“কি চায় ও” ধারাবাহিক বড়ো গল্পে সায়নী বসু (পর্ব – ১)

“যাক এবার তুমি নিশ্চিন্ত তো?”
“হ্যাঁ এবার একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বাঁচবো। ওই হইহট্টগলের মধ্যে না ঋকের ঠিকমত পড়াশোনা হয় না একটু প্রাইভেসি আছে। এই জায়গাটা বেশ ভালোই, আমার তো পছন্দই হয়েছে, দক্ষিণে বারান্দাওয়ালা এরকম ফ্ল্যাট এত কম দামে যেন অবিশ্বাস্য! কি ভাবছো আবার? চা খাবে? আমি এই কিচেন টা একটু সাজাচ্ছিলাম।”
রৌনক ও পিয়ালী তাদের ছোট্ট ছেলে ঋক কে নিয়ে বারুইপুরের একান্নবর্তী পরিবার ছেড়ে সদ্য উঠে এসেছে লেকটাউনের এই ফ্ল্যাট টাতে। যদিও সবাইকে কারণ দেখিয়েছে রৌনকের অফিস যাতায়াতে সুবিধে হবে বলে কিন্তু আসল কারণটা ছিল অন্য। ছোট থেকে একা বড় হওয়া পিয়ালী কুড়ি বাইশ জনের সংসারে মানিয়ে নিতে পারছিলনা। খুড়তুতো জাঠতুতো জায়েদের সাথে প্রায়েই ঝামেলা বাঁধত। সত্যিইতো একান্নবর্তী পরিবারে থাকতে হলে প্রাইভেসি শব্দটা মাথায় আনা যায়না, যে কারণে আজকাল একান্নবর্তী পরিবার খুবই বিরল। তাই পিয়ালী অনেকদিন ধরেই ইচ্ছে প্রকাশ করেছে আলাদা হওয়ার, তবে যতদিন রৌনকের মা বাবা ছিলেন ততদিন রৌনক পিয়ালীর কথায় সায় দেয় নি, কিন্তু ওনারা একে একে গত হওয়ার পর রৌনকেরও বাড়ির প্রতি টান কমে গেছে তাই শেষমেশ সে ও রাজি হয় পিয়ালীর প্রস্তাবে। পিয়ালীর কোন এক বান্ধবীর মাধ্যমে এই ফ্ল্যাটের খবর পায় তারা এবং সব দেখেশুনে ভালো লাগায় ফ্ল্যাট টা কিনে নেয়। সবেমাত্র দুদিন হল এখানে এসেছে, এই দুদিন লেগে গেছে সবকিছু গোছাতে, তাও এখনও অনেক কিছু কেনা ও গোছানো বাকি। এক ধাক্কায় এতটা খরচ করা রৌনকের পক্ষে মুশকিল হচ্ছে কিন্তু সংসার গোছানো অত সহজ নয় এটুকু তো লাগবেই। কিন্তু এসবের মধ্যে ঋক টা কেমন মনমরা হয়ে গেছে। পুরনো সব খেলার সাথীদের ছেড়ে এসে হয়ত এখানে একা লাগছে তার। রৌনকের জন্য চা বানিয়ে এনে পিয়ালী আবার বলতে শুরু করলো,
– যতদিন না ওভেন সিলিন্ডার সব দেয় আমায় মিনি গ্যাসে কাজ সারতে হবে। একটু দেখো না যাতে তাড়াতাড়ি দেয় । আর একটা ফ্রিজ কিনতে হবে তো। ও বাড়িতে নিজেদের আলাদা কিছু কিনে রাখার জো ছিল নাকি! সবাই মিলে হামলে পড়ত। এখন তো শুধু আমরাই ব্যবহার করব। একটা ফ্রিজ ভীষণ দরকার।
রৌনক কে একটু অন্যমনস্ক থাকতে দেখে আবার বলে ওঠে,
– কিগো শুনতে পেলে?
– হ্যাঁ দেখছি কি করা যায়।
এই বলে রৌনক বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়।
ডিনারের সময় একত্র হতে রৌনক পিয়ালী কে বলে –
এ্যাপার্টমেন্ট এর কেয়ার্টেকারের সাথে একটু গল্প করছিলাম। জিজ্ঞেস করছিল কোথায় থাকতাম আগে এখানে কেন এলাম এসব। ওর বাড়ি শিলিগুড়িতে কাজের জন্য এখানে পড়ে থাকতে হয়, বলছিল বউ বাচ্ছার জন্য মাঝেমাঝে মন খারাপ করে।
পিয়ালী এক মনে ঋক কে খাইয়ে চলেছে, কোনো উত্তর দিচ্ছে না দেখেও রৌনক বলে চলে,
– ওকে আমাদের অসুবিধার কথা বলছিলাম যে এত কম সময়ে এতকিছু অ্যারেঞ্জ করা অনেক টাকার ব্যাপার ম্যানেজ করতে অসুবিধা হচ্ছে। শুনে ও বললো এই ফ্ল্যাটে আগে যারা থাকতো তারা নাকি হঠাৎ কোথায় চলে যায়, অনেক জিনিস নিয়েও যায়নি নাকি। আমরা এখানে আসার আগে এপার্টমেন্টের মালিক ওগুলোকে সরিয়ে নিয়ে গেছে। তার মধ্যে ফ্রিজ বইয়ের তাক, আরো অনেক রকম আসবাবপত্র ও আছে যেগুলো হয়ত উনি বিক্রি করবেন। আমি যদি চাই ওগুলো অনেক কম দামে পেয়ে যেতে পারি।
এতক্ষণে পিয়ালী তাকায় রৌনকের দিকে এবং যথেষ্ট বিরক্তি ভরা কণ্ঠে বলে,
– তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? কার না কার পুরনো জিনিস কমে পাবে বলেই নিয়ে নেবে? আমার সেকেন্ড হ্যান্ড জিনিস একদম পছন্দ নয়। আচ্ছা আগে যারা থাকতেন তারা হঠাৎ চলে গেলেন কেন? কোথায় গেলেন! আর গেলেন তো গেলেন জিনিসগুলো এভাবে ফেলে রেখে গেলেন কেন?
আকস্মাৎ এত প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে এটা রৌনক ভাবতে পারেনি,
– আরে বললো তো কোথায় গেছে জানেনা। আমি আর বেশি প্রশ্ন করিনি।
– অদ্ভুত মানুষ তো তুমি! যা জানবে পুরোটা জানবেনা?
– কি হবে অত জেনে? নিজেদের যতটুকু দরকার সেটা নিয়ে মাথা ঘামালেই তো হয়।
– না হয়না। সবকিছু আগে জানা দরকার। ফ্ল্যাটটা হঠাৎ ছাড়লেন কেন! দরকার নেই ওসব পুরনো জিনিস ব্যবহার করার।
রৌনক বুঝলো এই বিষয়ে আর কথা বাড়িয়ে কোনো লাভ নেই। পিয়ালী কিছুতেই বুঝতে পারছেনা যে এই মুহূর্তে সবকিছু নতুন অ্যাফর্ড করা ওর পক্ষে সম্ভব নয় আবার প্রয়োজনীয় জিনিস না পেলে যে পিয়ালীর মেজাজ কতটা বিগড়ে থাকে তাও রৌনকের অজানা নয়। কথাগুলো যদিও পিয়ালী কিছু ভুল বলেনি তবুও রৌনকের মাথা থেকে কেয়ার টেকারের দেওয়া প্রস্তাব টা কিছুতেই বেরোলো না। পরের দিন অফিস থেকে ফেরার পথে রৌনক পৌঁছে গেল অ্যাপার্টমেন্টের মালিকের ঠিকানায়। বিষয়টা বলতে লোকটার ভ্রু দুটো যেন একটু কুঁচকে গেল,
– বেশ চলুন আমার সাথে গোডাউনে, জিনিসগুলো ওখানে রাখা আছে।
মালিকের সাথে গোডাউনে গিয়ে রৌনক পুরো তাজ্জব হয়ে গেল। আসবাবপত্রের কোনটাকেই এতটুকু পুরনো বলে মনে হচ্ছেনা, যেন কোনো শো রুম থেকে সদ্য তুলে আনা হয়েছে। অবাক দৃষ্টিতে মালিকের দিকে তাকাতেই তিনি যেন রৌনকের মনেরব কথা বুঝে বলেন
– ওই দম্পতির খুব সখ ছিল বাড়ি সাজানোর , কোনো জিনিস পুরনো হলেই আর রাখতোনা, সঙ্গে সঙ্গে নতুন চলে আসতো।
রৌনক এগিয়ে যায় জিনিসগুলোর কাছে, তার চোখে তাক লেগে যায় ফ্রিজটা দেখে। এগুলোকে যদি নতুন বলে দাবি করেও ফ্ল্যাটে নিয়ে যাওয়া হয় পিয়ালী ধরতে পারবেনা। সব জিনিস তো একসাথে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়, তাছাড়া তাতে সন্দেহ হতে পারে, তাই মালিকের সাথে দরাদরি করে অবিশ্বাস্য কম দামে ফ্রিজটা বাড়ি নিয়ে চলে গেল রৌনক। পিয়ালীর ও দেখে এতটুকু মনে হলোনা যে সেটা নতুন নয়, সে শুধু জিজ্ঞেস করল
– ওয়ারান্টি কার্ড কোথায়?
তাতে রৌনক উত্তর দিল
– আজকাল তো সব ই- ওয়ারান্টি, ওটা ফোনে এসে যাবে।
বেশ কিছুদিন সব ঠিকঠাকই চলছিল, একদিন দুপুরে পিয়ালী হঠাৎ লক্ষ্য করল রিক ফ্রিজের দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছে। একটু অবাক3 হল পিয়ালী কারণ ঋক সচরাচর এরকম করেনা, ক্যাডবেরি কুকিজ যা আবদার সব মায়ের কাছে করে! তাও হয়ত কোনো দুষ্টুমি মাথায় এসেছে এই ভেবে সে ঋক কে বকতে যায়,
– কি হচ্ছে এটা ঋক? ফ্রিজের দরজা খুলে কেউ দাঁড়িয়ে থাকে? ঠাণ্ডা লেগে যাবে তো।
– মা আমায় কে ডাকছিল এর ভিতর থেকে।
এই বলে রিক আঙ্গুল দেখায় ফ্রিজের মধ্যে। ছেলের দুষ্টু বুদ্ধি দেখে পিয়ালী বলে ওঠে
– হ্যাঁ সেই ওর মধ্যে তোর বন্ধু আছে তো যে তোকে খেলতে ডাকছে! বদমাইশ আর যদি কোনোদিন দেখি খুব মারবো কিন্তু।
রিক কে জোর করে টেনে এনে দরজাটা বন্ধ করে দেয় পিয়ালী। পরে রৌনক বাড়ি এলে তাকেও বিষয়টা বলে দুজনে মিলে হাসাহাসি করে। সেদিনকার মত ব্যাপারটাকে পাত্তা না দিলেও আস্তে আস্তে পিয়ালীর মনে সন্দেহ দানা বাঁধতে থাকে। পরপর আরো দুদিন ঋক কে ওভাবে ফ্রিজ খুলে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। কথাটা রৌনক কে জানাতে সে বলে,
– ওরকম একটু হয়। ও বাড়িতে সবাই একসাথে খেলাধুলা করত, এখানে কাউকে না পেয়ে একটু আধটু দুষ্টুমি করছে।
কিন্তু পিয়ালীর মনে অস্বস্তি টা থেকেই যায় যে এতকিছু থাকতে ফ্রিজটার প্রতি ঋকের কিসের এত আকর্ষণ! আর সেই অস্বস্তি দিনদিন বাড়তে থাকে কারণ সে নিজেও কিছু একটা অনুভব করতে পারে। একদিন ফ্রিজারের ভিতর অনেকগুলো আইস্ক্রিম রেখে ঢাকনা বন্ধ করতেই মনে হল কে যেন খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো। রিক তখন স্কুলে, এদিক ওদিক কেউ ছিলনা, পিয়ালীর মনে হল হাসিটা Cফ্রিজের ভিতর থেকে এলো, এক অজানা ভয়ের স্রোত পিয়ালীর মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে গেল, কোনরকমে সে অন্য ঘরে পালিয়ে গেল।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।