Cafe কলামে ডঃ সঞ্চারী ভট্টাচার্য্য – ৭

নিজের সম্বন্ধে আর কি বলি ! পেশায় একটি কলেজের অধ্যাপিকা , তবে পাশাপাশি সংগীত শিল্পী হিসেবেও কিছুটা পরিচিতি আছে। আছে বিভিন্ন ভাষার আর দেশের প্রতি আকর্ষণ , সেই টানেই বেশ কিছু বিদেশী ভাষা করায়ত্ত করার সৌভাগ্য হচ্ছে , হয়েছে দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতাও - তবে সেটা নিছক কর্মসূত্রে । সম্প্রতি বিভিন্ন দেশের জাতীয় সংগীত নিয়ে কাজ করছি আর অনেক অজানা তথ্য যা আমিও জানছি , সেগুলোই লেখার মাধ্যমে সবার সাথে ভাগ করে নিচ্ছি ।

কলকাতার ঐতিহ্য এই বিশ্বকোষ লেন

ইতিহাসের গন্ধ পেয়েছেন কখনো! কলকাতা মানে তিলোত্তমার অলি গলি একটু ঘুরলেই মিলবে এক অদ্ভুত গন্ধ- পুরোনো ইতিহাস মিশ্রিত স্মৃতির গন্ধ, যার ঐতিহাসিক মূল্য নেহাত কম নয়। কত অজানা গল্পের সম্ভার এই শহর। এক একটা রাস্তার নামের সাথে জুড়ে রয়েছে নানা ইতিহাস, সেই চিত্র কিন্তু কম রঙিন নয়। যেমন, কোনো বইয়ের নামে রাস্তার নাম যে হতে পারে তা ভাবা যায়কি ! হ্যাঁ, শুধু একটা বইয়ের নামে রাস্তা ! না, কলেজস্ট্রিট অর্থাৎ আমাদের চেনা বই পাড়ার কথা নয়। আজ সেই না জানা কথাই জানাবো।

উত্তর কলকাতার বাগবাজার অঞ্চলের নাম কারোর অজানা নয়। গিরিশ ঘোষ , বিখ্যাত কবিয়াল ভোলা ময়রা , সারদা মায়ের বাড়ি খ্যাত সেই বাগবাজার। সেখানকার কাঁটাপুকুর অঞ্চলে এলেই চোখে পড়বে ‘বিশ্বকোষলেন’। গোটা ভারতের প্রথম গ্রন্থ এনসাইক্লোপিডিয়া। তার নামেই আস্ত একটা রাস্তা! কিন্তু এতো বই থাকতে এই নাম কেন? এর সাথে ইতিহাস জড়িত। ওই রাস্তাতেই অবস্থিত নগেন্দ্রনাথ বসু’র বাড়ি। তিনি কে ? তাঁর সাথে বিশ্বকোষ নামটি জড়িয়ে আছে ওতপ্রোতভাবে।
১৮৬৬সালে নগেন্দ্রনাথের জন্ম মাহেশে। সেখান থেকে বাগবাজারে চলে আসেন তাঁর পূর্বপুরুষরা। আমৃত্যু এই বাড়িতেই থেকেছেন নগেন্দ্রনাথ। ছোটো থেকেই পড়াশোনায় অত্যন্ত মেধাবী হলেও মূলত প্রখ্যাত ঐতিহাসিক হিসেবেই তাঁর আত্মপ্রকাশ ঘটে। একটা সময় এশিয়াটিক সোসাইটির সদস্যও ছিলেন, সংগ্রহে ছিল অসংখ্য পুঁথি, পাণ্ডুলিপি।
কিন্তু এই যে গোটা পৃথিবীতে এত সব আশ্চর্য জিনিস ছড়িয়ে আছে, কত বিষয়— সেগুলো বাংলার সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতেই অসীম জ্ঞান ভান্ডারের অধিকারী এই মানুষটি খানিক অগ্রণী হয়েই বিশ্বকোষ রচনা করেন। ইতিমধ্যেই বাংলা থেকে ইংরেজি অভিধান ‘শব্দেন্দুমহাকোষ’, ‘শব্দকল্পদ্রুম’ সম্পাদনা করেছিলেন তিনি। অবশেষে তাঁর ইচ্ছাপূরণ হল। ১৮৮৭সালে রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় ও ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের যৌথ উদ্যোগে তৈরি হয় ‘বিশ্বকোষ’। বাংলার প্রথম এনসাইক্লোপিডিয়া। শুধু বাংলা নয়, গোটা ভারতীয় ভাষায় প্রথম এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরের বছরই বিশ্বকোষের দায়িত্ব চলে আসে নগেন্দ্রনাথ বসু’র হাতে। তারপর থেকে দীর্ঘ ২২বছর বিশ্বকোষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল অটুট। প্রায় ১৭হাজার পৃষ্ঠার মোট ২২টি খণ্ড সংকলন করেন এই সময়। ১৯১১সালে সেটা প্রকাশ পায়।
১৯৩৩-এ আবারও বিশ্বকোষের কাজ শুরু করলেও তাঁর মৃত্যু হয়। ১৯১৫সালে কলকাতা কর্পোরেশন তার বাড়ির সামনের কাঁটাপুকুরের ওই রাস্তাটির নতুন নামকরণ করে ‘বিশ্বকোষ লেন’। এখানেই ছিল নগেন্দ্রনাথবসু’র বাড়ি। যদিও এমন উদাহরণ সারা বিশ্বে আর একটি মাত্র আছে। নেইলগেইম্যানের লেখা বইয়ের নামানুসারে ইংল্যান্ডের সাউথসী-র এক রাস্তার নামকরণ করা হয়েছিল। বলতে দ্বিধা নেই সারাবিশ্বে বইয়ের নামে রাস্তার নামকরণে প্রথম নজির এই কলকাতার- যা অনন্য এক ঐতিহ্যও বটে।
Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!