সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে সোনালি (পর্ব – ১০২)

রেকারিং ডেসিমাল
সেকেলে সাদা ছাই ছাই সিমেন্ট দিয়ে করা মেজে সব। লোহার বালতি, মগ। তাতেই জল ভরে ছানাদের চান করিয়ে পরিষ্কার জামাকাপড় পরিয়ে রেডি করে দেন মা সবার আগে। তারপর নিজে, সখের ইক্কতের পাখি আর হাতির চৌখুপি নকশায় লাল সাদা সিল্কের শাড়ি পড়ে আঁচল কোমরে গুঁজে ফেলা শক্ত করে।
খাটের ওপর বাবার কাঁথা ফোঁড়ের ঘিয়ে সিল্কের পাঞ্জাবি, পায়জামা।
খুদি ছেলের ও, বাবার সঙ্গে ম্যাচিং ঘিয়ে পাঞ্জাবিতে কাঁথার কারুকাজ। কি গম্ভীর ভাব তার।
আরও গম্ভীর দিদি মায়ের পাশে পাশে ঘোরে, কিছু কাজ করার ডাক দেন যদি মা।
মা তার হাতেই ধরিয়ে দিলেন ঠাকুমার শাড়ি জামা, ঠাকুর্দার পাঞ্জাবি পাজামা। এই সুটকেসেই সকলের বেশি ভালো জামা টামা প্যাক করা আছে।
মা কন্যাকে পাঠান পাশের ঘরে।
যাও, দিয়ে এসো দাদা ঠাম্মাকে। বলো, চট করে চান সেরে নিতে, বাবা চান করে বেরোলেই মন্দিরে যাবো।
সকালে ঘরের পাশ দিয়ে যাওয়া মানুষদের মুখের ধ্বনি বাজতে থাকে বুকের গভীরে।
প্রণমামি শিবম, শিব কল্পতরুম।
মা সাবধানে সুটকেসের গভীর থেকে বের করে আনেন কৌটো। তাতে সোনা রুপোর ছোট ছোট বেল পাতা পাতলা গোলাপি কাগজে মোড়া। সখ করে বানিয়ে এনেছেন মা। এইসব সব, বিশ্বেশ্বর শিব, আর মা অন্নপূর্ণাকে দেবার বড়ো ইচ্ছে তাঁর।
বুকের মধ্যে গুঁজে নিয়ে চললেন পুজোর এই ক্ষুদ্র আয়োজন।
শ্রাবণের শেষ সোমবার। কি ভিড়, কি ভিড়!!
দেশের সব প্রান্তের মানুষ ভেঙে পড়েছে মন্দিরে।
জলে, বেলপাতায়, ফুলে, দই, চন্দনে, ঘিয়ে, পায়ের তলায় পিছল একটা স্তর। খালি পায়ে যেতে হয় মন্দির চত্বরে।
শ্রীমান সর্বজিৎ মুখোপাধ্যায় মহাশয় এক লাফে যে বাবার কোলে উঠে পড়লেন, আর তাঁকে সব পুজোআচ্চা শেষ হয়ে মন্দির থেকে বেরোনোর আগে মাটিতে নামানো গেলো না। ছবিতে আঁকা পাখিদের মতো তিনি পাদু’টো একেবারে গুটিয়ে রাখলেন।
দিদি খুব ভুরু কুঁচকে মায়ের হাত শক্ত করে ধরে ওই ক্যাতক্যাতে পাথরের ওপর দিয়েই চলতে থাকল। মা দু হাত আর নিজেকে দিয়ে ঘিরে রাখলেন পাঁচ বছরের ফুলের মত সুন্দর মেয়েকে। কারণ ভিড়ের মধ্যে, দেবস্থানেও মানুষের পাশবিকতা কত বাড়ে তিনি জানেন। তাঁর বাবা মা তাঁকে এভাবেই এল আই সি -র লোগোর মত যাবতীয় তামসিক স্পর্শ থেকে আজীবন বাঁচিয়ে রেখে বড় করেছেন। সেই ট্রাডিশনকেই সমস্ত শক্তি দিয়ে চালু রাখেন মেয়ের মা।
পিছনে হাত দিয়ে ক্ষুদ্র মা থেকে থেকে টেনে রাখেন হাঁসফাঁস হয়ে যাওয়া শ্বাশুড়ি মাকেও।
সে বেচারার ও এত ভিড়ে অবস্থা কাহিল।
তবু এক মনে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করছেন তিনি।
তাঁরই টান সবার চাইতে বেশি যে বিশ্বনাথের কাছে পৌঁছানোর।