ক্যাফে কলামে সঙ্কর্ষণ

কা কস্য পরিবেশনা
মাসছয়েক আগে পরিচিত এক উঠতি সংবাদমাধ্যমের অংশীদারের সঙ্গে তুমুল বাদানুবাদে লিপ্ত হ’য়েছিলাম তাঁদের সংবাদ পরিবেশনের হতশ্রী দশা ও নিম্নরুচি দেখে। সেই সূত্রেই আমি জেনেছিলাম জীবিকা নির্বাহনে আদর্শকে স্থান দেওয়ার নির্বুদ্ধিতাই বাঙালিকে দেশ ও বিশ্বের নিরিখে সফল ব্যবসায়ী হ’য়ে উঠতে দেয়নি।
ঠিক এইজন্যেই প্রথম সারির সংবাদমাধ্যমসমূহ দিনের এক তৃতীয়াংশ উচ্চমূল্যের টাকার পাহাড় দেখাতে ব্যয় করে এবং অবশিষ্ট ১৬টি ঘণ্টা বিজ্ঞাপনে। তদন্তের গতি কিছুই জানা নেই, অথচ স্তরে স্তরে ৫০০ ও ২০০০এর নোট সাজিয়ে রেখে অন্ততঃ ২০০টি ক্যামেরার চোখে ক্রমাগত দেখছে বঙ্গবাসী আপনাপন ২চোখ ভ’রে।
লক্ষ্যণীয় যে ঘরের মধ্যে প্রতিটি কোণায় প্রাপ্ত নিষিদ্ধ বা ব্যক্তিগত আসবাব সম্পর্কে আলোচনাসূত্রে সঞ্চালকের কন্ঠ যতোখানি উচ্চগ্রামে থাকে, তার ১%ও অর্থের উৎস বিশ্লেষণে থাকেনা। কেবল এটুকু বক্তব্য যে এই অর্থাগম বৈধ নয়। এমনকী যে একাধিক ব্যক্তি কেবল বিভিন্ন দলীয় মুখপাত্র হিসাবে আসেন, তাঁদেরও আলোচ্য এক।
সাধারণ মধ্যবিত্ত বাঙালির (ধৃত শ্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের মতো ব্যক্তিত্ব যাদের জনপ্রতিনিধি) ন্যায্য প্রাপ্তির অঙ্ক এতোই স্বল্প যে তথাকথিত বহু টাকার প্রলোভন তাদের নেশাগ্রস্থ অনৈতিক ক’রে তোলে প্রায়শই। বহু নিরুপায় প্রার্থীর কষ্টার্জিত অর্থ যাদের পুজোর বাজারের কথা স্মরণ ক’রিয়ে দেয়, তাদের ব্যস্ত রাখতে ওটুকুই যথেষ্ট।
আজ যখন শ্রীমতি মুখোপাধ্যায় স্বীকার ক’রছেন ধৃত মন্ত্রীর সঙ্গে আপন সম্পর্কের কথা এবং একের পর এক নূতনতর নারীর মুখ তুলে ধরা হ’চ্ছে পর্দায়, যাঁরা উক্তের ঘনিষ্ঠ ছিলেন, উত্তেজিত হ’য়ে প’ড়ছে দর্শক। কোনো সংস্থা প্রথম পরিবেশন ক’রছে আলমারিতে প্রাপ্ত নিষিদ্ধ বস্তুসমূহ। ৫মিনিট সংবাদ চ’লছে, ১৫মিনিট বিজ্ঞাপন।
কিন্তু এই উত্তেজনা ক্ষণিকের। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের একাংশ (যা নাকি আন্তর্জালিক), বিরোধী রাজনৈতিক দলসমূহ, এমনকী ‘সচেতন’ সমাজও কৌতুকপূর্ণ ছবি ছড়াতে ব্যস্ত, কারণ সেটিও প্রতিবাদ (প্রকারান্তরে উক্ত আসক্তিরই প্রকারভেদ)। ৮দিন ক্রমাগতঃ আমরা এই রঙ্গশালা উপভোগ ক’রে চ’লেছি, ক্লান্তি অবশ্যম্ভাবী।
এই ক্লান্তি দৈহিক নয়, মানসিক। মস্তিষ্ক অবচেতনে এই পরিবেশ থেকে মুক্তির পথ খুঁজবে এবং ঠিক এই মুহূর্তের অপেক্ষাতেই র’য়েছে অপরাধী শাসনযন্ত্র এবং পদলেহী চতুর্থ গণতান্ত্রিক স্তম্ভ। লক্ষ্যণীয় যে এই কাজ তারা ক’রছে অত্যন্ত ধীরগতিতে, যার হেতু জনসমক্ষে নূতন তথ্য আসছে প্রতিদিন, যাদের কোনোটিই উপকারী নয়।
মিগ ২১ ভেঙে পড়ার আধঘণ্টার মধ্যে সংবাদ পরিবেশন হয়, কিন্তু কমনওয়েলথ গেমসে ভারতের উপস্থিতি বা দেশের অন্যান্য ক্ষেত্রের রাজনীতি সম্পর্কে ন্যূনতম আলোচনাও শূন্য। মুদ্রিত সংবাদপত্রের প্রথম থেকে শেষ অবধি সমান বিষয় অহৈতুকি মুখরোচক পরিবেশনা। স্থূল, দীর্ঘ অক্ষরের ‘হেডলাইন’ রাজ্যকে সুরক্ষিত রেখে।
‘মরণকালে হরির নামে’ শ্রী অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্লজ্জ পদক্ষেপ ব্যতীত রাজ্য জানবেনা আন্দোলক পরীক্ষার্থীগণ ন্যায্য বিচার পেলো কিনা? মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং আপন নির্বাচকগণের সঙ্গে পরিচিত। অপ্রাপ্তির উৎসের প্রতি কৃতজ্ঞতার এই ‘স্টকহোম সিনড্রোম’ পশ্চিমবঙ্গের রক্তে বহমান। উপরন্তু সংবাদ ব্যবসায়ীগণ তো আছেই…
কেবল জীবিকা নির্বাহের সূত্রেই শ্রী বরুণ সেনগুপ্ত, শ্রী গৌরকিশোর ঘোষ বা শ্রী বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায়দের জাতি এতো দ্রুত ব্রাত্য ক’রে দিলো ভেবে আশ্চর্য হ’ই।
ধন্যবাদ।