।। ত্রিতাপহারিণী ২০২০।। T3 শারদ সংখ্যায় শাদাত আমীন

ভূত

তোমাকে কত বার করে বলেছি ওইপথে সাঁঝবেলায় চলতে নেই। কথা কানে যায় না কেন!
ভীষণ রাগে আগুন হয়ে আছেন রিতুর মা। আর ভয় পেয়ে ভ্যা ভ্যা কান্না জুড়েছে রিতু।
সন্ধ্যামালতি হাসছে, ঘর দুটোর সামনে রাখা টবগুলোতে। ঘরে সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বলছে।
দোচালা একটা ঘর থেকে দাদি লাঠিতে ভর করে বেরিয়ে আসলেন। দাদিকে দেখে রিতুর কান্নায় যেন নতুন মাত্রা পেল।
সব কথা শুনে দাদি রিতুর মাকে ঘরে পাঠিয়ে দিলেন। রিতু তখনও কাঁদছে। দাদি অনেক বলে কয়ে থামালেন ওকে।
মা ওই পথে চলতে নিষেধ করেছেন। আর কখনো ওই
পথে যাবি না। আর তুই তো পথঘাটও তেমন চিনিস না গ্রামের। দুদিন হলো গ্রামে এসেছিস।
দাদি, এবার থামো তুমি! আমার বাবা-মা বেঁচে থাকার পরও আমাকে কেন খালা বাসায় রেখে আসা হয়েছিল? কেন তোমার আদর আমি সব সময় আমি পাই নি? আমার ওই পথে চলতে নিষেধ কেন? বলো দাদি, বলো।
আবার কাঁদতে শুরু করলো রিতু।
কিন্তু, কান্নাটাকে বশে আনলো দ্রুত।
দাদি নিশ্চুপ। উত্তরের আশায় রিতু চেয়ে আছে দাদির মুখের দিকে। কিছুক্ষণ পর মুখ খুললেন দাদি। ”আজ না বুবু , আর একদিন। কথা দিলাম তোকে সব বলব।”
অনেকক্ষণ চুপ মেরে বসে থাকার পর মায়ের ঘরের দিকে গেল রিতু। বাবা বাড়ি নেই। সেই সকালে ব্যবসার কাজে দুদিনের জন্য শহরে গেছেন। মা একা বসে আছেন।
আর হাতে কি যেন একটা ধরে দেখছিলেন। ঠাওর করা কঠিন। ফটোর এ্যালবাম হবে হয়তো। রিতুকে আসতে দেখে মা দ্রুত জিনিসটা লুকিয়ে ফেললেন।
মা, খুব খিদে লেগেছে, খেতে দাও।
মা মুচকি হাসির ভান করে আঁচলের আড়াল করলেন মুখ। মলিন চোখে তাকানো যায় না, সরে পড়েন তিনি।
রিতুকে খাবার দিয়ে বাহিরে গেলেন। খাওয়া শেষ করে দাদির ঘরে চলে গেল রিতু। দাদি খেয়ে নিয়েছেন আগেই। ঘুমিয়ে পড়েছেন দাদি। ঘুমন্ত মানুষটাকে কি সুন্দর লাগছে! বয়সকালে মনে হয় অদ্ভূত রকম সুন্দর ছিল দাদি।
এখানে এসে লাইফ স্টাইলটাই পাল্টে গেছে, উল্টে গেছে নিয়ম করে হিন্দি সিরিয়ালে ডুবতে ডুবতে রাত্রিকে ঘন করে তোলা সময়ের মহারথ! জীবন এখানে ঝিমিয়ে আসে সন্ধ্যা নাবতেই। সকালে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে খালুজানের হাত থেকে দৈনিক পত্রিকাটাকে নিজের হাতে আনার প্রচেষ্টাগুলো আজ অলস, বিতিকিচ্ছিরি।
দাদিকে আর না জাগিয়ে ঘুমোনোর জন্য দাদির পাশেই কাত হলো রিতু। লাইটের সুইচটা অফ করলো। তবে বাহিরে ভরা জোছনা। জানলার ফাঁক গলিয়ে জোছনা উঁকি দিচ্ছে ঘরময়। কিন্তু, ঘুম তো আসে না!
কি আছে ওই পথে? এতদিন বাবা-মা আমাকে শহরের
রেখে পড়ালেন কেন? গ্রামেও তো পড়াতে পারতেন!
এটা সেটা প্রশ্ন ভাবনায় রাত যেন আরো গাঢ় হয়ে আসছে।
সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়েছে রিতু।
চোখের পাতারা মেলে উঠলো মায়ের মধুর ডাকে। দাদিটা কেমন জানি! আযানের সাথে জেগেছে অথচ তাকে ডাকে নি। সকালটা দারুণ স্নিগ্ধতায় ভরা। না জানি ভোরটা আরো কত সুন্দর ছিল। দাদির জন্য ভোরের সে সৌন্দর্য অদেখা রয়ে গেল।
মা ঘর ঝাড়ু দিচ্ছেন। সকালের নাস্তা রেডি করে রেখেছেন মা। কাজের মেয়ে নবিতা সেটা ঘরে দিয়ে গেছে। ফ্রেস হয়ে এসে তাই মুখে নিয়েছে রিতু।
দাদি বিছানায় বসে তসবিতে মশগুল। নাস্তা সেরে দাদির সাথে গল্প জুড়ে দিলো রিতু।
দাদি আজ নিজে থেকেই বলছেন, বুবু রে তোর মনে আজ যত প্রশ্ন আছে সব প্রশ্নের উত্তর দিবো।
দাদির পাশে আঁটসাঁট হয়ে বসে রিতু।
কুড়ি বছর আগের কথা।
তুই তখন যথেষ্ট ছোট। বয়স বছর খানেক। রিফা নামে একটা বড় আপু ছিল তোর। মরে গেছে ওই সেই পথের ধারের মন্ডলবাড়ির ভূতের হাতে। সাঁঝবেলায় বান্ধবির বাড়িতে খুব একটা দরকারে গিয়েছিল। আর ফেরে নি। কোনো মেয়েই ফেরে না ও বাড়ি থেকে।
মায়ের হাতের আড়ালে লুকিয়ে ফেলা বস্তুটা যে ফটোর এ্যালবামেই ছিল তা এখন পরিষ্কার। আর ওই ভূতের ভয়টাই তাকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল এতদিন, বাবা-মায়ের থেকে।
জানি তুই ভূতের কথাটা বিশ্বাস করছিস না। এইতো সপ্তাহখানেক আগে পাশের বাড়ির হাফিজের নতুন বউ হাফিজের উপর রাগ করে বাপের বাড়ি যাবার নাম করে সাঁঝবেলায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল আর ফিরে এলো না।
বাপের বাড়িতে খোঁজ নেয়া হয়েছে। সেখানেও যায় নি। আত্নীয়স্বজনদের বাড়িতেও নেই। দুই একজন তাকে ওই পথেই যেতে দেখেছিল। কিন্তু, ভূতের ভয়ে কেউ আর সাহস করে সে পথে এগিয়ে যায় নি।
গল্পে গল্পে দুপুর গড়িয়ে আসে। বৈশাখের সূর্যে যেন আগুন আগুন খেলা! জ্বলছে আকাশ।
স্নান সেরে খেয়ে ঘুমোতে যায় রিতু। ঘুম আসছে না। পুরো বাড়ি যেন ঘুমিয়ে পড়েছে। মা, দাদি ঘুমোচ্ছেন। রিতু ভাবলো এই সুযোগটাকে কাজে লাগাতেই হবে। চুপি চুপি মন্ডলবাড়ির পথে পা বাড়ায় সে।
সাহসী হলেও একটু ভয়ই হচ্ছে রিতুর। গা ছমছম করছে। ভরদুপুরেও বেশ খানিকটা অন্ধকার পথটা। ভয় ভয় করে এসে পড়লো একটা বাড়ির অনেক কাছে।
দাদির বর্ণনা অনুযায়ী রিতু নিশ্চিত এটাই মন্ডলবাড়ি। সেই পুরনো আমলের টিনের বেড়ায় ঘেরা চারপাশ। দুই এক জায়গায় টিন খসে গেছে। তার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে একটা ঘর।
তাতে দুই একজন মেয়ে মানুষ দেখা যাচ্ছে। তাহলে কি রিফা আপু বেঁচে আছে? আর হাফিজের বউ? চুপ হয়ে অবস্থা বোঝার চেষ্টা করে। হঠাৎ পাশেই কিছু মানুষের কন্ঠ শুনতে পায় রিতু।
মুই এ পাপের কাম আর কইবার নেও! ম্যালা পাপ করচো। গেরামের বহুত জুয়্যান মাইয়ার জীবন নষ্ট করচো, পাচার করচো বিদ্যাশোত। না! আর না! দ্যাশোত রাইন বদলিছে।
কিছু লোক সায় দিলো কথায়।
হ, তোমরা ঠেকে কইচেন বাহে। মোর বেটিও বড় হইতোছে। এইগুলা কতা শোনলে বেটিক কেউ বিয়াও কইরবান নেয়। থাকো তোমরা মুই নাই তোমারগুলার সাথে!
রাগে, ক্ষোভে চোখে জল আসছে রিতুর।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।