ক্যাফে নস্টালজিয়া তে শ্রীতন্বী চক্রবর্তী

সাবেকিয়ানা, সনাতনী মা, পরিবার এবং আমরা সবাই

দুর্গাপুজো কেবলমাত্র পাঁচটি দিনের সমাহার নয়, পুজো উদযাপনের মধ্যে দিয়ে সাড়ম্বরে পালিত হয় অশুভকে প্রবল পরাক্রমে বিনাশ করার যে সামগ্রিক প্রক্রিয়া, সেই সমস্তকিছু। আচার, স্তোত্র, মন্ত্র, মায়ের সনাতনী রূপ, সাবেকিয়ানা, পরিবারের সকলে মিলে একসাথে শরৎ-আনন্দে মাতোয়ারা হওয়া, এই সবকিছুর মধ্যেই দুর্গাপুজোর সুসংবদ্ধ রূপটি ফুটে ওঠে। ছোটবেলা থেকে যৌথ পরিবারে বড় হয়েছি, এমন এক পরিবেশে যেখানে আত্মীয়স্বজন সকলে মিলে দোল, রাসপূর্ণিমা, গণেশপুজো, দুর্গাপুজো, লক্ষীপুজো, কালীপুজো সমস্ত কিছু পালন করেছি মহা সমারোহে। পুজোর মধ্যেই আন্তরিকতার ছোঁয়ায় বড় হয়ে উঠেছি, পুজোর মধ্যেই কিছু ভাইবোনেরা বিদেশ চলে গিয়েছে পড়াশোনা বা চাকরির সন্ধানে, কেউ কেউ আবার ফিরে এসেছে প্রত্যেকবার বাড়ির পুজোর ছোঁয়ায়। তার মধ্যেই পুজোর কলেবর বৃদ্ধি হয়েছে, মামা, মামী, মাসি, মেসো, দাদু,দিদা, ভাইবোনেরা প্রত্যেকে নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছেন নিত্যনতুন দায়িত্ব। মহালয়া থেকে শুরু হয় গানবাজনা, ছোটদের কবিতা, বাড়ির সকলে মিলে পুজোর নাচ বা নাটক মহড়া দেওয়া আর তার সাথে আরো অনেককিছু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বিগত দিনগুলি থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত আমাদের বাড়ির এই সাবেকি পুজো প্রায় দেড়শো বছরের পুরোনো, কিন্তু মায়ের চালচিত্র, রূপ, কাঠামো প্রত্যেক বছর সেই মৃন্ময়ী থেকে চিন্ময়ী রূপ হয়ে ওঠা পর্যন্ত এতটুকুও পরিবর্তন হয় নি। বাংলাদেশ থেকে শুরু হয়ে, তারপর উত্তর কলকাতার মানিকতলায়, এবং সাম্প্রতিক সময়ে সল্টলেকে উদযাপন হওয়া এই পুজো পারিবারিক গন্ডি ছাড়িয়েও আপন করে নিয়েছে প্রতিবেশীদের, আন্তরিকতায় কাছে টেনে নিয়েছে সমগ্র বিশ্বকে।

দুর্গাপুজো একটি কালচারাল ফেনোমেনন, যেটি সাবেকি, এবং আধুনিকতার মেলবন্ধনের সাথে সাথেই ঘটমান বিষয়গুলিকে একটি এক্সিস্টিং, বিদ্যমান সংস্কৃতির প্রতিরূপ বা প্রামাণ্য হিসেবে তুলে ধরে। সমাজবিজ্ঞানী এবং গবেষক আর. এ. পিটারসন তার লেখা ‘প্রোডাকশন অফ কালচার’ প্রবন্ধটিতে বলেছেন, যে কোনো সাংস্কৃতিক ঘটনার অধ্যয়ন, সেগুলি বই হোক, বা চিত্রকর্ম, ধর্মীয় রীতিনীতি, বা সংবাদ অথবা গল্প, অবশ্যই চারটি ঘটনাকে বিবেচনা করে করতে হবে। সাংস্কৃতিক কাজগুলির একটি একনিষ্ঠ বিশ্লেষণ ছাড়াও, তিনি তার কাজটিতে এমন পরিস্থিতিতে মনোনিবেশ করেছেন যেখানে মানুষ সাংস্কৃতিক কাজ তৈরি করে, শ্রোতাদের প্রকৃতি এবং সমাজের প্রাসঙ্গিক দিকগুলি, দৃশ্যকল্প অনুধাবন এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পুজো বা যে কোনো রকমের অনুষ্ঠানের তাৎপর্যটি তুলে ধরে। হিন্দুদের কাছে দেবী দুর্গা ‘মন্দের ধ্বংসকারী’ হিসেবে পরিচিত দেবী, তাঁর দশটি অস্ত্র বিভিন্ন প্রাণঘাতী অর্থ বহন করে, সেইসাথে তার বাহন সিংহ – সংহার, তেজ এবং দৃপ্ততার কাণ্ডারী। কালচারাল ফেনোমেননের মধ্যেই দেবীকে আমরা ভবানী, কখনো বা অম্বা, চন্ডিকা, গৌরী, পার্বতী, মহিষাসুরমর্দিনী নামেও অভিহিত করে থাকি, দুর্গা হিন্দু ভক্তদের কাছে ‘মাতৃদেবী’ এবং ‘ধার্মিকদের রক্ষক’। একদিকে রয়েছে সমাজ, অন্যদিকে কনজিউমার বা ভোক্তা, তারই মধ্যে রয়েছে উৎপাদনকারী একটি পদক্ষেপ- ফলত এই ত্রিধারা সম্মেলনের সংগঠিত রূপ হিসেবে আমরা আগেও দুর্গাপুজোর বিশেষ বিশেষ তাৎপর্য্য পেয়েছি এবং আজ, এই ইউটিউব, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টুইটের যুগেও বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে সেই মানসিক সৌহার্দ্য, পুজো নিয়ে মানুষের আবেগবিহ্বলতা, গান, সিনেমা, গল্প, বনেদিয়ানা, সাজ, খাবার, পত্রিকা প্রকাশ কোনোকিছুতেই এতটুকু ভাঁটা পড়েনি। এটা সত্যিই অনস্বীকার্য যে গত দুই বছর ধরে আমরা যেভাবে অতিমারীর বিরুদ্ধে একজোট হয়ে লড়াই করে চলেছি তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় আর প্রত্যেকটি দিনের সাথেই উঠে এসেছে পুজোর নতুন লক্ষমাত্রা, পুজো নিয়ে নিত্য সংকল্প, ঘরে ফেরার তীব্র আকাঙ্খা, বেঁচে থাকার লড়াই সবকিছুই।

আমাদের বাড়ির পুজোর মাধ্যমে তৈরী হয় নিত্যনতুন পরিকল্পনা, বাড়ির মেজো ছেলে মানিক ভট্টাচার্য, অর্থাৎ আমাদের মানিকমামার কথাতে, “এই পুজো কেবলমাত্র ভট্টাচার্য বাড়ির পুজো হিসেবেই সীমাবদ্ধ নয়, এই পুজোতে আমরা সবাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ”। ফলত, এই যে সকলকে নিয়ে চলার সংবেদনশীলতা, পরিবারের মধ্যেই পরিক্রমা, বাড়ির কন্যাদের আর পুত্রবধূদের মধ্যেই যে শক্তি, সহনশীলতা, তেজ এবং ভালোবাসার ভিন্ন রূপের প্রতিফলন, তা তো শুধুমাত্র ঐতিহ্য এবং পরম্পরাকে বহন করার জন্যে নয়, তাকে নিরন্তর যত্নে লালন করে যাওয়াও।
দিন যায়, সমাজের রূপরেখা বিভিন্ন শিরা, উপশিরার মধ্যে দিয়ে বদলায়, আশ্বিনের শারদপ্রাতে, মা দুর্গা মহিষাসুরকে পরাজিত করেন। দেবীপক্ষের মঙ্গলজনক সূচনায় আকাশ বাতাস শিহরিত উচ্ছাসে প্লাবিত হয় আজও; তেজদীপ্ত, স্বয়ংসম্পূর্ণ, পরাক্রমী, সত্যের অধিষ্ঠাত্রীরূপে জগজ্জননীর আবির্ভাব আমাদের বারংবার মনে করিয়ে দেয় :
“আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোক মঞ্জীর;
ধরণীর বহিরাকাশে অন্তরিত মেঘমালা;
প্রকৃতির অন্তরাকাশে জাগরিত জ্যোতির্ময়ী জগন্মাতার আগমন বার্তা।
আনন্দময়ী মহামায়ার পদধ্বনি অসীম ছন্দে বেজে উঠে রূপলোক ও রসলোকে আনে নব ভাবমাধুরীর সঞ্জীবন।
তাই আনন্দিতা শ্যামলীমাতৃকার চিন্ময়ীকে মৃন্ময়ীতে আবাহন।
আজ চিৎ-শক্তিরূপিনী বিশ্বজননীর শারদ-স্মৃতিমণ্ডিতা প্রতিমা মন্দিরে মন্দিরে ধ্যানবোধিতা।”
প্রকৃতির অন্তরাকাশ আজ সেই চিন্ময়ীর আগমনের কারণেই সুবিন্যস্ত; আনন্দিত বিশ্বজননীর মূর্তিটি হৃদয়ে দেখি, দেখে আপামর জনসাধারণ, আধুনিকতা বা সাবেকিয়ানার দ্বন্দে না গিয়েই, আর জীবনপ্রাচুর্যের অক্ষয়রেখাটি ক্ষয়িষ্ণু হতে না দিয়ে আমরা আজও বলতেই থাকি:
“জাগো, জাগো দুর্গা, জাগো দশপ্রহরণধারিণী।”

আমাদের বাড়ির পুজোয়, আমরা সবাই এই জাগরণের বার্তাই দিয়ে চলি প্রতিনিয়ত।
(প্রতিবেদক ইংরেজির অধ্যাপিকা, সম্পাদক এবং কবি। ভট্টাচার্য পরিবারের একজন সদস্য)