গারো পাহাড়ের গদ্যে রনি রেজা

সমকালীন সাহিত্যে নারীপ্রীতি, মোহ ও স্ট্যান্ডবাজি

সাহিত্য যেহেতু সৃষ্টিশীল কর্ম তাই এর আলাদা শক্তি আছে। সৃষ্টির শক্তির সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই দায়বদ্ধতাও চলে আসে। আর যেখানে দায়বদ্ধতা যত বেশি থাকে সেখানে সতর্কতাও বেশি থাকতে হয়। নতুবা দুর্ঘটনার সম্ভাবনা থেকে যায়। সেই দায়ও একজন প্রতিশ্রুতিশীল সাহিত্যিক এড়াতে পারেন না। যিনি এড়িয়ে যান তিনি কবি-সাহিত্যিক নন। কারণ দায়বোধহীন কেউ কবি-সাহিত্যিক হন না। হতে পারেন না। নামধারী বা পোষাকধারী হতে পারেন। হতে পারেন সুবিধাবাদী। সে ভিন্ন ব্যাপার। ব্যতিক্রম কখনো ধর্তব্য নয়। তবে অবশ্যই আলোচ্য। স্বাভাবিকভাবেই সময়ের সঙ্গে কিছু প্রশ্ন তৈরি হয়। আলোচনা সামনে আসে। সেগুলোর সমাধানও নিশ্চয় আছে। সমকালীন সাহিত্যে নারীপ্রীতি, মোহ ও স্ট্যান্ডবাজি বিরাট প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্ভবত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণেই প্রশ্নটি বৃহৎ আকার পেয়েছে কিংবা প্রকাশ্যে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখা যায় একজন নারী নিজের দৃষ্টিনন্দন ছবির সঙ্গে দু’চার কথা লিখে দিলেই লাইক-কমেন্ট প্রশংসাবার্তায় ভরে ওঠে মুহূর্তে। এ প্রশংসায় কোনো আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু যখন একজন প্রতিষ্ঠিত কবি-সাহিত্যিক লেখাটি কোনো সাহিত্য হয়ে ওঠেনি বুঝেও শুধুমাত্র মোহের কারণে স্তুতিবাক্যে উস্কে দেন তখন সাহিত্য প্রশ্নবিদ্ধ হয়। ওই প্রতিষ্ঠিত কবি-সাহিত্যিকের নিশ্চয় অনেক ভক্ত থাকে। তরুণ অনেক কবি-সাহিত্যিক অগ্রজকে অনুসরণ করে। যখন অনুসরণীয় কবি-সাহিত্যিকের এমন মন্তব্য দেখে তখন ওটাকে মানদন্ড ধরে নিয়ে প্রভাবিত হতে পারে ওই তরুণ। এভাবে নিম্নমানের সাহিত্য ঢুকে পড়ে বিরাট আকারে। আবার কিছু সম্পাদকের মোহ ও স্ট্যান্ডবাজির কারণে অনেক গুরুত্বপূর্ণ লেখা স্থান পায় না। সেখানেও সুন্দরী নারীর মনগড়া লেখা (যা সাহিত্যই নয়) এবং নিজের বলয়ের কিছু মানুষের লেখা (সাহিত্যের বিচারে যা নিম্নমানের) স্থান পায়। এই প্রশ্ন সামগ্রীক সাহিত্যকে যেমন কলুষিত করেছে, একইসঙ্গে খাটো করেছে পরিশ্রমী নারী সাহিত্যিকদের। অনেক ক্ষেত্রে অনেক সম্ভাবনারও মৃত্যু হয় এসব কারণে। ফলে চূড়ান্ত ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয় সাহিত্যকেই। এখানে উল্লেখ করা জরুরি অনুভব করছি- যে সকল নারী সাহিত্যিক প্রতিশ্রুতিশীল, সত্যিকার সাহিত্য করেন কেবলমাত্র সাহিত্য দিয়েই টিকে রয়েছেন। সাহিত্যের ইতিহাসে নারী কখনোই দুর্বল নয়। বরং পুরুষের চেয়ে অনেক বেশি প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করে নারীকে এই সৃষ্টিশীল কাজে অংশ নিতে হয়। সমাজ-সংসারের কারণেই নারী গণ্ডিবদ্ধ। একজন নারী সাহিত্যিককে তার লেখার মান নিয়ে সন্তোষজনক পর্যায়ে পৌঁছাতে যত কাঠখড় পোড়াতে হয়, পুরুষ সাহিত্যিককে ততটা নয়। সাহসী নারী কবি-সাহিত্যিকেরা কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে তাদের কাজের ক্ষেত্রে গণ্ডি ভাঙছেন। এগিয়ে যাচ্ছেন। বিস্ময়কর সাহিত্যকর্ম আমাদের উপহার দিয়ে চলেছেন। এ সকল সাহিত্য পাঠ করলে স্পষ্টই বোঝা যায় সাহিত্যে নারীকে করুণা করার কিছু নেই। তবু যে সকল অগ্রজরা মোহের বসে কিংবা অন্য যে কোনো কারণে নিম্নমানের সাহিত্যকে উস্কে দেন তারা সাহিত্যের ক্ষতিই করে চলেন। তাদের দায়বদ্ধতার জায়গা প্রশ্নবিদ্ধ হয় প্রতিনিয়ত। এখান থেকেই প্রশ্ন আসে; কথা থাকে- সব কবি-সাহিত্যিক কি সামাজিক দায় পালন করেন বা করছেন? নির্দ্বিধায় বলা যায়- অবশ্যই নয়। যারা করছেন না, তারা বিকিয়ে যাওয়া! আর বিকিয়ে তো কোনো কিছু অর্জন হয় না। দৃশ্যত যা কিছু অর্জন তা ব্যক্তিটির হতে পারে। তা-ও সাময়ীক। প্রকৃতপক্ষে তারা হেরে যান। দায়িত্বের কাছে, প্রজন্মের কাছে,সময়ের কাছে এবং সব শেষে নিজের কাছে। হারান সাহিত্যকেও। প্রশ্ন তৈরি হয়, তবে কি এমন চেিত্র থেকে আর বেরোবে কালজয়ী কোনো অক্ষর! সেখানেও উত্তর হতাশাজনক। অন্য কথায়, এসব কবি-সাহিত্যিক কি নিজে নিশ্চিত করে বলতে পারবেন তিনি মহান কিছু লিখেছেন? ঠুনকো পাওয়ার আশায় তো তিনি বিকিয়েই গেছেন। মহান কিছু কি তখন আর বেরোনোর উপায় আছে? মহান কিছু বের হওয়া বা জমা থাকার আধার হয়ে ওঠা কি এত সহজ! সত্যিকার কবি-সাহিত্যিক গভীরে চোখ রাখেন, জন্ম থেকেই তাদের এই বিশেষ ক্ষমতা। কিন্তু কথা থাকে- বিশেষ এ চোখের সঠিক ব্যবহার হওয়া চাই। কালের বিচারে শ্রেষ্ঠত্বের আসন পাওয়ার জন্য। যদি এ চোখের ব্যবহার হয় ব্যক্তিস্বার্থে, তবে যা হওয়ার তা-ই হবে! কোনো কিছুই পাওয়া হবে না। বরং মাঝপথে অনেক কিছুই হারাতে হবে। আবার হতে পারে, ব্যক্তিটির আপাত লাভ হবে। কিন্তু গূঢ় অর্থে ভাবলে, ক্ষতিই বেশি হবে। নিজেই যিনি নিজের এমন ক্ষতি করেন, তিনি ভালো মানের বা মনের কবি-সাহিত্যিক নন। এ দুটির কোনো একটি ছাড়া তার দ্বারা সামাজিক দায় কতটুকু রক্ষিত হবে, ভাবনার বিষয়!
লেখক: কথাশিল্পী ও সাংবাদিক
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।