মার্গে অনন্য সম্মান শংকর ব্রহ্ম (সেরার সেরা)

অনন্য সৃষ্টি সাহিত্য পরিবার

সাপ্তাহিক প্রতিযোগিতা পর্ব – ৯০

বিষয় – বিদ্রোহী কবি নজরুল

বেদনার বালুচরে

বাস্তবতা অনেক সময় কল্পনাকেও হার মানায়। এটা এমনই বাস্তবের এক মর্মান্তিক করুণ কাহিনী। গল্প হলেও সত্যি।
নজরুলের জীবনের শেষ চৌত্রিশবছর ছিল মর্মান্তিক । অনেক অবহেলা আর বঞ্চনার শিকার হয়েছিলেন তিনি।
১৯৪২এর ৯ই আগষ্ট থেকেই কবি অসুস্থ হয়ে পড়েন । তখন তিনি আক্ষরিক অর্থেই কপর্দকশূন্য । সংসারে দুই শিশুপুত্র , পক্ষাঘাতগ্রস্ত স্ত্রীপ্রমীলা , শাশুড়ি গিরিবালা । ১৭০০ গানের রেকর্ডে লক্ষ লক্ষ টাকা মুনাফার করেও গ্রামোফোন কোম্পানী তার কোন রয়ালটি দেননি ,তাঁর লেখার প্রকাশকরা ফিরেও তাকাননি।
কবির অসুস্থতার কারণ , ‘নবযুগ’ সম্পাদনা কালে একবার কবি উত্তরপাড়ার এক অনুষ্ঠান থেকে ফেরার সময় , একদল দুষ্কৃতিদের দ্বারা প্রহৃত হয়েছিলেন , তাঁর ঘাড়ে ও মাথায় কঠিন আঘাত লাগে। নির্বাক কবি যখন বাংলাদেশে (১৯৭২), তাঁর চিকিৎসার জন্য গঠিত মেডিকেলবোর্ড, কবির ঘাড়ের পুরাতন কঠিন আঘাতের চিহ্নটি সনাক্ত করেছিলেন ।
তার একবন্ধু জুলফিকার হায়দার খবরের কাগজে প্রচার করে দেন নজরুল ‘উন্মাদ’ হয়ে গেছেন ।
শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের আর্থিক সহায়তায় কবিকে স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য মধুপুর পাঠানো হল ১৯৪২-এর ১৯ শে জুলাই , কিন্তু অর্থ শেষ হয়ে যাবার পর কলকাতায় ফিরিয়ে আনা হয় ২১শে সেপ্টেম্বর । ১৯৪৪-এর ২৪শে মে আনন্দবাজার পত্রিকার ‘কবি নজরুল পীড়িত’ শিরোনামে একটি আবেদন প্রচারিত হয়।
এরপর কয়েকটি সাহায্য সমিতি গঠিত হয় । কলকাতার সুখ্যাত চিকিৎসকেরা কবিকে দেখেন একাধিকবার , কিন্তু নিরাময়ের কোন লক্ষণ দেখা যায় না । কবি কাজী আবদুল ওদুদের উদ্যোগে গঠিত ‘নজরুল নিরাময় সমিতি’র উদ্যোগে কবিকে রাঁচির মানসিক চিকিৎসালয়ে পাঠানো হয় ১৯৫২র ২৫শে জুলাই । কিন্তু চারমাস চিকিৎসাধীন থেকেও তাঁর কোন উন্নতি না হওয়ায় ফিরিয়ে আনা হয় কলকাতায় । পরের বছর ১০ই মে ১৯৫৩ কবিকে নিয়ে যাওয়া হয় লন্ডনে। সেখানকার চিকিৎসকেরা মতপ্রকাশ করেন যে কবির ব্রেন কুঁকড়ে গেছে অর্থাৎ মষ্টিস্কের সংকোচন হয়েছে । লন্ডন থেকে ১০ই ডিসেম্বর নজরুলকে নিয়ে যাওয়া হয় ভিয়েনায় । সেখানেও চিকিৎসকের অভিমত ছিল কবিকে আর সুস্থ করে তোলা যাবে না । এরপরেও পূর্ব জার্মানীর বন বিশ্বিবিদ্যালয়ের ছাত্ররা এক রুশ ডাক্তারকে দিয়ে পরীক্ষা করিয়েছিলেন । তাঁর অভিমত ছিল যে অনেক দেরি করে রোগীকে আনা হয়েছে। সাতমাস বিদেশে বৃথা চেষ্টার পর কবিকে ফিরিয়ে আনা হয় কলকাতায় ১৯৫৩-র ১৪ই ডিসেম্বর ।
এর পরেও তেইশ বছর জীবিত ছিলেন নজরুল। অভাবের তাড়না , মানসিক কষ্ট , নিঃসঙ্গতা , পরিচিত বন্ধুদের দূরে চলে যাওয়া , অবহেলা এসবই ছিল কবির শেষ জীবনের সঙ্গী । পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃক বিনা ভাড়ায় থাকার জন্য ফ্ল্যাটের বন্দোবস্ত ও দুইবাংলা থেকেই লিটারারি পেনশনের ব্যবস্থা হওয়ার পর কিছুটা স্বস্তি এসেছিল । ১৯৬২র ২৩শে জুন স্ত্রী প্রমীলার দেহাবসান পর , কবি আরও ভঙে পড়েন।
জীবনের শেষ চারটি বছর কবি বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় অতিথির মর্যাদায় তাঁর প্রাপ্য সমাদর পেয়েছিলেন ।
মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় কবিকে সমাহিত করেন বাংলাদেশ সরকার।
তারাই মৃত্যুর পর তাঁকে ‘জাতীয় কবি’ হিসাবে সম্মানিত করে কবিকে যোগ্য মর্যদা দিয়েছেন।

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!