ক্যাফে প্রবন্ধে রাইলী সেনগুপ্ত (পর্ব – ৩)

মেঠোপথের সন্ধানে

পর্ব – ৩

|| লোকনৃত্য ||

বাংলা লোক সংস্কৃতির একটি ধারা যা স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে গতি, মুদ্রা ও ছন্দের সমন্বয় কোন অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর জীবনের পরিস্ফুটন এবং কোন কঠোর নীতি অনুসরণ না করে বাস্তব জীবনের কাছাকাছি ও দলবদ্ধভাবে পরিবেশন হলো লোকনৃত্য।
শিল্পের একটি প্রাচীনতম অংশবিশেষ,প্রাচীন সমাজের বিভিন্ন রীতিতে প্রকাশিত হয়েছে। ভারতীয় গুহাচিত্রের আচার-অনুষ্ঠানে নৃত্যের পরিপূর্ণ প্রকাশ পর্যবেক্ষণযোগ্য।লোক জীবনের আঙ্গিকে পরিবেশিত এই লোকনৃত্যকে তার বৈচিত্র্য অনুযায়ী কয়টি ভাগে বিভক্ত করা যায়। অনেক ক্ষেত্রে লোক নৃত্যকে সামাজিক ও আচার যুক্ত স্বকীয় নৃত্য হিসেবে বিভক্ত করা গেলেও একে কয়েকটি ভাগে আলোচনা করা যায়-
ক. ছৌ:
পুরুলিয়ার এই নাচ পশ্চিমবঙ্গ ঝাড়খন্ড ও ওড়িশায় মুখোশ এর তারতম্যের
তিনটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পরিবেশিত হয় (পুরুলিয়া ছৌ, সরাইকেল্লা ছৌ,ময়ূ্রভঞ্জ ছৌ)।চৈত্রসংক্রান্তি থেকে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠের রহিন উৎসবে এবং শিবের গাজনে এই নাচ হয়। কখনো মহাকাব্যের কাহিনী ও এখানে প্রতিফলিত হয়।
খ.ঝুমুর:
রাঢ় বঙ্গের প্রচলিত ঝুমুর গানের সাথে মাদল, বাঁশী, করতাল সহযোগেদৈনন্দিন জীবনযাত্রার বিনোদনে অকৃত্রিম সুর ও তালের সমন্বয় এই নাচ করা হয়।
গ.নাচনি:
পুরুলিয়ার বিভিন্ন এলাকায় নাচের গুরুর কাছে মেয়েদের নৃত্য প্রশিক্ষণের জন্য বেচে দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে এরা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নৃত্য পরিবেশন করে, এদের নাচনি বলা হয়।
ঘ. টুসু:
সাধারণত মকর সংক্রান্তিতে বীরভূম, মেদিনীপুর, পুরুলিয়ার আদিবাসীরা ফসল ফলানোর কৃতজ্ঞতায় টুসু পরবে টুসু দেবীর গানের সাথে এই নাচ করেন।
ঙ. রায়বেঁশে:
ডান পায়ে ঘুঙুর পরে, ঢোল ও কাঁসির সহযোগে বড় বাঁশ দিয়ে বিভিন্ন রকমের ভঙ্গিতে তীর ছোড়া, বর্শা ছোড়া ইত্যাদির অভিনয়ের মাধ্যমে কোচবিহার, বর্ধমান, মুর্শিদাবাদ ইত্যাদি অঞ্চলের পুরুষরা এই নাচ করেন।
চ. ব্রিতা:
সংস্কার বশত বাংলার সন্তানহীন মহিলারা সন্তান লাভের পর অথবা বিভিন্ন রোগ থেকে নিরাময় লাভের পর দলবদ্ধভাবে এই নাচ করেন।
ছ.লাঠি:
মহরমের সময় লাঠির সহযোগে নিজের আবেগ প্রকাশ করতে ছেলেরা এই নাচ পরিবেশন করে।
জ. সাঁওতাল নাচ ও দাসাই:
সম্প্রদায় তাদের ঐতিহ্য পূর্ণ এই নাচ পরিবেশন করেন। ঝাড়খন্ড, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া ইত্যাদি অঞ্চলে সাঁওতাল নৃত্য দেখা যায়। এই বৃত্তের আরেকটি বিভাগ দাসাই, যা এক প্রকার যৌথভাবে পরিবেশিত যুদ্ধ নৃত্য।
ঝ.নাটুয়া:
এক মৃত শিল্পী মাটিতেশুয়ে পড়লে তার উপর এক একটি সারিতে চারজন করে বিভিন্ন সরঞ্জামের (জোয়াল,মই, চাকা ইত্যাদি) ও তালের (চৈতালি, ধুমসী ,হলুদখেড়ি ইত্যাদি) সহযোগে পুরুলিয়া জেলায় বন্দনা পরিবেশনের মাধ্যমে এই নাচ শুরু হয়।
ঞ.খ্যামটা: বারোয়ারির অনুষ্ঠান, দুর্গাপুজো, দোল ইত্যাদিতে দলবেঁধে মহিলাদের নাচকে খ্যামটা নাচ বলে।বর্তমানে এর জনপ্রিয়তা কিছুটা কম হলেও ইহা বাংলার
এক জনপ্রিয় নাচ হিসেবে পরিচিত ছিল।
ট.বিহু:
অসমে বিহু গান ও ঢোল,শিঙা, বাঁশী,গগনা,বীণ ইত্যাদি লোক বাদ্য সহযোগে মেখলা চাদর পরে টাকুরি ঘুরিয়ে এই নাচ পরিবেশিত হয়। দেউরী,মরান,মিচিং, জেং ইত্যাদি ভাগে বিহুকে বিভক্ত করা হয়।
ঠ.করম: ফসল পাকার আনন্দে মহিলা ও পুরুষ মিলে প্রধান পুরুষের তালপাখা দিয়ে হাওয়া দিতে দিতে এই নাচ পরিবেশন করা হয়।
ড. ভাংড়া:
ভারত, পাকিস্তান ও পাঞ্জাবে বৈশাখে উৎসবে এই নৃত্য করা হয়।
ঢ.কাঠি:
দীর্ঘদিনের অনুশীলনে রণপার ওপর দাঁড়িয়ে পুরুষরা এই নাচ করেন।
ণ. গাজন:বাংলায় চৈত্র মাসের শেষ সপ্তাহ জুড়ে ভক্তদের মাধ্যমে দেবতাকে তুষ্ট করতে বিভিন্ন
ভুত-প্রেত দৈত্য-দানব ইত্যাদি সেজে নাচ করা হয়। আগে গ্রামীণ জনসাধারণের সন্ন্যাসীরা গর্জন করে এই উৎসব করায় এর নাম হয় গাজন।
ত.বাউল:
একতারার সুরে বাউলের গানের প্রকাশিত হয় এই ভাবনৃত্য।
থ. ঢালি:
যশোহর, খুলনা জেলায় রাজা প্রতাপাদিত্যের ঢালি যোদ্ধাদের এক তান্ডব নৃত্য যা ঢোল , কাঁশি, তলোয়ারের সহযোগে হয়।
দ.জারি:
মহরমে পূর্ববঙ্গের মুসলিম নর্তকরা ডান পায়ে নূপুর, পরনে ধুতি ও লাল রুমাল এর সমন্বয়ে গোলাকার ভাবে সংঘবদ্ধ হয়ে এই নাচ করে।
এছাড়াও বিভিন্ন অঞ্চল ভেদে লোক নৃত্যের তারতম্য দেখা যায়:
ঝাড়খণ্ডের ছৌ নাচ, পাইকা ইত্যাদি; অরুণাচল প্রদেশের খামতি, বুইয়া ইত্যাদি; মনিপুরে মনিপুরী, রাসলীলা, লেহাব ইত্যাদি, ত্রিপুরায় বিজু, গাজন ইত্যাদি; কেরালায় কৃষ্ণ নাট্যম, মোহিনীঅট্টম, পান্না ইত্যাদি; রাজস্থানে ডান্ডিয়া, ঘুমর, ঝুমুর ইত্যাদি।
অঞ্চলভেদে ছাড়াও বৃত্তের ভঙ্গিমা অনুযায়ী লোকনৃত্যের আরো কয়েকটি শাখা রয়েছে, যথা: অঙ্গদানী, কালী, ঢাকী, কেরাই, ঘাটু, চাং, গম্ভীরা,ভাঁজো,বোলান, ব্রতচারী ,মেছেনি ইত্যাদি।

|| লোকনাট্য ||

বাংলার সংস্কৃতিকে ধারণ করে নিয়ে চলেছে এই লোক নাট্য। স্থান, সময়, পরিবেশ সজ্জা,সংলাপ ইত্যাদি সবকিছুর নিখুঁত মেলবন্ধনে সমাজের দর্পণ ও কাহিনীর প্রকাশ ঘটে লোকনাট্যে।
আলকাপ, পালাটিয়া, চন্ডী যাত্রা, লেটো, কাপ , মূকাভিনয়, মৈমনসিংহ গীতিকা, কৃষ্ণ যাত্রা, খৃষ্ঠ যাত্রা, মাছানি, নাথ গীতিকা ইত্যাদি লোক নাট্য বাংলার ঐতিহ্যকে বহন করে চলেছে। লোকনাট্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ হলো যাত্রা,যা সমাজের সচেতনতা বৃদ্ধি, পৌরাণিক কাহিনী, সামাজিক রাজনীতি ইত্যাদির প্রকাশ ঘটায়।
• পালাগান:
ধর্মীয়,সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে গীতিনাট্যের ন্যায় কোন ঘটনাকে গানের আকারে প্রকাশ করা হয় পালা গানের মাধ্যমে।
• পুতুল নাচ:
কাঠের পুতুলকে সুতো
বা কঞ্চি দিয়ে বেঁধে সাজিয়ে সংলাপ, গান ও কারুকার্যে এই নাটক পরিবেশিত হয়।
•ডোমনি:
মালদা জেলায় এই নাটক উপস্থাপন করা হয়।
|| লোক উৎসব ||
‘বারো মাসে তেরো পার্বণ’-এ যে উৎসব সামাজিক, ধর্মীয় ও ঐতিহ্যের বন্ধনকে প্রকাশ করে, তাই হল লোক উৎসব। বাংলায় নানান ধরনের লোক উৎসব প্রচলিত আছে – অরন্ধন, চড়ক, ঝুলন, পৌষ পার্বণ, রাস, অক্ষয় তৃতীয়া, জামাইষষ্ঠী, ইতু পুজো, ছট পুজো, বাহা পরব, ভাদু পরব ইত্যাদি উৎসব গুলি বাংলার ঐতিহ্যকে অটুট রেখেছে। বর্তমানে বিভিন্ন অঞ্চলে লোক উৎসবকে তার নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে বজায় রেখে পালন করা হয়।
সবশেষে, আমাদের হারানো শিকড়কে বারংবার উজ্জীবনে ফিরে যেতে হয় সেই সংস্কৃতির কাছে, যা নগরায়নের যুগেও নিজস্ব অস্তিত্বকে বাঁচিয়ে উপহার দেয় এক মুক্তির আস্বাদ।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।