সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে সোনালি (পর্ব – ৩৪)

পুপুর ডায়েরি
খুব খুব জরুরি কথা ডিজিটাল মিডিয়াতে আলোচনা হচ্ছিল । আমি চারপাশে তাকিয়ে যখনই ভাবি/ ভেবেছি আমার বাচ্চাদেরও বড় হবার সময়, যে আমার বাবা মা তো আমি ইস্কুলে যাবার সময় থেকেই আমার সঙ্গে খুব সমান সমান সম্মান দিয়ে কথা বলতেন, এবং মতামত নিতেন বাড়ির নানা ব্যাপারে কথা বলতে বসে। বেশিরভাগ পরিবারেই ছোটোদের এত তাচ্ছিল্য কেন?
বয়সে কম হলেই মানুষ কি অমানুষ প্রাণী হয়ে যায়? আর অন্য প্রাণীদের সাথেও কি খারাপ ব্যবহার করার কোনো অধিকার আমাদের আছে? শুধু খেতে পরতে দিই বলেই?
ভাগ্যিস আমি এর থেকে দূরে ছিলাম।
বাবা মা আর আমি, তিন জনেরই মতামতকে গম্ভীরমুখে আলোচনা করে ভেবে দেখা হত বাড়িতে।
তাই কমলের দোকান থেকে কি আনা হবে সে ব্যাপারে ও আমায় জিজ্ঞেস করা হত মাসের প্রথমে।
কমলের দোকান কাকে বলে?
সে এক আশ্চর্য ব্যাপার।
কমল বাবু ছিলেন এক অতি অভিজাত ভদ্রতায় মোড়া সুন্দর মানুষ। তিনি হাতা গোটানো সাদা বা হাল্কা রঙের লম্বা শার্টের সাথে ধুতি পড়তেন। ফর্সা টুকটুকে মানুষ। মাথাটিও ফর্সা চকচকে। দু চারটি লম্বা চুল, এক দিক থেকে অন্যদিকে পেতে আঁচড়ে রাখা থাকত পরিপাটি করে। ছোটো ঝুঁপো গোঁফ। এবং প্রসন্ন মুখ।
এত মোলায়েম ভাবে কথা বলতেন, উল্টো দিকের মানুষের গলাও নেমে আসত।
চারু মার্কেটের প্রধান দরজা দিয়ে ঢুকে দুটি দোকানের পরে ডান হাতে দোকান। মানুষ দাঁড়ালে যতটা উচ্চতা তার মাঝামাঝি, মানে কোমরের কাছ ধরে একটা টেবিলের মত কাঠের ডেস্ক। ঠিক ডেস্ক না, তার নীচে জিনিসপত্রের তাক ও। কিন্তু ওই টেবিলের একটা ভাগ ভাঁজ করে তুলে ফেলা যেত।
একেবারে ছোটো থাকতে আমার এইটা মহা বিস্ময়কর মনে হত।
যেই কেউ বাইরে থেকে এসে ভিতরের অজস্র জিনিসপত্র ভরা গুহার মত মস্ত জায়গায় ঢুকতে চায়, আলিবাবার চিচিং ফাঁকের মত একটা ছেলে এসে খট করে টেবিলের মাঝখানটা খুলে সামনের তাকের খানিকটা ক্যাঁচ শব্দে ভেতর দিকে টেনে নেয়।
আর সেই ফাঁক দিয়ে সুরুৎ করে গলে যায় মানুষ। তারপর আবার খট খট খট। ব্যাস।
যেমনকে তেমন। একখানা বড় আলমারি গোছের ডেস্ক। তার ওপরে হাত রেখে টুলে বসে আছেন বড় দোকানদাররা। পিছনে দোকানের ভেতরে গহ্বরে বাচ্চা কর্মচারীরা কাজ করছে। কোথাও কোন ঢোকার জায়গা নাই।
সামনে বসতেন কমল বাবু, বা তাঁর আত্মীয়, বোধহয়, ভাগ্নে, বাদল বাবু।
কমল বাবু যতটাই হাসিখুসি মানে না হাসলেও মুখে একটা হাসি হাসি ছায়া, ওকেই স্মিত বলে বোধহয় ; বাদল বাবু ততটাই, যাকে বলে খ্যাঁচা।
মানে ঠিক বোঝাতে পারব কি? ভুরু কুঁচকে এমন তালতোবড়া করে রাখতেন মুখখানা বেশির ভাগ সময়, যেন খুউব তেতো কিছু এখুনি খেয়ে এসেছেন, জিভ থেকে তেতোটা আর যাচ্ছে না।
আর ফাঁক পেলেই বকা। যাকে যখন পাচ্ছেন। সুযোগ পেলেই দনাদ্দন।
..এত তাড়া দিচ্ছেন কেন?
..এত হুড়োহুড়ি করে কি জিনিস দেয়া যায়?
.. দেখছেন সবাই ব্যস্ত, কাকে ফেলে কাকে দেব?
..জিনিসের দাম ত দেখে বলতে হবে। সব কি আমি মুখস্থ করে রেখেছি?
ওরে বাবা রে, বাবা।
পুপুর মাথা ওই ডেস্কের মত সামনের দেয়াল কাম তাকের সমান সমান। ডিঙি মেরে উপরটা দেখতে পায়। মায়ের পাশে , বাবার পাশে দাঁড়িয়ে। ভিড় থাকে বেশিরভাগ সময়েই। তার একফাঁকে কাত হয়ে দাঁড়িয়ে ভেতরটা দেখার চেষ্টা করে ছোট মানুষ।
আশ্চর্য রকমের গন্ধ আসে।
মশলা, দারচিনি, হলুদ, শুকনো লংকা, তেজপাতা, আরও আরও সব। তার সাথে মিছরি, ব্রাসো, সার্ফ, সোডা, ফিটকিরির ঝাঁঝ। এক পাশের কাঁচের তাকের নতুন খাতা, পেন্সিল, প্যাস্টেল রঙের পরম লোভনীয় বাক্সের গন্ধ। আর এত্ত রকম সেন্ট দেয়া রঙিন ইরেজার, আহা আহা। বেশিরভাগই খুব বাজে মোছে, তাতে কি। কী বায়নাক্কা সেইগুলোর জন্যে। দোকানের আরও গভীরে, ওই যে আলিবাবার গুহা, ওই রকমই ভেতর দিকে সব চটের বস্তা থাকে। তাতে লাল টুকটুকে মুসুর ডালের স্তুপ, পাশেই হয়ত গুড়, চ্যাটচ্যাটে, আরেক পাশে চকচকে চিনি। ছোটো মাঝারি খোকারা, কেউ গামছা প্যাঁচানো, কেউ হাফ প্যান্ট পরা দৌড়ে দৌড়ে, এই ভিড় করে থাকা ক্রেতাদের চাহিদার যোগান দিতে থাকে।
পুপু ভাবে এমন আশ্চর্য জায়গায় বসেও বাদল বাবু এত তিরিক্ষি হয়ে থাকেন কি করে!
তো, এই কমলের দোকানের একটি ছোট্ট নোট খাতা ছিল। চার কি ছয় ইঞ্চি বাই দুই ইঞ্চি।
সেটাই ছিল হ্যারি পটারের ম্যাজিক ওয়ান্ডের মত পুপুদের চিচিং ফাঁকের চাবি কাঠি।
ও-ই খাতা হাতে নিয়ে দাঁড়ালে তুমি যা খুসি নিয়ে চলে আসতে পারো।
হয় মা তাতে কি লাগবে লিখে পাঠাবেন , নয় তুমি মুখে বলবে, বাদল বাবু বা কমল বাবু খুব কচিৎ থাকলে, লিখে দেবেন খাতায়।
ব্যস।
কোন পয়সাকড়ি লাগে না।
ব্যস, খালি কমলের দোকান-এর খাতা লাগে।