মার্গে অনন্য সম্মান সুতপা ব‍্যানার্জী(রায়) (সেরার সেরা)

অনন‍্য সৃষ্টি সাহিত‍্য পরিবার

সাপ্তাহিক প্রতিযোগিতা পর্ব – ১১০
বিষয় – শিশুদিবস

ফটিক

ফটিক ওর কচি কচি হাতে এঁটো কাপ ডিশগুলো ধুয়ে
চায়ের দোকানের র‍্যাকে তুলে রাখছিল। দোকানে এখন একমাত্র খদ্দের বিষ্টুচরণ দুটো লেড়ো বিস্কুট দিয়ে চা খেতে খেতে স্নেহভরা চোখে ফটিককে দেখছে। চায়ের দোকানের মালিক ভোম্বল তো বলে ফটিক ওদের দূর সম্পর্কের আত্মীয়।ওর বাবা’মা মরতে ভোম্বলের আশ্রয়ে এসে আছে। ভোম্বল ফটিককে যেরকম খাটায় তাতে বিষ্টুচরণের মনে হয় লোক দেখাতে ঐ আত্মীয়তার গল্পটা ফেঁদে রেখেছে ও। বিষ্টুচরণের খুব ইচ্ছে ফটিককে নিয়ে গিয়ে নিজেদের বাড়ি রাখে,রিঙ্কির কোল ভরে দেয়।কিন্তু ওর মনের কথা মনেই মিলিয়ে যায়। ভোম্বলকে ভরসা করে সেসব কথা বলতে পারে না। বিনা বেতনে শুধু পেটে ভাতের এরকম লোক তো ভোম্বল আর পাবে না।ফটিককে কাছে ডেকে বিষ্টুচরণ পকেট থেকে একটা ক‍্যাডবেরী চকলেট বার করে দিল।
বিষ্টুচরণ সেদিন টাটকা রুই মাছ কিনে বাড়িতে রিঙ্কিকে গিয়ে বলল-“ভাল করে রেঁধো তো মাছটা।” রিঙ্কি বিস্মিত হয়ে-“এতক্ষণ কোথায় ছিলে,
তোমার খদ্দেররা সব বসে আছে,যাও কামারশালায় যাও।””হ‍্যাঁ যাই গো,ওখানেই তো আমার জীবন,রুজি এরপর মরণও বোধ করি ওখানে লেখা আছে।ওখানে তো যেতে হবেই।” বরের এরকম ভাবুক উত্তরে সন্দেহ প্রকাশ করে রিঙ্কি বলল-“সকাল থেকে কোথায় ছিলে?নিশ্চয়ই ভোম্বলের দোকানে গেছিলে ফটিককে দেখতে।”বিষ্টুচরণ মাথা চুলকে ধরা পড়ে যাওয়ার ভঙ্গিতে সলজ্জ হাসি হাসল।বিষ্টুচরণ ওখানে কাজ করতে করতে হঠাৎ একজন এসে খবর দিল-“ভোম্বলের দোকানে পুলিশ এসেছে,ও ভেগে পড়েছে।” পড়ি কি মরি করে ছুটল বিষ্টুচরণ ভোম্বলের দোকানের দিকে। গিয়ে দেখল ভোম্বলের দোকান তোলপাড় করছে পুলিশ, ফটিক এককোণে ভয় জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।ভোম্বলকে না পেয়ে পুলিশ ফটিককে নিয়ে টানাটানি করছে-“বল দোকানের মালিক কোথায়?মদের অবৈধ কারবার কতদিনের?”বাকী দোকানদাররা তামাশা দেখছে তবুও ফটিকের হয়ে কিছু বলছে না। বিষ্টুচরণ গিয়ে ফটিক আর পুলিশের মাঝে ঝাঁপিয়ে পড়ে ফটিককে বাঁচাতে বলে উঠল-“আপনারা আসল অপরাধীকে ধরতে না পেরে নিরপরাধকে নিয়ে টানাটানি করছেন।ও কি করে জানবে এসব,ঐটুকু দুধের ছেলে।
সকালে এই দোকানে ওকে আমি পাঠিয়েছিলাম, ও আমার ছেলে।”উপস্থিত জনতার উদ্দেশ‍্যে হাত নেড়ে বিষ্টুচরণ বলল-“পুলিশবাবুরা ভিন গঞ্জ থেকে এসেছেন,ওনারা কি করে জানবেন আসল কথা,তোমাদেরই বলা উচিত ছিল।” উপস্থিত জনতা এবার বিবেক দংশনে বলে উঠল-“হ‍্যাঁ বাবু,ও তো বিষ্টুরই ছেলে ওকে ছেড়ে দিন। ভোম্বলকে দেখতে পেলেই আমরা আপনাদের খবর দেব,নিশ্চিন্তে যান।”পুলিশ দোকান সিল করে দিয়ে নোটিশ ঝুলিয়ে দিয়ে গেল। ফটিকের গায়ে মাথায় হাত ভুলিয়ে,ওর ভয় কাটিয়ে বিষ্টুচরণ ওকে নিয়ে এল নিজেদের বাড়িতে।মনে মনে ভাবল এরপর যদি ফটিকের ব‍্যাপারে ভোম্বল বেগরবাই করে তবে শিশু শ্রম আইনে ওকে টাইট দেবে বিষ্টুচরণ। হুট করে এই কাজটা করে একটু চিন্তা হচ্ছিল ওর যে রিঙ্কি ফটিককে দেখে কী বলবে।বাড়ি গিয়ে জোরে জোরে হাঁকল-“রিঙ্কি আমাদের বাড়িতে কে এসেছে দেখ,তোমার গোপাল।আজ আমরা বাপ বেটায় একসঙ্গে মাছভাত খাব।”
রিঙ্কি দরজায় এসে বিষ্টুচরণের ওপর রাগতে গিয়েও ফটিককে দেখে আর চোখ ফেরাতে পারল না। এ যে
তার নিত‍্যপুজোর গোপাল।কী সরল,নিষ্পাপ মুখ। বিষ্টুচরণের কথার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ফটিকের দিকে তাকিয়ে রিঙ্কি বলল-“নিশ্চয়ই খাবে,শুধু আজ কেন,এবার থেকে রোজ খাবে,তুমি সদরে গিয়ে একটা পাকাপাকি ব‍্যবস্থা করে আসবে যাতে ভোম্বল ওকে আর কষ্ট দিতে না পারে। বিষ্টুচরণ আর রিঙ্কি দুজনে একসঙ্গে ফটিককে বলল-“কি রে খাবি তো?থাকবি তো আমাদের সঙ্গে?” ফটিক হেসে সম্মতি জানাল।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।