– হোয়াট? একটা সেন্সলেস ছেলে কে পাওয়া যাচ্ছেনা মানে? এসব কি বলছেন?
– আপনারা হসপিটালে আসুন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। পুলিশ কেও ইনফর্ম করতে হবে।
এই বলে ওপার থেকে ফোন কেটে যায়। পিয়ালী র মুখ পাংশু হয়ে যায়। ছেলে কে সুস্থ করে তোলার আশাটুকু যেন হারিয়ে যাচ্ছে। রৌনক তাড়াহুড়ো করে হসপিটালের উদ্দেশ্যে বেরোতে যাচ্ছিল তখন অসীম বাবু ওদের কে বাধা দিয়ে বলেন,
– আমার মনে হয় হসপিটাল বা পুলিশ স্টেশনে না গিয়ে কোথায় গেলে রিক কে পাওয়া যেতে পারে তা আমি আন্দাজ করতে পারছি। প্রথম থেকেই মনে হচ্ছিল বিপদ মাথার ওপরে কিন্তু সেটা এতটা ঘনিয়ে এসেছে ভাবতে পারিনি। অনেক সময় নষ্ট হয়ে গেছে। আত্মাটা দেহকে প্রায় কব্জা করে ফেলেছে। এক্ষুনি চলো তোমরা আমার সাথে।
সান্তা দেবী, পিয়ালী ও রৌনককে সাথে নিয়ে অসীম বাবু রওনা হলেন সান্তা দেবীর বাড়ির উদ্দেশ্যে। সাথে একটা ব্যাগে ভরে নিলেন প্রয়োজনীয় কিছু সামগ্রী। সবার মুখেই এক অজানা আতঙ্কের ছাপ।
স্ত্রী সান্তা ওই দম্পতিকে নিয়ে বেরিয়ে যেতে পরেশ বাবু আবার নিজের কাজে মন দেওয়ার চেস্টা করছিলেন। হ্যাঁ চেষ্টা করছিলেন বলাই ভালো কারণ মন টা তার বারবার ফিরে যাচ্ছিল পুরোনো সেই ঘটনায়। আচ্ছা যা ঘটেছে তাতে সত্যিই কি তার দোষ ছিল? অনেকেই তো ওরকম ভাবে বিল্ডিং এর কাজ শেষ করে। তৈরির সময় যে সব জিনিসপত্র ব্যবহার করার কথা ছিল তার থেকে একটু কম দামি জিনিস ব্যবহার করা হয় তাতে উপড়ি কামাই টা ভালোই হয়। ইলেকট্রিকের কানেকশান গুলোও একটু শর্টকাটে সারা হয়েছিল কিন্তু তাতে যে দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে এমন তো কোনো কথা নেই। তিনি কোনোভাবেই এসবে জড়িত নন। তাও কেন নিজেকে মাঝে মাঝে অপরাধী বলে মনে হয়! আর এই অসীম বলে লোকটা। সান্তার মাথা টা তো খেয়েছে এবার বাকি লোকগুলোর ও মাথা খারাপ করে দেবে। আজ কাজের মেয়েটাও তাড়াতাড়ি ফিরে গেছে। বাড়িটা যেন খাখা করছে। আজকাল একা থাকতে কেমন যেন লাগে পরেশ বাবুর। বয়স তো হচ্ছে, তার বংসের প্রদীপ বলতে কেউ নেই যে এবার তার দায়িত্ব গুলো কাঁধে নেবে। সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে কিচেনের দিকে পা বাড়ায় পরেশবাবু। এক কাপ চা খেলে মাথা টা একটু পরিষ্কার হয়, এই সান্তা টাও হয়েছে তেমন, খেয়ে কাজ নেই চললেন মহারানী লোকের উপকার করতে। আরে ওদের ছেলে অসুস্থ তো আমরা কি করতে পারি! আরে ওটা কে!
কিচেনে যেতে গিয়ে হঠাৎ পরেশবাবুর নজরে পড়ে ড্রয়িং রুমে একটা কে যেন দাঁড়িয়ে আছে, একদম ছোট কোনো মানুষের ছায়া। তাড়াতাড়ি গিয়ে আলো জ্বালাতে দেখেন কেউ নেই। অন্য কিছুর ছায়া দেখে ওরকম মনে হল এই ভেবে আলো নিভিয়ে আবার কিচেনে র দিকে পা বাড়ালেন। গ্যাস জ্বালিয়ে চা এর জল চাপাতেই ওনার কানে গেলো আরেকটা শব্দ, এবার শব্দটা আসছে ওনার ঘর থেকেই, কেউ ওনার ঘরের টেবিল থেকে সব ফাইল ফেলে দিচ্ছে মনে হচ্ছে। কোনো চোর ঢুকে থাকতে পারে এই ভেবে দৌড়ে ঘরে এসে দেখেন কোনো কিছুই হয় নি সব যেমন ছিল তেমন ই আছে, কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে উনি টের পেলেন আরেকটা গন্ডগোল, গোটা বাড়িটা আস্তে আস্তে ভরে উঠছে একটা বাজে গন্ধে আর গন্ধটা আসছে কিচেন থেকেই। বাড়ি থেকে বেরিয়ে পালাবেন কিনা এই খেয়াল মাথায় আসতে আসতেই প্রচণ্ড জোর একটা শব্দ….
চারজনে একটা গাড়ি করে এসে বাড়ির সামনে নামলো। দেখলো পাড়ার কিছু লোক বাড়ির সামনে জড়ো হয়েছে, দমকলের একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে, হয় তো এনারাই খবর দিয়েছিলেন। আগুন প্রায় নিভে এসেছে তবে এক অপার্থিব কালো ধোয়া যেন গোটা বাড়িটাকে গ্রাস করেছে। ওরা দেখতে পেলো দমকল কর্মীরা ভিতর থেকে দুটো দেহ বার করে নিয়ে আসছে, কাছে অন্তেই বোঝা গেলো একটি দেহ প্রায় পুরো পুড়ে যাওয়া মৃত পরেশ বাবুর ও অন্য দেহটি অক্ষত তবে অচৈতন্য রিকের! সান্তা দেবী তৎক্ষনাৎ জ্ঞান হারালেন। পরেশবাবুর দেহ, ঋক ও সান্তা দেবী সবাইকেই হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হল।
পুলিশ এলো, জিজ্ঞাসাবাদের পর্ব শেষ করে চলেও গেল। কে কি উত্তর দেবে! হসপিটাল কর্তৃপক্ষ, রৌনক পিয়ালী কারুর কাছে কোনো উত্তর নেই, তারা নিজেরাই বুঝতে পারছেনা কিভাবে কি হল! আর যার কাছে উত্তর পাওয়া যাবে সে তো আবার অচৈতন্য হয়েই পড়ে আছে। তবে সারাক্ষণ অজ্ঞান হয়ে থাকা ঋক কে হসপিটাল থেকে পরেশ বাবুর বাড়ি কে নিয়ে গেল! তার পক্ষে নিজে থেকে যাওয়া তো অসম্ভব। এমনিতেই ওইটুকু বাচ্ছা রাস্তা ঘাট চেনেনা তাছাড়া হসপিটালের সিকিউরিটির চোখ এড়িয়ে সে গেল কি করে আর কেউ নিয়েই বা যায় কি করে! কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসে থাকে সবাই। ধীরে ধীরে জ্ঞান ফেরে সান্তা দেবীর, তবে স্বামীর মৃত্যু শোকে সে বিহ্বল তাই কারুর সাথে কোনো কথা বললেন না।
এতক্ষন অসীম বাবু দোষীর মত চুপ করে দাঁড়িয়েছিলেন। কোনোকিছু করার সুযোগ পেলেন না যে! বুঝতে বড় দেরি করে ফেললেন। কিন্তু আর সময় নষ্ট করা যাবেনা একেবারেই। তাই ঋক আর সান্তা দেবী কে বেডে রেখেই পিয়ালীদের চোখের ইশারায় বাইরে বেরিয়ে আসতে বললেন।