সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায় (পর্ব – ২৯)

ইচ্ছামণি

পর্ব ২৯

ঘরখানা জবরজং হয়ে আছে। কত কিছু খুঁজে পাওয়া যায় না এই এলোমেলো স্তূপে। রোজই ভাবে রুমা সব গুছিয়ে রাখবে। কিন্তু মেয়েকে স্কুল আর অতীনকে অফিস পাঠানোর মতো অত্যাবশ্যকীয় কাজদুটো করার পর ঘরদোর ঠিকঠাক রাখার কাজটাকে বাড়তি মনে হয়। তাই ‘আজ করব কাল করব’ করে ধূলোর ওপর ধূলো চড়ে, খাতাপত্রের স্তূপে ব্যাঙ্কের পাসবুক হারিয়ে যায়, গ্যাসের বই খুঁজে পাওয়া যায় না, কলমদানিতে পেন থাকে না, নিজের লেখা গল্প আবিষ্কার করে কাগজওয়ালাকে কাগজ বিক্রি করতে গিয়ে। মেয়ে সদ্য উঠে বারান্দায় টবের মাটি নিয়ে খেলছে। খেলুক, আর পিট পিট করবে না; খাবার আগে হাতদুটো ধুইয়ে দিলেই হবে। এত যার বাতিক, শুচিবাই, সে কীভাবে এমন অগোছালো বিশৃংখলার মধ্যে থাকে নিজেই ভেবে পায় না। পরিচ্ছন্নতার প্রাথমিক ধাপ তো গোছগাছ।
কিন্তু এই সময় যে বড় ঘুম পায়; ভারি চমৎকার মৌতাত তাতে। ঢুলুঢুলু চোখ ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসে, চেতনা আচ্ছন্ন হয়ে আসে। রুমা ঘুমের আমন্ত্রক হিসাবে খবরের কাগজ খুলে বিছানায় আধ শোয়া হল। হঠাৎ মনে পড়ল, কতগুলো জরুরি জিনিষ কিনব কিনব করে কেনা হচ্ছে না। তাই ঝট করে উঠে বসে বাজারের একটা ফর্দ বানিয়ে নিয়ে মেয়েকে বাড়িওয়ালার ছেলেমেয়ের জিম্মায় সকুণ্ঠায় চালান করে দরজায় তালা ঝোলাল। তার আগে সপ্তাহভর জমানো এক ডাঁই জামাকাপড় সাবানজলে ভিজিয়ে দিল। ফিরে এসে যন্ত্রের সাহায্যে কাচবে। বাড়িউলি শম্পাদি মেশিনে কাপড় কাচলে বেশি জল খরচ হয় বলে মেশিন চলার আওয়াজ পেলেই খিটিমিটি করে, দরজায় টোকা মেরে জানতে চায় আর কতক্ষণ বিদ্যুৎ সংযোগে ও জলের উৎসে অত্যাচার চলবে। কিন্তু রুমাদের কাপড় কাচুনি ও সাময়িক রাঁধুনি লাভলিকে তো ওরাই তাড়িয়েছে। তার দোষ, চৌধুরী দম্পতির ন্যায়সম্মত দাবিটা মানতে চায়নি, যে ভাড়াটেদের কাছে যখন মাস মাইনে বা বালতি পিছু নগদ টাকা পাচ্ছেই, তখন বিনা পয়সায় বা যৎসামান্য পারিশ্রমিকে বাড়িওয়ালাদের লাট লাট কাপড় কেচে দেওয়াটাও তার কর্তব্য। ‘অশিক্ষিত ঝি শ্রেণীর মেয়ে’ নিজের গতর আর গতর খাটানোর দাম অর্থমূল্যে বোঝে, সাম্যবাদী সমাজতন্ত্রী স্কুল মাস্টারের বোঝানো দাতব্য কর্তব্যকর্মের তত্ত্ব মাথায় ঢোকেনি। ফলত তার রুমাদের কাপড় কাচার জন্য তপন চৌধুরীর বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে ঢোকাও নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। আর বাধ্য হয়ে অতীনকে কিনতে হয়েছে কাপড় কাচা মেশিন।
[২১০৭ শব্দ]
১২
বাজার করে ফেরার পথে রেল লাইন পেরোতে গিয়ে বিরাট জোরে হোঁচট খেয়ে সবশুদ্ধু রেলশয্যা। লোকজন ধরাধরি করে উঠিয়ে দিল। থলিতে কুড়িয়ে দিল ছড়িয়ে পড়া ফল, তরকারি। কনুই খানিকটা কেটে গেছে। তবু স্টেশন থেকে বাড়ি পর্যন্ত হেঁটে আসতে পারত। কিন্তু শুভানুধ্যায়ীদের উদ্যোগে রিকশায় চাপতে হল। খামোকা পনেরোটা টাকা ধসে যাবে। রিকশায় উঠতে উঠতে শুনল, “ দিদি টেডভ্যাক নিয়ে নেবেন আর …”
কত কাজ আজ তার জমানো। বেরোনোর আগে কাপড় ভিজিয়ে এসেছে। সারা সপ্তাহ ঝিমিয়ে থেকে এক একদিন তেড়েফুঁড়ে ঘরবার সমস্ত সমাধা করে বরকে তাক লাগিয়ে দিতে চায়। মানুষটা আজ কথাকাটাকাটির জেরে রাগ করে অফিস গেছে। অতীনের অবশ্য বক্তব্য, “এ তো সব গৃহবধূই করে থাকে।” “কিন্তু সব বৌ কাটুম কুটুম পারে কি?” “কিন্তু তারা যা আছে তা সজিয়ে গুছিয়ে রাখতে পারে।” “সব হাউসওয়াইফ কি সঞ্চয়, ইনভেস্টমেন্ট নিয়ে মাথা ঘামায়? আজ যেটুকু যা জমেছে, মেয়েটাকে যে ভালো স্কুলে দেওয়া গেছে, সব এই অকর্মণ্য বৌটার জন্য।” “তোমায় অত মাথা ঘামাতে কে বলেছে? শেয়ারের কথা বাদ দিলে যে? সংসারটাকে নিয়মানুবর্তিতার ছন্দে বেঁধে রাখো, বাকি সব আপসে হবে।” “তুমি তো আমার ঘর সাজানো, কাজকর্ম কোনওটারই প্রশংসা করো না।” “প্রশংসার কী আছে? ও তো সবাই করে এবং রোজ করে। তোমার মতো মাথায় পোকা নড়লে নয়।”
কোনও মানে হয়? রিকশায় আসতে আসতে অতীনের সাথে কাল্পনিক তর্কাতর্কি করে চলেছিল। রিক্‌শাওয়ালা দুবার “কী হল” বলে মাথা ঘুরিয়েছে। “এই, এই, এই! বাড়ি এই তো ছেড়ে এলাম। এখানেই দাঁড়াও।”
যা! টেডভ্যাক নেওয়ার ছিল। ওষুধের দোকান তো আগেই ফেলে এসেছে। কিছু হবে না বোধহয়। এখন অতীন জানতে পেরে রাগ না করলেই হল। রিকশাওয়ালাও বিরক্ত। সারাক্ষণ আপন মনে বকবক করে এল, আর বাড়ি ছাড়িয়ে চলে যাচ্ছে বলতে পারে না?
ঘরে ঢুকে আগে রাস্তায় গড়াগড়ি খাওয়া সব্জিগুলোকে ভালো করে ধোয়া শুরু করল। যে সমস্ত ফল বা সব্জির খোসা ছাড়ানো যায় না, যেমন টমেটো, ক্যাপসিকাম, বেগুন, ঢেঁড়স বা আপেল, আঙুর, পেয়ারা ইত্যাদি বার বার ধুলেও শান্তি হয় না। জানে ওগুলো ওরকম নোংরা মেখেই ক্রেতাদের হাতে আসে। কিন্তু নিজের চোখে দেখলে বাড়তি সাফাই করতেই হয়?
আঙুর সাবধানে কচলে ধোয়ার সময় একটা শক্ত কী যেন হাতে লাগল। দেখেছ! হুবহু আঙুর রঙা একই আকার ও আকৃতির একটা পাথর গছিয়ে দিয়েছে ফলওয়ালা। আলাদা করলে একটা আলগা দ্যুতি বেরোচ্ছে। কিন্তু ফলগুলোর সাথে মিশে থাকলে আর আলাদা করা যাচ্ছে না। এমনও হতে পারে, আঙুরগুলো রেইল ট্র্যাক থেকে প্যাকেটে তোলার সময় পাথরটা আঙুরের সাথে চালান হয়ে গেছে। নুড়ি সাজিয়ে রাখার পাত্র থাকলে রাখা যেত। আর ফেলে দিলেই বা কী? কিন্তু কেন কে জানে, পাথরটা খুব সাধারণ মনে হল না। আলমারিতে তুলে রাখবে। সাতপাঁচ ভেবে পাথরটা রুমা আলাদা করে রান্নাঘরের স্ল্যাবেই রেখে দিল।
এখন রাশি রাশি কাজ বাকি। সবে মাত্র ফল আর সব্জিগুলো ধোয়া হয়েছে। জল ঝরে শুকিয়ে গেলে ফ্রীজে তুলে রাখতে হবে। ততক্ষণে মেশিনে কাপড়গুলো কেচে ফেলা যাক। এক ঘণ্টার ওপর ভেজানো রয়েছে। যাঃ! লোডশেডিং। কী হবে? বাকি গৃহকর্মের ফাঁকেই কাচাটা সেরে ফেলবে ভেবেছিল। ধুস্‌! একজন সর্বক্ষণের মহিলা পেলে বড় ভালো হয়। হাতে থুবে কাপড় কাচা অসম্ভব। কোমর সোজা করে দাঁড়াতেই পারবে না, হাত-কাঁধ খুলে রাখতে ইচ্ছা করবে। আর রুমা কেন কৃচ্ছসাধন করবে, যার বরের মাইনের একটা অংশ দাক্ষ্যিণ্যে বেরিয়ে যায়? ওর কোনও কাজ করতে ভালো লাগে না। সংসারের দায়িত্ব অন্যেকে দিতে, এমনকি সপত্নীকে দিতে হলেও আপত্তি নেই। তার ওপর ছেড়ে সার দিনটা শুয়ে শুয়ে পার করে দিতে পারলে বেশ হত। রুমার চাহিদাটুকু তো হল বিশ্রাম।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।