সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে সোনালি (পর্ব – ৪৬)

পুপুর ডায়েরি 

ডাক্তার বাবু আর তাঁর চেম্বার পুপুর বড়ো হবার একটা মস্ত অংশ জুড়ে আছে ।
তখন চেম্বারের সঙ্গে ডিস্পেন্সারি ও থাকত । ওষুধ কোম্পানির এত বাড়াবাড়ি ছিল না । এত রকমের ওষুধ ও ছিল না ।
অনেক কিছুই চেম্বারের পিছনের কাঠের পার্টিশন দেয়া জায়গায় গিয়ে ডাক্তার বাবু বানিয়ে দিতেন । অনেক সময় এক জন কমপাউন্ডার কাকু ও থাকতেন তাঁর সাথে ।
মিষ্টি টক কাশির সিরাপ । তেতো ট্যাবলেটের গুঁড়ো ভাঁজ করা কাগজের পুরিয়া । জ্বরের ওষুধ । পেট ব্যথার ওষুধ । মাথা ব্যথার ওষুধ ।
কত রকম , কত কিছুই যে কষ্ট হত ছোটো পুপুর ।
আর মা সন্ধ্যে বেলা বাড়ি ফিরে , অফিসের কাজের চিন্তা , সংসারের বাকি কাজের ফাঁকে ভীষণ চিন্তিত হয়ে তার হাত ধরে দরজায় তালা দিয়ে , চলো , ডাক্তার বাবুর কাছে যাই , বলে , রাস্তা পার হয়ে উলটো ফুটপাথের দিকে হাঁটতেন ।
মায়ের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ত । এখন নিজের ছানাদের বড়ো করতে গিয়ে বুঝি , কত কত দুশ্চিন্তা ভিড় করে আসত নিশ্চয়ই মাথায় ।
কিন্তু পুপুর ত সে সব বোধভাস্যি ছিল না ।
তার মনটা তা ধিন তা ধিন করত ডাক্তার বাবুর চেম্বারে যাবো ভেবে ।
যেন ভারি একখান বেড়ানোর জায়গা ।
আহা , মায়ের হাত ধরে বেড়াতে যাচ্ছি ।
বাড়ির চার দেয়ালের বাইরে একটু তো অন্য কিছু ।

আর চেম্বার মানেই ডাক্তার বাবুর গমগমে ভারি গলা ।
খুব সুন্দর করে কথা বলেন ।
অবশ্য বাবা মায়ের খুব কাছের বন্ধু ত ।
বাবা মায়ের সব বন্ধুরাই খুব সুন্দর করে কথা বল্লেন ।
আজকের দিনে পুপু বোঝে সে ভারি সৌভাগ্যের শৈশব পেয়েছিলো ।
রোজকার দিনে, চারপাশে, এত সুসংস্কৃত বাংলা উচ্চারিত হতে শুনে অনেক ঢের উচ্চবিত্ত পরিবারের বাচ্চারাও বড়ো হয় না , পুপুর মত মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ ত নয়ই ।
অথচ , পুপুর চারপাশের বৃত্তটি এত বেশী মার্জিত বাক্য , অভিজাত কথোপকথনের ভঙ্গী , চলাফেরা , আর সহবতের মানুষে ঘেরা ছিল , যে সে বেড়া টপকে একেবারে গায়ে গায়ে লেগে থাকা রেলব্রিজের গলি আর বস্তির ভাষা বা রুচি ছোটো মানুষ পুপুর মনের কোথাও রেখাপাত করতে পারতো না ।

বাবা মায়েরা , বা যারা বাবা মা হবার আশা রাখেন , তারা যদি এইটুকু মাথায় রাখেন , তবে , শিশুদের শিশু বেলা আর ভবিষ্যত পৃথিবীটা ও আরামের হয় , সুন্দর হয় ।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।