ক্যাফে গল্পে সুপ্তা আঢ্য

শেষেরকথা
স্টেশন লাগোয়া বাজার ছাড়িয়ে গেলেই মতিগঞ্জ গ্রাম। তবে এখন আর একে গ্রাম বলা চলে না।স্কুল, কলেজ,ব্যাঙ্ক,পোস্টাপিস,বাজার সব নিয়ে মতিগঞ্জ আধা শহর হয়ে উঠেছে।এখানকার মানুষজন অনেকেই বেশ শিক্ষিত।
আজকের কাহিনী মতিগঞ্জ কলেজের অধ্যক্ষা অনসূয়া চৌধুরীর। প্রায় বছর কুড়ি আগে এই কলেজে শিক্ষিকা হিসেবে যোগ দিয়ে আজ এই কলেজের অধ্যক্ষা উনি।ঘাড়ের কাছে একটা আলগা হাতখোঁপা ,চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা ,ডানহাতের কব্জিতে হাতঘড়ি,পরনে সাদা শাড়ি আর হালকা প্রসাধনী অনসূয়া চৌধুরীর ব্যক্তিত্বে এক আলাদা মাত্রা এনে দিয়েছে।রাশভারী মানুষটাকে মতিগঞ্জের মানুষ এক অন্য চোখে দেখে।স্কুলের শাসনের চৌকাঠ পেরিয়ে আসা ছেলেমেয়েরাও ওনাকে সম্ভ্রমের চোখেই দেখে।কোনোরকম অন্যায় বরদাস্ত করেন না উনি।কলেজ লাগোয়া যে গার্লস হস্টেল আছে সেখানেই থাকেন অনসূয়া।কলেজ থেকে অন্য ব্যবস্থা করা হলেও মেয়েদের চোখের আড়াল করবেন না বলে হস্টেলকেই বেছে নিয়েছেন উনি।
আজ কলেজের অ্যানুয়াল ফাংশান থাকায় ছেলেমেয়েরা বেশ কিছুদিন ধরেই ভীষণ উত্তেজিত। ছাত্র সংসদ সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবার কোন শিল্পীকে নিয়ে আসবে।ছাত্র সংসদের সাথে কলেজের শিক্ষক শিক্ষিকাদের বিশেষত ওনার সম্পর্ক খুবই ভাল। যেকোন প্রয়োজনে উপদেশ নেয় ছেলেমেয়েরা।শিল্পীকে আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়েও ওনার পারমিশন নিয়েই এগিয়েছে ওরা।সংসদের ছেলেমেয়েরা অনসূয়াকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে শিল্পীর হাতে পুষ্পস্তবক তুলে দেওয়ার জন্য। কোনো না ই শোনে নি দলটা।
দুপুরের খাওয়ার পর থেকেই মেয়েরা ফাংশনে যাওয়ার তোড়জোড় শুরু করে দিয়েছে।হস্টেলের খাওয়ার সময় কোনদিনই থাকেন না উনি।নিজের খাওয়াটা ঘরেই সেরে নেন।আজ নিয়ম ভেঙে খাওয়ার সময় হলঘরটায় ঢুকতেই চারিদিকে এক অস্বাভাবিক নীরবতা নেমে এল।মেয়েরা খাওয়া থামিয়ে তাকিয়ে রইল ম্যাডামের দিকে।কোনোরকম ভণিতা না করেই অনসূয়া বললেন”দেখো,আজ একজন বড়ো শিল্পী আসছেন আমাদের কলেজে।সন্ধ্যের অনুষ্ঠান আজ তোমাদেরই।নিজেদের মতো করে আনন্দ করার দিন আজ তোমাদের। তবে তা যেন মাত্রাছাড়া না হয়ে যায় সে খেয়াল তোমাদেরই রাখতে হবে।কলেজের সম্মান, শিল্পীর সম্মান আর নিজেদের সম্মান বজায় রেখেই আনন্দ করবে এই আশাটুকু করতেই পারি তোমাদের কাছে।”কথাগুলো বলে নিজের ঘরে গিয়ে খাওয়া শেষ করে বিছানায় শরীরটা এলিয়ে দিতেই মেয়েদের কলকাকলী কানে এল ওনার।প্রথমে একটু বিরক্ত হলেও পরে ভাবলেন “এটাই তো বয়স ওদের প্রজাপতির মতো উড়ে বেড়ানোর। এখন আনন্দ না করলে আর কবেই বা করবে।নিশ্চয়ই ওরা এখন রেডি হচ্ছে।আজ ওরা ওদের মতোই থাকুক। “এসব ভাবতে ভাবতে কখন যেন চোখটা লেগে এসেছিল ওনার।হঠাৎই দরজায় ধাক্কার আওয়াজ শুনে দরজাটা খুলে দেখেন তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী মেহুল দাঁড়িয়ে।”কিছু বলবে?”
“হ্যাঁ ম্যাম,আপনি যাবেন না!”
“ওটা তোমাদের অনুষ্ঠান,আমি গিয়ে কী করব?”
“আপনি তো আমন্ত্রিত ম্যাম ।আপনি আমাদের চিফ গেস্ট। প্লিজ ম্যাম রেডি হয়ে নিন।”
“আচ্ছা বেশ,তোমরা যাও——অনুষ্ঠানের তো দেরী আছে!ঠিক সময় পৌঁছে যাব।”
“আপনাকে একা যেতে হবে না ম্যাম, আমি এসে নিয়ে যাব।”
“বেশ তাই হবে।তোমরা যাও আনন্দ কর।আর আমার কথাগুলো মনে রেখো।”
মেহুল চলে যেতেই ঘরের দরজা বন্ধ করে ঘরের লাগোয়া ছোট্ট বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন অনসূয়া।মেয়েরা সেজেগুজে দল বেঁধে কলেজের মাঠের দিকে চলেছে।ওখানেই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে ওরা।নানা রঙে রঙিন ফুলকুমারীদের দেখে ঠোঁটের কোণে একচিলতে হাসি খেলে গেল ওনার।হয়ত বা নিজের কথাই মনে পড়ে গেল ওনার।তবে স্মৃতিচারণের অভ্যেস ওনার নেই বলেই মেয়েদের গতায়তের পথের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন অনসূয়া।
বিকেল প্রায় পাঁচটার দিকে দরজার বাইরে থেকে ডাক শুনে দরজা খুলে মেহুলকে দেখে গুরুগম্ভীর মানুষটা মুচকি হেসে বললেন”বা!তোমাকে তো ভারী মিষ্টি দেখাচ্ছে।”
একটু লজ্জা পেয়ে মেহুল বলল”একটা কথা বলব ম্যাম?”
“হ্যাঁ বলো।”
“আপনি আজও একইরকম সেজেছেন —–তবু আজ আপনাকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে।আপনার শাড়িটা খুব সুন্দর ম্যাম। “মুচকি হেসে বললেন “চলো যাওয়া যাক।”
কলেজের মাঠের একটা অংশ জুড়ে মঞ্চ বাঁধা হয়েছে।মঞ্চের সামনের দিকে বেশ কিছু চেয়ার রাখা হয়েছে আমন্ত্রিত অতিথিদের বসার জন্য। নিজের জন্যে নির্দিষ্ট চেয়ারটায় বসতেই সুবেশা মেয়েরা অন্যান্যদের সাথে ওনাকেও বরণ করে নেয়।এর কিছুক্ষণের মধ্যে সংসদ সভাপতির হাত ধরে যে মানুষটা মাইক হাতে গান গাইতে গাইতে মঞ্চে উঠে এলেন তাকে দেখে পায়ের তলার মাটি কেঁপে উঠল অনসূয়ার।এ কাকে চোখের সামনে দেখছে ও—–বিখ্যাত গায়ক কৌস্তভ মিত্র। একে সম্বর্ধনা জানাতেই মঞ্চে উঠতে হবে ওনাকে!”এটা কীভাবে সম্ভব আমার পক্ষে!কৌস্তভ যদি চিনতে পারে আমাকে!”মনের এই দোটানার মধ্যেই নিজের নাম শুনতে পেয়ে যতটা সম্ভব নিজেকে শক্ত খোলসের মধ্যে রেখে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলেন মঞ্চের দিকে।
স্টেজে উঠে কৌস্তভের হাতে তুলে দেওয়ার সময় আঙুলে আঙুল ছুঁয়ে যেতে অনসূয়ার দিকে তাকাতেই থ হয়ে গেল শিল্পী কৌস্তভ মিত্র। দু তিন মিনিটের মধ্যে নিজেকে সামলে নিয়ে ফুলের বোকেটা পাশে সরিয়ে রেখে হাত জড়ো করে নমস্কার করতেই প্রতি নমস্কার ফিরিয়ে স্টেজ থেকে নেমে হস্টেলের দিকে পা বাড়াতেই ছেলেমেয়েরা পথ আটকালো ওনার”প্লিজ ম্যাম দুটো গান শুনে যান।”
“হস্টেল থেকে শুনতে তো পাব।তোমরা আনন্দ করো।”
“আপনি থাকলে আমাদের আনন্দ আরও বেশী হবে।প্লিজ ম্যাম—-” ছেলেমেয়েদের অনুরোধ এড়াতে না পেরে সামনের সারির চেয়ারে স্থবিরের মতো বসে রইলেন অনসূয়া।
স্টেজে উঠে সময় নষ্ট না করে গান শুরুকরে দিল কৌস্তভ। আজ কৌস্তভ নিজের অ্যালবাম
থেকে গান না গেয়ে পুরানো দিনের গান গাইছিল আর বারবার ওর চোখ চলে যাচ্ছিল সামনের সারিতে বসে থাকা সাদা জমির ওপর কালো বুটির পিওর সিল্ক পরিহিতা মহিলার দিকে।মোটা ফ্রেমের আড়ালে ঢেকে রাখা মায়াবী চোখদুটো খুঁজছিল কৌস্তভ। আর খুঁজছিল আলগা হাতখোঁপার বাঁধনে বেঁধে থাকা একঢাল কালো কেশরাশিকে আর ভেতর ভেতর অস্থির হয়ে উঠছিল ও।
প্রথম গানটা শেষ হতেই চোখ থেকে চশমাটা খুলে ওপরে তাকাতেই দৃষ্টি বিনিময় হয়ে গেল কৌস্তভের সাথে আর সাথে সাথেই এক অজানা শান্তিতে ভরে গেল ওর মনটা।নিজের অজান্তেই ঠোঁটের কোণে হাল্কা হাসি ছুঁয়ে গেল কৌস্তভের।আর অপর দিকে অনসূয়া এক অদ্ভূত অস্বস্তিতে কৌস্তভের চোখ থেকে চোখ সরিয়ে পরে ফেলল চশমাটা তাড়াতাড়িই। পেছনে তখন ছেলেমেয়েরা কৌস্তভের নামে হর্ষধ্বনি দিচ্ছে।মুহুর্তের মধ্যে বুকের ভেতরটা চিনচিন করে উঠল ওর।আর কাল বিলম্ব না করে কোনো দিকে না তাকিয়ে ধীর পায়ে হেঁটে চললেন হস্টেলের দিকে।এখন আর কেউ আটকানোর নেই—–ছেলেমেয়েরা আনন্দে মশগুল।তবে তারই মধ্যে কয়েকজোড়া ছেলেমেয়ে এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।তাদের না দেখার ভান করে এগিয়ে যেতে যেতেই কানে আসছিল কৌস্তভের গান ।এই বয়সেও কৌস্তভ যে মেয়েদের কতটা ক্রাশ তা ওখানে বসেই বুঝতে পারছিল অনসূয়া। হস্টেলে ফিরে এসে জামাকাপড় না পাল্টেই নিজের একচিলতে বারান্দায় বসে রইল ও।এখান থেকে কলেজের মাঠটা অনেকটা দেখা গেলেও কৌস্তভকে কোনোভাবেই দেখতে না পেলেও গানের কথাগুলো একেবারে হৃদয়ে গেঁথে যাচ্ছিল ওর।আজকের প্রত্যেকটা গান যেন ওকে উদ্দেশ্য করেই গাওয়া।আজ এতবছর পর কৌস্তভকে চোখের সামনে দেখে বড় দিশাহীন লাগছিল নিজেকে।রাগ হচ্ছিল ওর ওপর।কৌস্তভ কি জেনেই এখানে এসেছে—– কিছুই বুঝতে পারছিল না ও।শুধু কৌস্তভের গান আর স্মৃতি আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরছে ওকে।
বারান্দার চেয়ারে শরীরটা এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করতেই সেদিনের সেই রোগা একমাথা ঝাঁকড়া চুল ,অল্প দাড়ি,টানা দুটো চোখ আর গোলাপী ঠোঁটের ছেলেটার চেহারাটা ভেসে উঠল চোখের সামনে। সেদিনও এরকমই পুরো কলেজের ক্রাশ ছিল ও।মেয়েরা ওকে দেখলে পাগলপারা হয়ে গেলেও এসব দিকে ছেলেটার কোনো ভ্রূক্ষেপই ছিল না।বরং ওর উৎসাহ ছিল সদ্য গড়ে ওঠা ওদের গ্রূপটা নিয়ে।শাশ্বতর টেবিল বাজানো,অভ্রর মাউথ অর্গ্যান কৌস্তভ অনসূয়ার গান , অপালার কবিতা আর দেবারতির নাচ এই নিয়ে ওদের গ্রূপটা বেশ ভালোই ছিল।হইহই করে কলেজের ক্লাস আর ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে টেবিল বাজিয়ে গান—— কিভাবে যেন কেটে যাচ্ছিল দিনগুলো।এর মধ্যেই কখন যে ও কৌস্তভকে মন দিয়ে বসেছিল বুঝতেই পারেনি বছর উনিশের মেয়েটা।আর কৌস্তভের এসব দিকে কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই দেখে নিজের মনের কথা মনেই জমিয়ে রেখেছিল অনসূয়া।প্রিয় বান্ধবী অপালাকেও জানতে দেয়নি কখনও। কৌস্তভের ছোঁয়ায় শিউরে উঠলেও অনুভূতিগুলোকে একান্ত আপন করেই রেখে দিত ও।হঠাৎই গানের রেশ থেমে যাওয়াতে বুঝতে পারল অনুষ্ঠান শেষ হয়ে গেছে।বারান্দা থেকে মাঠের দিকে তাকাতেই দেখল বড়ো কালো গাড়িটা মাঠ পেরিয়ে বেরিয়ে গেল।কৌস্তভকে চলে যেতে দেখে অনসূয়া একটা শান্তির নিশ্বাস ফেলল—“যাক,কৌস্তভ এতদিন পর চিনতে পারেনি ওকে।”নীচ থেকে মেয়েদের গলার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছিল। কৌস্তভের গান আর রূপে মুগ্ধ মেয়েদের কলধ্বনি থামতেই চাইছিল না।মেয়েদের আলোচনা কিছুটা শুনে ধীর পায়ে ঘরে ঢুকে বিছানায় শরীর মন দুটোকেই ছেড়ে দিল অনসূয়া।আজ আর শাড়িটাও পাল্টাতে ইচ্ছে করছিল না।
বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করতে করতে কখন যেন চোখটা লেগে গিয়েছিল। পরদিন যখন ঘুম ভাঙল তখন বেশ বেলা হয়ে গেছে।রোজ ভোরে কলেজের মাঠে মর্নিং ওয়াকের অভ্যেস অনসূয়ার। আজ সেই নিয়মের বেনিয়ম হওয়ায় নিজের ওপর বেশ রাগ হচ্ছিল ওর।হঠাৎই দরজায় ধাক্কার আওয়াজে দরজাটা খুলতেই দেখল মাসী চায়ের কাপ হাতে দাঁড়িয়ে আর মেয়েরা পিছনে দাঁড়িয়ে।
“কী ব্যাপার, কিছু বলবে?”
“হ্যাঁ ম্যাম, আসলে আজ তো ছুটি আর পরশু
রবিবার—-তাই বাড়ি যেতে পারলে—-”
“বেশ তো যাও।সোমবার কলেজ যেন অ্যাবসেন্ট না হয়।”মেয়েরা রেডি হয়েই এসেছিল। ওরা চলে যেতেই পুরো হস্টেল নিস্তব্ধতার মোড়কে মুড়ে গেল।আগেও মেয়েরা বাড়ি গেছে—-কিন্তু কোনোদিন এরকম অনুভূতি হয়নি ওর।এ সব কিছুই যে কালকের ঘটনার ফল বেশ বুঝতে পারছিল ও।
চা খেয়ে স্নান সেরে ঘরের টুকিটাকি কাজকর্ম সেরে সকালের ব্রেকফাস্ট শেষ করে অফিসিয়াল কাগজপত্রগুলো বসল ও।কলেজের ক্লাসরুম বাড়াতে হবে,নতুন কিছু কোর্স শুরু করতে হবে,কলেজকে আড়ে বহরে আরও বাড়াতে হবে যাতে পাশাপাশি অঞ্চলের ছেলেমেয়েরাও এখানেই পড়াশোনা করতে পারে।হঠাৎই মাসি এসে দরজার বাইরে থেকে ডাকতে বেরিয়ে আসতেই মাসি বলল”দিদি,একজন এসেছেন আপনার সাথে দেখা করতে।ভিজিটার্স রুমে বসিয়েছি।”
ঘরের দরজা বন্ধ করে নীচের ভিজিটার্স রুমে ঢুকতেই যাকে দেখল—–তাকে দেখে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল অনসূয়া।
“তুই এখানে!”
“হ্যাঁ,তোর সাথে দেখা করতে এলাম।কাল আমার সাথে দেখা না করে চলে এলি যে?”
“তুই আমাকে চিনতে পেরেছিলি!”
“তোকে চিনব না এটা হয় কখনও? এটা আমার প্রশ্নের উত্তর না অনু।”
“ছেলেমেয়েরা আনন্দ করছিল—-আমি থাকলে ওদের অসুবিধে হত—–তাই চলে এসেছিলাম।তবে তোর ক্রেজ কিন্তু সাংঘাতিক। ”
“এই বয়সে এসে এসব নিয়ে আর ভাবি না।”
“কোনদিনই কী ভেবেছিলি?”
এলোমেলো চুলগুলো আরও একটু ছড়িয়ে দিয়ে লাজুক হাসি হেসে বলল”জানিসই তো আমাকে।”
“এত বিখ্যাত হয়েও এতটুকুও বদলাসনি তুই।বিয়ে করেছিস তো?বউ নিশ্চয়ই খুব সুন্দরী!সে এসেও তোকে পাল্টাতে পারল না!বাই দ্য ওয়ে,আমি এখানে থাকি তুই জানলি কীকরে?”
“ধীরে বন্ধু ধীরে—–এত প্রশ্নের উত্তর একবারে দিই কীকরে বলতো!তোর প্রথম প্রশ্নের উত্তরে বলি—-বিয়ের আগেই কনে পালিয়ে গিয়েছিল, তাই বিয়েটা হয়নি।”
“আর দ্বিতীয় উত্তর? ”
“কাল সংসদের ছেলেদের কাছেই তোর হোয়্যার অ্যাবাউটস নিয়েছিলাম।এখন বলতো,কনে পালিয়ে গেছে শুনেও তোর কোনো দ্বিরুক্তি নেই—-এতটা বদলে গেলি কিভাবে অনু!”
“এটা বাজে কথা তাই!”
“তার মানে তুই বলতে চাস আমাকে ছেড়ে কেউ যেতে পারে না!”
“কখনই না”
“তাহলে তুই কীকরে পালিয়ে গেলি আমাকে ছেড়ে—-মানে—আমাদের ছেড়ে।তুই তো বলতিস,এই গ্রূপ তোর প্রাণ——একে ছেড়ে তুই থাকতেই পারবি না!কীকরে পারলি তাহলে?”
“তুই কী জেরা করবি বলে এখানে এসেছিস?”
“স্যরি রে ,তোকে জেরা করছি না।বাট্,বলবি না ——কেন তুই স্বেচ্ছা নির্বাসন বেছে নিলি!বাড়ির সঙ্গেও তো যোগাযোগ রাখিস নি—-কতবার গেছি তোর বাড়িতে—–কেউ কোনো খবর দিতে পারেনি।”
“একদিনেই সবটা জেনে নিবি!এতদিন পর দেখা হল—–তোর কথা বল—–তোদের কথা বল।শাশ্বত,অপা ওদের কী খবর?কেমন আছে ওরা?”
“তার মানে তুই আজও সবটা চেপে রাখলি বরাবরের মতো।বেশ,তোর ইচ্ছে নাহলে বলিস না।গ্রূপের সবাই ভালোই আছে।তোর কথা আমি কালই সবাইকে বলেছি।সবাই মিট করতে চায় তোর সাথে।”
“আমার কথা মনে আছে সবার?”
“তোকে কেউ ভুলতে পারে?বাই দ্য ওয়ে,আজ তোর হস্টেল এত চুপচাপ কেন?”
“দুদিন ছুটি থাকায় মেয়েরা বাড়ি গেছে।”হস্টেল ফাঁকা শুনে একলাফে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে কৌস্তভ বলল”বেশ তো ,তাহলে তুইও চল।”
“কোথায় যাব!”
“আমার সাথে,সবাইকে ডেকে নেব——সবাই মিলে একসাথে কাটাব।চল না রে।”
“আজ না অন্য কোনদিন যাব।আজ অনেক কাজ আছে রে।”
“আসলে তা নয়,তুই এখনও পালিয়ে বেড়াতে চাস আমাদের থেকে।আর তাই যেতে চাস না—-তাই তো অনু!”
একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে অনসূয়া বলল”হয়ত তাই।আমাকে একটু সময় দে প্লিজ। ”
“বেশ সময় দিলাম।কিন্তু আমি মাঝে মধ্যেই আসব তোর সাথে দেখা করতে।না করিস না প্লিজ। “আরও বেশ কিছুক্ষণ কথাবার্তার পর কৌস্তভ চলে যেতেই নিজের ঘরে এসে মাথায় হাত দিয়ে শুয়ে পড়ল অনসূয়া।
অনসূয়া ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই ওর চলে যাওয়া পথের দিকে একঝলক তাকিয়ে একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে হস্টেলের বাইরে বেরোতেই দেখল একটা ছোটখাটো ভিড় জমে গেছে।কোনোরকমে ভিড় সরিয়ে
গাড়িতে উঠেই পিছনের সিটে মাথাটা হেলিয়ে ড্রাইভারকে স্টার্ট দিতে বলে চোখটা বন্ধ করে রইল কৌস্তভ। অনসূয়াকে দেখার পর থেকেই মনটা বারবার কুড়ি বছর আগের দিনগুলোয় ফিরে যাচ্ছিল।কলেজের প্রথম দিনেই একঢাল কালো চুলের কোমর ছাপানো বেণী আর সুগভীর আয়ত চোখের শ্যামলা মেয়েটাকে দেখে বন্ধুত্ব করার ইচ্ছেটা জাগতেই ইচ্ছেটা পূরণ করে নিয়েছিল ও।আর দুজনের পছন্দের বিষয় এক হওয়ায় বন্ধুত্ব গভীর হতে সময় নেয়নি বেশী।অনুর সুগভীর চোখের গভীরের মতোই মনের গভীরের তলও পায়নি ও।বরাবরের চাপা স্বভাবের অনু নিজেকে মেলতই না কখনো।ওদের দুজনের দলটা আস্তে আস্তে ছজনের হওয়ায় অনু আনন্দ পেয়েছিল কিনা জানতে পারেনি কখনও। তবে আড়ে বহরে দল বাড়লেও ওদের বন্ধুত্বে ভাটা পড়েনি কখনও।অনসূয়ার চোখ আর চুল বড়ো পছন্দের ছিল কৌস্তভের। মাঝে মধ্যেই বলত”বুঝলি অনু,তোর চোখ আর চুল নিয়ে পরেরজন্মে আমি মেয়ে হব।”ওর কথায় খিলখিলিয়ে হেসে উঠে অনসূয়া বলত”বেশতো,পরেরজন্মে তুই আর আমি রূপটা বদলে নেব।তখন হাত কামড়াসনা যেন।”ওর কথায় বাকীরা হেসে উঠলে লজ্জায় মুখ নামিয়ে নিত ও।হঠাৎই ফোনের রিংটোনের আওয়াজে চমকে তাকাতেই স্ক্রিনে অপার নামটা দেখতে পেয়ে ফোনটা ধরতেই ওপাশ থেকে অপা বলল”কী রে ,গিয়েছিলি ওর কাছে?ও আসবে বলেছে?”
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কৌস্তভ বলল”হ্যাঁ,গেছিলাম। ওর একটু সময় লাগবে সবার সামনে আসতে।”
“কেন ওর এই স্বেচ্ছানির্বাসন—–কিছু জানতে পারলি?”
“তোর প্রিয় বান্ধবীকে তুই চিনিস না!ও কখনও কাউকে কিছু বলেছে যে আজ বলবে।”
“আমি কী একবার যাব ওর কাছে।”
“দেখ যদি পারিস ওর অভিমান ভাঙ্গাতে।তবে আমি যে ওর কাছে যাব—–এটা ওকে বলে এসেছি।”
“তুই একজন সেলিব্রিটি।তোর কী বারবার যাওয়াটা ঠিক হবে?”
“ও যদি সেটা না বোঝে তাহলে তো ওকে আর হারিয়ে যেতে দিতে পারিনা।কুড়িটা বছর পর ওকে খুঁজে পেয়েছি অপা।তুই চাসনা আমাদের বৃত্তটা সম্পূর্ণ হোক।”
“চাই কৌস্তভ—–শুধু আমি না,আমরা সবাই চাই অনু আমাদের মধ্যে ফিরে আসুক।তুই জানিস—–শাশ্বত আর অভ্রতো ভীষণ এক্সাইটেড ওর সাথে দেখা করার জন্যে।কাল ভাবছি একবার মতিগঞ্জ যাব।”
“নারে,ওকে কটাদিন সময় দে।এরপর যেদিন যাব—-তোকে নিয়েই যাব।”
“থ্যাঙ্কস রে।রাখি এখন।”
ফোনটা রেখে ভাবনার অতলে তলিয়ে গেল কৌস্তভ।
এরপর প্রায় সপ্তাহখানেক কেটে গেছে।প্রথম প্রথম ইউনিভার্সিটির দিনগুলোর মতো রাস্তার দিকে চোখ চেয়ে তাকিয়ে থাকলেও এখন আর তা করে না।এত বছর পর ওর নিস্তরঙ্গ জীবনে হঠাৎ আসা ঢেউয়ের মতো কৌস্তভ এসে সবটা ওলটপালট করে দিলেও এখন তা অনেকটাই স্তিমিত হয়ে এসেছে।অনসূয়া বুঝতে পেরেছে এ আসলে শিল্পীর সাময়িক উত্তেজনার ফল।অনেকদিন পর পুরোনো বন্ধুকে দেখে সামলাতে পারেনি নিজেকে।হঠাৎই মনে পড়ে গেল,কলেজ শেষে ওরা পাঁচজন ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলেও কৌস্তভ মিউজিক নিয়ে পড়ার জন্য অন্য ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হওয়া সত্ত্বেও ক্লাস শেষে নিয়মিত বন্ধুদের সাথে দেখা করতে চলে আসত ইউনিভার্সিটি ক্যাণ্টিনে।আর সেখানেই পড়ন্ত বিকেলের রোদ্দুরের আভায় চলত ওদের আড্ডা, গান,খুনসুটি আরও কত কিছু।নিজের ঘরে বসে এসব পুরোনো কথা নাড়াচাড়ায় অনসূয়া যখন মগ্ন তখন মাসী এসে বলল”দিদি,সেদিনের সেই দাদা আর সাথে একজন মহিলা এসেছেন।ভিজিটার্স রুমে বসিয়েছি।”মাসীর কথায় এক মুহূর্তের জন্য বুকের রক্ত চলকে উঠে সারা শরীর মনে কম্পন ধরিয়ে দিল ভীষণ ইচ্ছে করছিল কিশোরীর লঘু পায়ে দৌড়ে যেতে।কিন্তু তা তো আর সম্ভব না ——তাই ধীর পদক্ষেপে নীচে এসে দেখল ছোটখাট ভিড় জমে গেছে ঘরের সামনে।কৌস্তভ হাসিমুখে ওদের সাথে কথা বলছে আর একটু দূরে অপা দাঁড়িয়ে মজা দেখছে।ওকে আসতে দেখে মেয়েরা চলে গেলেও উঁকিঝুঁকি দেওয়াটা বন্ধ হল না।ওকে দেখে অপা দৌড়ে এসে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল”আমাদের এত কাছে থেকেও এতটা দূরে কীকরে আছিস অনু!”
“তোরা—–হঠাৎ!”
“তুই কী ভেবেছিলি সাময়িক উত্তেজনার বশে তোর সাথে দেখা করতে এসেছিলাম!”
“হ্যাঁ আমার সেটাই মনে হয়েছিল।তুই শিল্পী মানুষ,তোর পক্ষে যা স্বাভাবিক সেটাই ভেবেছি।”মুচকি হেসে কৌস্তভ বলল”ভুল ভাবনা তোর।তুই সময় চেয়েছিলি তাই সময় দিচ্ছিলাম আমরা তোকে।অপা পরদিনই আসতে চেয়েছিল। আমি না করেছিলাম।”
“কেমন আছিস অপা?”
“আমি ভালো আছি।কিন্তু তুই আমার প্রশ্নের উত্তর দিলি না যে!”
“কী বলব বলতো—–চাকরীটা পেয়ে গেলাম তাই চলে এলাম।এর মধ্যে অন্য কোনো ব্যাপার নেই।”
“তা বলে বাড়ির কাউকে,আমাদের—–কিছু না বলে চলে আসবি!কোনো যোগাযোগ করবি না কারোর সাথে!”
বড্ড অস্বস্তি হচ্ছিল ওর।কী জবাব দেবে অপার প্রশ্নের। আর অপা যে সহজে ছাড়বে না সেটা ভালোই বুঝতে পারছিল অনসূয়া। হঠাৎই ওকে এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতি থেকে মুক্তি দিয়ে কৌস্তভ বলল”ওর নিশ্চয়ই কোনো ব্যক্তিগত কারণ আছে।ও যখন বলতে চাইছে না—–জোর করিস না ওকে আর।নাহলে হয়ত আবার কোথাও পালিয়ে যাবে।তারচেয়ে বরং কাজের কথায় আসি।আমরা অপেক্ষা করছি,তুই তৈরি হয়ে আয়।”ওর কথায় অবাক হয়ে অনসূয়া বলল”কোথায় যাব বলতো?”
“আমার বাড়িতে।আজ সব্বাই আসছে তোর সাথে দেখা করবে বলে।প্লিজ, লক্ষ্মী মেয়ের মতো গিয়ে রেডি হয়ে আয়।”কৌস্তভের কথায় এমন কিছু ছিল অনসূয়া না বলতে পারল না।শুধু ভাবল সময় সবকিছুকে কতটা বদলে দেয়।সেদিনের সেই কৌস্তভ আর আজ যে ওর সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে দুজনের কত ফারাক।আগে হলে হয়ত ওর হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে যেত ওকে।আর আজ অপির কথায়—-ওর কথায় কত সুন্দর ভাবে নিজের বশে করে নিল সবটা।”কীরে কী ভাবছিস,যাবি তো!”অপার কথায় চমক ভেঙ্গে ওপরে গিয়ে সাদা জমির ওপর চাঁপা রঙের বুটি দেওয়া শাড়িটা পরে ,ঘাড়ের কাছে খোঁপাটা এলিয়ে নিয়ে যখন নীচে নামল তখন কৌস্তভ মেয়েদের সাথে গল্প জুড়েছে।ওকে দেখে কৌস্তভ বলল”চল বেরোনো যাক।অনু,সাদা শাড়িতে তোকে বেশ শুভ্র দেখাচ্ছে—-চুলটাতো খোলাই রাখতে পারতিস।”মেয়েরা কৌস্তভের কথা চোখ বড়ো বড়ো করে শুনছিল।তাদের ম্যামকে কেউ এভাবে বলতে পারে ভাবতেই পারেনা ওরা।আর অনসূয়া মেয়েদের সামনে এরকম প্রশংসায় একটু অস্বস্তিতে পড়ে গিয়ে চাপা ধমকের সুরে বলল”যাবি—-না বাজে বকবি।দেরী হয়ে গেলে আমি কিন্তু যাব না।”
“স্যরি ম্যাডাম, চলুন।”পরে মেয়েদের দিকে ঘুরে বলল”পরেরবার অনেকটা সময় নিয়ে এসে তোমাদের সাথে গল্প করব।আসি টা টা।”মেয়েরা হইহই করে হাত নাড়তে গিয়েও অনসূয়াকে দেখে থমকে গিয়ে চুপচাপ হাত নেড়ে বিদায় জানাল কৌস্তভকে।
ওরা বেরোতেই মেয়েদের মধ্যে আলোচনার ঝড় বয়ে গেল।সে আলোচনায় আমাদের না ঢুকলেও চলবে।হস্টেল থেকে বেরিয়ে তিনজন যখন কৌস্তভের বাড়িতে পৌঁছতেই দেখল শাশ্বতরা আগেই চলে এসেছে।ওকে দেখে সকলে হইহই করে উঠল।ওদের ছজনের আড্ডাটা আগের মতোই জমে উঠল আবার।অনসূয়াও অনেকদিন পর মনের আগল খুলে বেরিয়ে এল।তবে মাঝেমধ্যেই কৌস্তভের চোরাচাহনি বুকের মধ্যে ঝড় তুলছিল ওর।বহুদিন পর কৌস্তভের সাথে গলা মিলিয়ে অভ্রর মাউথ অর্গ্যানের সুরে আর শাশ্বতর টি টেবিল বাজার সাথে গান করল অনসূয়া। ওর মনে হল সময়টা যেন কুড়ি বছর আগে থমকে গেছে।লাঞ্চের পর হঠাৎই অভ্র বলল”আমার একটা প্রস্তাব আছে।”সবাই উন্মুখ হয়ে ওর দিকে তাকাতে ও বলল”এবার একটা মহৎ উদ্দেশ্য সাধন করলে কেমন হয়!”
“কী উদ্দেশ্য, একটু ঝেড়ে কাশবি!”শাশ্বতর কথায় অভ্র বলল”আমি ভাবছি,বহুদিন তো হল —–এবার কৌস্তভের বিয়ে দিলে কেমন হয়।”
“ওয়াও! দ্যাটস অ্যা গ্রেট আইডিয়া।কিন্তু পাত্রী —“অপালা বলে উঠল “পাত্রী রেডি।কীরে অনু,তোর কোনো আপত্তি নেই তো এই বিয়েতে।”
“মানে,কী বলছিস তোরা!”
“ঠিকই বলছি,তোকে খুঁজে পেয়েই আমরা চারজন ঠিক করেছি তোদের বিয়ে দেব।তুই না করিস না অনু——আর কেউ না জানুক আমি তো জানি তুই কৌস্তভকে কতটা ভালবাসিস।”
“শুধু তুই না অপা,আমরা সবাই জানি।”দেবারতির কথায় সবাই সায় দিয়ে ওদের বিয়েটা ফাইনাল করে ফেলল।কিছু একটা বলতে গিয়ে কৌস্তভের দিকে তাকাতেই দেখল চোখ ভরা আশা নিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রয়েছে ও।অনসূয়ার মুখে কথা সরল না।মৌনং সম্মতি লক্ষণম্ ধরে নিয়ে আনন্দ উচ্ছ্বাস শুরু হয়ে গেল সবার মধ্যে।
বিকেলে হস্টেলে ফেরার সময় কৌস্তভ বলল”কীরে ,তুই চুপ করে আছিস যে—–কিছু বলবি না—-”
“কী বলব বল্”
“তোর মনে আছে অনু,ইউনিভার্সিটির পরীক্ষার শেষে তুই কাঁদতে কাঁদতে আমার কাছে এসে বলেছিলি”আমার বিয়ে ঠিক করছে বাড়ি থেকে।কিছু একটা কর।”আমি হাসতে হাসতে বলেছিলাম ভালোই তো,বিয়েটা করে ফেল।জমিয়ে ভোজ খাব।সেদিন তোর কথার মানে বুঝিনি অনু—–আমাকে ক্ষমা করে দে।”অনসূয়া কিছু বলতে যেতেই ওকে চুপ করিয়ে দিয়ে কৌস্তভ বলল”আমাকে বলতে দে।এর কিছুদিনের মধ্যেই তুই কোথায় হারিয়ে গেলি।অনেক খুঁজলাম তোকে—–সেদিনের তোর বলা কথার মানেটা বুঝতে পারলাম।বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।অপাকে সবকথা বলতে অপা গালাগালি দিয়ে বলে উঠল’গর্দভ,ও ভালবাসে তোকে।তুই এভাবে যেতে দিলি ওকে।’নিজেকে প্রশ্ন করলাম—–উত্তর পেলাম না।বুঝতে পারলাম না তোকে ভালবাসি কিনা।তবে তোকে হারিয়ে নিজেকে বড়ো অসম্পূর্ণ মনে হত।খুব খালি খালি লাগত চারপাশটা।অভ্র বলল,এটাই নাকি ভালবাসা।কিছু বলবি না অনু?”
“কী বলব,এগুলো সব আমার জানা।নতুন কিছু বল।”
কথার রেশ ধরে এগিয়ে চলল কৌস্তভ “তোকে সেদিন কলেজে দেখে স্থির রাখতে পারছিলাম না নিজেকে।মনে হচ্ছিল দৌড়ে গিয়ে তোকে জড়িয়ে নি—-আর যেন কখনো তোকে হারাতে না হয়।এটাই তো ভালবাসা রে।নিজের উত্তর আমি পেয়ে গেছি অনু—–তোকে ভালবাসি অনু।”কথায় কথায় হস্টেল এসে যেতে কৌস্তভের হাতে আলতো চাপ দিয়ে নেমে এল অনসূয়া।কৌস্তভের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে হস্টেলে ঢুকে গেল অনসূয়া আর নিজের মনে জমে থাকা কথাগুলো আজ ওকে বলতে পেরে ভীষণ হাল্কা লাগছিল নিজেকে।হঠাৎ খেয়াল হল,অনুর উত্তরটাতো শোনা হল না।থাক আর তো মাত্র কটাদিন। বিয়ের পরেই নাহয় শুনব।
এরপর কেটে গেছে বেশ কয়েকটাদিন।আজ অনসূয়া আর কৌস্তভের বিয়ে।জোগাড় যা করার কৌস্তভই করেছে—–অনসূয়া কলেজ ছাড়া আর কিছুই করে নি।কথা ছিল কৌস্তভ সকালেই গাড়িটা পাঠিয়ে দেবে।চলে আসবে অনসূয়া।কথামতো গাড়িটা পাঠিয়ে দিয়েছে কৌস্তভ। সকলে অপেক্ষা করছে অনসূয়ার জন্য। হঠাৎ বাইরে গাড়ির আওয়াজ পেয়ে অপা আর দেবারতি বাইরে দৌড়ে যায় কনেকে আনতে।কিছুক্ষণ পর ওরা যখন ফিরল তখন অনসূয়া নেই অপার হাতে একটা চিঠি।চিঠিটা অপার হাত থেকে কৌস্তভ নিয়ে পড়তে শুরু করল
প্রিয় কৌস্তভ, তুই আজও বুঝিসনি আমাকে ভালোবাসিস কিনা।সবার কথায় সায় দিয়ে তুই এ বিয়েতে রাজী হয়েছিস।হয়ত বিয়ের পর তুই আমাকে চেষ্টা করবি ভালোবাসার। হয়ত সফলও হবি।তোর মনে হয়েছে তোর কারণেই আমার এই স্বেচ্ছানির্বাসন। সেই অপরাধবোধ থেকে মুক্তি পেতেই তুই আমাকে বিয়ে করছিস।আমার স্বেচ্ছানির্বাসন আমার নিজের প্রতি অভিমানে—–তোর ওপর কোনো রাগ,অভিমান—-কিচ্ছু নেই আমার।আমি তোর ভালবাসা চেয়েছিলাম কৌস্তভ—-তোর কর্তব্য নয়।এই বয়সে এসে তোর বোঝা হতে আর পারব না।চাকরীটা ছেড়ে দিলাম।নিজের মনকে প্রশ্ন কর——যদি সত্যিই ভালোবাসিস আবার আমাদের দেখা হবে।এ জন্মে নাহয় পরজন্মে।তবে তুই তো শিল্পী—–পৃথিবী ঘুরে বেড়াস——আর পৃথিবীটা বড্ড ছোট।হয়ত কোনো এক কোণে আবার দেখা হয়ে যাবে তোর সাথে।সেদিন যদি ভালোবেসে সব দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে হাত ধরিস—–ছাড়ব না কখনও ।কথা দিলাম।
অনু
চিঠিটা হাতে ধরে কাছে থাকা চেয়ারটায় বসে পড়ল কৌস্তভ ।বাকীরা হতভম্বের মতো এ ওর দিকে তাকিয়ে রইল আর মাথার ওপর ঘুরতে থাকা ফ্যানের হাওয়ায় কৌস্তভের হাতে ধরা চিঠিটা উড়তে লাগল হাল্কা হয়ে।