সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে সোনালি (পর্ব – ৩২)

রেকারিং ডেসিমাল

এই ছয় ফুট লম্বা পুরুষ মানুষটি অনেক পরিশ্রম করে , বহু কৃচ্ছসাধন করে নয়টি সন্তানকে বড় করেছেন ।
আর স্ত্রী সঙ্গে সমানে সমানে লড়াই করেছেন যাতে ছেলে মেয়েরা সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হয় , নিজেদের প্রত্যেকের সঙ্গে খুব শক্ত মনের বাঁধনে বাঁধা থাকে পুরো পরিবার ।
পিঠোপিঠি ভাইবোনেদের মধ্যে সারাক্ষণ খুনসুটি , ক্যাচর ম্যাচর। কিন্তু কেউ একজন ব্যথা পেলে বা কোন বিপদে পড়তে চলেছে মনে হলেই সবাই এক সাথে হাতে হাত ধরে দেয়ালের মত প্রতিরোধ তৈরি করে ফেলে । মায়ের কথায় এক ডাকে এক জোট হয়ে দাঁড়ায় সবাই ।
মায়ের গলার সুর , মিষ্টি হাসি , মধুর ব্যবহার, কখনও বা তরল ঠাট্টা ছেলেমেয়েদের তাঁর চারপাশে টেনে রাখে ।
কিন্তু বাপ ?
ওরে বাবা ।
বাবার ধারেকাছে কেউ নেই ।
দাদু সর্বদা হুংকার দিয়ে চলেছেন। এক বড় নাতি ছাড়া বাকি সবাই পারতপক্ষে তাঁর ধারকাছ মাড়ায় না।
গল্পগাছা সব দিদার সঙ্গে।
দাদু খাটে পা লম্বা করে দেওয়ালে হেলান দিয়ে খবরের কাগজখানা হাতে মেলে ধরে সবই শোনেন। মাঝে মাঝে মন্তব্য করেন দু চারটে। বেশিরভাগই ধমক।
দিদা মাঝখানে থামিয়ে দেন তাঁকে।
তারপর বাকিদের বলেন, এর কথায় কান দিও না। বাপ মায়ের আদর পায়নি ত কখনো। এই রকম রুক্ষ কর্কশ ভাষা চিরকাল। কিন্তু ভালবাসে সকলকেই, বুঝলা। সব বাচ্ছাদের খাওয়া পড়া, ইস্কুল, এমনকি চাকরির ব্যবস্থা ও করছে কত দৌড়াদৌড়ি করে। কিন্তু, ওই, মুখে জন্মের পর মধু দেয় নাই কেউ মনে হয়।
দিদার মধ্যস্থতায় বেশিরভাগ ঝামেলা মিটিয়ে দেয়া যায়।
অনেক সময়েই দাদু এ সব শুনে ঘোঁতঘোঁত আওয়াজ করে খুরপি হাতে চটি ফটফট করে ছাদের সিঁড়িতে পা দেন বিছানায় কাগজ রেখে দিয়ে ।
দিদা মুচকি হাসেন।
বাপের আর কি। পয়সা রোজকার করেই কাম শেষ।
বুঝলা নাতবৌ, মায়ের কাম শেষ হয়না।
এই যে তুমি নয় মাস বুকের মধ্যে নিয়ে টেনে চলছো। বুঝবো বাপে এর মর্ম?
তার কাম ত পাঁচ মিনিটে খতম।
নাতবৌ চোখ বড় বড় করে।
— বাবা, ভারি রস দেখি দিদা ?
— আরে রসের কি? একটার পিঠে একটা, আকাশ থিকা পড়ল?
বাচ্চা হইতে দ্যাশে গেলে, খড়ের গাদার পিছে পাঁচ মিনিটেই ত হইয়া গেসে। ব্যস। আবার এগারো মাসের মাথায় আর একখান।
কত সময় ঢেঁকিতে পাড় দিসি। ঘরের ভিত কাটা গর্তে লম্ফ দিয়া পরসি যাতে নষ্ট হইয়া যায়। উঁহু।
দেখা গেসে সেই বাচ্চা আরো শক্ত স্বাস্থ্য।
সুস্বাস্থ্যের সন্তানের জননীর মুখ গর্বে উজ্জ্বল হয়।
সেই সঙ্গে নারীত্বের সাফল্যেও।
সফল ভাবে সুস্থ সন্তান জন্ম দেয়াতে মহিলা জাতীয় জীবের যে প্রাকৃতিক উল্লাস, বিজয়িনীর আনন্দ, তা এঁকে দেখে টের পায় হবু মা।
এই বুঝি প্রকৃতির প্রাণশক্তি। সারভাইভাল অফ আ স্পিসিস।
বুদ্ধিজীবী বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান, বই কাগজের মধ্যে বেড়ে ওঠা মানুষ, এই রঙিন কাহিনীকে আগে চোখের সামনে কখনো দেখেনি।
মনের খাতায় হবু মা এক দুই করে লিখে রাখে গল্পদের।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।