সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে রূপক সান্যাল (পর্ব – ৫)

দখল
ফুলশয্যার রাতের গল্প শোনার জন্য অনেকেই উদগ্রীব ছিল, সৌমিলি ছদ্ম লজ্জায় তাদের বেশ করে গল্প শুনিয়ে দিল। মনে মনে ভাবলো, আরে বাঃ, আমি তো বানিয়ে বানিয়ে গল্পও বলতে পারি বেশ। আমি তবে পারি না কী? আমার না পারার তালিকায় কিছুই কি নেই?
ঘুম ভাঙার পর মণীশ অনেকক্ষণ শুয়ে রইলো বিছানায়। দু’দুটো অঙ্কের হিসেব তার মিলছে না। সে দিনরাত এলোপাথারি ভেবে ভেবে কুলকিনারা পায় না। প্রথমত, তার পা দু’টো অকেজো হলো কি করে? এমন কী দুর্ঘটনা ঘটলো তার সাথে যে, তার দু’টো পা’ই শরীরের ভার বহন করতে অক্ষম হয়ে পড়লো? কি হয়েছিল সেদিন রাতে? আর দ্বিতীয়ত, তার দুর্ঘটনার মাত্র মাস তিনেকের মধ্যেই সৌমিলি তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিল কেন? সে কি মণীশ’কে ভালোবাসতো? এতটাই ভালোবাসতো যে, তার এই অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা জেনেও স্বেচ্ছায় তাকে বিয়ে করতে এগিয়ে এলো? এটা কি ভালোবাসা, না দয়া বা করুণা? কিন্তু সৌমিলি তো এত দয়ালু ছিল না কোনদিন! ওকে তো মণীশ বেশ স্বার্থপর বলেই জেনে এসেছে, অন্তত মণিকর্ণিকার কাছে তেমনই শুনে এসেছে এতদিন। তবে কি ভুল বলতো সে? মিথ্যে বলতো তাকে? কিন্তু কেন, কী লাভ তাতে?
সন্ধের পর একটা টিউশানি থাকে মণীশের। সাড়ে সাতটা থেকে সাড়ে নটা পর্যন্ত। সেদিন সেই টিউশানি থেকে ফিরছিলো সে। আকাশে মেঘ করেছিল,টের পায়নি,মাথার ওপর কয়েকবার বিদ্যুত্ চমকাতেই সে তাড়াতাড়ি পা চালিয়েছিল। সন্ধের পর মণীশ সাইকেল বা মোটর বাইক কোনটাই বের করে না,বরং একটু হাঁটে।
কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। বাজার পেরিয়ে ডানদিকের রাস্তাটা বাঁক নিতেই ঝমঝম করে নেমে পড়লো বৃষ্টি,মূহুর্তে ভিজিয়ে দিল মণীশকে। কাছেই একটা বড় জাম গাছ,সেটার নিচে আশ্রয় নিল সে। গাছের গোড়ায় একটা পাথরের ওপর হাঁটু মুড়ে বসে রইলো,গুটিসুটি মেরে। কারেন্ট ছিল না,রাস্তার বাতিগুলো শুধু অন্ধকার বিকিরণ করে চলেছিল। মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলকানিতে চকচক করে উঠছিল বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটাগুলো।
হঠাত্ই একটা ভারীমত কি যেন এসে পড়লো মণীশের হাঁটুর ওপর। কী পড়েছিল সেদিন? জাম গাছটার ডাল? নাকি অন্যকিছু? অনেক চেষ্টা করেও মণীশ কিছুই মনে করতে পারে না। যন্ত্রণায় কোঁকিয়ে উঠে সে পড়ে গিয়েছিল মাটিতে। তারপর তার আর কিছু মনে নেই।
প্রায় দেড়মাস বিছানায় শুয়ে থেকেছে মণীশ। মণিকর্ণিকা একদিন দেখা করতে এসেছিল,জানিয়ে গেছে তার বাধ্যবাধকতার কথা। এরপর থেকেই আনাগোনা শুরু হলো সৌমিলির। সৌমিলি সব জানে? মণীশ সেদিন ঝড়জলের রাতে জামগাছের নিচে মাটিতে পড়েছিলো,তার হাঁটুতে চোট লেগেছে,পা-দুটো অকেজো হয়ে গেছে,সব জানে? সব? কিন্তু কিভাবে? আশ্চর্য!
ওদিকে হারাধন সরকার এতদিন মেয়েকে নিয়ে এত অহংকার দেখিয়েছে,কিন্তু এবার খুবই ভেঙে পড়েছে সে। শেষে কিনা একটা পঙ্গু ছেলে তার একমাত্র জামাই হলো! তাও আবার তার মেয়ে নিজে আহ্বান করে নিয়ে এসেছে এই ছেলেকে। না না,মেয়ে এটা ভালো কাজ করেনি মোটেই। হারাধন মুখ ভার করে থাকে,হাসে না,কথা-টথা বিশেষ বলে না। বাইরে বের হলে অনেকে অনেক রকম প্রশ্ন করে,এক এক সময় রেগে গিয়ে তাদের বলে বসে,‘আপনাদের কি আর কোনও কাজ নেই? আমার মেয়ে যাকে খুশি বিয়ে করুক,তাতে আপনাদের কী? …” তারপর হনহন করে বাড়িতে ফিরে এসে দরজা বন্ধ করে ঘরে বসে থাকে।
কিন্তু হারাধনের স্ত্রী ঊর্মিলার ধরণ আবার ভিন্ন,মণীশের জন্য তার বড়ই মায়া। আহা,কী সুন্দর দেখতে ছেলেটা। ক’দিন আগেও ও হেঁটে-চলে দৌড়ে বেড়াতো,কত কাজ না জানি করতো। চাকরিও নিশ্চই পেতো একদিন,লেখাপড়া জানা ছেলে,ঘরে বসে থাকতো না নিশ্চই। আর চাকরি না পেলেও আরো কতো কিছু করার তো আছে,নিশ্চই করতো। তাছাড়া এখন ঘরে বসেও তো অনেক কিছু করা যায়,রোজগারও হয় তাতে। ওর তো শুধু পা দু’টো খারাপ,মাথা তো আর খারাপ নয়! ঊর্মিলার তাই জামাই পছন্দ হয়েছে বেশ। জামাই তো নয়,যেন নিজের ছেলে। কী আন্তরিক ব্যবহার,তাকে মা বলে ডাকে। বড় মায়া জন্মে গেছে ঊর্মিলার।
আগামী পর্বে সমাপ্য