“এই শ্রাবণে আষাঢ়ে গপ্পো” বিশেষ সংখ্যায় সাহিন আক্তার কারিকর

 মায়ার ছন্দপতন  

বাল্য বয়সের যে দূরন্তপনা থাকে তা গ্রামের মেঠো আলপথকে ও বোকা বানিয়ে দেয়। তর্জনি মুখে দিয়ে গল্প শোনার ঊকন্ঠ আজীবন একটি নিজস্ব ইতিহাস আছে সাত পুরুষ জন্মের আগে থেকেই, কিন্তু ক্রমশ সেদিন পাতা ঝরা মরসুমের মত বেঁচে আছে। কেননা আমার গ্রাম শহরের পথে, সেই স্মৃতিচারণের মেঠো আলপথে আজ কালো পিচ ঢাকা। সবুজের বদলে কালো আর কিছু উড়নচন্ডী কোম্পানির প্রযুক্তি অবাধ্য ছেলের মত টো টো করে ঘুরছে রাস্তায়।সন্ধ্যা হলেই  পাড়ার মোড়ে চা-চুমুকে আড্ডা চলে । অবশ্যই আড্ডা সমবয়সি বন্ধুদের হলে সেখানে নিজেদের অপেক্ষা গার্লফ্রেন্ড নিয়ে আলোচনা বেশি হওয়াটাই স্বাভাবিক। এই আড্ডার ইতি টানছে স্মার্টফোন ও দ্রুতগামী নেটওয়ার্ক। বকবক করা কন্ঠের বদলে হাত চলছে, আর এই নবীন প্রজন্মের যুদ্ধ কৌশলগত পদ্ধতি শিখছে অশ্লীলভাষায়, ছেলে মেয়ে সবাই সামিল। আধুনিক গেমসের গর্ভে জন্ম নিচ্ছে দূরত্ব। বাঙালি আর বাঙালির তপ্তোপশে মলয়ম সিল্কের আবরনে গ্রাম্যবধূ সিরিয়াল আর ওয়েব সিরিজ দেখছে উৎসাহিত মোহে.. । পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিজীবীদের আসর বসে এই চায়ের দোকানে। শালা সবাই আলেকজান্ডার বৃদ্ধ থেকে বালক, এরা সরকারের ভুল চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেন, অর্থনীতিবিদ, রাজনীতিবিদ, বিজ্ঞানী, ডাক্তার ঐতিহাসিক সব গুন মজুত। ডাক্তার কে রুগীর রোগ সম্পর্কে বোঝান, তারিখের উপর খবর কাগজের প্রিন্টারের ভুল ঠিক করে আরো কত কি?

একটি ক্ষুদ্র দাগ খতিয়ানের মধ্যে আবদ্ধ একটা গ্যাংস্টর গ্রুপ আছে, সেখানে উঠতে বসতে অপমান। পাশে বাড়ির ছেলে মেয়েদের পা ধুয়ে খা এমন উজবুক উক্তি। জানি না সব বাবা মা পাশের বাড়ির ছেলে মেয়েদের মধ্যে কি জিনিস লক্ষ্য করে? “ওদের থেকে ঢের কয়ালিটি আমাদের বেশি”  আতহার বলে উঠল। আতহার সম্পর্কে বলতে গেলে ইংরেজি জানা এক ছিপছিপে ফর্সা গোছের দূরন্ত ঘোড়া। কথায় কথায় ক্ষ্যাপা ষাঁড় হয়ে উঠে কিন্তু বন্ধুত্বের কোনো তুলনায় নেই। স্বভাবের মধ্যে একটু রাস্তার মেয়েদের মাল, ঝাল মুড়ি ভাবে। রবীন্দ্র ভারতীর ইংরেজি ছাত্র প্রেমে পড়ে ছিল আঠারো তে, বিচ্ছেদে পর তার চওড়া বুক, ঠোঁট কামড়ে গল্প আর নরম তুলতুলে পেটের তিল নিয়ে বেশি কথা বলে অবশ্যই প্রেমিকা তার গোপন গন্তব্যে পৌঁছতেই দেয়নি। একুশের মস্তিষ্কে যদি এই সব গল্প শোনে তাহলে তাকে ধরে রাখে কে? তারপর তারপর প্রশ্ন থেকেই যায়। গ্যাংস্টরে কোনো রণংদেহি সেনাপতি কিম্বা উজির নেই, আছে বলতে হাতে গোনা কয়েকটি মেষশাবক। নামের কোনো নৈতিক অর্থ নেই, দলের সবথেকে জ্ঞানী শান্ত ভদ্রখেলোয়াড় শুভদ্বীপ খাড়া, অবশ্যই টাইটেলের জন্য কলেজে মাঝে মাঝে খাড়া খাড়া রব উঠত…। তাতে ওর কোনো অসুবিধাই নেই এমনকি ওর মুখ থেকে কখন ফুল চন্দন খিস্তি শুনতে পাইনি, শোনার ইচ্ছায় তীব্র রাগালেও  শালা চুদির ভাই টুকু ও বলে না।  ইমন মুখার্জি, ধর্ম কর্মের মানুষ পূজা পাঠ করে কিন্তু এর মধ্যে আমিষ নিরামিষের কোনো পার্থক্য নেই। যেখানে যেমন সেখানে তেমন এই বিশ্বাসের পন্ডিত। আর আছে ইন্দনীল, শালা সাথে ও নেই পাশে ও নেই দরকার বাদে ভবিষ্যতে খুবই চিন্তা। আর আমার কথাটাই বাদ থাক, নিজেই জানি না  গ্রহের মানুষ মাঝে মাঝে ভয় হয় এরিয়ান টেরিয়ানটান না তো।আমি নাকি জন্মেছিলাম আষাঢ়ের মাঝরাতে ঝনঝন বৃষ্টি আর বজ্রের মাঝে,  কান্না সেদিন কেউ শুনতেই পাইনি সবাই কালে আঙুল চেপে ঈশ্বরকে ডাকছিল। এমনকি আজ ও আমার কান্না কেউ নিজের চোখে দেখেনি। একান্ত কখনও দুঃখ পেলে নিজেকে আরও মজবুত করে তুলি … তীব্র বজ্রের আওয়াজ ও সামান্যই পটকা বাজি মনে হয়।

অদ্ভুত লাগে যখন সবাই  শোনে, ‘প্রেমিকার খবর কি’? ও রাগ নিয়ে তাকে মায়া স্বরে বলি ভালোবাসা! আকাশে তারা দেখছ কখনও। আমি নিশ্চিত তারা কখনো এমন উত্তরের আশা করে না। যদি আর কিছু বলে তো মনে হয়, গান্ডুর জামার কলার ধরে থুথনি নিচে দিই কয়েকটা উষ্ণ কিল। মাজা ভাঙা ত্রিকোণমিতির অঙ্ক আজ ও মাথায় ঢুকল না কিন্তু দুহাতে দশ আঙুলের কসরত জানা হয়ে গেছে। যেমন, যত দিন মধ্যমা মাথা নিঁচু থাকবে ঠিক ততদিন বন্ধু- বান্ধব আত্মীয় স্বজন সবাই পাশে থাকবে, মাথা উঁচু করলে সব শেষ।

তবে আমাদের বন্ধুত্বের মানিক জোড় নিয়ে পাড়ার ঈর্ষা কম নেই। মাঝে মাঝে তিল তাল গুলিয়ে ফেলি, আরে কাকা, বাবা বলে একে অপরকে বেশি ডাকা হয়। একদিন তো পাড়ার মোড়লের কাছে ঝাড় খেতে খেতে বেঁচে গেলাম । সেদিন আমি আর ইমন বসে সবুজ ঘাস মাঠ প্রকৃতি দেখছি, শালিক ফড়িং এর সাথে সফলতার গল্প করছে, গাঙ চিল আকাশ পথে উড়ে গন্তব্যে ফিরছে, রাখাল অমন বাগচি তার সন্তান তুল্য গরুদের সাথে খেলা করছে। জন্মভূমির সুন্দরতর মূহুর্ত গুলি  চোখে ধরা পড়ে এক নিমেষেই, কেউ যদি রাস্তার দুপাশের ঝাউ বন, বড় বড় গাছের ডাল কাটে তো ও রেগে যায়। সব থেকে সুন্দর লাগে বৃষ্টির দিন, টুপটাপ করে কলা ডুমুর কচু পাতায় বৃষ্টি ফোঁটা এত নিখুঁত ভাবে দেখে যে বৃষ্টির টোপ ঠিক কোথায় পড়ছে, তা আবার ফোয়ার মত ছড়িয়ে যাচ্ছে। আচমকা মোড়লমশাই সেদিন পিছন থেকে মাথায় হাত দিয়ে বলতে যাবে এমন সময় কে বে? । মোড়লমশাই বলে উঠল  এ কেমন কথা, কে বে।
নিজেকে সামলে  না মানে, না মানে কি? ওই বলতে যাচ্ছিলাম কে রে, কথাটা সুন্দর করতে গিয়ে পুটুলি পড়িনি আর কি? আসলে  ভীষণ রাগ হচ্ছিল সেদিন  প্রকৃতি দেখার মাঝে বাহাত মোটেই পছন্দ হয় না। এমনকি একদিন তো ভীষণ ঝামেলা ও হয়েছে সেদিন শহর থেকে আসা এক ভদ্রলোক গ্রামের সম্পর্কে উল্টো পাল্টা বলছে সব শুনে বুঝে পাশে গিয়ে হে তোমার বাড়ি কোথায়। হে হে সে আবার কি আমার নিয়ে হ্যাটা হচ্ছে। আসলে সেদিন রাগের মাথায় ও টা বলতে ভুলে গিয়েছিল, মানে ওহে তোমার বাড়ি কোথায়? অবশ্যই পড়ে যানতে পারে ভদ্রলোকটার বাড়ি গ্রামে, কয়েক দিন হল শহরমুখী। দেশী বিড়াল বনে গিয়ে বনবিড়াল হয়েছে আর কি?

কলেজ শেষ করে বখাটে ছেলের মত সব দাপিয়ে বেড়ায়। হাতে কোনো কাজকর্ম নেই। বাড়ি থেকে যে টুকু কাজ বলে বেশ সেই টুকু। কিন্তু  বন্ধুত্বের সামনে ক্রমশ পাঁচিল হয়ে উঠছে ভবিষ্যতে কথা। বাবা মা আর কতদিন বেকার ছেলের বোঝা পিঠে নিয়ে চলবে। তা বলে সে কথা মোটেই না যে বাবা মা খারাপ তবুও কিন্তু থেকে যায় সন্তানের ভবিষ্য? আজ কিছুটা মনমরা লাগছে ইন্দ্রনীলের, ইমন মজার ছলে “কি রে চান্দু প্রেমে পড়লি নাকি, চুপচাপ ওর কথা ভাবছিস আমাদের একটু খুলে খুলে বল খবর। তাই বলে এই ভাবিস না যে এক এক করে প্রেমিকার কাপড় চোপড় খুলতে বলবি” বলেই হেসে উঠল। ইন্দ্র কিছুই না বলে বলল ” কিরে চা খাবি তো সব, অর্ডার করি”। বেকার বন্ধুদের মধ্যে একবার কেউ এমন কথা বললে আর রক্ষে নেই মনে হয় অনেক দিন পর খাব…
” কর কর অর্ডার কর “-শুভ। শুধু কি তাই পেটের মধ্যে থেকে নাড়ি ভুড়ি টেনে এসে গন্ধ শুকছে আতহার। কোনো দিন তো খাওয়াই না কি হল আজ মনে মনে ভাবতে ভাবতে হঠাৎ সূর্য কোন দিক থেকে উঠেছে রে ? গম্ভীর কন্ঠে উত্তর দিক । কেননা আজ আকাশ অনেক গম্ভীর করে আছে হয় তো প্রিয়া শোখে বিরহ কাতর। কি রে আমাদের ছেড়ে চলে যাবি ইন্দ্র,
ইন্দ্রপতন ভালো লক্ষন না কেননা এই মানিক জুটি মহেনজোদাড়ো সভ্যতার আগে থেকেই… শুভর মা তো মাঝে মাঝে বলে তোরা হয়তো গর্ভে থেকে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠিয়ে ছিলিস আর নোটিফিকেশন আসতেই দোস্ত। এক সাথে কত জায়গায় ঘুরতে গেলি স্কুল, পাঠশালা এমনকি রাস্তার সমস্ত ঘাস লতা পাতা গাছগাছালি পশু পাখি, তারা খুড়ো তোদের চেনে বোঝে । তারা খুড়ো মানে তারা ঘোষ, তার কথা ও মনে পড়ছে ” চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলত দাদুরা রায়মঙ্গল কালিন্দী যতদিন এক না হচ্ছে ততদিন আমি মরব না” । কিন্তু সে কথা আজ  ইতিহাস… কেউ কথা রাখেনি আর কেউ কথা রাখে না। ভাবতে ভাবতে চোখে ছলছল করছে জল, ঠিক তেমনি সময় কাটা ঘা এ নুনের ছিটে ইন্দ্র নিজেকে সামলে বলল “কাল আমি চলে যাচ্ছি দিল্লি, সেখানে আমার দুর সম্পর্কের একটা দাদা থাকে সে বলেছে এখানে যেতে তার হাতে একটা কাজ আছে… ফুলের দোকানে” । আতহার
প্রশ্ন করতেই যাচ্ছিল কি কাজ? সবাই বেশ খানিকক্ষণ চুপচাপ যে উৎসাহে চা খাওয়ার আইটেম করছে তা ভেস্তে যাওয়ার পথে, চা ঠান্ডা হয়ে আসছে, মিষ্টি চা আজ ভীষণ তেতো আর পোড়া গন্ধ লাগছে। এবার উঠি, কাল যাবতো জামা কাপড় গোছানো দরকার বলে ইন্দ্র উঠতেই ইমন বলল আর কিছুটা সময় বস না বন্ধু, আবার কবে দেখা হয় ঈশ্বর জানে, কাঁপা কাঁপা কন্ঠে আর কিছুই উচ্চারণ হচ্ছে না। না রে ভাই কাল সকাল সকাল বার হতে হবে। হাওড়া থেকে ট্রেন…

“যাওয়ার একদিন আগে বলল, অনেক আগে থেকে প্লান করছে শালা, আগে জানলে যদি আমরা না জেতে দিই” ইমন বলছে ঠিক তখনই আতহার বলল” ও গেলে আমরা বাধাঁ দেব কেন ওর ইচ্ছা যাবে আসবে সেটা ওর কাছে”। তবে আজ সকাল সকাল তিন বন্ধু উঠে জেটিঘাট পৌঁছাম, পিছন থেকে দেখছে ইন্দ্র নৌকাই উঠে চলে যাচ্ছে, চোখের সামনে টা ঝাপসা হয়ে যেতে লাগল তিন বন্ধু তিন জনকে তাদের ব্যথার কথা লুকানো চেষ্টা করছে সেই সব স্মৃতি গুলো স্কুল থেকে ফেরার পথে আড্ডা, মারপিট, ইন্দ্রের সেই কবিতা আবৃত্তি – “বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই পৃথিবীর রুপ খুঁজিতে যাই না আর”
সবই ইতিহাস। দিন দিন বাড়ি থাকাটাই তীব্র যন্ত্রনাদায়ক হয়ে উঠছে শুভর উঠতে বসতে লাঠি ঝাটা। হল তো মানিক জোর আর কতদিন, একে একে সব যাবে শুধু তুই বট গাছের মত শিঁকড় গেড়ে বসে আছিস, বাবাকে একবার দেখেছিস রোগা পাইকাঠি হয়ে যাচ্ছে বয়স হয়েছে আর কতদিন গতর চালাবে দীর্ঘ অবজ্ঞার কাহিনী নিয়ে পরাজিত সৈন্যদের মত কাঁদছে, বড় হয়েছে সবার সামনে কান্নাকাটি করলে মানসম্মান। তাই বুকে পাথর চাপা দিয়ে একদিন ইমনকে বলল” আর হয়তো থাকতে পারব না বন্ধু আমার যাওয়া সময় হয়েছে” । কথাটা শুনে আকাশ থেকে পড়ার মত অবস্থা

খেলাঘর ভেঙে যাচ্ছে সাধের সন্ন্যাস প্রতিজ্ঞা ভেঙে গৃহমুখী, আর বাস্তব অভিজ্ঞতা শিক্ষা নিয়ে কল্পনাকে হাতের  মুঠোয় দলা পাকিয়ে গভীর সমুদ্রে ঈশ্বর সব ছুড়ে ফেলে দিচ্ছে। চোখ থেকে মুক্ত গড়িয়ে পড়ছে অবসরে। ঠিক অমন সময় হল মারাত্মক হুলুশ্থুলু কান্ড রেগে গিয়ে আতহার মুখ খিস্তির পাহাড় বসিয়ে নির্দ্বিধায় চোখ লাল করে  “তোর মতো ক্যালানেচোদা আমি একটাও দেখিনি রে বোকাচোদা গাড় মারার কেউ থাকে তো গাড় মার তাকে চোদনাচুদি কোথাকার ঢ্যাবনাচোদা চুদগে যা রেন্ডি নিয়ে” । ধমক খেল ইমনের কাছে যাচ্ছে যেতে দে না গালিগালাজ করছিস কেন? আমি কিছুই না বলে জিউলি গাছের শোঁওপোকার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে ভাবছি সবারই প্রজাপতি হওয়ার ইচ্ছা কতদিন আর কাঁটা নিয়ে কীটনাশক খেয়ে বেঁচে থাকবে। ইমন বলল, শুভ সাবধানে যাস জায়গা মোটেই ভালো না তামিলনাড়ু তামিলদের সাথে কোনো ঝামেলায় জড়াবি না। আমচা না টামচাই যাচ্ছে… নেটের কোম্পানি কেমিক্যালের কাজ।
সকাল আটটাই এগিয়ে দিয়ে এলাম বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত। তারপর চা এর দোকানে এসে তিন তারা দুটি তারার গতিপথ আন্দাজ করছে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে…
আতহার আর ইমনের মধ্যে বেশ কয়েক দিন মনকষা কষি চলছে একটি জবা ফুলে তো দুটি ভ্রমর একসাথে মধু নিতে পারে না।জবা মোহন বাগচীর একমাত্র মেয়ে, ইমন তার গজ দাঁত মায়াবী চোখ আপেল ঠোঁট ন্যাশপাতি মতো ছোট খাটো জবাকে মনে মনে ভালো বেসে ফেলেছে। ঝড় মাথায় মনে কথা না লুকিয়ে নিঃসঙ্কচে সাহস জুগিয়ে জবা আমি তোমাকে ভালোবাসি। তোমাকে নাইন থেকে দেখে আসছি বলে কবিতা শুরু করে দিল –
“ভ্রমর এর মত উন্মাদ নেশায়
ঘুম কেড়ে নিয়েছে সখি
তোমার বক্ষযুগলের মায়া তিল এক মুহূর্তে
হৃদয়ের সুনামি আনে
উত্তেজনায় ছুঁয়ে দিই নরম শরীর
তুমি জানো না প্রিয়, আমার ছায়া তোমার শরীর কে আলিঙ্গন করে রোজ”।
এবারের যাবে কোথায় পায়ে নতুন জুতো স্বাক্ষী থাকল কিছু ঠাস ঠাস্ শব্দে।” জানোয়ার মেয়ে দেখলে জিভ দিয়ে নাল পড়ে বাড়ি মা বোন নেই। বখাটের মত মেয়েদের পিছনে টো টো করে ঘোরা আর ফাঁকা পেলে শরীরের নরম মাংস স্পর্শ। ইতর কোথাকার। জং ধরা মস্তিষ্কে কবি হতে এসেছে”। কবির নামে এত বড় অপমান আমি নিশ্চিত রবি কিম্বা জীবনানন্দ থাকলে অজ্ঞান হয়ে মরেই যেত।একটা রোগা পাটকাঠি কলেজ শেষ ছেলেকে জ্ঞান দিয়ে গেল! জবা আতহার কে চুপিশাড়ে প্রেম করে, ইমন জেনে যাওয়ার পড়ে এই সব কান্ড কারখানা। অবশ্যই আতহার নিজেই জানে না তবুও এই র্কীতন, মেয়ে পটানোর তুখর বেটা মেয়ে দেখলেই টু টয়েন্টি বডি ফোর ফরর্টি হয়ে যায় শান্ত নরম সুরে কথা বলে। একদিন আতহার নাইনের একটা ছেলেকে ডেকে শুধু বলেছিল ভাই শরীর দেখে নয় মন দেখে ভালোবাসো শান্তি পাবে এতেই গলে গেল জবা।
এই ত্রিকোণ প্রেম তিন বন্ধুর পৃথিবী তাসের ঘরের মত ভেঙে যেতে লাগল,  দুজনেই ভুল বোঝাবুঝি মেটাতে গিয়ে নিজেই সরে আসতে বাধ্য হলাম । আর আসবেই না কেন, ইমন একদিন হঠাৎ আচমকা জাত নিয়ে কথা বলল যা কখনো মেনে নিতে পারি নি। মেনে নিতে পারিনি ওদের জন্য কত কি না করেছে, স্কুলের সরস্বতী পুজো একা হাতে সামলেছি এক থালাতে খাওয়া দাওয়া সে কি না এই কথা বলে মুসলিম তো তাই আরেক মুসলিমের সঙ্গ দেচ্ছ, আমি বুঝিনা জবা হিন্দু তোদের ঘরে গেলে তো আরেকজন সদস্য বাড়বে যা না তাই করে গালাগালি দিল। কখনো মেনে নেওয়া যায় না তবুও সব মেনে নিয়ে এক এক করে তিনমুখো রাস্তার মত গন্তব্য পাল্টে গেছে। মাঠে আর কেউ যায় না গল্প হয় না, পাখিদের ডাক কানে এসে তীরের মত লাগে, পূর্নিমার চাঁদ অপেক্ষায় অম্যাবস্যার অন্ধকার কে ভালো বেসে ফেলেছি  এই একাকীত্বতের আলপথে ফড়িং আর লাফিয়ে পায়ে পড়ে না।
এবার আমাকেও শহর মুখী হতে হবে ফোন এসেছে যে কাকা অসুস্থ, কলকাতায় গিয়ে কাকার সাথে টিউশন ব্যাচের পড়ানো। অগত্যা যেতেই হবে, শহর ভালো লাগে না তবুও যেতে হবে। দিন দিন তো ভালোলাগা জিনিস হারিয়ে যাচ্ছে। প্রথম শহরে যাব তাই কাকিমা নিতে এসেছে আজ। কাল যেতে হবে তাই সন্ধ্যায় ইমনের বাড়ি যেতেই কাকিমা  বলল আরে তুই বহুদিন পর। বস বস কি খাবি ?
কিছু না কাকিমা, ইমন কোথায়?
এই  বাজারে গেল আর কি একটু বসো ও আসল বলেই প্রায়ই দু ঘন্টা বসে আছি, না আসতে দেখে ও কাকিমা আজ চলি আবার কোনো একদিন আসব ও আসলে বল কাল আমি কলকাতায় যাচ্ছি ও যেন আমার সাথে একটু দেখা করে।
“আচ্ছা বলে দেব, সাবধানে যেও খোকা” ।প্রায় রাত আটটা বেজে গেছে, গ্রাম বলে কথা সারাদিন মাঠে ময়দানে খাটা খাটনি করে সবাই প্রায় খুবই তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ে, যাওয়া কি ঠিক হবে? না যায় আবার যে কবে দেখা হবে ঠিক নেই বন্ধুর মুখটা একটু দেখে আসি।
ভাই এ ভাই দেখ কে এসেছে আমদের বাড়ি। অবজ্ঞাসূচক কন্ঠে কি রে পথ ভুল করে নাকি? আয় বস
রাতের খাবার বন্দোবস্ত দেখে বসতে চাইনি। আতহার কে বললাম  কাল আমি কলকাতায় যাচ্ছি কবে দেখা হয় না হয় তাই এলুম একটু দেখা করতে। যাই রে অমন সময় আতহারের বাবা বলে উঠল আই রে খাওয়া দাওয়া করেই বাড়ি যাবি।
না কাকু বাড়ি সবাই আমার জন্য অপেক্ষা করছে আসি এখন।
আজকে সূর্যদয় মোটেই ভালো লাগছে না, চারিদিকে মেঘ প্রহরী মত ঘিরে বসে আছে তবুও ঘর ভেঙে যেতেই হবে
উজ্জ্বল আলোর বন্দী ঘরে। পিছনে ফিরে বার বার কই ইমন, কই আতহার?
নিজের শরীর থেকে এক এক করে অকেজো হয়ে পড়ছে অঙ্গ… কাকিমা বলল, কি রে  যেতে ইচ্ছা করছে না? মন খারাপ কেন এত?
না ঠিক আছে চল, আসলে গ্রামের মেঠো পথ, পশুপাখি গাছ গাছালি আমার পা জড়িয়ে কান্নাকাটি শুরু করেছে, বন্ধুরা এল না… আচ্ছা ঠিক আছে আবার তো মাঝে মাঝে আসবি চিন্তা কিসের?
পৌঁছে গিয়ে ও পিছুটান কাদা মাটি, খেলাধূলা নতুন জায়গা পরিচিত মুখ বলতে কাকা আর কাকিমা।চিনাপার্ক কাকুর টিউশন, তাই ওখানে ঘর ভাড়া নিয়ে বসবাস। পড়ানোর সময় বেশ ভালো ভাবেই হিমশিম খেতে হয় মর্ডান শর্টকাট ফিটফাট চিমলি চামেলির কাছে, কেননা সিলেবাস বহির্ভূত আজগুবি সব প্রশ্ন “স্যার, আপনি প্রেম করেন? পছন্দ হয় কারো? আমার নিয়ে যাবেন UCO পার্ক”। এর থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব হঠাৎই যদি কাকু কিম্বা কাকিমার আবির্ভাব ঘটে। ভদ্র গোছের পড়ুয়াদের তল্পিতল্পা গুটিয়ে বাড়ি ফিরলে অবসর সময় ছাদে বসে গল্প, উপন্যাস, নাটক, কবিতা পড়ে কাটিয়ে দিই। সিগনাল মোড়ে বিখ্যাত মুখেশ দার চায়ের দোকান, মাঝে মাঝে  চা টা খেয়ে যায়। অজানা দের আড্ডায় মন খারাপের গন্ধ ভাসে, ইমন আতহার ইন্দ্র শুভ ইতিহাসের ভিতরে লুকিয়ে লুকিয়ে ভবিষ্যতে ভূতকে দেখছে ইচ্ছা অনিচ্ছা মায়া জালে। ঈশ্বরের কাছে সবসময়ই প্রার্থনা করি হে ঈশ্বর আমাদের ছন্দপতনের খেলায় নাবাবেন না। প্রায় যেতে খেতে যেতে খেতে মুখেশদার সাথে আট আনার ভাব জমেছে আড্ডা হয় গ্রামের জনজীবনের রোজনামচা গল্প শোনে সবুজ মাঠ গরুর পাল রাখাল ইত্যাদি। আজব শহর মাইরি, রাস্তার দুপাশে বড় বড় আকাশ ছোঁয়া ইমারত। আচমকা কালো ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে হুস হুস করে গাড়ি গুলি নিশ্বাস নিয়ে প্রানে বাঁচে, ফুটপাতে তেলে ভাজা হরেক রকম যাতাকল, সিঙ্গরা, চপ ঢপের কীর্তন, ফুচকা, মশলা মুড়ি, চা কফি সু হাউস। হ্যালজিনের ভিতরে নামি দামি কোম্পানির নাম প্লেট মিষ্টান্ন ভান্ডার কোমর বেঁধে দাঁড়িয়ে  আছে। কিন্তু যত যাই বল না কেন খোলা আকাশ আর নীল আকাশের নীচে কফিন বন্দী শহর কিছুই না। মালসার মত ছোট্ট আকাশ তাও দাঁড়িয়ে দেখার কোনো উপায় নেই। পুতুলের মত মানুষ গুলো কর্মব্যস্ত মানুষের ভীড়ে এসে হারিয়ে যায়, কি বিচ্ছিরি এই উজ্জ্বল আলোর শহর। মনের মত সঙ্গী সাথী না হওয়ায় একা একা ঘুরে বেড়ায়, একবারও কেউ এসে জিজ্ঞেস পর্যন্ত করে না – “কেমন আছো হে”। এর থেকে ঢের অনেক ভালো আমাদের তাঁতি পাড়া, তালতলার মাঠ, কালিন্দী – রায়মঙ্গল নদী ।বাচ্চা ছেলেমেয়েরা চাকজাল দিয়ে খাল বিল থেকে শিশু  কই মাগুর সোল লাটা বোয়াল ধরে পুকুরে ছাড়চ্ছে, ডুব দিয়ে শামুক, গুগলি তোলা। পড়ন্ত বিকালে কাছারি মাঠের পশ্চিম দিকের আকাশে কে যেন এসে লাল টিপ পড়িয়ে দিয়ে যায়। এই সব ভাবতে ভাবতে চঞ্চল হয়ে উঠি । বেপরোয়া ভাবে কাটছে কয়েকটি দিন, দিশেহারা রাত্তির। মাঝে মাঝে তো চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা করে – –  হে ঈশ্বর
             স্বপ্নের সেই সুন্দর দিনগুলো
             ফিরিয়ে দাও আবার।
আকাশের বুকে এখন খুবই দুঃখ তাই রং পাল্টে ক্রমশ কালো হয়ে আসছে,  চোখে আষাঢ়ের ঘনঘটা মেঘের থলি গ্রামে থাকলে কত কিছুই যে দেখতে পেতাম। কল্পনার জাল পেতে এক এক করে  – পুঞ্জভূত মেঘের দৌড় প্রতিযোগিতা, সবুজের শাখায় শাখায় পত্র পল্লবের নতুন প্রানের শিহরন। বিল খাল নদী নালা মাছ গর্ভবতী হয়ে উঠার জলন্ত উচ্ছ্বসিত অপেক্ষা। এজহার দাদু লাঙ্গল নিয়ে মাঠে নেমে বৈকুন্ঠ থেকে লক্ষী কে বার করে আনছে। প্রকৃতি তার রং-বেরঙীন শাঁড়ির আঁচল উড়িয়ে হারানো প্রেমিক কে ডাকচ্ছে… “কি ভাবছিস রে? চুপচাপ বসে” মুখেশের কর্কশ স্বরে যেন স্বপ্ন ভঙ্গ হল। “কি ভাবছিস?” কি?
এই বদ্ধ ইট পাথরের দেওয়াল ভেঙে আমাকে বার হতে হবে মুখেশ দা, এই রাক্ষসী রাজপ্রসাদ আমার দেশ না। মগজের মধ্যে তোলপাড় করছে –
         “গাছগুলো তুলে আনো, বাগানে বসাও
            আমার দরকার শুধু গাছ দেখা
            গাছ দেখে যাওয়া
           গাছের সবুজটুকু শরীরে দরকার
           আরোগ্যের জন্যে…”
-জানো মুখেশ দা শহরের একটাই অসুখ দূরন্ত স্বপ্নের মত সবুজ ও খায়। এই সময় আমাদের গ্রামের অঙ্গে লাবন্য ঢলমল। ব্যাঙ মুততেই যানজট রাস্তায় ছোট খাটো হাঁটু জল সমুদ্র, প্লাস্টিক ভেসে আসে আটকে যায় কর্মব্যস্ত মানুষের জীবিকা। আর আমার মেঠো আলপথ” স্মান করে গাছপালা প্রাণ খোলা বরষায়, নদী নালা ঘোলাজলে ভরে ওঠে ভরসায়”
-আচ্ছা হয়েছে, এবার রুমে যা রাত অনেক হল বৃষ্টি আসতে পারে।
ঘড়ির দিকে চেয়ে দেখি এগারোটা ত্রিশ … আচ্ছা উঠি তাহলে, পড়ে কথা হবে ।
বহুদিন পর একটু বৃষ্টিতে ভিজব এই আশায় রোড ধরে তেঘোরীয়া স্কুলের দিকে যাওয়ার মনস্থির করলাম । ভীষণ ভাবে আজ স্কুল জীবনের অবিচ্ছেদ্য আনন্দের কথা মনে করে হাঁটতে হাঁটতে রাত প্রায় বারো টা অতিক্রম, সুনসান হয়ে আসা রাস্তায় হর্ন বাজিয়ে দ্রুতগামী যান্ত্রিক স্যাত স্যাত করে মিলিয়ে যাচ্ছে। কেউ কোত্থাও নেই ফট ফট করে দরজা জানালা বন্ধ করে দালান হানাবাড়ীর রূপ ধারণ করছে। রাস্তা ফাঁকা। হঠাৎ বিদ্যুৎ খেলে গেল সমস্ত শরীরে, পিছন থেকে কে যেন ক্লান্তির মিষ্টি গলায় – “এই শুনছ”?
কে? আমাকে তো এই তল্লাটে কেউই চেনে না এমনকি এত সুন্দর ভাবে ডাকে নি কখনো। পিছনে ফিরতেই
-” আমি এই তো তোমার ডান দিকে” ।
কি চান?
-“আসলে আমি একটা অসুবিধাই পড়েছি সাহায্যে করবে” ?
চিনি না, জানি না সাহায্য ?
“বা রে জানা শুনো না থাকলে বুঝি কেউ সাহায্য করে না” ? আর কিছুই বলতে পারলাম না, আসলে মেয়েদের সামনে গেলে যেন ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ি।
আচ্ছা কি সাহায্য? মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করলাম
– “কিছুটা সামনে গেলে চার্নক হসপিটাল, হসপিটালের পিছনে গলি দিয়ে কিছুটা গেলে মন্ডল পাড়া ২২ নম্বর ওয়ার্ডের আমার বাড়ি, ওখানে পৌঁছে দেবে”।
আপনার নাম? “ইস্ আমার নামটাই তো এখনো বলা হল না… মায়া, মায়া সিকদার”। কোনো অসুবিধা হবে না চলো, আমি ভালো মেয়ে। আসলে অনেক দূর থেকে আসছি তো, রাত ও অনেক হল তার ওপরে মাথাটা ভীষণ যন্ত্রনা করছে তাই বললাম আর কি? “না গেলে অসুবিধা নেই, তবে একথা মনে রাখবে আমার কিছু হলে পুরুষ হিসেবে অপরাধী থাকবে, কেননা ঝড় জল রাতে অসহায় একটি মেয়ে, পুরুষ হওয়ার খাতিরে তোমার কাছে সাহায্য চেয়েছিল আর তুমি তা কানে ও নাওনি”।
নিজের মধ্যে এক অদ্ভুত রকমের মায়া হল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম চলুন তাহলে, নগন্য এর দ্বারা যদি কেউ উপকৃত হয় তা আমারই পরম পাওয়া। আপনার ব্যাগ টি দিন, মেয়েটির মুখের দিকে এবার ভালোভাবে তাকিয়ে হতভম্ব হয়ে গেলাম কি সুন্দর নাক নকশা দেহের গড়ন এত সুন্দর মনমহোনী মেয়ে চোখে তো দূরে কথা কল্পনাতে দেখিনি। পূর্নিমার চাঁদ যেন আমার ডান দিকে লুকোচুরি খেলছে। স্লিভলেস ডিপকাট টপ আর টাইট জিন্স, হিল জুতো, গলায় স্বর্গীয় পুঁথির হার ঠিক বুকে মাঝে ঝলমল করছে।
– “কি দেখছ অমন করে ?”
ভ্যাবাচাকা হয়ে গেলাম, কই কিছু না তো?
“বললেই হল, বল না প্লিজ”…
না মানে… তুমি
“বল না তুমি আমাকে দেখছিলে?”
তুমি! হঠাৎ কেসটাই ক্রমশ জন্ডিসে কর্নভাট ।না মানে হ্যাঁ তোমাকেই দেখছিলাম।
“কি দেখলে?” ম্যাচিওড মস্তিষ্ক সবই বোঝে অথচ না বোঝার ভান করে…
দ্বিতীয় বার একটি ও কথা না বলে এগিয়ে যাচ্ছি।কানাগলির মোড়ে টিমটিম করে আলো জ্বলছে, পাশ দিয়ে একটি কুকুর হঠাৎ লাফ দিয়ে ডাকতে লাগল ইস্ পা লেগেছে বোধ হয় মায়া আমার হাতটি শক্ত করে চেপে ধরে হাঁটতে লাগল। কোমল হাতের স্পর্শে হৃদয়ে সুনামির ঢেউ আছড়ে পড়ছে এই বুঝি সব লন্তভন্ড হয়ে যায়। এমন সময় বৃষ্টি এসে হাজির…
মায়া বলল – ব্যাগে ছাতা আছে, ছাতাটা বার করো?
আমার বৃষ্টিতে ভেজার খুবই ইচ্ছা ছাতাটা বার করে দিয়ে আমি বাইরে ভিজছি।
“কই ছাতার ভিতরে আসো”। একটি ছাতা দুজন? না থাক ঝনঝন করে বৃষ্টি পড়ছে।
অবাধ্য শিশুর মত আচরন করছ কেন? এসো ছাতার ভিতরে বলে জোর করে টেনে কাঁধের কাছে নিয়ে এল…।
আমার মনে হয় পৃথিবীর সব মেয়েরা ছেলেদের মানুষ করার পন নিয়ে জন্মায়, এটা করে না ওটা করে না, এটা ভালো ওটা খারাপ, সবই যেন বোঝে। দুটি হৃদয় খুবই পাশাপাশি জোয়ার ভাটার উত্থান পতনের শব্দ যেন কানে আসছে, হৃৎপিন্ডে কম্পন বেড়েই যাচ্ছে যাবে না কেন, মায়া উদাসীন চুল আমার মুখের উপর, ফর্সা কাঁধ বুকের মধ্যে এসে আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছে। মনে মনে ভাবতে লাগলাম এমন সুন্দর মেয়ের সাথে পৃথিবীর সমস্ত পুরুষ পাশাপাশি হাঁটা কিম্বা কথা বলার তীব্র ইচ্ছা কেউ মিস করবে না, যে করবে সে অকাঠ মূর্খ।
“কিছু ভাবছ?” কই না তো, আর কতদূর মায়া?
“এই তো সামনে – আর একটু”।
আচ্ছা… এত তাড়াতাড়ি কল্পনা ও করতে পারিনি আর একটু বেশি হলেই ভালো হত।
ইটের পাঁজরের মধ্যে লুকিয়ে আছে এত সুন্দর নয়নাভিয়ম মুখ যে কোনও কবি হলে  কল্পনায় মহল তৈরি করত, ভালোবাসার ঝরনা । কখনো ভাবতেই পারিনি এ ঝরনা কখনো শুকনোর নই। এ শহরে যতদিন মানুষ আছে ততদিন অফুরন্ত এই ভালোবাসার ঝরনা মায়ার ঠোঁট বুক বেয়ে নেমে আসবে ধরনিতে। ফেলে আসা দিনের কথা চোখের সামনে ভাসছে এ সময় বন্ধুরা থাকলে  নিশ্চয়ই বলত –  ভালো করে দেখ ক্যাটরিনা – সোহিনী – মান্দানা ককটেল একটা। যে খাবে নেশা ধরে যাবে শালা আগুন আগুন এমন আগুনে আমি শতবার পুড়তে রাজি আছি।
আনমনে হেসে উঠলাম। “কি হল আবার?” প্রশ্ন করতেই কল্পনার জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে এসে বললাম বন্ধুদের কথা… ।”প্রেমিকা নেই?”
কি?
“আমি বলছি যে তোমার কোনো প্রেমিকা নেই?”
ওহ না নেই গম্ভীর মুখ নিয়ে বলতেই “আচ্ছা, তাকে আজকের কথা কি বলবে?”
নেই তা আর কি বলল?
“মিথ্যা কথা, নেই বললে হত, লজ্জা করে না বলো দিখিনি বাবু। থাকলেও এই রাতে কথা যেন ভুল করে ও বলো না। তা না হলে বেচারা কে দ্বিতীয় আরেকটা খোঁজ করতে হবে “বলেই হেসে উঠল।
না গো নেই, তিন সত্যি।
“ওহ তাহলে তুমি ভার্জিন? লজ্জার দরকার নেই… “ওই আমাদের বাড়ি…
তাকাতে যাব এমন সময় লোডশেডিং
” যা এবার কি হবে? “
তখনই আচমকা কুকুর দল বেঁধে ডেকে উঠতেই , শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। আহা ভয় পাচ্ছ কেন বাড়ি চলে এসেছে তো? যাও তাহলে আমি চলি।
“ও মা সে কি, কেন বৃষ্টিতে ভিজে গেছ অনেকটাই মাথা শরীর মুছে কিছু খাওয়া দাওয়া করে তাই যাবে”
আমি বললাম রাত কটা বাজে তার খেয়াল আছে কি?
” সে যাই বাজুক আসো তো দেখি”। দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যে মনে মনে আনন্দই পেলুম,চল যাই। লোহার গেট খুলতেই বিকট একটা আওয়াজ মনে হয় কেউ যেন সাঁড়াশির ভিতরে আঙুল দিয়ে আর্তনাদ করছে। বহুদিন মনে হয় এ বাড়িতে কেউ আসেনি, ভিতরে ঢুকতেই জীর্ণ সিঁড়ি কাঁপতে লাগল ভয় ভয় নিয়ে পা ফেলতেই মায়া হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে গেল বেডরুমে। ব্যাপারটা এতটাই আকস্মিক হল যে কিছুই বলতে পারলাম না। সিঁড়ি দিয়ে উঠতেই শুনলাম দরজা বন্ধের শব্দ, আকাশে বাতাসে বজ্র নিনাদ সে শব্দে আমার কন্ঠ ক্রমশ অসাড় হয়ে আসছে, বাইরে ঝনঝন বৃষ্টি..। “একটু বসো, আমি পোষাক পাল্টে কিছু তৈরি করে আনি আর হ্যাঁ তুমি এই তুয়ালি দিয়ে মাথাটা মুছে নাও ” বলে পাশের রুমে গেল, একটি প্রদীপ জ্বালানোর অনুভব করলাম গ্যাস ওভেনে কিছু তৈরি করছে। আমার কানে ভেসে আসছে মৃদুস্বরে গান, খলখল করে কথা বলছে, লাবণ্যময়ী মুখে হঠাৎ চিৎকার করে উঠতেই আমি লাফিয়ে উঠলাম।
কাঁপা কাঁপা কন্ঠে কি কি হয়েছে? বলে ছুটে পাশের ঘরে যেতেই সম্মোহনী চোখ ভয় নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে পড়নে লালা বেনারসি এত সুন্দর ভাবে সেজেছে মনে হচ্ছে সদ্য বিবাহিত কোন বধূ।
“দেখতো আমার পিঠে কি কামড়ছে?”
“ভালো করে দেখ”
বলে কাছে যেতেই দুহাতে চেপে ধরে বুকের মাঝে টেনে ধরে “কিস মি, প্লিজ কিস মি” বলে আচমকা আমার ঠোঁটে মুখে বুকে চুমু খেতে লাগল। মায়া কে এত চঞ্চল দেখাচ্ছে যে কি বলব, একটা সুন্দর শান্তশিষ্ট স্বভাবের মেয়ে হঠাৎ এত দূরন্ত হলে তার মুখে আকৃতি আর কেমন বলি।ক্ষুধার্ত কোনো হিংস্র পশু যেন শিকারে নেমেছে।
চাপা ভয়ার্ক্ত স্বরে” আমার দিকে দেখো তুমি, আমি কি সুন্দরী নই? এই দেখো হাতে মেহেন্দী কাচের চুড়ি চোখে কাজল, লাল ঠোঁট আমি এখনো ভার্জিন। তুমি আমাকে ভার্জিনিটি থেকে মুক্ত কর প্লিজ। বলে আবার পাগলের মত উদ্মাদ হয়ে হাত দুটি চেপে ধরে বেডরুমে নিয়ে গেল। আমি জড় পদার্থের মত অসাড় অবাক হয়ে গেলাম কিছুই বলতে পারছি না আর যা বলছি তা বোধ হয় পৃথিবীর কেউ শুনতে পাচ্ছে না। মূহুর্তে মধ্যে মায়ার নরম শরীর, উত্থিত বুক, উষ্ণ নিশ্বাস, শ্যাম্পু করা চুলের গন্ধ জ্ঞানশূন্য হয়ে আছি। বাইরে বর্ষা আরো তীব্র আকার, মায়ার মুক্ত বসানো দাঁত দিয়ে ঠোঁটে, মুখে, বুকে কামড়াতে লাগল ।ঘরের মধ্যে কোনো আলো নেই, রাস্তাঘাট সুনসান আলোহীন মনে হিংস্র মনবৃত্তি মায়ার কোমর খামচে ধরে বুক পেটে চুমু খেতে খেতে নিচে নামছে। মায়া হাত দিয়ে শক্তিভোর চাদর খামচে ধরে আহত পাখির মত ছটফট করতে লাগল। মুখ তুলে দুপায়ের মধ্যে নিজেকে নিমজ্জিত করে হারানো মুক্ত সুখ কুড়িয়ে আনছে শরীর ।বিদ্যুৎ চমৎকানো আলোয় দুটি শরীর দুলতে লাগল অদ্ভুত ছন্দে। হঠাৎ বিকট শব্দে হুশ ফিরল, অমনি দুহাতে ধাক্কা মেরে জীর্ণ সিঁড়ি দিয়ে ছুটে নিচে নেমে আসছি আর অন্ধ ঘর থেকে ভেসে আসছে পোড়া গন্ধ, আবচ্ছা করুন একটা চাপা কান্নার শব্দ। জলর্পূণ রাস্তা দিয়ে ছুটছি আর পিছনে পিছনে হিংস্র পশুর মতো একদল কুকুর ডাকতে ডাকতে ছুটে আসছে। ভয় নিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে দিগবিদিগ জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটতে ছুটতে চার্নক হসপিটালের সদর দরজায় এসে জ্ঞান হারাল…।
 পরের দিন সকালে হুস ফিরতেই চেয়ে দেখি মাথার পাশে বসে আছে কাকু আর কাকিমা।
কাকু- “কিরে কাল বাড়ি আছিস নি কেন? কোথায় ছিলি”
কোনো উত্তর না দিয়ে রুমে ফিরলাম। সারাদিন ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে আর নীল আকাশ দেখিনি। পরের দিন একটা ছাত্র কবীরের সাথে মন্ডল পাড়ার গিয়ে বাড়িটা দেখলাম, ভাঙাচোরা দ্বিতলা ঘর উঠানে ঘাস ভরতি,গেট  লাগানো তার ভিতরে অনেক ঘাস মাথা নিঁচু করে ঘুমি আছে। পাশের বাসিন্দাদের ওই বাড়ি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতেই, চোখে মুখে একটা ভয়ে ছাপ স্পষ্ট…
কিছু কি জানেন? এ বাড়ি কালকে কি হয়েছে?
“কই না তোর, কাল কেন দীর্ঘ দিন এই বাড়ি বন্ধ আলো জ্বলে না।” একজন কৌতুহল নিয়ে জিজ্ঞাসা করল কেন বলুন তো? আমি কিছুই না বলে বললাম এ বাড়ি কেউ কি থাকে না? একটি বুড়ড্ডা উত্তর দিল থাকত একটি পঁচিশ বছরের মেয়ে ও তার অসুস্থ মা।
বেশ কয়েক সপ্তাহ পর বাড়ি ফিরলাম। গ্রামের মাটিতে পা রাখতেই পাখি কলরব, পাতার ঝনঝন শব্দে গাছে গাছে নতুন জীবনের আশ্বাস। চারিদিকে গতিময় তরুলতাদের মহোল্লাস। মেঘরৌদ্রের সকৌতুক লুকোচুরি মাঝে আতহার ইমনকে দেখতে না পেয়ে একাকী কাছারির মাঠ বাড়িতে বসে আছি। বিকাল বেলা মেঘের গুরু গুরু গর্জনে ঐকতানে নৃত্য করছে কদম্ব – কেতকী – হাসনাহেনা – দোপাটি – অপরাজিতার সজল রূপৈর্শ্বর ষোড়শী কন্যার চোখে চোখ রেখে ডুবে যাচ্ছে সূর্য আর স্মৃতি থেকে লোপ পাচ্ছে মায়ার ছন্দপতন।
মাঘের শেষে ডাকপিওন আমাদের বাড়ি এসে হাজির।
কি হল জিজ্ঞেস করতেই দাদু তোমার নামে ক্যুরিয়ার এসেছে?
আমার নামে! কোথা থেকে?
জানি না, কোনো ঠিকানা নেই বলে চলে গেল।
খুলে দেখি একটি শুকনো গোলাপ আর হলুদ সাদা রুমাল, চমকে উঠলাম এ কি আমার রুমাল? কোথায় ছিল, কে দিল?
রুমাল তুলতেই একটা লাল কাগজে মোড়ক খুলতেই কালো অক্ষরের লেখা “তোমাকে কি বলে ধন্যবাদ দেব তার ভাষা আমার নেই। তুমি আমাকে সেই পৃথিবীতে নিয়ে গিয়েছিলে যে পৃথিবীতে মেয়েরা নারী হয়ে ওঠে, নারী মর্যাদা পায়। দীর্ঘ দিন তোমার রুমালটা আমার কাছে ছিল তাই পাঠিয়ে দিলাম…”
Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!