কর্ণফুলির গল্প বলা সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে সুজিত চট্টোপাধ্যায় (পর্ব – ৯)

নীলচে সুখ 

সিকিমের পাহাড় গুলো বড়ো ই ভঙ্গুর। যখন তখন, যেখানে সেখানে ধ্বস নামে। মানগাং তাদের অন্যতম। সম্ভবত সেই কারণেই এখানে জনবসতি কম। জনবসতি কম বলেই , এখানকার সৌন্দর্যে ভাটা পড়েনি। প্রকৃতি এখানে নিষ্কলুষ। মন এখানে প্রজাপতি হতে চায়। সৌন্দর্যের মধু নিতে চায় উড়ে উড়ে , আরও আরও আরও দাও প্রাণ ।
গতকাল যেখানে ধ্বস নেমেছিল সেই জায়গা এখনো পরিস্কার করার কাজ চলছে । বিপর্যয় মোকাবিলা দপ্তরের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সাধারণ কর্মীরাও অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন।
এখানের ধ্বসে , পাথরের ছোট বড়ো টুকরোর সাথে প্রচুর মাটিও ওপর থেকে নেমে আসে।
বড়ো বড়ো পাথরের চাঁই গুলো কে সরিয়ে দেওয়া গেছে , কিন্তু ছোট ছোট টুকরো গুলো , বৃষ্টি ভেজা মাটির সঙ্গে লেপটে আছে। কাদা প্রায় হাঁটুর সমান। তারই নিচে ডুবে থাকা পাথর গুলো দেখা যায় না। অন্তত পঞ্চাশ মিটার এলাকা এইরকম ভয়ঙ্কর ভাবে রয়েছে।
দপ্তরের কর্মীরা পুলিশের সহায়তায় , একটি একটি করে গাড়ি অতি সাবধানে এই রাস্তা টুকু পার করিয়ে দিচ্ছেন।
দইগোলার মতো কাদার ওপর দিয়ে কোনও রকমে একটি একটি করে গাড়ি ঐ ভয়ঙ্কর রাস্তা টুকু পার হয়ে গিয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচচ্ছে।
বাঁ দিকে গভীর খাদ। সেখানে গিয়ে পড়লে , সোজা কল্পিত স্বর্গলাভ নিশ্চিত।
কয়েকটি গাড়ি মোটামুটি নির্বিঘ্নেই চলে গেল। কিন্তু বিপদ হলো ওদের গাড়ির বেলাতেই।
কাদার নিচে ডুবে থাকা একটা পাথরে ধাক্কা লেগে গাড়ির চাকা গেল ঘুরে। তখনই সকল কে হতবিহ্বল করে গাড়ি চলে এলো একেবারে গভীর খাদের কিনারায়।
গাড়ির সামনের দিকের অংশ খাদের দিকে ঝুলে গেল। কিন্তু ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল বলতে হবে। অথবা আয়ুর জোর । পিছনের দিকের একটা চাকা , বেশ বড়ো একটা পাথরে আটকে গেল। তাই গাড়িটা যাত্রী সমেত খাদে গড়িয়ে যেতে গিয়েও , শেষ অবধি থমকে থেমে গেল।
গাড়ির মধ্যে নয়টি প্রাণী আতঙ্কে চোখ বন্ধ করে কাঠের পুতুলের মতো নিথর হয়ে নিশ্চিত মৃত্যুর প্রতিক্ষা করছে।
কিছু পরেই তারা অনুমান করলো , এ যাত্রা তারা মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছে , কিন্তু বিপদ কাটেনি। সামান্য নড়াচড়া তাদের বিপদে ফেলতে পারে। নীল মৃদু স্বরে বললো ,,,, কেউ নড়াচড়া করবেনা। যে যেখানে যেমন আছো , তেমনই থাকো।
ড্রাইভার, নীলের কথায় সমর্থন জানিয়ে , ভাঙা বাংলায় বললো ,,,, রাইট স্যার। একদম হিলবেন না। গাড়ি হিলিয়ে গেলে , নিচে চলে যাবে। জান কা খতড়া আছে বাবু ।
ততক্ষণে বিপর্যয় মোকাবিলা দপ্তরের কর্মীরা এসে গেছে। গাড়ির পিছনে ক্রেনের হুক লাগিয়ে টেনে তুলছে গাড়ি। খুবই সন্তর্পণে , ধীরে ধীরে গাড়ি আবার সেই রাস্তায় ফিরে এলো।
বিপদ কেটে গেছে। মানালি মায়ের কোলে মুখ ডুবিয়ে বসে আছে। মিসেস রায় , প্রফেসর কে প্রবল বিক্রমে জাপটে ধরে আছেন। প্রফেসরের চোখ বন্ধ , কিন্তু
ঠোঁট দুটো থরথর করে কাঁপছে। ভয়ে , নাকি
মহা মৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র জপ করছেন, তা তিনিই বলতে পারবেন।
গাড়ি রাস্তায় উঠে আসার পরেই , আবার চলতে শুরু করেছে। প্রফেসর এবার চোখ মেলে তাকালেন । ড্রাইভারের উদ্দেশ্যে অত্যন্ত বিনয়ী কন্ঠে ধীরে ধীরে বললেন ,,,,
সামাল কে ভাইয়া , জান কা মামলা হ্যায়।
ড্রাইভার হেসে বললো ,,,, পাহাড় মেঁ এয়সা হোতি হ্যায় সাব। ঘাবড়াইয়ে নেহি । সামনে অর ভি খতরনাক জায়গা মিলেগি। ভরোসা রাখিয়ে। কুছ নেহি হোগা। ম্যয় হুঁ না।
আপাতত বিপদ কেটে গেছে। কিন্তু মিসেস রায়ের মনে ভীষণ ভয় ঢুকে গেছে । ওই যে ড্রাইভার বললো , সামনে নাকি আরও বিপদ আছে ? ড্রাইভারের ওই, , ম্যায় হুঁ না ,, কথায় কারো বিশ্বাস নেই। এইমাত্র যে কান্ড ঘটিয়েছ , তারপরে তোমাকে ভরসা করার কোনও মানেই হয়না। অথচ অনন্যপায়, তাকেই নির্ভর করতে হবে, আগামী বেশ কয়েকদিন।
এরচাইতে অসহায় অবস্থা আর কি-ই বা হতে পারে ?
মানালি মায়ের কোল থেকে মুখ তুলে , হালকা স্বরে বললো ,,, গাড়িটা একটু দাঁড় করা-ও না,,, একটু নেমে জল খাবো।
সম্ভবত জল খাওয়া উদ্দেশ্য নয়। সেতো গাড়িতে বসেই খাওয়া যায়।
আসলে মাটির মানুষ। মাটিতেই ভরসা, নির্ভরতা। সাক্ষাৎ মৃত্যুকে এত সামনে থেকে দেখে , সেই মাটির প্রতি টান গভীর হয়ে উঠেছে। একবার এখনই তাকে না স্পর্শ করলেই নয়।
মাটি । মানুষের জীবন ধারনের এক প্রধান উপাদান। মাটি , তুমি ছাড়া হ’লেই হৃদয় কম্পমান। মাটি , তোমাকে শতকোটি প্রণাম।
কথাটা বোধহয় সকলের মনেই ঘুরপাক খাচ্ছিলো , শুধু মুখ ফুটে বলছিলো না।
নীল তৎক্ষনাৎ হুকুমের সুরে বললো ,,,, এই ড্রাইভার , গাড়ি থামাও। আমরা একটু নামবো।
ড্রাইভার আরও মিনিট কয়েক পরে একজায়গায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে দিলো।
পাহাড়ের কোলে ছোট্ট একটা চায়ের দোকান । প্রকৃতি এখানে আরও উদার। চারপাশ , যেদিকে চোখ যায় , পাহাড় পাহাড় আর পাহাড় । একটি ঝর্ণা , এলোচুল চঞ্চলা কিশোরীর মতন হেলেদুলে নাচতে নাচতে ওই দূরের পাহাড় থেকে নিচে নেমে আসছে। তার ঝরঝর শব্দ, সরোদের ঝংকার তুলে ধ্যানমৌন পাহাড়ের ঘুম ভাঙাতে নিরলস চেষ্টায় নিমগ্ন।
পাইন কাঠের ছোট্ট বেঞ্চি। প্রফেসর আর মিসেস রায়, তাতে বসে পড়লেন। বুক ভরে নিলেন বিশুদ্ধ বাতাস। এখনো কেউই স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারেননি। জলের বোতল থেকে ঢকঢক করে জল খেলো সবাই। দারুণ ঠান্ডা জল। আবারও মেঘ ঘনিয়ে আসছে। কনকনে ঠান্ডা বাতাস বইছে।
চা দোকানী , একটি পাহাড়ি স্ত্রী লোক, তার পিঠে কাপড় দিয়ে বাঁধা একটি বাচ্চা।
চলমান জীবন যুদ্ধের জলজ্যান্ত ছবি। এভাবেও বাঁচে জীবন। বুকে লড়াই আর স্নেহ মমতাকে পিঠে বেঁধে , সুখ অসুখের সীমানা পেরিয়ে , মৌন গম্ভীর ধূসর জীবনযাপন।
আরও পথ। সামনে আরও পথ। অজানা অচেনা। আস্থাহীন সারথি’র হাত ধরে , সুখের খোঁজে পথ চলা। কেবলই পথ চলা।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।