সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে সোনালি (পর্ব – ৩২)

পুপুর ডায়েরি

বাবা মশাইয়ের চোখে কলকাতা আর তার ইতিহাসকে শুনতে শুনতে আমি বড়ো হয়েছি।
সব কিছুকেই এখনো মাপি ১৯৩৪ এর সাথে হিসেব করে। ১৫ই নভেম্বরেই সেই বছর শ্রী ভূপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য আর সরলা দেবীর তৃতীয় পুত্র হয়ে পৃথিবীতে এসেছিলেন আমার বা’ মশাই যে।
বাড়ির বড়োরা ডাকতেন খোকা।
আর বন্ধুরা বলাইবাবু। বাকি চারপাশের মানুষের মুখে সেজদা বা বলাইদা।

টালিগঞ্জ আগে জঙ্গল ছিলো।

প্রথম দিকের কলকাতা মানে কলেজ স্ট্রিট, সিমলে পাড়া, হাতি বাগান, হেদোর জলে ছেলেদের সাঁতার শেখা, অবশ্যই হিন্দু স্কুল, প্রেসিডেন্সি কলেজ, হেয়ার, বেথুন, স্কটিশ চার্চ। রমরম করে চলছে কলেজ স্ট্রিট মার্কেট, বৌবাজারের গয়না, বিয়ের কার্ড আরও সারি সারি দোকানের লাইন। আহা পুঁটিরাম, প্যারামাউন্ট, পাশের পানের দোকান যেখানে দু চারশ টাকাও দাম হতে পারে একখানা পানের, কালিকার চপ, বসন্ত কেবিন, ওহো।
এদিকে নরেন দত্ত ওরফে স্বামী বিবেকানন্দর বাড়ি। তার থেকে দু পা হাঁটলেই জি সি, কিনা গিরীশ ঘোষ মশাইয়ের ভিটে, পাশেই বাগবাজারে বলরামবাবুর বাড়িতে ঠাকুর রামকৃষ্ণ মশাইয়ের আড্ডাখানা, সবই হাঁটা পথের মধ্যে। পরে সেইখানেই সারদা মায়ের থাকার জন্যে বাড়ি কিনে দিয়েছিলেন মায়ের ছেলেরা। সেই গলির পিছনের দিক দিয়ে বেরলেই গঙ্গার ঘাট। আজও সে বাড়ি মায়ের বাড়ি, আর সে ঘাটকে ও মায়ের ঘাট বলেই ডাকে সবাই।
ভীম নাগের দোকানের বিলিতি মস্ত ঘড়িখানার সামনে দাঁড়িয়ে এই সব ভাবতে থাকলে গায়ে কাঁটা দেয়। ঘড়িটা সাহেবি কোম্পানির, কিন্তু তাতে বাংলায় সব নম্বর লেখা। আজও ঠিকঠাক সময় দিচ্ছে।
পাশেই কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ।

এই সবই আমি বাবার চোখ দিয়ে দেখি ।
বাবা সারাক্ষণ গল্প করেন যে।
ঐটা তাঁর ছোট বেলার পাড়া। ওখানেই ইস্কুল। হেদোয় দাপিয়ে সাঁতার কাটা। সামনের বাড়িতে ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায় থাকতেন। নজরুল আসতেন সে বাড়িতে। তাঁর গান শুনতেন ছোট্ট বাবা নিজেদের বারান্দায় ঝুঁকে থেকে। বাবার বড়দাদা মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাশ করা ডাক্তার। খুউব ভালো ছাত্র। কলেজে পড়তে পড়তেই তাঁর বিয়ে হয়েছে বাগবাজারের মেয়ের সঙ্গে। বড় বৌদিদি যখন এসেছেন তখন বাবার বয়েস পাঁচের কাছে।
পাশ করে নতুন ডাক্তার পসার জমানোর জন্য বৃহত্তর কলকাতার খোঁজ করছিলেন। টালিগঞ্জ রেলব্রিজের পাশে দ্বারিকের মিষ্টির দোকানের উল্টো দিকে কবিশেখর কালিদাস রায় বাড়ি করে থাকছিলেন। তার পাশেই একটি চেম্বার ভাড়া নিলেন নতুন ডাক্তার।
সেই সময় বাবামশাইয়ের বয়েস পনেরোর কাছে।
রেলব্রিজের একেবারে পাশের গলি, চারু এভিনিউতে ভাড়া নেয়া হয়েছিল বাড়ি। খুব মন খারাপ নিয়ে কলকাতা থেকে গ্রামে থাকতে এসেছিল বাবাদের পরিবার। এখন সে জায়গার নাম চারু এভিনিউ।

সেখান থেকে আরেকটু এগিয়ে গিয়ে রসা রোডের জমি ভারি সস্তা বলেই কিনতে পেরেছিলেন দাদু, মানে আমার দাদা শ্বশুর।

আনওয়ারশাহ রোড আর তার সামনের মসজিদ এবং তার চারপাশের জমি জায়গায় এককালে ক্লাইভের আটকে রাখা দুই রাজপুত্রই ত রাজত্ব করেছেন। এরা মহীশুরের নবাব টিপু সুলতানের বংশধর। নবাবকে যুদ্ধে হারিয়ে ইংরেজ রবার্ট ক্লাইভ যুদ্ধবন্দী হিসেবে তুলে নিয়ে এসেছিল দুই শিশু পুত্রকে। তার বিবেকে বাধেনি।
সারা জীবন এই বাংলাতেই কাটিয়ে গেল রাজপুত্ররা । কোনদিন আর ফিরে যেতে পারল না নিজেদের দেশ, পরিবারের কাছে। তারা আর তাদের দেখাশুনো করবার লোকজন বাস করতে শুরু করেছিল এই জনহীন জঙ্গলে। বনবাসী বন্দী রাজপুত্ররা এইখানেই বড় হয়ে উঠেছিল।
জলা জমি, শেয়াল সাপের বাসস্থান, চারদিকে কাদা আর নোংরার মধ্যে রেখে দেয়া হয়েছিল দুই রাজপুত্রকে। তাদের বাপ, মহীশুরের রাজা টিপু সুলতান তিনশ লক্ষ সোনার মোহর ইংরেজকে দিতে পারলে তবে ছেলেদের ফেরত পাবেন, এই শর্তে রবার্ট ক্লাইভ তুলে নিয়ে এসেছিল দুই শিশুকে।
রাজপুত্র গুলাম মহম্মদ আনোয়ার শাহ, তার তিনশ লস্করকে সাথে নিয়ে, ইংরেজের দেয়া সামান্য মাসোহারা ধীরে ধীরে জমিয়ে প্রমাণ রেখেছিল যে সে হায়দার আলির যোগ্য বংশধর।
তৈরি হয়েছিল মসজিদ এই দূর দেশে চৌরঙ্গীর বুকের ওপর খাস ইংরেজদের নাকের ডগায় আর তারপর আজকের টালিগঞ্জ নামক জায়গাটির মাটিতে। রাজপুত্র, নিজের বাবা এবং মহীশুর সাম্রাজ্যের নামের পতাকা উড়িয়ে ছিলেন এখানে স্বাভিমানের সঙ্গে।

অতি জঘন্য কাদা জলের মাঝখানে, রসা পাগলার খালের পাশে বাস করতে করতেই বুদ্ধির জোরে জমি কিনে বসতি তৈরী করে ছিলেন কিশোর রাজপুত্র। দক্ষিণ এবং মধ্য কলকাতার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মালিক হয়ে উঠেছিল টিপু সুলতানের পরিবার ।
তৈরী হয়েছিল প্রিন্স গোলাম মহম্মদ ট্রাস্ট, যা আজ দেশের অন্যতম ধনী ট্রাস্টের একটি।

কর্ণেল উইলিয়াম টালি, গোবিন্দপুর খালের সংস্কার করে তাকে যুক্ত করলেন একদিকে কলকাতার বন্দর আর অন্যদিকে মাতলা আর বিদ্যাধরী নদীর সঙ্গে। এর যোগ রইল গঙ্গার ।
এই নালার পারে বাস করতে আসা মানুষ একে ডাকত, টালির নালা। বুড়ো মানুষরা বলতেন, আদি গঙ্গা। এর পাড়েই কালিঘাটের মন্দির, কেওড়াতলার মহাশ্মশান।

আনোয়ার শাহের বানানো টিপু সুলতানের নামের মসজিদের উল্টো দিকে এই খালের মধ্যে থেকে উঠে আছে রুদ্রের আসন, সবাই বলে পঞ্চাননতলা। কতদিনের সিদ্ধ আসন তার হিসেব নেই। পাশের গলিতে পূজিত হন রুদ্রের শক্তি গন্ধেশ্বরী দেবী।
পুরোনো মানুষেরাই খোঁজ রাখেন এখন তার।
টালির নালার ওপরে পঞ্চানন মন্দিরকে পাশে নিয়ে উনিশ শ চৌত্রিশ সালে তৈরী হল ব্রিজ।
বরিশা, সিরিটি, সাবর্ণ চৌধুরীদের এদিকের জমিদারি আর বিরাট লোকালয়ের সাথে সহজে যোগাযোগ করার রাস্তা হল এবার।

ইংরেজরা এই নতুন গজিয়ে ওঠা জনবসতির পাশে আরেকটা ব্রিজ বানালো ট্রেন লাইন পাতার জন্য।
লাইনের পাশের ঢালু জমি সরকারি।
কিন্তু গরীব হা-ঘরে মানুষ ঝপাঝপ দখল করে ফেলল সে জায়গাপত্র।
বিরাট অঞ্চল জুড়ে সমস্ত রেললাইনের পাশে পাশে গড়ে উঠল বস্তি। আঠারোশ নব্বই সাল থেকে।

ক্রমশ কলকাতা ছড়াতে লাগলো। দেশ ভাগের ধাক্কায় ছিন্নমূল মানুষের স্রোত জায়গা খুঁজছিল বাসস্থান তৈরি করার জন্য।
উত্তর কলকাতা এদের রিফিউজি বলে নাক সিঁটকাচ্ছিলো।
এঁরা টালির নালার আশপাশের এবং গড়িয়া, বোড়াল, যাদবপুর অঞ্চলের, অল্পমূল্যে পাওয়া মাটিকে নিজেদের পরিশ্রমে অভিজাত করে তোলার লড়াই শুরু করলেন।
শুরু হল প্রতিযোগিতা।
উঠতি দক্ষিণ কলকাতা বনাম বনেদী উত্তর কলকাতার।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।