সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে সোনালি (পর্ব – ৩৪)

রেকারিং ডেসিমাল

বাড়িতে সবাই দেখতে শুনতে ভালো, তবু চার বোনের মধ্যে এই তিন নম্বর মেয়েটি ক্ষুদ্র ডল পুতুল থেকে কিঞ্চিৎ বড় হয়েই ডানাকাটা পরী হয়ে উঠেছিলেন একেবারে। ভারি কায়দা তাঁর। আর তেমনি মেজাজ। ডাকসাইটে সুন্দরীদের যেমনটি হয় আরকি। সাধারণ নগন্য মানুষকে তারা কি আর সহজে পাত্তা দেয় ?
বুদ্ধি এবং জিভ দুটিতেই ক্ষুরের ধার কন্যার। চার দিকে কত উমেদার। লম্বা লিস্টি অজ্ঞান হয়ে থাকা মানুষের। কিন্তু বাবা, দাদারা, ভাইয়েরা ; চারদিকে এত পাহারাদারি নজর, সে টপকে কারো সাধ্য কি রাজকন্যার কাছে পৌঁছায়।
ইস্কুলের গন্ডী পেরোনোর আগেই বিয়ের সম্বন্ধ এসে গেল।
ইঞ্জিনিয়ার পাত্র। পালটিঘর। হালিশহরের জমিজমা ইত্যাদি। মোদ্দা কথা মারাত্মক সুপাত্র। অভাবনীয় সৌভাগ্য।
হই হই করে বিয়ে হয়ে গেল।
দক্ষিণ কলকাতার বাড়ি , টালিগঞ্জ, সিনেমা পাড়া, লেকের হাওয়া, গল্ফ ক্লাবের ফুরফুরে চারপাশ থেকে রাজকন্যা পৌঁছে গেলেন গ্রামে। সেখানে গ্রামের সম্পত্তি, গোয়ালে গরু, তার পরিচর্যা, দাপুটে বয়সে বেশ খানিক বড় জাঁদরেল চাকুরে বর, তার সংসার সামলানোর দ্বায়িত্ব ঃ রাজকন্যা নাজেহাল।
রাজকন্যা থেকে রাণী হওয়া যে কি ঝকমারি সে এক রাণীরাই টের পায়।
সৌভাগ্যের চোটে একলা ঘরে হাপুস নয়নে কাঁদতে ইচ্ছে হয় সকলেরই।
যাই হোক, দুই ছেলে এবং রাজ্যপাট সামলাতে সামলাতেই কন্যের রক্তে চিনি আরও এটা ওটা শারীরিক কষ্ট ধরা পড়ল। তিনি বাপের বাড়ি আসেন একটু জিরিয়ে নিতে। বাচ্ছারাও মামা বাড়িতে আনন্দ করে।
আর তখনই ভিতরে চাপা দুঃখ, ক্ষোভ, কলকাতা ছেড়ে দূরে পড়ে থাকা, অনভ্যস্ত পরিশ্রম, কঠোর দাম্পত্যের চাপ সব ফেটে বেরিয়ে আসে ভেতর থেকে।
কন্যা স্বামীগর্বে গর্বিত। অর্থের স্বাচ্ছন্দ্য আর স্বাচ্ছল্য বাপেরবড়িতে দেখান ও বটে এ বাড়ির মানুষের মধ্যে ভাগ করে ও নেন। কিন্তু তার সঙ্গে ঝাঁঝ থাকে অনেক।
ভাইয়েদের বিয়ে হয়েছে তত দিনে। বৌয়েরা তটস্থ হয়ে থাকে।
সৌখিন, অপূর্ব সুন্দরী ননদিনী এলেই পদে পদে অতি ধার মন্তব্য করে নাকের জলে চোখের জলে করে ফেলবেন সবাইকে।
কেউ বুঝতে পারে না, এত আছে তবু সবাইকে নাস্তানাবুদ করে কি আনন্দ পান মহিলা।
অথচ সকলে দিতে থুতে ত কোন কার্পণ্য নেই। বাবা মার যখন যা দরকার এগিয়ে আসেন মেয়ে।
বৌয়েরা বলাবলি করে, যাক গে যাক। যে গরু দুধ দেয় তার চাট সয়ে যাওয়া ভাল। দেখো বাচ্চাদের জন্যও কত কিছু নিয়ে আসে সব সময়।
কেন এত ধার এত ঝাঁঝ সুন্দরী সৌখিন মানুষের, কি না-পাওয়া তাকে উত্যক্ত করে রাখে কে আর টের পায়?
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।