মার্গে অনন্য সম্মান সুতপা ব‍্যানার্জী(রায়) (সর্বোত্তম)

অনন্য সৃষ্টি সাহিত্য পরিবার

সাপ্তাহিক প্রতিযোগিতা পর্ব – ৮০
বিষয় – বিষয় – দোল উৎসব / ক্রেতা সুরক্ষা / মানবিক

সহযাত্রী

অলকেশ আজ অফিস ফেরতা গড়িয়াহাটে আসে হোমের বাচ্ছাদের জন্য পূজোর জামাকাপড় কিনতে, প্রতি বছর পূজোর সময় ও “স্বপ্ন সুন্দর”- হোমের বাচ্ছাদের জামাকাপড় দেয়, নতুন জিনিস পেয়ে ওদের আনন্দটুকু দেখার জন্য শত ব‍্যস্ততাতেও ও এই কাজটা নিজেই করে, হোমের আরো অনেক সুখ দুঃখের সঙ্গে জড়িয়ে অলকেশ। গাড়ি পার্ক করে হন হন করে হাঁটতে গিয়ে ওর নজর পড়ে একটা জটলার দিকে। গড়পরতা বাঙালি জটলা দেখলে ঝামেলার ভয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যায়, কিন্তু অলকেশ সে প্রকৃতির নয়, জীবনের সব সমস‍্যার সামনে অনায়াসে দাঁড়ায়। জটলা সরিয়ে এগিয়ে যায় অলকেশ, একি আসন্ন প্রসবা এক তরুণী রাস্তায় পড়ে আছে, সবাই ঘিরে থাকায় শ্বাস নিতেও অসুবিধে হচ্ছে ওনার। আহা রে, অলকেশ দৃঢ় হাতে ভিড় সরিয়ে দেয়।
মুখে চোখে জল দেওয়ার ব‍্যবস্থা করে, যন্ত্রণার বিকৃতি মুখে চোখে, সঙ্গে নিঃশব্দ কাতর আকুতি। আর সময় নষ্ট করে না অলকেশ, কয়েকজনের সাহায্য নিয়ে তরুণীকে নিজের গাড়িতে তোলে, আশেপাশে তাকিয়ে নেয়, তরুণীর সঙ্গে কেউ ছিল কিনা দেখার জন্য। কেউ কোথাও নেই, অপেক্ষা করার কোন মানে হয় না, গাড়ি ছোটায়।
কাছাকাছি বাইপাসের কাছে অলকেশের পরিচিত একটা নার্সিংহোম আছে, ওখানেই যাবে ঠিক করে। গাড়ি চালাতে চালাতে প্রশ্ন করে,”আপনি এই অবস্থায় একা বেরিয়েছেন কেন?”- উত্তরে কান্না ছাড়া কিছুই শুনতে পায় না। অলকেশ বলে ওঠে-” আচ্ছা আচ্ছা বলতে হবে না, আগে আপনি সুস্থ হন। হাসপাতালে গাড়ি থেকে মেয়েটিকে নামিয়ে, স্ট্রেচারের ব‍্যবস্থা করে নিয়ে যায় এমার্জেন্সিতে। বেড পেতে অসুবিধে হয় না, তবে ডাক্তার অবস্থা বুঝে সব ফরমালিটি করিয়ে নিয়ে ওটির ব‍্যবস্থা করলেন। শারীরিক ও মানসিক আঘাতে প্রসবের সময় এগিয়ে এসেছে, সময় নষ্ট করা যাবে না। অলকেশ বাড়িতে ভুবনদা মানে ওর সব সময়ের সঙ্গীকে একটা ফোন করে
ওটির বাইরে চেয়ারে গা এলিয়ে দিল। অলকেশের স্বভাব অনুযায়ী এ ঘটনা থেকে ও মেয়েটাকে অসহায় অবস্থায় রেখে বেরিয়ে যেতেও পারছে না। তার সঙ্গে ওটির ভেতরে কি ঘটছে তাই নিয়েও দুশ্চিন্তায় আছে। নার্সদের ছুটোছুটি ব‍্যস্ততা লক্ষ‍্য করছে। একটু তন্দ্রা মতো এসেছিল, দেখল ওটির ডাক্তারবাবু বেরিয়ে এলেন। অলকেশের জিজ্ঞাসু দৃষ্টি দেখে বললেন-” Everything is okay now”- নার্সদিদি বেরিয়ে এসে বললেন-” ফুটফুটে মেয়ে হয়েছে, বাচ্চা আর মা দুজনেই ভাল আছে।” অলকেশ একটা সস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। সেইসঙ্গে মনের মধ্যে পুরোনো তোলপাড়টা টের পাচ্ছে। সেদিনের সমস্ত বিল পেমেন্ট করে, সব ব‍্যবস্থা করে ঘরে ফিরল অলকেশ। বাড়ি এসে ভুবনদাকে বলল-” ভুবনদা ঘরে একজন অতিথি আসবে, সঙ্গে একটা ছোট বাচ্ছাও থাকবে, তুমি ব‍্যবস্থা করে রেখো, একটা ঘর ঠিকঠাক করে গুছিয়ে রেখো।” ভুবনদা অবাক হয়ে প্রশ্ন করে-“কে
গো দাদাবাবু, তোমার নিজের কেউ আছে বলে তো শুনি নি, তোমার সবকিছুই তো আমি- এই ভুবন শম্মা।” অলকেশ ভুবনদার বলার ধরণে হেসে ফেলে বলে-” আচ্ছা, আচ্ছা অনেক হয়েছে, এলেই দেখতে পাবেখন,” ভুবনদা মাথা নাড়তে নাড়তে চলে যায়।অলকেশ ঠিক করে হোমের বাচ্ছাদের জামা, সাথে নতুন পুচকিটার দরকারী জিনিস একেবারে কিনেই নার্সিংহোমে ঢুকবে।

সে একা একাই সব গুছিয়ে কিনল, নবজাতকের সুতির জামা, জনসনের পুরো সেট, ছোট মশারি, যদি দরকার লাগে- একটা ফিডিং বটল। নিজের কেনাকাটা দেখে নিজেই মনে মনে হাসল, এই অবস্থায় অফিসের কেউ যদি দেখে তো খেলা পুরো জমে যাবে। নার্সিংহোমের পার্কিং লটে গাড়ি রেখে সবে লিফ্টে ঢুকবে অফিসের নীলাম্বরের
সঙ্গে দেখা, জিজ্ঞেস করল-” দাদা তুমি এখানে?” কোনো রকমে একটা জবাব দিয়ে অলকেশ পাশ কাটিয়ে লিফ্টে ঢুকে গেল। নবজাতিকার বেডের কাছে গিয়ে দাঁড়াল, কী সুন্দর হাত পা ছুঁড়ে খেলছে। অলকেশ তরুণীর দিকে তাকিয়ে বলল-” হাসপাতালে ভর্তির সময় যে নাম দিলেন ওটাই আপনার আসল নাম তো।”- ওদিক থেকে কাঁদতে
কাঁদতে উত্তর এলো-” হ‍্যাঁ- আমি চৈতি, এ দিনটা দেখব বলে গত নমাস অমানুষিক লড়াই করেছি, গতকাল আপনার সাহায্য ছাড়া, এসব কিছু হোত না, আপনি ওর একটা নাম রাখুন, ও শুধু ওর নিজের নামেই পরিচিতা হবে।”-অলকেশ উত্তর দিল-” এরপর আপনি কি করবেন কিছু ভেবেছেন।” চৈতি বলল-“কি আর ভাবব,বাবার পরিচয় ছাড়া সমাজ তো ওকে টিকতে দেবে না, কোনো হোমেই যেতে হবে।”-অলকেশ প্রতিবাদ করল-“আপাতত কোনো হোমে যাওয়ার দরকার নেই, বাড়িতে যখন যেতে
পারবেন না, আমার বাড়িতেই চলুন, সেখানে আপনার কোন অসুবিধে, অমর্যাদা হবে না। চৈতি অবাক চোখে তাকিয়ে বলে-“আপনি এতোটা করলেন, আবার আপনার বোঝা হব।”- অলকেশের কত না বলা কথা মনের মাঝে গুমড়ে ওঠে, কিন্তু সে কথা কাউকে কখনোই বলতে পারে না, শুধু অপলকে নবজাতিকার হাত-পা ছোঁড়া দেখে আর ফিরে যায় অতীত, আরো অতীতের পানে, ঘোর কাটে চৈতির ডাকে।”শুনছেন, এখান থেকে কবে ছুটি হবে
আমার?”- অলকেশ হঠাৎ বলে ওঠে-“শয়তানটা কে? কে আপনার এতো বড় ক্ষতি করে গেল।” চৈতি মাথা নীচু করে বলল-” যেই হোক, আমি ওসব কাদা ছোঁড়াছুঁড়ির মধ্যে যেতে চাই না, বরঞ্চ যে এসেছে তাকে সুন্দর করে মানুষ করে তুলতে চাই।”-অলকেশ বলে-” আপনার যে মনের জোর রয়েছে তা তো সকলের থাকে না, কেউ হয়তো সব হারিয়ে ফেলে, এমন কি নিজের সন্তানকেও।”- বলেই মুখ ঘুরিয়ে আড়াল করে নিজেকে।

আজ চৈতি নবজাতিকাকে নিয়ে অলকেশের সংসারে
হাসপাতাল থেকে ফেরে, মন তার অলকেশের প্রতি কৃতজ্ঞতায় পরিপূর্ণ হয়। যাকে নিজের বাড়ি লোকলজ্জার ভয়ে আপন করতে পারে নি, তাকে অলকেশ শুধু ঠাঁই দেওয়া নয়, পরিপূর্ণ দায়িত্ব নিয়েছে। ভুবনদারও আনন্দের সীমা নেই, নতুন মানুষদের সঙ্গে আনন্দে মেতে ওঠে। নবজাতিকার নাম রাখা নিয়ে তন্নতন্ন করে খোঁজায় ভুবনদাও মাথা ঘামায়। শেষ পর্যন্ত অলকেশের দেওয়া নামই সবাই মেনে নেয়, সুহানা- এই নামটাই বেশ লাগে সকলের। বার্থ সার্টিফিকেট তৈরীতে বহু লড়াইয়ের পর উপাধিবিহীন সার্টিফিকেট পাওয়া যায়। অলকেশ ভুবনদার হাতে সব ব‍্যবস্থা ছেড়ে দিয়ে
অাগের মতো অফিস আর স্বপ্নসুন্দর আশ্রমের কাজে ব‍্যস্ত হয়। এতো নিশ্চিন্ততার মধ্যেও চৈতি নিজের ও সুহানার ভবিষ্যৎ আশঙ্কায় শঙ্কিত হয়, কিভাবে টিকে থাকবে এই দুনিয়ায় যেখানে দশবছরের সম্পর্ককে অস্বীকার করে ধিরাজের মতো লোকেরা অনায়াসে চলে যায়। হ‍্যাঁ মা হয়ে সে কি করে নিজের মধ্যে বেড়ে ওঠা প্রাণের অস্তিত্বকে অস্বীকার করত। তাই সব অভিমান ঠেলে সে এই ক-মাস দাঁতে দাঁত চেপে ছিল। অলকেশের মতো একজন ভদ্র, দয়ালু মানুষ তার পাশে দাঁড়িয়েছে বলে পুরো দায় তো মানুষটার ঘাড়ে
চাপিয়ে দেওয়া যায় না।
নিজের ব‍্যবস্থার স্থায়ী সমাধান তার নিজেকেই করতে হবে। চৈতি মনে মনে ভাবে আজ অলকেশবাবুর সঙ্গে কথা বলে একটা চাকরির চেষ্টা করতে হবে। ভুবনদা
সুহানার একটা সুন্দর ডাক নাম রেখেছে, বিউলি।
ভুবনদার বদ্ধমূল ধারণা সুহানা নাকি ওর বিউলি নাম বোঝে আর ওই নামে সাড়াও দেয়, চৈতি ভুবনদার খ‍্যাপামি দেখে হাসে, বলে-” ভুবনদা তুমি ভুল করছো, ওইটুকু বাচ্ছা নিজের নাম বোঝে না, ও সাড়া দেয় না, নিজের মনে হাসে। ভুবনদা মাথা নাড়তে থাকে”না না কক্ষনো না, বিটির আমার দেওয়া নাম খুব পছন্দ।”ওদের কথাবার্তার মাঝে অলকেশ আসে- পরিবেশটা সামান‍্য ভারী হয়। চৈতি একটু উসখুস করেও ওর আজকের ভাবনাটা বলতে পারে না, মানুষটা সবে ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরল। ভুবনদার সঙ্গে খাবার তৈরীতে হাত লাগায়। অলকেশ হাত, মুখ ধুয়ে সুহানার সঙ্গে খেলে নেয়, আজকাল এই খেলাটুকু ওর বড় ভাল লাগে। দিন শেষে
বাড়ি ফেরার তাগিদটুকুও অনুভব করে সুহানার জন্য,
আগে ঘরে ফিরে ভুবনদার সঙ্গে দিনের জাবরটুকু কাটত,এখন সুহানার হঠাৎ হঠাৎ হাসিতে হারিয়ে যায়। চৈতির প্রস্তাব মতো স্বপ্নসুন্দর আশ্রমে চৈতির কাজের ব‍্যবস্থা হয়, সুহানাকে সাথে নিয়ে রোজকার চলা শুরু হয়।
ওখানে বাচ্ছাদের দেখাশোনার জন্য অতিরিক্ত আয়া থাকায় সুহানার কোন অসুবিধে হয় না। আশ্রমের কাজকর্ম দেখে চৈতি অলকেশের জন‍্য আরো শ্রদ্ধা অনুভব করে। রবিবার করে অলকেশও আশ্রমে সময়
দেয়, এই আশ্রম যেন অলকেশের প্রাণ। আশালতাদেবী, অলকেশ যাকে জ‍্যাঠাইমা বলে, আশ্রমের এক খুদের হাত ধরে নিয়ে এসে বলল-“দেখ আজ টুনি কি বায়না ধরেছে আমি নতুন মা মানে চৈতি ম‍্যাডামের হাতে খাব।” চৈতির
চোখের কোণ জলে ভিজে যায়,বোজা গলা নিয়ে বলে ওঠে-” টুনি তো ঠিক বায়নাই করেছে, আমিই তো ওর নতুন মা, আমিই তো ওকে খাওয়াব, তুমি কিচ্ছু জানো না আশামাসি।”-কথাটা শুনে অলকেশের মনের পাষাণ ভার নেমে যায়, মনে মনে ভাবে তার স্বপ্নসুন্দর আশ্রমের প্রকৃত রূপকার এসে গেছে, একটা নিশ্চিন্তির শ্বাস বেরিয়ে আসে। চৈতির হাতে টুনির ভাতের দলা খাওয়া দেখে অলকেশ হেসে ফেলে। ওদিকে সুহানা গীতামাসির
কোলে চেপে এসে মায়ের কোলে অন্য কাউকে দেখে ভ‍্যাঁ করে কেঁদে ফেলে, সবাই অবাক হয়, ওইটুকুটারও হিংসে জাগলো নাকি। চৈতি দুজনকে নিয়েই মাটিতে বসে পড়ে। টুনি, সুহানা দুজনের মধ্যেই খুশির আলো ছড়িয়ে পড়ে। এ দৃশ‍্য দেখে চৈতির দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে অলকেশ। হঠাৎ নিজেকে টুনি আর সুহানার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলে, ভীষণ স্নেহ পেতে ইচ্ছে করে। নিজের মনের ভাব লুকোনোর জন্য দ্রুত অফিস ঘরের দিকে পা বাড়ায়।
চৈতি অলকেশের চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে রইল, মনে হয় মানুষটার মধ্যে এক কূপ রহস‍্য লুকিয়ে আছে, কিন্তু কি তা ভেবে পায় না। ভুবনদাও তাদের আইবুড়ো সংসারের এক অত‍্যাবশ‍্যকীয় সদস‍্য বলে ধরে নিয়েছে চৈতি আর সুহানাকে, মনেই হয় না ওরা কোনদিন ছিল না এ বাড়িতে।

দিন গড়ায়, ছোট্ট সুহানা হামা টানতে শেখে, ফোগলা মুখে একখানি দাঁতে ভুবন ভোলানো হাসি দেয়। ভুবনদা বলে
-“দেখ দেখ চৈতি দিদিমনি, বিউলির মুখে বিউলির দানা।”
চৈতি বলে-“ওই বিউলি দানায় ধারও আছে, মুখে আঙুল দাও, দেখ কেমন কামড়ায়।”ভুবনদা হ‍্যা হ‍্যা করে হাসে, সাথে সুহানাও খিলখিলিয়ে ওঠে। দূর থেকে দেখে অলকেশ, কেন জানি না ওদেরকে বড় আপন ভাবতে মন চায়, মনে হয় একই পথের যাত্রী।
অলকেশ, ভুবনদা দুজনেরই ইচ্ছে সুহানার অন্নপ্রাশনটা হোক, চৈতির অল্প আপত্তি ছিল; ওর আপত্তিকে নস‍্যাৎ করে ঠিক হল হবে
অন্নপ্রাশন, স্বপ্ন সুন্দর -আশ্রমের বড় জায়গাতে শুধু আশ্রমিকদের নিয়েই হবে। শুধু ঠিক হওয়াটুকু বাকী ছিল, এই অনুষ্ঠানের প্রস্তাবে বাচ্ছা, বড় সবাই নেচে উঠল।
সামাজিক অনুষ্ঠানে মেতে ওঠার আনন্দ তো বিশেষ হয় না, এই সুযোগ। তবে প্রত‍্যেক আশ্রমিকের জন্মদিন খুব সুন্দরভাবে পালিত হয়। আপাতত সবার অনেক কাজ, ভাল দিন তো পাওয়া গেছে, এবার দরকার মতো কেনাকাটা। রান্না আশ্রমের ঠাকুররাই করবে, সবার পছন্দের পদই থাকবে। শুধু ব‍্যতিক্রমী কান্ড যেটা ঘটাল অলকেশ তা হল- সুহানার জন্য একটা সোনার হার কিনে
আনল। হারটা দেখে চমকে উঠে চৈতি বলল-” এসব বাহুল‍্যের কি দরকার ছিল, অনুষ্ঠানের খরচা আছে, আশ্রমের খরচ এসবের জন্য আমি কমাতে পারব না।” অলকেশ চমকালেও আশ্রম সম্পর্কে চৈতির অধিকার বোধে মনে মনে খুশি হয়। আশ্রমের বাচ্ছা, বড় সব মিলে অন্নপ্রাশনের জায়গাটাকে সুন্দর করে সাজায়, এসব দেখে চৈতির মনে হয় নিজের লোকেরা সুহানার আবাহনে সাথ দেয় নি, এরা সঙ্গে না থাকলে সে কোথায় ভেসে বেড়াত। ঠাকুরমশাইকে আগেই বলা ছিল,সুহানার পিতৃপরিচয় ছাড়া মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানটুকুর মধ্যে দিয়ে অন্নভক্ষণটুকু সম্পন্ন হবে, চৈতিকে কোন বিড়ম্বনায় ফেলা চলবে না। সুহানার প্রথম তরকারির আস্বাদ নেওয়া
দেখে ভুবনদা বলে ওঠে-“আমাদের বিউলি ঝাল খেতে শিখে গেছে।”অপলকে দেখছে অলকেশ-মনের মধ্যে অর্ধপ্রস্ফুটিত স্বপ্নেরা ডানা ঝাপটায়। আশালতাদেবী কাঁধে হাত রাখে, অলকেশের বিহ্বলতা চোখ এড়ায় না চৈতির। পায়ে পায়ে অফিস ঘরে আসে অলকেশ, ড্রয়ার থেকে একটা বিবর্ণ ছবি বের করে নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকে সেদিকে। পেছন পেছন দরজায় এসে দাঁড়ায় চৈতি,
জিজ্ঞেস করে-“ওটা কার ছবি?” হতবম্ব হয়ে তাকায় অলকেশ, মুখটা ব‍্যথায় ভরে আছে। আশালতাদেবী পেছন থেকে বলে-“উনি অলকেশের মা।” অলকেশ বাধা দেয়-“জ‍্যাঠাইমা”- আশালতাদেবী বলেন-“আমাকে বলতে দাও বাবা, আর কতকাল বুকে পাষাণ ভার নিয়ে ঘুরে বেড়াবে।”-চৈতি বলে-“ওনার যদি আপত্তি থাকে,তবে থাক।” অলকেশ টেবিলে মাথা রেখে এলিয়ে পড়ে। আশালতাদেবী বলে চলে-“এই আশ্রমে ঠিক তোমারই মতো অসহায় অবস্থায় এসেছিল অলকেশের মা-প্রভা, ঠিক তোমারই মতো প্রভারও কোন যাওয়ার জায়গা ছিল না, অলকেশের জন্ম এই আশ্রমেই। কিন্তু অলকেশের জন্মের পর ঐ সময় এতো কঠিন ধাক্কাটা প্রভা নিতে পারে না, অলকেশকে এখানে রেখেই আশ্রম ত‍্যাগ করে, শুনেছি শেষ অবধি আত্মহননকে মুক্তির পথ হিসেবে বেছে নেয়।আমিই ওকে কোলেপিঠে করে বড় করেছি।
চৈতি বলল-“তাই উনি সুহানার এতো খেয়াল রাখেন।”
আশালতাদেবী-“এখন তো ওর সর্বস্ব দিয়ে ও আশ্রমকে দেখে।” চৈতি অলকেশের কাছে গিয়ে গাঢ় স্বরে বলে উঠল-“আমরা একই ঝড়ের খেয়া, একই পথের যাত্রী, আজ থেকে- এ দুঃখকষ্ট ধুয়ে যাবে,হ‍্যাঁ হ‍্যাঁ অামিই ধুয়ে দেব, আপনি আমায় সুযোগটুকু দেবেন তো।” আশালতাদেবী বললেন-” তাই নাও মা, তুমিই সেই ভার নাও।”
ভুবনদার ডাকে আশালতাদেবী চলে যান। চৈতি অলকেশের হাতে হাত রাখে, অলকেশ সেই বন্ধনে সাড়া দেয়। দূর থেকে মঙ্গলশঙ্খের আওয়াজ ভেসে আসে। ভুবনদার কোলে চেপে সুহানা এসে অলকেশের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়, কোলে চেপে শার্টের বুকপকেটে এঁকে দেয় সদ‍্য খাওয়া ভাতের চিহ্ন। কচিকাঁচাদের কলকাকলিতে অফিস ঘর প্রাণ পেল।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।