গদ্যে ঋত্বিক সেনগুপ্ত

কলকাতায় জন্ম এবং বেড়ে ওঠা ঋত্বিক সেনগুপ্ত, ছোট ভাই মৈনাকের সঙ্গে নানা জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছেন বাবার চাকরির সুবাদে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্কিটেক্ট ঋত্বিক এবং স্ত্রী পর্ণা বাঙালিয়ানাকে ভালোবেসে ছুঁয়ে থাকেন দিল্লির চিত্তরঞ্জন পার্কেও। শৈশব আর এখনকার কাজের খাতিরে খুঁজে পাওয়া দেশের বিভিন্ন স্বাদ গন্ধ মানুষের রীতিনীতির গল্প কল্পনার তুলিতে সাজিয়ে ঠাকুমার ঝুলির গল্পের মত পরিবেশন করেন ঋত্বিক। কখনও বা কবিতায় ও ফুটে ওঠে নষ্টালজিক বাংলা, বর্তমান আর অতীতকে মিলিয়ে মিশিয়ে। নবনালন্দার ছাত্র ঋত্বিক তাঁর সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে তুলে দিয়ে যেতে চান পুত্রকন্যা তিথি ও দেবের হাতে। তিনি বলেন, পাঠকদের মতামত জানতে পারলে ভালো লাগবে।

স্মৃতিবহ

মার্চ মাসের শুরু – শীত কাটিয়ে  বসন্তের আভাস চারিদিকে। শহরের এইদিকটাকে এখনও উপকন্ঠ বলা যায়। ভোর-ভোর উঠে এই ব্যালকনিতে দাঁড়ালে, দুটো টিলার মাঝখানে, কিছু দূরে,  পুরোনো শহরটা দেখা যায়। উত্তর-পশ্চিম দিকের টেগোর হিল-এর ফাঁক দিয়ে। বেশ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, হালকা-সাদা রঙের কুয়াশার, একটা পাতলা চাদর গায়ে-টেনে, এখন ও ঘুমের ঘোরে রাঁচি শহর । এই দিক-কার বাসিন্দারা, শহরের ওই অংশটাকে বলে ওল্ড-রাঁচি। আবাসনের পিছন দিক থেকে, ভোরের সূর্যের কোমল আলোতে, বড়ই মনোরম লাগে এই দৃশ্য এই উঁচুতলার ফ্ল্যাট থেকে।
কুসুম কানন আবাসন – সমসাময়িক ভাষায়,  লাইফ-স্টাইল হাউজিং কমপ্লেক্স।  শতকরা ৮০ সংখ্যক বাঙালি পরিবার। তাদের মধ্যেও আবার শতকরা ৮০ জন, রাঁচি শহরের বাসিন্দা, বহুযুগ ধরে। আর বাকি বাঙালিরা এসেছেন কলকাতা বা দিল্লী বা আর কোন শহর থেকে, সখ করে একটু নিরিবিলি-তে থাকতে – যেমন এসেছেন অশোক ঘোষ ও তাঁর স্ত্রী সুনেত্রা। ওঁরা এসেছেন কলকাতা ছেড়ে – নিরিবিলি পরিবেশ, কিন্ত বাঙালির পছন্দের শাক-সব্জি-মাছ, প্রায় সব পাওয়া যায় – এমনটাই খুঁজছিলেন  জীবনের এই অধ্যায়। রাঁচি শহরে দুর্গাপুজোর উদযাপনও বেশ সমারোহ করে হয়। অশোকবাবু  ও সুনেত্রা-দেবীর একমাত্র কন্যা, বিয়ের পর থেকেই,  পুনাতে থাকে। কলকাতায়,  তাই  পিছুটান কম। সব মিলিয়ে,  এই কুসুম কানন আবাসনের আটতলার ব্যালকনি থেকে, ভোরের শহরের দৃশ্য উপভোগ করবার, উপযুক্ত পর্যায়, অশোক-বাবুদের জীবনে। পেশায় আইনজীবী ছিলেন অশোক ঘোষ,  এখন ও, অনলাইন কন্সাল্টেন্সি করেন, মাঝেমধ্যে। একটু আলগা-আয়েশের জীবন কাটাতেই মাস চারেক হল, এই কমপ্লেক্স এর আবাসিক হয়েছেন।
অশোকবাবু, ভোরে উঠে মর্নিং-ওয়াক করেন, সপ্তাহে তিন দিন,  নিয়মিত। আবাসনের চত্বরের ভিতরেই। ফিরে এসে খুব উৎসাহ নিয়ে গল্প করেন, যদি কোন প্রতিবেশীর সাথে আলাপ হয়। গল্পের শেষ নির্দিষ্ট – “আমি ওনাকে বলেছি, দুই-তিন দিনের মধ্যেই,  আমার স্ত্রীকে নিয়ে আপনাদের বাড়িতে আলাপ করতে আসবো; না বলবে না, যেতে হবেই”।
প্রতিবার, একইরকম নির্লিপ্ত ভাব করে, সুনেত্রাদেবীর উত্তর,  “অন্য লোকের তো সুবিধা-অসুবিধা ও থাকতে পারে, তার বাড়িতে উপস্থিত হবার আমন্ত্রণ জানানোর সুযোগটা তার অধিকারের মধ্যেই পড়ে, তুমি একরকম জবরদস্তি করে, নিজেদের নেমন্তন্ন করে এলে তার বাড়িতে? ভেবেছিলাম কিছু পুরনো ফার্নিচার এর সাথে সাথেই কিছু পুরনো অভ্যাস কলকাতায় রেখে আসবো, হল কই?”
চিরাচরিত প্রত্যুত্তর অশোকবাবুর, “আজকাল তো কেউ কারো বাড়িতে যায়না, তাই,  গেলে খুশিই  হবেন, ওনারা”।
“সবাই কে খুশি করবার দায় নিয়ে ঘুরে বেড়াও,  আর কি!”, বলেন সুনেত্রা-দেবী।
আজও, মর্নিং-ওয়াক থেকে ফিরে, উত্তরদিকের বারান্দায় দুটো বেতের চেয়ার টেনে নিয়ে গিয়ে বসলেন, অশোকবাবু। একটু অলস  হয়ে বসে, ওই দুটো টিলার মাঝখান দিয়ে, শহরের দিকে তাকিয়ে,  ভাবুক হয়ে থাকেন  – তার মাঝেই সুনেত্রা-দেবী চা-পেয়ালার সেট নিয়ে এসে বসেন – এ এক আকাঙ্ক্ষিত বিলাসিতা – কেমন যেন মনের আরাম। অনেক সময় তাঁরা দুজন, কিছু স্মৃতিচারণ করেন, চায়ের চুমুকের সাথে সাথে – যেন তাঁদের জীবনের অর্জন করা উপহার!
“পরশু তুমিও আমার সাথে মর্নিং-ওয়াকে চলো, যাবে?”, প্রস্তাব অশোক-বাবুর।
“হঠাৎ! কারো নাম মনে পড়ছে না, নাকি কেউ টাকা ধার চেয়েছে কিন্ত নিজে ‘না’ বলতে পারছি না, তাই আমার যাওয়ার প্রয়োজন?”, প্রশ্ন সুনেত্রা-দেবীর।
“তোমার আন্দাজ মন্দ নয়, কাছাকাছি; এক ভদ্রলোকের সাথে আলাপ হল, দীনেশ মাহিকর, আগে জামশেদপুরে ছিলেন কিছু বছর – ওনার স্ত্রী ক্লাব-হাউসের সামনে দালানটাতে বসে গল্প করছিলেন কারো সাথে; দীনেশবাবু দুর থেকে দেখিয়ে আলাপ করালেন।”
” খটকাটা কোথায় লাগল তোমার, ভদ্রলোক কাছে গিয়ে আলাপ করালেন না বলে?”, চা ছাঁকতে ছাঁকতে প্রশ্ন সুনেত্রা-দেবীর।
“এই বয়সে এইসব ইয়ার্কি করার কোন মানে হয়, সুনেত্রা? জেলাস হয়ে কী লাভ, আমার সব জায়গাতেই একটা ফ্যান ফলোয়িং তৈরী হয়েই যায়!” বলেই হো-হো করে হেসে উঠলেন অশোক-বাবু।
বারান্দায় বেতের চেয়ারে গা ছেড়ে দিয়ে, চারিদিকে ভরা বসন্তের আমেজ উপভোগ করতে করতে, চায়ে চুমুক দেন অশোক ও সুনেত্রা। ফাঁকে ফাঁকে, হালকা দখিনে বাতাস বয়ে যাচ্ছে, গায়ে-গালে-কপালে যেন আঙুল বুলিয়ে দেবার শিউরে ওঠার অনুভূতি। সিলিংয়ের উইন্ড-চাইমটা সেই হাওয়ার তালে, রিনি-রিনি সুর তুলে দুলে উঠছে – অতীতের কিছু ছাড়া ছাড়া সুখস্মৃতি রোমন্থন করছেন ঘোষ দম্পতি, চায়ের চুমুকের অবকাশে।  দুজনেই, বড়ই উপভোগ করেন এই অবসর।
কুসুম কাননের পশ্চিম দিকে, টেগোর হিল রোডের দুই ধারে সারি দেওয়া রাধাচুড়া আর কৃষ্ণচুড়া গাছের, ফুলে ভরা ডালপালা, রঙিন করে রেখেছে রাস্তাঘাট।  রাঁচি শহর থেকে, দক্ষিণ-মুখি হয়ে নেমে এসেছে টেগোর হিল রোড। যেখানে পশ্চিম দিকে ছুটে গেছে ভ্যালি এভিনিউ,  টেগোর হিল যাওয়ার রাস্তা। সেখান থেকে আরো দুই-শ মিটার দক্ষিণে এসে, পুবদিকে কুসুম বিহার লোকালয়। টেগোর হিল রোড আর কুসুম বিহার মার্গ-এর সংযোগের, খুব কাছে অবস্থিত এই কুসুম কানন আবাসন। এখানে শহরের সব সুবিধা সুলভ হলেও,  নির্জন পরিবেশ। কুসুম কানন আবাসনের সামনের রাস্তা ধরে পুব-মুখি কিছুটা এগিয়ে গিয়ে দূর্গামন্দির। তার সংলগ্ন অতিথিশালা। প্রতি শনিবার, অশোক-বাবু মর্নিং-ওয়াক শেষে, এই মন্দিরে প্রণাম করে আসেন। আজ সেখানেই, দীনেশ মাহিকরের সাথে বাক্যালাপ শুরু। ক্যাম্পাসে ঢোকার মুখেই ক্লাব-হাউস ও বাহারি ক্লক-টাওয়ার, সেখানেই অপেক্ষা করছিলেন তার স্ত্রী, শ্রীমতি আভা মাহিকর। তাঁকে দেখেই অশোক-বাবুর মনে হয়েছে যেন ‘পরিচিতা’।
সেই সাক্ষাৎ হবার সময় থেকেই তিনি মনে করতেন পারছেন না, কোন অনুষ্ঠান-বাড়িতে দেখা হয়েছিল কি না। আবার, মাঝে মধ্যে মনে হচ্ছে একবারের বেশীই দেখা হয়েছে। সব শুনে সুনেত্রা জানতে চাইলেন কেমন দেখতে?
“বোঝা যায় আধুনিকা, ছিমছাম, সাড়ে-পাঁচ-ফুট মতন  উচ্চতা, পরিমিত প্রকাশ-ভঙ্গী – দেখো,  আলাপ করলে ভালো লাগবে -” , কথা শেষ করবার আগেই একটু মুচকি হেসে সুনেত্রা জিগেস করলেন, “হাতে কোন কাঠি ছিল, যাদু কাঠি?”
একটু তারিফের সুরের অশোক বললেন, “হুম, এটা ভালো স্ম্যাশ করেছ, মানতেই হবে!”
পরেরদিন মর্নিং-ওয়াক করতে গিয়েই মাহিকর দম্পতির সাথে সুনেত্রার পরিচয় করিয়ে দিলেন অশোক-বাবু। শ্রীমতী মাহিকর স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে, প্রস্তাব দিলেন, আগামীকাল সন্ধ্যাবেলা, আমাদের বাড়িতে আসুন, একসাথে চা খাই। তাই স্থির হল। মাহিকর দম্পতি একটু এগিয়ে যেতেই সুনেত্রা বললেন, “বুঝলি তোপসে,  এটা মিউচুয়াল এডমিরেশনের কেস,  আরো একটু স্টাডি করতে হবে!”
অশোক একটু হেসে ফেললেন,  “ম্যাডাম ক্রিষ্টি, ইনসিকিওরড্ বোধ করছেন নাকি? কারণ নেই, কন্ফিডেন্ট হোন, আপনিও তো স্মার্ট লেডি ; আর তাছাড়া অশোক ঘোষ কে দেখে, এর আগেও তো কত মহিলা চায়ের ইনভিটেশন দিয়েছেন!”
এবার দুজনেই হা-হা করে হেসে উঠলেন।
সব হালকা-হাসি বা কৌতুকের ফাঁকে, অশোক-বাবু বেশ অনুভব করছেন, কিছুতেই মাহিকরদের ব্যাপারে, মানে, তাঁদের এর আগেও কোথায় দেখেছেন , সেই ঔৎসুক্য কেমন মনটাকে অস্থির করছে। সন্ধ্যাবেলায়, পশ্চিমের বারান্দায় দাড়িয়ে, সূর্যাস্তের রঙিন আকাশ দেখতে দেখতে একটা সিগারেট ধরিয়ে, মনটা খালি করে অতীতের কথা ভাবতে শুরু করলেন। বিশেষ করে, জীবনের নানা সন্ধিক্ষণ – ল-কলেজ থেকে পাশ করে প্রথম ট্রেনিং, এডভোকেট নীরাজ মিশ্র তাকে একরকম নিজের সন্তানের মত সস্নেহে মেন্টরিং করেছেন।  অনেকবার,  বাড়িতে ডেকে, সবিস্তারে বুঝিয়েছেন,  একটা কেস, কীভাবে তার পজিশনিং করতে হয়, কীভাবে মক্কেলের থেকে আসল ঘটনা জানতে হয়। খুব ডাকসাইটে এডভোকেট হিসেবে সুখ্যাতি ছিল সারা হাইকোর্ট চত্বরে, এডভোকেট মিশ্র-র। কতদিন, কেসের প্রস্তুতি করতে গিয়ে আটটা বেজে গেলে, তাঁর বাড়িতে ডিনার খাইয়ে দিয়েছেন,  বলতেন “বাস ধরে বাড়ি পৌঁছাতে পৌঁছতে রাত হয়ে যাবে, কালকে আবার সকালে কোর্ট, আমার সাথে খেয়ে যাও, বাড়ি গিয়ে শুয়ে ঘুম দিয়ে, ফ্রেশ হয়ে জজ-সাহেবের সামনে, তবেই না ভালো যুক্তি জাহির করতে পারবে!” এখনও মনে হয়, এডভোকেট মিশ্র-র কাছে, ওই সস্নেহ মেনটরিং না পেলে, হয়তো পেশাদার আইনজীবী হিসেবে স্বীকৃত হওয়া অনেক কঠিন হত। হঠাৎই মনে পড়ে গেল সেই প্রায় পঁচিশ বছর আগে, রাঁচিতে প্রথম কেস করতে আসা। সেটাই তার প্রথম কেস কলকাতার বাইরে – তখন তার সাথে দুইজন ট্রেইনি। কেসটা তাকে রেফার করেছিলেন এডভোকেট মিশ্র।  রাঁচিতে তাঁর হলিডে হোম ছিল। কোন একটি পরিবারের শরিকি বিবাদ। কলকাতার কোন বস্ত্র ব্যবসায়ী, হঠাৎই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে পরলোকগমন করেন। হাজরা রোডে বিশাল বাড়ি। কিছুদিন পর, তার স্ত্রী, পুত্র ও দুই মেয়ের নামে নিরুদ্দেশ এর বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হল যুগান্তর পত্রিকায়। প্রয়াত ভদ্রলোকের এক বোন, রাঁচি তে থাকতেন। তিনি এডভোকেট মিশ্রকে অনুরোধ করেছিলেন আইনজীবী সেই ‘নিরুদ্দেশ হবার’ বিজ্ঞাপনের উৎস সন্ধান করে মামলা করবার জন্য।
সবকিছুই কেমন স্পষ্ট ও বিস্তারিত ভাবে মনে পড়ছে। অশোক-বাবু স্ত্রীকে ডেকে বললেন, “শুনে যাও,  এই শহরের বুকে আমার প্রথম মামলার গল্প বলি”।
ছোট করে যেমন মনে পড়েছে, তার একটা সূচনা দিয়ে, বলতে শুরু করলেন, অশোক-বাবু।
” সেই ভদ্রলোকের বোন-ভগ্নিপতি, আর স্যারের,  মানে এডভোকেট মিশ্র-র দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে ওই নিরুদ্দেশ হবার বিজ্ঞাপনে ভুয়ো। আমি যখন রাঁচিতে পৌঁছোলাম, তখন সকাল সাড়ে সাতটা কি আটটা হবে । স্টেশনে নেমে দেখি স্যার নিজে আমাকে রিসিভ করতে এসেছেন।  স্টেশন থেকে ওনার গাড়িতে চাপিয়ে সোজা নিয়ে রাঁচি হোটেল,  সেখানে রাজকীয় ব্রেকফাস্ট! খেতে খেতে স্যার বেশ হালকা মেজাজে হেঁয়ালি করে বললেন, “বুঝলে অশোক, গত কিছুদিনে, আমার একটা বিশ্বাস জন্মেছে, যে আমি রিয়াল লাইফ ব্যোমকেশ – তবে হ্যাঁ, আসল ক্রেডিট ওই পরলোকগত ভদ্রলোকের বোন-ভগ্নিপতির; ওরা এত সরল ও বিস্তারিতভাবে আমাকে বোঝালেন যে ওই খবরের কাগজের বিজ্ঞাপনের আসল উদ্দেশ্য হল ওই মিস্টার গাঙ্গুলির,  অর্থাৎ যিনি মারা গেছেন,  তার পরিবার কে বঞ্চিত করে ওই হাজরা রোডের বাড়ি ও সম্পত্তি হাতানো।  যাই হোক আমরা ওনার পরিবারকে ও লোকেট করতে পেয়েছি এবং তারা গতকাল রাতে হাজারিবাগ থেকে রাঁচিতে, মিসেস নন্দী, মানে ভদ্রলোকের বোনের বাড়িতে এসে উঠেছেন। আজ আমরা মিস্টার গাঙ্গুলির বিধবা স্ত্রীর হয়ে, তার উপস্থিতি তে একটি হলফনামা আর একটা প্লেইন্ট রেজিস্টার করব, রাঁচি ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে।”
সুনেত্রা বললেন, “তোমার এই গল্পের মধ্যে থেকে বেশ রহস্যের খোরাক-এর গন্ধ পাচ্ছি, মনে হচ্ছে!”
অশোক-বাবু খানিক উদাসীন ভাবেই বললেন,  “আরে সে রহস্য বলতে বেশ কিছু ব্যাপার ছিল বটে, তবে আমি এক্ষুনি অন্য কোন একটা রহস্যের সমাধান করতে পেরেছি মনে হচ্ছে, সেটাই আগে বলতে চাই “।
“কিন্ত একটাই প্রশ্ন, তোমরা সেইদিন কোর্টে হলফনামা জমা করলে, তো সাক্ষী প্রয়োজন হলনা?”
“তুমিও তো দেখছি চেম্বার খুলতে পারো সুনেত্রা!”, বলেই হেসে উঠলেন অশোক-বাবু।
“হ্যাঁ, আমি যেদিন পৌঁছোলাম,  সেদিনই দুপুরে গাঙ্গুলিদের কলকাতার বাড়ি থেকে, ওদের রান্নার লোক আর একজন চৌকিদার কে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন মিস্টার নন্দী, মিস্টার গাঙ্গুলির ভাবেই – সেটা অবশ্যই স্যারের পরামর্শ ছিল”।
“একটু চট করে চা হলে কেমন হয় সুনেত্রা?”
চা এলো, এক চুমুক দিয়ে অশোক-বাবু বললেন, “তার মানে, গল্পটা বেশ পছন্দ হয়েছে তোমার-”
“ঠিকই,  তবে আমার অনেক বেশি ঔৎসুক্য, এই কারণে , যে এই গল্পের এমন কি ব্যাপার,  যে তুমি আমাকে ডেকে গল্প শোনাচ্ছে!”
“আরে পুরো গল্পটা শুনতে চাইলে পরে বলব, আসল কথাটা এখন সংক্ষিপ্ত ভাবে বলি তোমাকে – তার সেইদিন দুপুরে মিসেস গাঙ্গুলি যখন কোর্টে এলেন,  মনে আছে, দেখেই বেশ ইমপ্রেসড্ হয়েছিলাম; সুদর্শন, সাবলীল হাব ভাব, চোখে নাক, ছোট করে চুল কাটা, আর পরিমিত প্রকাশ-ভঙ্গী; তখন তো বাঙালিদের মধ্যে সেই সুচিত্রা মিত্র ছাড়া ওইরকম চেহারা বিশেষ দেখা যেতো না তাই বেশ মনে থেকে গেছে – পরে, মোকদ্দমা চলাকালীন যতবার দেখা হয়েছে, মনে মনে তারিফ করেছি! তুমি দেখলে, তুমিও তারিফ করতে”।
“তারপর – আসল কিছু বাকি আছে মনে হচ্ছে?” মন্তব্য সুনেত্রা-দেবীর।
” তাহলে, এই গল্পটা বলবার আসল উদ্দেশ্যটা বলি, আমার এখন উপলব্ধি হল, যে ওই মিসেস মাহিকরের চেহারায়, সেই মিসেস গাঙ্গুলির  চেহারা বা হাব ভাব এর সাথে বেশ মিল পাওয়া যায়, সেই রকম ঠাট,  সেই উপস্থিতি – অনেক মিল”, বললেন অশোকবাবু।
“এমন তো হতেই পারে, মিসেস গাঙ্গুলির দুই মেয়ের একজন ইনি, জিগেস করে দেখ -” মুচকি হাসলেন সুনেত্রাদেবী, “তবে উনি যদি তোমাকে চিনতে না পারেন,  তবে সাহেব কি করবেন তাই ভাবছি”।
“আরে, সে চান্স নেই – বললে তো আবার আওয়াজ দেবে, মিসেস গাঙ্গুলির মেয়েদের নাম ছিল নন্দনা আর চন্দন – হঠাৎই মনে পড়ে গেল “, বললেন অশোকবাবু, ” মিসেস মাহিকরের নাম হল আভা মাহিকর “।
পরেরদিন মাহিকর-দম্পতির সাথে চায়ের আড্ডা যখন শেষের দিকে, তখন সুনেত্রা বললেন,  “এইবার আপনাদের একটা মজার গল্প শোনাই,” বলে অশোকবাবুর সেই মিসেস গাঙ্গুলির গল্প শোনালেন।
“আপনার স্মৃতিশক্তি সত্যিই অতুলনীয়,  মিস্টার ঘোষ , বিস্মিত হবার মতন!”, বললেন মিসেস মাহিকর, “সত্যি বলতে কি আজকাল আমাদের অনেক আত্মীয় ও বলেন, যে আমাকে দেখে নাকি একদম মায়ের মত লাগে!”
“তার মানে আপনি – কিন্ত হলফনামাতে তো ওনার মেয়েদের নাম -“, কথা শেষ হবার আগেই মিসেস মাহিকর আবার বলে উঠলেন, “হ্যাঁ, আমিই নন্দনা গাঙ্গুলি, বিয়ে হল মারাঠি পরিবারে, ওরা আমার সেই পিসির প্রতিবেশী ছিলেন, ও তখন সবে টাটাতে চাকরি পেয়েছে, অল্পদিনের আলাপেই বিয়ে হয়ে গেল; বিয়ের পর, মারাঠি রীতি অনুযায়ী আমার নাম ও পাল্টে গেল – নন্দনা গাঙ্গুলি তখন থেকে আভা মাহিকর হিসেবে পরিচিত “।
সশব্দে হেসে উঠলেন অশোক-বাবু, “আপনাদের সাথে সেদিন আলাপ হবার পর থেকেই একরকম অসোয়াস্তি হচ্ছিল,  বোধ হচ্ছিল আপনাকে দেখেছি, অথচ স্মৃতির পথ ধরে কিছুই খুঁজে পাচ্ছিলাম না, এবার হিসেব মিলল। তবে বিশ্বাস করুন,  খুব ভাল লাগল।”
মিস্টার মাহিকর বললেন,  “আপনাকে ওদের পরিবারের সকলেই বিশেষ বন্ধু মনে করেন, আপনাদের তো এইভাবে ছেড়ে দেওয়ার প্রশ্ন ওঠে না, আজকে আমাদের সাথে ডিনার করে যান – বেশ জমে গেছে আড্ডার আসর”।।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।