T3 || আমার উমা || বিশেষ সংখ্যায় সন্দীপা

আমার উমা, আমার মা

আমার উমা, আমার মা। তিনি যখন ঘরে আসেন, কারও কাছে সে এক উৎসবের সময়, কারও কাছে পূজার, আমার কাছে সে সময় শিক্ষার। সমস্ত জগত সংসার আমার উমার। কোন সে ফুল, কোন সে ফল, কোন সে উপাচার আছে, আমার এমন কী আছে যা আমি তাঁকে দিতে পারি? সকলই কি তাঁর নয়? তাঁকে দেওয়ার মতো যদি কিছু থেকে থাকে তাহলে সে শুধুই আত্মনিবেদন। আমি তাই নিজেকে তাঁর কাছে নিবেদন করে, তাঁর থেকে শেখার চেষ্টা করি। জীবনের যাত্রা পথটি ঠিক কেমন হবে, কী ভাবেই বা এগিয়ে চলতে হবে সেই পথে – সেই শিক্ষাই আমাকে দেন আমার মা, উমা।

মাকে ভালবাসার জন্য, তাঁর থেকে শেখার জন্য যেমন মায়ের ঠিকুজি কুষ্ঠি জানার প্রয়োজন পড়ে না, কোন খাতায় আমার মায়ের সম্পর্কে কী লেখা আছে, কে লিখেছে – সে সব জানার যেমন প্রয়োজন পড়ে না, তেমনই আমার উমা মাকে ভালবাসার জন্য, তাঁর থেকে শেখার জন্য কোন পুরাণের দরকার পড়ে না। সমস্ত অন্তঃকরণ দিয়ে তাঁর দিকে দেখলে দেখা যায় এই ন’দিনে তিনি শিখিয়ে যান কীভাবে নিজেকে এবং নিজের জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে নিয়ে, সেই পথে ক্রমশ পূর্ণ হয়ে উঠতে হবে, কীভাবে সার্থক করতে হবে এই মানব জীবন। মা যেমন একবার শিখিয়েই হাল ছেড়ে দেন না, নিয়ম করে শিখিয়ে চলেন, তেমনই প্রতি বছর চার বার – চৈত্র, আষাঢ়, শরত ও মাঘ মাসে উমা মা আমাদের মনে করিয়ে দেন আত্মোন্নতির ও অভীষ্টে পৌঁছনোর উপায়। তাঁর মুখটি দেখে, তাঁর আঁচল ধরে তাঁর দেখান পথে চলার চেষ্টা করে যাই আমি।

একেবারে শুরুর দিনটিতে, দেবী শৈলপুত্রীরূপে, তিনি আমাকে শেখান নিজেকে খুঁজে নিতে। আত্মানুসন্ধানের মাধ্যমে নিজের জীবনের উদ্দেশ্য, এই মানব জন্মের উদ্দেশ্য খুঁজে নিতে উদ্বুদ্ধ করেন তিনি আমাকে।

দ্বিতীয় দিনে উমা মা ব্রহ্মচারিণী। তিনি তখন নিজেকে ও নিজের জীবনের মূল উদ্দেশ্যটি খুঁজে পেয়েছেন এবং সেই উদ্দেশ্য সাধনের উদ্দেশ্যে নিজেকে প্রস্তুত করে নেওয়ার লক্ষ্যে কঠিন, কঠোর সাধনায় মগ্ন হয়েছেন। “শিব” আসলে জীবনের চূড়ান্ত ও অন্তিম লক্ষ্য। বিভিন্ন মানুষের জীবনে বিভিন্ন রূপে আবির্ভূত তিনি। তাঁকে পাওয়ার সাধনা, আসলে নিজের জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছনোর সাধনা।
এই দিন আমার উমা মা আমাকে শেখান কীভাবে জাগতিক সকল মোহমায়া, বিলাস ত্যাগ করে, ক্ষুধা তৃষ্ণা ভুলে, একাগ্র সাধনার মাধ্যমে সেই চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছনোর জন্য নিজেকে যোগ্য ও প্রস্তুত করে তুলতে হয়।

তৃতীয় দিনে আমার উমা মায়ের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে, এবং তিনি অভীষ্টের পথে যাত্রা শুরু করেছেন। এখন আর তিনি ব্রহ্মচারিণী নন, তিনি শিবের ঘরণী দেবী চন্দ্রঘন্টা। নিজ অভীষ্টের দিকে যাত্রা করার যোগ্যতা প্রমাণ করেছেন তিনি। এখন তিনি শান্ত, নির্ভীক ও আনন্দময়ী। তাঁর অন্তর থেকে ছড়িয়ে পড়ে ইতিবাচকতা।
আমি শিখি কী ভাবে লক্ষ্যের দিকে যাত্রা শুরু করলে নিজের অন্তরে ইতিবাচকতা ও অটল বিশ্বাস ধারন করে স্থির হতে হয়।

চতুর্থ দিনে আমার উমা মা দেখা দেন দেবী কুষ্মাণ্ড রূপে। তিনি ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির মূল শক্তি। সূর্যের কেন্দ্রে থাকেন তিনি, সকল তেজের আধার। বিশ্বকে উষ্ণতা ও শক্তি তিনিই প্রদান করেন। অথচ তিনি সদা হাস্যময়ী।
আমি দেখি কীভাবে সাধনায় এগিয়ে চলতে চলতে সৃষ্টির ক্ষমতা আসে, কীভাবে সমর্পণ সম্পূর্ণ হলে অসীম শক্তি ও তেজ জন্ম নেয় নিজের অন্তরে। আমি বুঝি, উমা মা বলছেন, সেই অসীম তেজ অন্তরে ধারণ করেও নিজেকে স্থির ও আনন্দময় রাখতে হয়।

পঞ্চম দিনে উমা মা হয়ে ওঠেন দেবী স্কন্দমাতা। তিনি তখন স্কন্দ অর্থাৎ কার্তিকেয়-র জননী, মাতৃরূপা। তিনি এখন সৃষ্টি ক্ষমতার অধিকারী। আবার তিনিই প্রতিপালন ও সুরক্ষা প্রদান করেন।
আমি দেখি অভীষ্টের পথে কেমন করে ও কতটা অগ্রসর হলে সৃষ্টি ক্ষমতা জন্মায়। শেখার চেষ্টা করি কেমন করে নিজের সৃষ্টিকে সুরক্ষা ও শক্তি প্রদান করতে হয়, তাকে লালন করতে হয় বৃহত্তর কল্যানের উদ্দেশ্যে।

ষষ্ঠম দিনে আমার উমা মা হঠাৎ যেন বদলে যান। তিনি তখন দেবী কাত্যায়নী। তাঁর শরীরে সহস্র সূর্যের তেজ। তেজোদৃপ্ত চোখ। তিনি মহিষাসুরমর্দিনী। আমার উমা মা অশুভের দমনে এখন ভয়ঙ্করী। ঠিক যেই সময় তাঁর মধ্যে সকল শুভ শক্তি জাগ্রত, তিনি উদ্যত হন অশুভের বিনাশে। এই প্রথম তাঁর উগ্রা, প্রচণ্ডা রূপ দেখি আমরা। একে একে অশুভের বিনাশ করতে করতে এগিয়ে চলেন তিনি।
আমি বুঝতে পারি শুধু শুভ শক্তির জাগরণে থেমে গেলেই চলবে না। কাজ তখনও বাকি থাকে। বাকি থাকে সকল অশুভের বিনাশ। এই সেই সময় যখন যখন নিজের অন্তরের সকল অশুভ শক্তিকে চিনে নিয়ে তাকে ধ্বংস করতে অস্ত্র তুলতে হবে। কিন্তু কেন এই সময়? শুরুতেই নয় কেন? উমা মা আবারও আমাকে বোঝান – শুভ শক্তি না জাগলে অশুভকে চিহ্নিত করা সম্ভব নয়। আলোর সঙ্গে পরিচিত না হলে অন্ধকারকেই আলো বলে ভ্রম হয়।

সপ্তম দিনে আমার উমা মা আরও ভয়ঙ্করী। এই দিন তিনি দেবী কালরাত্রি। ভয়ঙ্করতম তাঁর রূপ। তিনি ঘোর কৃষ্ণবর্ণা, ত্রিনয়না, চতুর্ভুজা। প্রতি নিঃশ্বাসে তাঁর আগুন। যে অশুভকে বিনাশ করতে গেলে সে আবারও সহস্রগুন অধিক শক্তিতে জেগে ওঠে, সেই অশুভ শক্তি, সেই রক্তবীজ বিনাশ করে তার রক্ত পান করেন তিনি।
আমি অনুভব করি শান্ত রূপের পাশাপাশি অশুভের বিনাশে ভয়ঙ্করতম রূপ ধারণ না করলে পরিপূর্ণ শুদ্ধ হয়ে ওঠা যায় না। নিজের অন্তরে শান্ত সমাহিত আনন্দময়ী কল্যাণকর শক্তি স্থায়ী করতে হলে, অন্তরে ধারণ করতে হলে সেই শুদ্ধ সুন্দর রূপের পাশে রাখতে হবে এই ভয়ঙ্করতম রূপটিও। শুভ এবং অশুভ অথবা দেবতা এবং অসুর – দুইয়েরই অবস্থান আমাদের অন্তরে। সেই অশুভের বিনাশে নির্মম হতে শেখান আমার উমা মা।

অষ্টমী তিথিতে আমার উমা মা অশুভের বিনাশ শেষে শান্ত। পরম কল্যাণময়ী দেবী মহাগৌরী। তিনি শুদ্ধ, নির্মল। এই রূপে দেবীর মধ্যে মাতৃরূপ ও ভয়ঙ্করীরূপ দুইই জাগ্রত এবং সঠিক ভারসাম্যে অবস্থিত। তিনি এই রূপে শান্ত ও সমাহিত।
নিজেকে সঠিক সময় ভারসাম্যে এবং শান্ত কল্যাণময় স্থিতাবস্থায় ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনীয়তা, নিজের অপরাজেয় তেজকে নিয়ন্ত্রণ করার শক্তিই যে আসল শক্তি – সেই শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করেন আমার উমা মা।

নবম ও শেষ দিনে আমার উমা মা সিদ্ধিদাত্রী। এই রূপে তিনি তাঁর জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্যে উপনীত। সিদ্ধিলাভের চরমে উন্নিত এবং শিব, অর্থাৎ নিজ অভীষ্টের সঙ্গে মিলিত হয়ে পুরুষ ও প্রকৃতির ভারসাম্যের প্রতীক। যে পথ চলা শুরু হয়েছিল আত্মানুসন্ধানের মধ্যে দিয়ে, নিজেকে যোগ্য করে তোলার কঠিন সাধনার মাধ্যে দিয়ে – এই পর্যায়ে পৌঁছে সেই সাধনা পরিপূর্ণতা পায়। এখন আমার উমা মা নিজের মধ্যেই পূর্ণ। তিনিই সৃষ্টি করেন, তিনিই রক্ষা করেন, তিনিই আদি, তিনিই অনন্ত, তিনিই পুরুষ, তিনিই প্রকৃতি। তিনিই শিব। তিনিই শক্তি। তিনি অর্ধনারীশ্বর।
এই রূপে আমার উমা মায়ের মধ্যে জাগরিত আটটি গুণ – অনিমা, অর্থাৎ নিজেকে অনু পরিমান করে নেওয়ার ক্ষমতা। মহিমা, অর্থাৎ নিজেকে অসীম অনন্ত বিরাট ব্যাপ্ত করে তোলার ক্ষমতা। গরিমা, অর্থাৎ নিজেকে অনন্ত ভারী করে তোলার ক্ষমতা। লঘিমা, অর্থাৎ নিজেকে অসীম লঘু করে তোলার ক্ষমতা। প্রপ্তি,অর্থাৎ নিজেকে সর্বব্যাপী করে তোলার ক্ষমতা। প্রকম্ব্য, অর্থাৎ সকল ইচ্ছাপুরণের ক্ষমতা। ইশিত্ব, অর্থাৎ নিজেকে ঐশ্বরিক ক্ষমতার অধিকারী করে তোলা। এবং বশিত্ব, অর্থাৎ সকল জগত সংসার, এবং একই সঙ্গে নিজের সকল ক্ষমতাকে নিজের বশে রাখার ক্ষমতা। আমার উমা মা এখন সর্বগুণান্বিতা। এই সময় আমার উমা মা তাঁর জীবনের সকল উদ্দেশ্য সাধন করে, পরম ক্ষমতায় বলীয়ান হয়ে কেবল মাত্র মানুষ নয়, দেব, দেবী, গন্ধর্ব, অসুর, যক্ষ সকলেরই আরাধ্যা।
আমি অবাক বিস্ময়ে উপলব্ধি করে, এই সেই ক্ষমতা যা প্রকৃত অর্থেই শক্তিশালী করে তোলে মানুষকে। আমার উমা মা আমাকে দেখিয়ে দিলেন, শিখিয়ে দিলেন। বলে দিলেন কীভাবে পরিপূর্ণতা পায়, সার্থক হয় এই মানবজীবন।

জীবনের শুরু থেকে শেষ বিন্দু পর্যন্ত পথটি যেন মানচিত্রের মতো আমার চোখের সামনে তুলে ধরেন আমার উমা মা। একটি সাধারণ জীবনকে কী করে অসাধারণত্বে নিয়ে যেতে হয়, তিনি বারেবারে তাইই শিখিয়ে যান, আমিও ক্রমাগত শেখার চেষ্টা করে যাই।

গৃহী অথবা সাধক – প্রত্যেকের জীবনে রয়েছে কোন না কোন উদ্দেশ্য। উদ্দেশ্যহীন মানবজীবন হয় না। কোন না কোন কর্ম সাধনের উদ্দেশ্যেই আমাদের জন্ম। সেই বার্তাটিই বহন করে এই ন’টি দিন, অর্থাৎ নবরাত্রি, যা মূলত আত্ম উত্তিরণের কথা। এর সঙ্গে ব্রতর আচার বিচার ও অন্যান্য নিয়মের কী সম্পর্ক আছে অথবা নেই – সে তর্ক বা বিচারে না গিয়ে শুধু যদি এই ব্রতের মূল সুরটি ধরা যায় ও নিজের রোজকার জীবনে বুনে নেওয়া যায়, তাহলে এই পথেই জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছোট ছোট কাজে এগিয়ে চলতে চলতেই সমগ্র জীবন সুন্দর হয়ে উঠতে পারে। একটি অতি সাধারণ গৃহী জীবনও হয়ে উঠতে পারে সফল ও পরিপূর্ণ।
পরিশেষে একটি কথা বলে যাই, অনেকেই হয়ত জানেন, নবরাত্রির সঙ্গে যোগ আছে কুণ্ডলিনী সাধনার। এই কুণ্ডলিনী সাধনাও কিন্তু শুধুমাত্র তান্ত্রিকদের সাধনার বস্তু নয়। সংসারী মানুষের জীবনেও এর গুরুত্ব ও প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে। ঠিক একই রকম ভাবে কুণ্ডলিনী সাধনাও সাধারণ গৃহী মানুষকে তাঁর মানবজীবন সার্থক করার পথ দেখায়। কিন্তু সে কথা পরে কখনও, অন্য কোন পরিসরে বলা যাবে। আজ এই পর্যন্তই।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

1 Response

  1. Saubhik Datta says:

    Osadharon lekha. Sandeepa r lekha sob somoy mugdho hoye Porte hoye. Etao tar byatikrom noye.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।