সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে সোনালি (পর্ব – ৩৮)

রেকারিং ডেসিমাল

প্রথম যখন মেয়েরা বাংলা দেশে, ঘরের বাইরে এসে দাঁড়াতে চাইল অসূর্যম্পশ্যা নাম ঘুচিয়ে, সবচেয়ে অসুবিধে হয়ে দাঁড়ালো পোশাক।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর তীক্ষ্ণ নজরে মেপে, সে ব্যাপারে নোট রেখেছেন।
ফিনফিনে শান্তিপুরী শাড়ি, সঙ্গে সেলাই করা অন্য কোন জামা বা অন্তর্বাস ছাড়া পরাটাই নাকি বনেদিয়ানা, এবং ঐতিহ্য মেনে চলা অন্দরমহলের নিয়ম, আর সেলাই করা জামা, বা জুতো পড়লে বিবিয়ানা, মেমসাহেবি, ছি ছি লজ্জায় মাথা কাটা যাবার কথা।
কিন্তু আমাদের তাঁতিদের অপূর্ব শিল্পকলা, সেই যে ” আকাশের মত নীল, বাতাসের মত ফুরফুরে, জলের মত চিকন ” শাড়ি, অন্য কোন পোশাক সঙ্গে না পড়ে, শুধু এই রকম একটি বস্ত্র পেঁচিয়ে কারো সামনেই কি দাঁড়ানো শালীন হয়?
মেয়েরা ওমনিই অন্ধকার অন্তঃপুরে বন্দী থাকতে বাধ্য।
তাই ঠাকুর বাড়ির মেয়ে বউয়েরা এই অভব্যতার সাথে লড়াইয়ে নেমেছিলেন। সঙ্গে সাহসী স্বামীকে নিয়ে বিলিতি জ্যাকেট, সেমিজ, পেটিকোট পড়ে, তার ওপরে পার্সি কায়দায় ব্রোচ দিয়ে শাড়ি, পায়ে জুতো নিয়ে কলকাতার বড় রাস্তায় ঘোড়ার গাড়িতে দেখা গেছিল সেই বৈপ্লবিক মহিলাদের। তারপর ত বরের সাথে এদেশে বিদেশে সর্বত্র ছুটেছেন তাঁরা।
এদের সাহস মধ্যবিত্ত মেয়েদের ও সাহস জুগিয়েছে।
সেমিজ, জ্যাকেট, চাদরে নিজেদের ঢেকে খোলা আকাশের নিচে তারাও এসে দাঁড়িয়েছে ধীরে ধীরে।
আজকের দিনে, আমরা এঁদের সেমিজ পরার ধারাটা ধরে রেখেছি অন্দরে।
নাম পালটে এখন একে ডাকি ম্যাক্সি বা নাইটি।
বাড়িতে নাতবউ এল যখন খুড়শাশুড়ি ফুলশয্যার খাটে তত্ত্বে আসা নাইটি একখান দিয়ে এলেন চুপ করে।
বললেন, এখন থেকেই পড়া শুরু কর। নইলে আর পারবি না। অবজেকশান এসে যাবে।
নতুন বউ পরের দিন ভোরে সবাই তত্ত্ব দেখতে ডাকাডাকি করতে সেই আধুনিক সেমিজখানা গলিয়ে, চুল খুলে, সঅব গয়না বালিশের নিচে খুলে রেখে দিয়ে বারান্দা দিয়ে এক গাল হেসে দৌড় দিয়েছিল।
সেই থেকেই এ বউয়ের বেয়াড়াপনা চলছে আর কি।
মুস্কিল হচ্ছে বউ ত দেড় হাত লম্বা। কিন্তু রেডিমেড ফ্রি সাইজ ম্যাক্সি তো প্রমাণ সাইজের মহিলার মাপে, তাই পায়ের নিচে লটপট করে।
এবাড়ির সবাই চা- তাল, মানে প্রবল চায়ের নেশা। চা আর পান চলতেই থাকে। এবং চা কেউ খাবে মানেই সবাই খাবে।
বড় কেটলি, মোটামুটি প্রতিবার দশ কাপ কম করে।
কেউ চিনি, কেউ স্যাকারিন, কেউ গাঢ় লিকার কম চিনি, কেউ দুধ চিনি কিছুই না। এই সব আস্তে আস্তে মুখস্থ করে নিচ্ছে বটে, কিন্তু চা বানাতে একেবারে লাড্ডু নতুন বউ।
সে নিজে ত চা খায়না। তার মা চা কফি কিছু খেতে বারণ করেছেন ছোট থেকে। নেশায় মানুষ খায়, তাঁর বক্তব্য। তিনি নিজেও কখনো চা কফি খান না। বাবা খান নেসক্যাফে। সে তো দুধে গুলে দিলেই হয়ে যায়।
সুতরাং চা এবং পান দুটো বানাতেই হিমসিম নাতবউ।
জুত মতো হয় না কিছুতেই।
তবু চেষ্টা চালিয়ে যায়, রোজ ট্রায়াল আর এরর।
বাড়ির বড়দের অসীম ধৈর্য।
দোতলার রান্নাঘরের লাল সিমেন্টের মেজে একটু ফুটিফাটা।
অল্প জল টল আটকে থাকে রান্নার সময়।
ম্যাক্সির পায়ের দিকটা লুটিয়ে থাকলে ভিজে যায়।
তাই আধখানা ভাঁজ করে, বাবা যেমন বাড়িতে ধুতিটা লুংগির মত ভাঁজ করে নিয়ে কাজ করেন, ঐ স্টাইলে ম্যাক্সির তলাটা তুলে কোমরে গিঁট দিয়ে নেয় নতুন বউ।
দু এক দিন পরে শ্বাশুড়ি মা রান্নাঘরের দরজায় এসে দাঁড়ালেন।
হ্যাঁ রে, এখানে কি অনেক জল?
অনেক? না। ওই একটু। পায়ের কাছটায়।
ছাঁকনিতে চা ছাঁকতে ছাঁকতে জবাব ম্যাক্সিওয়ালির।
— ওহ। আমি ভাবলাম কোমর জল।
এক গাল হেসে চায়ের কাপগুলো বড় ট্রেতে রাখে বউমা।
না না। অত ও নয়। তুমি যাও না ঘরে। আমি চা নিয়ে আসছি।
শ্বাশুড়ি দীর্ঘ শ্বাস ফেলে ঘরের দিকে পা বাড়ান।
গায়ত্রীদি ফিল্ডে নামে এই বার।
তুমি কি গো? হ্যাঁ। বলি বড় বৌদিদি কি বলেন বুঝো না?
বউ মানুষ, ঐরম তুলে কোমরে বেঁধেছ কেন নাইটি?
একে এইসব পড়তে দেখলে দাদু বিরক্ত হন। নেহাত তুমি ছোট মানুষ তাই কিছু কন না। তায় আবার এরম লুংগি বানিয়েছ তাকে।
সেই জন্য ত বৌদি তোমায় খেয়াল করাচ্ছে। তুমি আবার দাঁত বার করছ তাতে। কি করব তোমায় নিয়ে আর।
সত্যি কথাই। নালিশ বউয়ের বাপের বাড়িতেও পৌঁছে গেল খুব মৃদু হেসে।
এত ” ইগনর ” করার বদ অভ্যাস। একেবারে অশিক্ষিত চাষার মত চলাফেরা।
আর গালি দিলে যদি সেও না বোঝে তবে এ আর শুধরাবে কি করে?
মা জননী সবাইকে আদর আপ্যায়ন করে বললেন, করি কি। বড় ও হয়েছে, আর ডাক্তারি শুরু করে থেকে হাতের বাইরে। বিয়ের দিন সকাল অব্ধি ত একখান ঢলঢলে টি শার্ট আর জিনস পড়ে দাপিয়েছে। এ কি আর মানুষ হবে ?
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।