বর্ষায় প্রেম সংখ্যার আজকের লেখা সোনালি

প্রেম কারে কয়?
আমার কাছে ১৪ই জুলাই মানে প্রেম।
একবারও চোখের দেখা না দেখে, শুভদৃষ্টিতে প্রথম দুই চোখে চোখ পড়ে, যাকে কিনা বলে লাভ এট ফার্স্ট সাইট।
দু জন সুন্দর মানুষ। যারা একজন রবীন্দ্রনাথের এক লাইন বললে বা গাইলে অন্যজন বাকিটা ধরিয়ে দেন। একজন রিডার্স ডাইজেস্ট পড়ে খানিক হেসেই অন্যজনকে ডেকে বাকিটা পড়িয়ে তবে শান্তি। দুজনে মিলে কাপড় কেটে নতুন ডিজাইনের পর্দা, শান্তিনিকেতনি সাজ ছোট্ট ঘরের আনন্দে।
আমার বাবা মা।

আজ ৫৪ তম বিবাহবার্ষিকী। দু জনে যেখানে আছেন, এক সাথেই গানে কবিতায় আছেন আশা করি।
ছোটবেলায় অনেক রাতে যেমন আধা ঘুমে দেখতাম দু জনে নতুন টেপরেকর্ডারের সামনে বসে আবৃত্তি করছেন, দুজনের চোখে দেখেছি জগত দোঁহারে দেখেছি দোঁহে…

বাবার যে ছ বছর ধরে অফিসে লক আউট, মা যে একলা চাকরি করে আমায় ইংরেজি ইস্কুল এবং রবিতীর্থে নিয়ে যেতে, কত কিছুর সখ বাদ দিয়ে দিয়েছেন, সে সব কোথায় ভেসে যেত, ১৪ই জুলাই বাবার রান্না বিরিয়ানি আর মায়ের জন্য আনা রজনীগন্ধা আর অবশ্যই একটা নতুন বইয়ের সুগন্ধি পাতার আবেশে।

সে আবেশ একেবারে ৭০ য়ে পা দিয়েও তেমনি অপরূপ ছিল। তাই, বাল্মিকীর সেই “মা নিষাদ ” বলা ক্রৌঞ্চ মিথুনের বিচ্ছেদের যন্ত্রণার মতই দেখলাম, মা কেবলই চোখের জল ফেললেন দুটো মাত্র বছর, কে আমায় গান শোনাবে, কে কবিতার বাকিটা বলবে, কে অপেক্ষা করে বসে থাকবে, বলতে বলতে।
আর তারপর চলেই গেলেন।
আমার জন্য রইল ১৪ই জুলাই, আর প্রেমের ওপর অগাধ ভরসা।

“ পুরস্কার প্রত্যাশায় পিছু ফিরে বাড়ায়ো না হাত
যেতে যেতে ; জীবনে যা সত্য ছিল দান
মূল্য চেয়ে অপমান করিওনা তারে
এ জীবনে শেষ ত্যাগ হোক তব ভিক্ষা ঝুলি
নব বসন্তের আগমনে অরণ্যের শেষ শুষ্ক পত্রগুচ্ছ যথা –”
একখানা আয়তাকার সাদা কার্ডবোর্ড । নতুন জামাটামার মধ্যে যেমন থাকে । তাকে মাঝখান দিয়ে ভাঁজ করে বানানো হয়েছে কার্ডটা ।
ছাই রং দিকটা বাইরে । তাতে সরু কাল মাইক্রোটিপে আঁকা বর্ডার । ভিতরে এক আশ্চর্য ছবি । কাল সরু নিবটা একবারো না তুলে একটানে আঁকা । কিউবিজম ? সবটাই সোজা সোজা জ্যামিতিক কোনা, কিন্তু দিব্যি বোঝা যাচ্ছে, রবীন্দ্রনাথ ।
ভিতরে খুললে সাদা ধবধবে পাতায় সোজা লাইনে সেই অপূর্ব টানা হাতের অক্ষরে কাল দিয়ে ওপরের এই শব্দ কটি কি সুন্দর দেখাচ্ছে যে ।
যে দেখত মুগ্ধ হয়ে যেত এই কার্ড ।
সবার আগে দেখেছিলাম আমি।
সে ছিল চোদ্দই জুলাই ।
আমি ক্লাস এইট ।
ভারি হিংসে হয়েছিল ভিতরে ।
বা’ মানে আমার বাবামশাই আমার বেস্ট ফ্রেন্ড, সব কিছু দু জনে বক বক করি, মাইকের হিন্দি গান, রাতের নাটকে রেডিওতে শম্ভু মিত্র , ক্যাসেটে ভীষ্মদেব আবার মান্না দের পুজোর গান, কিন্তু এ কার্ড কখন বনল টেরই পেলামনা ?
আর মানে টাও বুঝছি না, কি খটমট ।
চুপিচুপি মায়ের হাতে দিয়ে মুক্ত অংগনে বিকেলবেলা নাটক দেখতে যাব বলে টিকিট কাটতে গেছেন বাবা ।
খপ করে নিয়ে কত যে উল্টেপাল্টে দেখেছিলাম কার্ডখানা ।
মা মুচকি হেসে রান্নাঘরে পায়েস রাঁধতে চলে গেছিলেন ।
১৪ই জুলাই আমাদের বাড়িতে সকাল থেকেই আনন্দে থই থই থাকত । কেউ কিছু বলত না, তবুও। রাতে বা বিকেলে ফুল নিয়ে এসেই পড়ত মাসিরা।
অনেক বড় হয়ে খেয়াল করেছি আশেপাশে আর কোন বাড়িতে সে ভাবে বাবা মায়েদের বিয়ের তারিখ কেউ মনে রেখে আনন্দ করে না আমাদের মত।
আমার ছোট দশ ফুট বাই দশ ফুট ঘরের বাড়িতে, এই দুটি সুন্দর মানুষের শুভদৃষ্টির মুহুর্তটি বরাবর বড় উৎসব আমেজ ।
শুনেছি ফুলশয্যার রাতে বাবামশাই মাকে শুনিয়েছিলেম “ আমার এ আঁখি উৎসুক পাখি –“ আর তার সংগেই, “ জগত জুড়ে হরির মেলা, হরি জগত ময় রে —”

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।