গল্প গাথায় সায়র ব্যানার্জী

বাবার মেয়েটি

তারপর অবনীবাবু চেকবইটা বার করে কাঁপাকাঁপা হাতে কলমটা নিলেন। তাঁর জমানো সমস্ত সঞ্চয় দিয়ে দিলে এবার হয়তো বাড়িটাই বন্ধক রাখতে হবে। তিনি এমাউন্ট লিখে সই করবেন, তার আঙুল কাঁপছে।
মিস্টার সেন হাসতে হাসতেই বললেন – ‘আরে মশাই এ তো আর পণ নয়, এ রীতি আমাদের পরিবারের বহু পুরোনো। এ এক ঐতিহ্য বহন করে। আপনার একটি মাত্র মেয়ে, কয়েক লক্ষ টাকার জন্য নাক সিটকাবেন না প্লিজ’।
নীহারিকা এতক্ষণ শক্ত চোয়ালে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখে ঘনিয়ে আসা মেঘ। সে আর থাকতে না পেরে এবার এগিয়ে এসে একটানে বাবার হাত থেকে কলমটা কেড়ে নিল। অবনীবাবু কি একটা বলতে যাচ্ছিলেন, তবে সময় পেলেন না।
নীহারিকা কলমটার দিকে তাকিয়েই বলতে শুরু করলো-
‘আপনাদের এই চুক্তিপত্রের ঐতিহ্য বহন করার দায় আমার বা আমাদের কারোর নেই। এতক্ষণ, সরি! এতদিন চুপ করে ছিলাম তার সম্পূর্ণ দায় যদিও আমার বাবার দেওয়া শিক্ষার। তবে সেটাও ভেঙে গেল যখন দেখলাম ওই মানুষটার কলম ধরা আঙুলগুলো কাঁপছে। সেই আঙুলগুলো যেই আঙুলগুলো ধরে আমি প্রথম হাঁটা শিখেছিলাম, সেই আঙুলগুলো যেই আঙুলগুলো ছোটবেলার রাস্তা পারের সময় এখনকার জেব্রাক্রসিং বা সিগনালের থেকেও সেফ মনে হত, সেই আঙুলগুলো যে আঙুলগুলো রাজা-রাণীর গল্পের শেষে মুখে ভাতের শেষ গ্রাসটা তুলে দিত, আজ সেই আঙুলগুলো আপনার এই বালের চুক্তিপত্রের জন্য কাঁপছে দেখে কি করে চুপ করে থাকি বলুন’?
মিস্টার সেন তার লাল হয়ে যাওয়া বাংলার পাঁচের মত মুখটা নিয়ে তেলে বেগুনে জ্বলে বললেন
– ‘বাহ! কী শিক্ষা দিয়েছেন মুখার্জীমশাই আপনার মেয়েকে! এই শিক্ষা, এই মুখের ভাষা! ছি’!

নিহারীকা অকপটে হালকা হাসি ঠোঁটে এনে বলল-
‘এতদিন তো বাবার সাথে কথা হল। শুনুন না, আমি বলি কি এই এক টাকাটা রাখুন। দেখুন, আমরা নিম্নমধ্যবিত্ত হতে পারি, তবে ভিখারীদের সামার্থমত সাহায্যও করি। পার্সে এক টাকাই ছিল বিশ্বাস করুন’।

মিস্টার সেন উঠে দাঁড়িয়ে কাঁপা গলায় আগের মতই মেজাজ নিয়ে বললেন – ‘আমি কী করবো! এক টাকা নিয়ে’?
– ‘মারান! সরি, সারান…আপনাদের চির-বালের..উফ! কালের ঐতিহ্য। নমস্কার, বেরোনোর দরজাটা মনে আছে তো?’
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।