সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে সোনালি (পর্ব – ৯৮)

রেকারিং ডেসিমাল

বাড়ি মস্ত বড়।
রাস্তার থেকে অনেক উঁচুতে তার দরজা। রোয়াকে ঘেরা সামনে। কিন্তু চৌকাঠের চারপাশে ফ্রেমে ঘেরা কাঠের পুরোনো দরজাটা সরু খুব। বেশ কয়েক ধাপ সিঁড়ি চড়ে তারপর দরজায় পৌঁছলো সবাই এক এক করে।
ঠাকুমা হাঁসফাঁস করছিলেন, একেই এত বড় ট্রেনজার্নি, তারপর এই গলি দিয়ে কতখানি হেঁটে আসা।
যাই হোক, সবাই চৌকাঠ টপকে এসে দাঁড়ালো উঠোনের সামনে।
এক পাশ দিয়ে ঘোরানো খুব সরু সিঁড়ি উঠে গেছে। মাঝখানে চৌকোনা উঠোন পাশে কুয়ো। এরা বলছে চবুতরা। ওপরে চৌকোনা ফাঁক রেখে ঘোরানো নক্সায় সারি সারি ঘর দেখা যাচ্ছে। অনেক তলা পর পর।

মিশ্রজী ত টকটক করে চড়ে পড়লেন সিঁড়ি। বাকিরা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল খানিক।
পুরোনো চুন সুরকির গাঁথনি। একেকটা সিঁড়ি এক ফুট প্রায় উঁচু। খাড়াই দেখে মনে হয় এর চেয়ে পাহাড়ে চড়া সোজা।
ঠাকুর্দা ফিট বীরপুরুষ। তিনি বললেন, হ্যাঁ হ্যাঁ উঠে যাব।
বাবা খ্যাঁক করে বললেন, আর মা কি নীচে দাঁড়িয়ে থাকবে? একে তুলব কি করে?
মিশ্রজী চটপট নেবে এসে অবাক হলেন।

আরে, খড়ে কিঁউ?
এবার মা আঁচল কোমরে গুঁজে এগোলেন।

এত খাড়া সিঁড়ি চড়বে কি করে সবাই? পড়ে যাবে তো।

মিশ্রজী ভারি অবাক হয়ে বললেন, কাহে ? রসসি হ্যয় না? পকড় লিজিয়ে।
মা উঁকি মেরে দেখলেন সিঁড়ির মাথায়, আর নীচে দরজার পাশে দুটি সিড়িঙ্গে লোহার পেরেক গাঁথা আছে। তার থেকে দেয়ালের গায়ে ঝুলছে লিকলিকে নারকেল ছোবড়ার দড়ি একগাছা।
ওই নাকি ধরে উপরে ওঠার অবলম্বন। হায় হায়!
বাবা ছেলেকে ঘাড়ে তুলে নিলেন।
মা মেয়ের হাত ধরলেন শক্ত করে। ঠাকুর্দা চড়া শুরু করলেন আগে।
মা এক ধাপ এক ধাপ করে উঠতে থাকলেন মেয়েকে শক্ত করে সাথে নিয়ে।
বাবা নীচে দাঁড়িয়ে হইহই করে উৎসাহ দেন তাঁর মাকে।
আরে ওঠো। দেয়ালের দিকে একেবারে চেপে উঠবে। পড়ে গেলে কিন্তু আর তুলতে পারব না।
মা পিছনে তাকিয়ে তাকিয়ে এক পা এক পা উঠতে ভাবেন, উফ কি আশ্বাসবাণী। কি আনন্দই হচ্ছে শুনে।
তারপর আস্তে আস্তে বলেন, এই ত আমি আগের সিঁড়িতেই আছি। ভয় পেও না। দেয়াল ধরে ওঠো।
তারপর জোরে নীচের দিকে আওয়াজ পাঠান, এই যে, তুমি মায়ের পিছনে পিছনে উঠতে থাকো। তা হলেই আর ভয় পাবে না বেচারা।

বাবা গজগজ করতে করতে ওঠেন, হ্যাঁ হ্যাঁ, কি আরাম আমার, এই গরুর পালকে উপরে তুলব, তারপর আবার নীচে নেমে সুটকেস নিয়ে আসব, এই করতে থাকি আমি।

খাড়া সিঁড়িতে এক হাতে দড়ি আর এক হাতে মেয়ে নিয়ে উঠতে উঠতে মা আর জবাব দিতে দম পান না।
এক মনে পর্বতারোহণ সামলান।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।