছি নীচে আয় আমি দিচ্ছি”।
“উফ কি ডিসগাস্টিং , বলছি তো তাড়া আছে ওসব পরে হবে ,আমি বেরোচ্ছি।”বলে বেরিয়ে গেল সঞ্জয়।
পায়েসের বাটিটা হাতে নিয়ে ছলছল চোখে তাকিয়ে রইল মিসেস গুপ্ত।অনেক রাত করে সঞ্জয় তার অফিসের বন্ধুদের সঙ্গে পার্টি করে ঘরে ফিরল। মিসেস গুপ্ত ,”বললেন অনেক রাত হয়েছে বাবু, হাত মুখ ধুয়ে আয় আমি খেতে দিচ্ছি”।
“আমি খাব না বাইরে থেকে খেয়ে এসেছি তুমি খেয়ে নিলে খেয়ে নাও”।
“তোর জন্য যেসব রান্না করে রাখলাম সেগুলো?”
“তোমাকে তো বলিনি করতে এবার তুমি করেছ তুমি তোমার ব্যাপার কি করবে না করবে ,আমি এখন খাব না।”বলে উপরে উঠে গেল সঞ্জয়। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিসেস গুপ্ত ঘরে চলে গেলেন, নিজেও কিছু খেলেন না।
বেশ কয়েকদিন পরে রঘু হঠাৎ সঞ্জয় ঘরে টোকা মারলো, ঘুমচোখে সঞ্জয় উঠে বলল ,”কি হল রঘু কাকা এত সকাল সকাল ,কি হয়েছে?”
“শিগগিরই চলুন দাদাবাবু মা জননী অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে”। রবির কথা শুনে সঞ্জয় তাড়াতাড়ি নীচে নেমে এল, মিসেসগুপ্তর ঘরে গিয়ে দেখলেন তিনি অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে আছেন। এক মুহূর্ত দেরি না করে সঞ্জয় মিসেসগুপ্ত কে হাসপাতালে নিয়ে গেল। সঞ্জয় চিন্তিত হয়ে বসে আছে, হঠাৎ দেখল ডাক্তারবাবু কেবিন থেকে বেরোচ্ছেন সে জিজ্ঞেস করল ,”ডাক্তার বাবু আমার মায়ের কি হয়েছে দয়া করে বলুন”।
“দেখুন সঞ্জয়বাবু আপনার মায়ের অবস্থা কিন্তু খুবই আশঙ্কাজনক , হার্টে ব্লকেজ হয়েছে ,আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করছি কিন্তু কোনরকম আশা দেখতে পাচ্ছি না, বললেন ডাক্তার বাবু। এই কথা শুনে বসে পড়ল সঞ্জয় কি করবে কিছু বুঝতে পারছেনা তার মাথায় কোন কাজ করছে না।
দিন পাঁচেক পর হাসপাতাল থেকে ফোন এলো, ফোনের ওপার থেকে রিসেপশনিস্ট বলল ,” Hello Mr Sanjay Gupta speaking?” সঞ্জয় কাঁপা কাঁপা গলায় বললো,”হ্যাঁ বলছি”, ফোনের ওপার থেকে ভেসে আসলো , “আপনার মা আজ ভোরবেলা এক্সায়ার করেছেন, আপনি দয়া করে হাসপাতলে চলে আসুন”। সঞ্জয় নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না কোনো রকমে গাড়িটা বের করে সোজা হাসপাতালে চলে গেল ,কিছুক্ষণ পর যখন কেবিন থেকে তার মায়ের মৃতদেহ আনা হলো সে পাথরের মতন দাঁড়িয়ে রইল। শেষকৃত্য সম্পন্ন করে যখন ঘরে ফিরে এলো একটা অব্যক্ত যন্ত্রণা অনুভব করল সে চোখের কোনে জল চলে এলো কোনরকমে নিজেকে সামলে নিয়ে সে ঘরে চলে গেল।
পেরিয়ে গেছে দু দুটো বছর ,আজ সঞ্জয় জন্মদিন কিন্তু আজকে তার কোনো তাড়া নেই অফিস যাওয়াতে , মায়ের ছবিটার দিকে তাকিয়ে বসে আছে। তার মনে পড়ছে আজকের দিনেই তার মা পায়েস রেঁধে খাওয়াতে চেয়েছিল কিন্তু সে খায়নি ,উপেক্ষা করেছিল তখন। হঠাৎ সে শুনতে পেল পাশের বাড়িতে গান বাজছে,” “তখন আমায় নাইবা মনে রাখলে তারার পানে চেয়ে চেয়ে…….”। গানটা কানে আসতেই দুচোখের জল ধরে রাখতে পারল না সে , মায়ের ছবিটা কে জরিয়ে ছোট বাচ্চার মতো কাঁদতে লাগলো। মায়ের প্রত্যেক টা স্মৃতিগুলো পরিস্কার হয়ে ভাসছে তার চোখের সামনে।
নিজেকে খুব অসহায় ও নিঃস্ব মনে হচ্ছে আজ তার , মুখ থেকে অস্ফুট শব্দ বেরিয়ে এলো – “মা”।
Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!