কবি স্মরণে সায়ন

আমার নন্দিনী

ভয় কাকে বলে নন্দিনী? তুমি জানো!
নন্দিনীর চোখে এখন নীলাভ কাজল মেঘ – আমার মুখের দিকে চেয়ে প্রতিটা রেখার ছবি আস্তে আস্তে স্পর্শ করছে …. এইবার তার ভেজা চোখ কত সুন্দরের ভাষা ঢেউ তুলছে । আমাকে বললো – কেন গো তোমার ভয় নিয়ে কি কাজ? তুমি তো স্রষ্টা , আজ তো তোমার জন্মদিন!
– আজ আমার জন্মদিন ! না তো , আজ তো ২৫শে বৈশাখ – তোমার কবির জন্মদিন ।
– পৃথিবীর যে প্রান্তেই তুমি তাকাও না কেন – শিল্পীর জন্মদিন বহুর মধ্যে এক – আবার একের মধ্যে বহু ।
– ও তাই বুঝি! আচ্ছা বেশ তাই মানলাম।
নন্দিনীকে আমি শুধু দেখি। চারপাশে যখন অন্ধকার আমার বুকের পাঁজরকে আঁকড়ে ধরে – যখন ভাইরাস আর ভয় সমানুপাতিক হয়ে ঘিরে ধরে প্রতিটি কোষ , তখন সবটুকু ছিঁড়ে আমি বলে উঠি – ” সকালে ফুলের বনে যে আলো আসে তাতে বিস্ময় নেই,” এখন। শুধু মনে হয় পৃথিবীতে অনেক নিঃশ্বাসের সামনে তুলে দেওয়া হচ্ছে দেওয়াল, একটা নৃশংস ক্ষমতার জাল। এই ক্ষমতার পিছন থেকে কেউ বন্দি করছে সোনা, সেইই আবার আড়াল করছে অক্সিজেন সিলিন্ডার।
আচ্ছা নন্দিনী , শোনো – বিশুপাগল, ফাগুলাল, চন্দ্রা – আর তুমি – আর, আর অসংখ্য খোদাইকার – তোমরা নিঃশ্বাস নিতে পারছো ?
গোটা বাংলায় এখন মনে হয় আমার প্রতিদিন, নন্দিনী , মানুষ নিঃশ্বাস নিতে পারছে না – আমার ভয় করে – মনে হয় এ কেমন যক্ষপুরী যেখানে অক্সিজেন , ভ্যক্সিন সব সব সর্দার ও মোড়ল বাহিনী বন্দি করে রেখেছে।
নন্দিনী পদ্মপাতার হাত স্পর্শ করে আমার গালে , আমার অশ্রু ও বিশ্বাসের ত্বকে ভেসে আসে কন্ঠের স্পন্দন – “কোনও ভয় নেই তোমার ! আমি তো আছি , জানো ” আমার রঞ্জনকে এখানে আনলে এদের মরা পাঁজরের ভিতর প্রাণ নেচে উঠবে।” ”
আমিও কি পারি না নন্দিনী এই সময়ের বুকের উপর গিয়ে লিখে দিতে একটা একটা জীবনের শিলালিপি। কেন আমার ভাষায় আজ শুধু অন্ধকারের ধ্বনি! কোন পথ দিয়ে যাবো তুমি বলো নন্দিনী ?
– ” যে পথে বসন্ত আসবার খবর আসে সেই পথ দিয়ে। তাতে লেগে আছে আকাশের রঙ, বাতাসের লীলা।” কে বলছে তোমার ভাষায় লেগেছে গ্রহণ!
– এই সময়ে তুমি বসন্তের স্বপ্ন দেখছো নন্দিনী?
নন্দিনীর সাদা নীল তাঁতের শাড়ির আঁচলে কয়েক ফোঁটা চোখের জল স্বচ্ছ হয়ে কাঁচ হয়ে গেল – এবার যেন আমি দেখতে পাচ্ছি যেভাবে আয়না স্পষ্ট করে প্রতিফলন । দেখতে পাচ্ছি আকাশের বুক ভেদ করে বার হয়ে আসছে জীবন্ত লালের আভা। প্রতিটা মেঘ যেন মুষ্টি বদ্ধ হাত, দৃপ্ত বলগাহীন অশ্বের ছুটে চলা সীমান্তহীন পথ – দেখতে পাচ্ছি একদল তরুণ জনতা, যেন নির্ভীক বলিভিয়া, গুনান্তেনামো, মেক্সিকো, নকশালবাড়ি ভেদ করে বার হয়ে আসা গেরিলা , সমস্ত ভাইরাসের বিরুদ্ধে ছড়িয়ে পড়ছে শহর নগর গ্রাম ! নন্দিনী বললো – এই আমার বসন্ত গো – ওরা রেড ভলেন্টিযা়র্স! আমি বলেছিলাম না ” যখন রঞ্জন আসবে তখন দেখিয়ে দেব,” , আমার রঞ্জন এখন ছড়িয়ে গেছে সারা বাংলার আর্তের ঘরে ঘরে, আমার রঞ্জন এখন জীবনের রঙ মাখা আবির হয়ে প্রবেশ করে খাবার ওষুধ অক্সিজেন কিংবা কোনও রকম সমস্যার দুয়ারে। তুমি যাকে ভয় বলছো – দেখো আমরা তাকে ‘জয়’ করে নিচ্ছি ভালোবাসা দিয়ে ।
আস্তে আস্তে নন্দিনীর আজানু কেশ আমাকে ঘিরে ধরলো একটা নতুন ভোরের সুগন্ধ নিয়ে , নন্দিনীর আঁচলে একটা সাদা পৃষ্ঠা অপেক্ষা করে আছে। আস্তে আস্তে আমার বুকের উপর হাত রাখতেই সমস্ত স্নায়ুর চাঞ্চল্য কোথায় মিলিয়ে একাকার হয়ে গেল । মনে হলো বলি “তোমার ঐ রক্তকরবীর আভাটুকু ছেঁকে নিয়ে” আমি একটা কবিতা লিখতে পারি গো?
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।