ক্যাফে কলামে সঙ্কর্ষণ

কুকুরের কাজ কুকুর করেছে

স্বৈরাচারী শাসনতন্ত্রে পুলিশ বস্তুতঃ শাসকপোষিত ঊর্দিধারী দুর্বৃত্ত মাত্র। মানুষ বৃথাই তাদের আইনের রক্ষক ব’লে ভুল করে। পশ্চিমবঙ্গে এই নৃশংসতা নূতন বিষয় নয়। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীকেই প্রতিবাদের প্রত্যুত্তরে চুলের মুঠি ধ’রে পথে নামিয়ে আনা হ’য়েছিলো।

সমস্যা এখানেই যে পুলিশ এমন প্রত্যক্ষ জান্তব প্রবৃত্তির আদৌ ছিলোনা। ‘প্রভুর আদেশ’ পালনের যুক্তিতেও তারা মনুষ্যত্বই বজায় রেখেছে। অমানবিক পেশার কারণে সম্ভবতঃ হ’তেই হয়, কিন্তু আন্দোলনের তীব্রতা যেন ৩টি পক্ষেরই উগ্রতা প্রবল রূপে স্পষ্ট ক’রে তোলে।

শাসকের ভয় এই আন্দোলন স্তব্ধ না হ’লে তার ক্ষমতা থাকবেনা। পুলিশের ভয় শাসকের ক্ষমতা না বাঁচলে সে থাকবেনা। ৩য় পক্ষের ভয়োল্লেখ নিষ্প্রয়োজন। কিন্তু পুলিশ ব্যতীত অপর ২পক্ষের সংখ্যালঘিষ্ঠ অংশটি ক্ষমতাসীন হ’য়েইছে উল্লিখিত বাহুবলের অপপ্রয়োগে।

সামান্য পদোন্নতি, অর্থনৈতিক প্রেক্ষিতে নিশ্চিন্ত জীবন নিয়েই তো পুলিশ। অন্যান্য সরকারি বেতনভোগীদের সঙ্গে তার পার্থক্য আগ্নেয়াস্ত্রেই। কিন্তু শাসকের পরিবর্তে আইনের রক্ষক হিসাবে সাধারণ মানুষ তাদের থেকে আশা করে ‘বিবেক’। এদেরও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বর্তমান।

তবে বাঙালি সরকারি চাকুরির উচ্চপদে আসীন হয় দেশের সেবার্থে আত্মোৎসর্গের প্রতিশ্রুতিতে ও সন্তান আদর্শ ‘মানুষ’ হয় বিদেশে। অতঃপর মাংসলোভী সারমেয়স্বরূপ প্রভুর পদলেহনে এদের ন্যূনতম দ্বিধা থাকেনা, বরঞ্চ এরা ক্কচিৎ স্বরূপ প্রকাশ ক’রে থাকে।

সম্পূর্ণ দাক্ষিণ্যের বিনিময়ে জীবনধারণ করা একটি জাতি, এদেরই একাংশ পরিশ্রমের বিনিময়ে তথাকথিত ‘উপার্জন’ করে। সেক্ষেত্রে ‘ভরণপোষণের’ যুক্তিতে এদের থেকে আমরা কীসের আশা রাখি? বাঙালিমাত্রেই তো গর্ব ক’রে বলে যে “যার নুন খাই, তারই গুণ গাই। “।

আদ্যোপান্ত অধঃপতিত, ইতর, জঘন্য, স্বার্থপর এই রাজ্যে সরকারি বেতনভোগী সরকারের বিপক্ষে কোনো বক্তব্য রাখবেনা এই প্রতিশ্রুতি দিয়েই ‘চাকুরিতে’ ঢোকে। একই যুক্তিতে অজস্র ভারতীয়, ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রব্যবস্থার অপরিহার্য অঙ্গ ছিলো। সাতের দশকে তো ছিলোই।

যারা লিখেছিলো, ” পুলিশ তুমি যতোই মারো, মাইনে তোমার একশো বারো। “, তারাই কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিস্মৃত হ’য়েছে যে ” সস্তার আবেগ বিপ্লবের শত্রু। “। পুলিশ কখনও সন্ততির সম্মুখে সগর্বে দাঁড়াবে কিনা, সেই তুলনায় সত্য যে বাঙালির চক্ষে পিতামাতাই ঈশ্বর।

কালের নিয়মে একদিন সরকারের পতন অবশ্যম্ভাবী। আজ যাঁরা বিরোধিতা ক’রছেন, তাঁদেরই কেউ ক্ষমতায় আসবেন। তবে শুভেচ্ছাবার্তা প্রাপ্তিমাত্রেই যদি বর্তমান পাশবিকতাকে কেউ ‘কর্তব্যজনিত ক্ষতি’ বা প্রফেশনাল হ্যাজার্ড ব’লে উপেক্ষা করেন, সেই প্রতারণার ক্ষমা নেই।

সোভিয়েত রাজতন্ত্রের পতন শেষে জারকে সপরিবারে মৃত্যুদণ্ড দেয় প্রথম সাম্যবাদী সরকার। ইপাতিভ হাউজে গৃহবন্দী অবস্থায় বন্দুকের গুলিতে জার ও জারিনার সঙ্গে হত্যা করা হয় তাঁদের ৪ সন্তানকেও, যাদের মধ্যে ছিলেন আজন্ম প্রতিবন্ধী যুবরাজ ও ৩ কিশোরী কন্যা।

ইংল্যাণ্ডেও রাজতন্ত্রের অবসান ঘ’টেছে বহুকাল। পরিবার কিন্তু প্রাপ্য সম্মান গ্রহণ করে আজও। তবু রাশিয়া এই নৃশংসতায় সক্ষম হ’য়েছিলো। পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি আলোচনায় এগুলির উল্লেখ এইজন্যেই যে একদা আমরাও পৃথিবীকে দেখিয়েছিলাম জনরোষের প্রাবল্য…

আক্রমণ, নিশ্চিহ্নকরণ এবং পুনরুত্থান। রক্তবীজের কোনো শেষ রাখতে নেই। স্বৈরাচারীপোষিত রক্তখদ্যোতের তো নয়ই।

ধন্যবাদ

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।