সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী (পর্ব – ১৫)

ক্ষণিক বসন্ত
বসন্ত
বসন্ত ক্ষণিকেরই হয়। একথা বসন্ত জানে। কারণ ওই অতোটুকু মুহূর্ত সে খানিক জিরিয়ে নিতে পারে। অন্য সময় তার মনের ভিতর যেন ঘূর্ণীর মতো কীসব ঘুরতেই থাকে। সে আটকাতে চায়। পারে না। বাবা চেপে ধরে এক হাত। মা চেপে ধরে। ওষুধের ফোঁটা নাক দিয়ে তেতো হয়ে গলার ভিতর গড়িয়ে যায়। কিন্তু তার ভিতরের সেই ঘূর্ণী শান্ত হয় না কিছুতেই। ঘুরতেই থাকে। ঘুরপাক খেতে খেতে যতোবার আছড়ে পড়ে, বসন্ত ততোবার অদ্ভুত সব দৃশ্য দেখতে পায়। এইসব দৃশ্য সে কোনও সময় টিভিতে বা মোবাইলের পর্দায় দেখেছে বোধহয়। ঘূর্ণিঝড় ঘুরপাক খেতে খেতে বসন্তকে খোলা মাঠে আছাড় মারে। বসন্ত দেখতে পায় ছোট্ট শিশুদের পার্ক। সেখানে ছোটরা খেলছে। তারও ছুটে যেতে ইচ্ছে হয়। উঠে দাঁড়াতে গিয়ে সে বুঝতে পারে তার হাতদুটো ভিজে গেছে। তার মুখ দিয়ে লোলা ঝরছে। আর ঠিক তখনই ধোঁয়ায় ভরে গেল চারদিক।অসম্ভব জোরে শব্দ করে কারা যেন বাজি ফাটাচ্ছে। কেউ বলে গেল কানে কানে। ওটা আতসবাজি নয়। শেল। কামানের শেল। পার্কটায় আছড়ে পড়েছে। তাহলে ওই শিশুগুলো? ওদের কী হলো? ভাবতে ভাবতেই তার শিবনেত্র হয়। তর্কার প্রকোপে সমস্ত শরীর ধনুকের মতো বেঁকে যায়। ঘাড়ের কাছটা টনটন করতে থাকে। মা কেঁদে ওঠে। “বসন্ত, বসন্ত রে”।
ঠিক তখনই দিগন্তবলয় থেকে একটা পীতাভ আলো ধেয়ে আসে তার দিকে। খানিক পর বসন্তর ভ্রম ভাঙে। এ তো আলো নয়। এ যে বেহালার সুর। আভোগী মিশ্র বেহালা বাজাচ্ছেন। বসন্তর সেই মনের ভিতর চলতে থাকা ঘূর্ণি এইবার যেন ধীরে ধীরে থেমে এল। সে দেখল তার আশপাশ বদলে যাচ্ছে আবার। ময়ূর পেরিয়ে হঠাৎ যেন কোকিলের ভিড়ে চারপাশ বসন্তময় হয়ে উঠছে। যদিও আর আগেকার ওই পার্কে খেলতে থাকা ছেলেমেয়েগুলোকে আর দেখা যাচ্ছে না, তবু বসন্তর যেন এই খিলখিল করতে থাকা চারপাশ ভালো লেগে যাচ্ছে। তার শরীরের যন্ত্রণা মুছে যাচ্ছে। ক্রমশ সে বুঝতে পারে তার বাবার হাতের বেহালার দণ্ডটা জাদুকাঠির মতো কোকিলগুলোকে হাতিতে পরিণত করছে। এক অদ্ভুত শান্তির ভিতর সে বুঝতে পারে আবার যেন সেই শিশুগুলো ফিরে আসছে। একটা জানালা পার হলেই ব্যাস। কিন্তু এই ক্ষণ দীর্ঘায়িত হয় না। বসন্ত বোঝে। এই ক্ষণটুকু ক্ষণিকেরই। আবার ঘূর্ণাবর্ত ফিরে আসে। আবার ধোঁয়া। আবার সেই বারুদ আর মানুষের পোড়া মাংস আর রক্তমাখা গন্ধ। এর যেন কোনও শেষ নেই।
ভাবতে ভাবতে রাত থেকে ভোর হয়। ঘোর কাটলে বসন্ত বুঝতে পারে তার মা মধুমাধবীর চোখে জল। দুধ গুলে এনেছে তার জন্য। খেতে হবে তাকে। খেতেই হবে। বসন্তর ভিতর ঘূর্ণিপাক দানা বাঁধতে গিয়েও পারে না। টেবিলে খাঁড়া করে রাখা রেডিওতে ষড়জ গান্ধার আর পঞ্চম ময়ূর আর কোকিলের মতো তার সঙ্গে খেলতে ছুটে চলে আসছে। আহা। অদ্ভুত ঘুমের আবেশ আচ্ছন্ন করে তোলে তাকে। ভাবতে ভাবতে বসন্ত খেয়ে নেয়। খেতে খেতে তার মায়ের দুই চোখ দেখতে থাকে সে। চোখ তো নয়। যেন নরেন্দ্রসরোবর। ওই তো দেবতা ডুব দিয়ে উঠলেন। এইবার যাবেন গুণ্ডিচাধাম। তারপর সোজা হেঁটে যাবেন তার ঘরের দিকে। মন্দিরে।বসন্ত জগন্নাথ দেবতাকে দেখেছে। ভাসা ভাসা সে স্মৃতি। তবু তার মনে আছে। তার জন্য তার বাবা আর মা মন্দিরে মিনত রেখেছিল। সেদিন সেও ঠাকুরের নবকলেবরের ওই চোখের দিকে তাকিয়ে দেখেছিল। সেই চোখের ভিতর হাজারটা গ্যালাক্সি ঘুরপাক খাচ্ছে।
স্কুলে যেতে খুব ইচ্ছে করে বসন্তর। কিন্তু সেও বড় তাৎক্ষণিক। যখন তখন ওই ঘূর্ণির অসুরটা তাকে জাপটে আষ্টেপৃষ্ঠে ধেবড়িয়ে বেড়ায় যেন। সে জানে এই ঘূর্ণিরোগের ভয়েই তার বাবামা তাকে স্কুলে দিচ্ছে না কিছুতেই। স্কুলে না যেতে পারার দুঃখ বসন্ত নিজে নিজে মেটায় টিভি আর রেডিও শুনে। সুর ভেসে এলেই তার মনের ভিতরটা কেমন শান্ত হয়ে আসে। তার মনের শক্তি যেন সহস্র গুণ বেড়ে যায়। তখন সে গ্যালাক্সির কথা জানতে পারে। অতল সাগরের বুকে গভীর নীচু মারিয়ানা ট্রেঞ্চের কথা জানতে পারে। আর জানতে পারে তার বাবা আর মা শুধু তাকে নিয়েই নিজেদের জীবনের তাগাকে যেন বেঁধে রেখেছে। ঠিক যেন এক গণ্ডি কেটে দিয়েছে কেউ। বাবার চোখে আতঙ্ক। মায়ের চোখেও। ওই বুঝি ঘূর্ণি এল। ঘূর্ণি এলে অনেক সময় বসন্তর জিব কেটে রক্ত পড়ে। তখন বসন্ত অনুভব করতে পারে। রক্তর স্বাদ নোনতা। অথচ সে এতোদিন ভাবতো রক্ত তেতো খেতে। তার জিহ্বার রক্তের লবণ আর তার বাবামায়ের চোখের জলে মিশে থাকা লবণের স্বাদ এক! ভাবতে ভাবতেই সে অনুভব করে। ক্ষণিকের অনুভব। কারণ যখন মৃগীর ঘূর্ণি বসন্তকে আচ্ছন্ন করে, তার চারপাশ এক ঘন কালো কুয়াশায় ঢেকে যায়।
বাবা মা চায় বসন্ত স্কুলে যাক। বসন্তও চায়। সে কথা বলতে চায়। পারে না। কথা তার জরিয়ে যাবেই। কেমন হতো যদি তার ভাষা আর সকলের ভাষার মতোই হতো। তার ভাষার সঙ্গে অন্যদের ভাষাগুলো মিলে গেলে বেশ একটা সুর করে গান তৈরি করা যেত। এ সবটুকুই মনের ভিতরে যদিও। বসন্তর যে মুখের ভিতর ক্ষতর পর ক্ষত। শেষবারের এপিলেপ্টিক ফিটে তার জিভ ফালি ফালি করে কেটে গেছে। মুখ খোলবার জো নেই।তবু হাতড়ে হাতড়ে বসন্ত সুর খুঁজে চলে। জলের পাম্প চলার শব্দ, রাস্তায় রোড শব্দ, জল পড়ার শব্দ, নাকি কোয়ার্জ ঘড়ির একরকম টিকটিক আওয়াজ। এইসব ভাবলেই বসন্তর ভিতরটা শান্ত হয়ে আসে। সে জানে এই ঘটনাটা নিয়ে বেঙ্গালুড়ুতে তার ডাক্তারকাকু ইতিমধ্যেই গবেষণা শুরু করে দিয়েছে। সে করুক। গবেষণায় কী হয়? বসন্ত ভাবছিল মায়ের চোখের জলের লবণের কথা। ভাবতে ভাবতে তার দুই চোখও ভিজে আসছিল। তার ওই গ্যালাক্সি ভরা দেবতার চোখের ওপর তার সমস্ত রাগ গড়িয়ে পড়ল। কেন তার ভাষা অন্য ভাষার মতো হবে না? কেন হবে না? কী তার দোষ? ভাবতে ভাবতেই বসন্ত বাবা আর মায়ের কাঁধে ভর রেখে হাঁটতে শেখে। একটা রড বের করা কাঠখোট্টা খাঁচার মতো যন্ত্র ধরে বসন্ত আজকাল হাঁটতে পারে। বাবা বলেছে ওটার নাম ‘ওয়াকার’। বসন্ত ‘ওয়াক’ মানে জানে। মেঝেতে পা ফেলে নিজের মনেই গুণতে থাকে। এক দুই তিন চার।তার পরের গুণতি গুলিয়ে যায় তার।
রোজ দুপুরে বসন্তর বাবা গানের ক্লাস নিতে বসে। ছাত্র ছাত্রীরা তাকে ঘিরে ধরে। তার এক ফাঁকে মুখ গুঁজে বসন্ত বসে থাকে। এমনই এক দুপুরে একদিন এক অদ্ভুত কাণ্ড হল।আভোগী মিশ্র তখন একটি ধ্রুবপদ বাজাচ্ছিলেন হারমোনিয়ামে। রাগ ভৈরবী। ধৈবত থেকে গান্ধার। পঞ্চম। বসন্ত দেখল সে উড়ছে। তার আর ‘ওয়াকার’ লাগছে না। সে এখনই বিনা কষ্টে উড়ে চলে যেতে পারবে যেখানে খুশি। সেখানে ঘূর্ণির ভয় নেই। জিহ্বায় যন্ত্রণার কষ্ট নেই। ক্লাসের ছাত্রছাত্রীরা খেয়াল করেনি কখন বসন্ত দরজা খুলে বেরিয়ে পড়েছে বাইরে। ঘরের ঠিক বাইরে এক সরু সোঁতা। সেই সোঁতা এঁকেবেঁকে পড়েছে বৈরাগী নদীতে। বসন্তর মনের ভিতর শতসহস্র কলকাকলির স্বরমালিকা যেন ডানা মেলে বাগানের চারিধারে প্রজাপতির মতোই উড়তে থাকে। বসন্ত সেই ভয়ানক যুদ্ধর ছবিগুলো আর দেখতে পায় না যেন। সেইসব মরুপ্রদেশে অঝোরে কাঁদতে থাকা আধাঝলসানো শিশুর কান্না আর তাকে স্পর্শ করেনা। পথে এক পাগল ভবঘুরে তাকে প্রশ্ন করে। কোথায় চললে গো? বসন্ত খিলখিল করে হাসতে হাসতে বলে “আবা বাবা বাবা”। ভবঘুরে সে কথা শুনে হেসে গড়িয়ে পড়ে। ভাবখানা এমন যে ,এ কী ভাষা বলে রে! এতো আমার চেয়েও বড় একখানা পাগল এসেছে। উড়তে উড়তে বসন্ত দেখতে পায় সে মোহনার কাছে চলে এসেছে কখন। বাবার ক্লাসের সেই সুর গুলো আর শোনা যাচ্ছে না তেমন। দুর্বল হয়ে পড়ছে তার ডানাগুলো। আবার সেই কালো কুয়াশাভরা ঘূর্ণি তেড়ে আসছে তার দিকে। ওই বোধহয় গিলে খাবে তাকে। বসন্ত বলে “আবাবা বাবা বাবা”। ঘূর্ণিঝড় খিলখিল করে হাসে। তার খিদে লেগেছে। সে এইবার রক্ত খাবে। খাবেই। বসন্ত ভয়ে শিউরে ওঠে। আর যে পালাবার পথ নেই তার।